হংকং-এ, এক ব্যাংকারের বাড়িতে, জবাব দিল ইনশু। চীনারা দখলে যাবার আগে ভদ্রলোক তার সম্পদ বেঁচে দিয়ে মালয়েশিয়ায় সরে যাচ্ছেন। বছরখানেক সময় লাগলেও, শেষ পর্যন্ত তাকে আমি বেঁচতে রাজি করিয়ে ফেলি টেলিফোনে। দেরি না করে সাথে সাথে হংকং-এ চলে যাই, দর দাম করে জিনিসটা নিয়ে ফিরে আমি। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি আপনার অফিসে চলে এসেছি।
কত?
একশো পঁয়তাল্লিশ মিলিয়ন ইয়েন।
সন্তুষ্টচিত্তে দুহাতের তালু এক করে ঘষল সুমা। ভাল দামই বলব আমি। ধরে নিন, কিনলাম।
ধন্যবাদ, মি. সুমা। আপনি সত্যি উদার। শুধু আপনার কথা ভেবে আজিমার খোঁজে আরও লোক লাগাব আমি। পরস্পরকে বাউ করল ওরা, তারপর তোশি কুদোর পিছু পিছু কামরা থেকে বেরিয়ে গেল আশিকাগা ইনশু।
পেইন্টিংয়ের ওপর ফিরে এল সুমার দৃষ্টি। সৈকতে কালো পাথর ছড়িয়ে রয়েছে, জেলেদের ছোট একটা গ্রামও দেখা যাচ্ছে, একধারে কয়েকটা মাছ ধরার বোট। প্রতিটি জিনিসের আকার-আকৃতি দেখে মনে হয় যেন আকাশ থেকে ভোলা একটা ফটো। কি আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল সে। দ্বীপের যে ছবিটা আমি সবচেয়ে ভালবাসি শুধু সেটাই আমার কাছে নেই।
আজও যদি ওটার অস্তিত্ব থাকে, ইনশু ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলবে, বন্ধুকে সান্ত্বনা দিল কামাতোরি। লোকটাকে দেখে নাছোড়বান্দা বলে মনে হলো আমার।
আজিমার জন্যে কেচির চেয়ে দশ গুণ বেশি দাম দেব আমি।
একটা চেয়ারে বসে পা দুটো লম্বা করল কামাতোরি। আজিমা আঁকার সময় শিমজুর কোন ধারণা ছিল না, দ্বীপটা কিসের প্রতীক হতে যাচ্ছে।
কামরায় ফিরে এসে তোশি কুদো সুমাকে মনে করিয়ে দিল, দশ মিনিট পর আপনার সাথে মি. ইয়োশিশুর মিটিং।
প্রাচীন কাণ্ড চোর এবং গোল্ড ড্রাগনস-এর লীডার, বলল কামাতোরি, ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি। তোমার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে নিজের শেয়ার হিসেব নিতে এসেছেন।
ধনুক আকৃতির বিশাল জানালা দিয়ে পার্কের দিকে তাকাল সুমা। যুদ্ধের সময় ও পরে কোরোরি ইয়োশিশু আর আমার বাবা সে সংগঠনটা গড়ে তোলেন, তারই নিরেট ফল হলো আজকের এই প্রজেক্ট।
আগামী শতাব্দীর নিপ্পন-এর গোল্ড ড্রাগনস বা অন্যান্য গুপ্ত সংগঠনগুলোর কোন ভূমিকা থাকবে না, বলল কামাতোরি। নিপ্পন একটি প্রাচীন শব্দ, অর্থ হলো সূর্যের উৎস।
আমাদের আধুনিক টেকনলজির পাশে ওদেরকে বেমানান লাগে, স্বীকার করল হিদেকি সুমা, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে এখনও ওরা আমাদের কালচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ওদের সাথে আমার অনেক বছরের সম্পর্ক, তা থেকে আমি লাভবানই হয়েছি।
এ-সব ফ্যানাটিক্যাল গুপ্ত সংগঠন বা আন্ডারওয়ার্ল্ড ক্রাইম সিন্ডিকেটগুলোর সাহায্য না নিলেও চলে তোমার, ব্যাকুলস্বরে বলল কামাতোরি। মন্ত্রিসভায় তোমার পুতুলের সংখ্যা কম নয়, তোমার হুকুম পালন, করার জন্যে এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে সবাই। তারপরও কেন যে তুমি…, কথা শেষ না করে কাঁধ ঝকাল সে, বলল, যদি কোন দিন ফাঁস হয়ে যায় যে তুমি দুনম্বর ড্রাগন, বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে তোমাকে।
কারও কাছে আমি বাঁধা পড়ি নি, শান্তভাবে ব্যাখ্যা করল সুমা। আইন যেটাকে ক্রিমিন্যাল অ্যাকটিভিটি বলে, তার সাথে আমার পরিবার দুই শতাব্দী ধরে জড়িয়ে আছে। পূর্ব-পুরুষদের পায়ের ছাপ ধরে এগোচ্ছি আমি, তাদের রেখে যাওয়া ভিতের ওপর গড়ে তুলছি একটা সংগঠন। আমি গর্বিত, কারণ এ-ধরনের শক্তিশালী সংগঠন দুনিয়ার খুব কম দেশেই আছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের বন্ধুদের জন্যেও আমি গর্বিত, লজ্জিত নই।
আমি আরও খুশি হতাম তুমি যদি সম্রাটের প্রতি সম্মান দেখাতে, গুরুত্ব দিতে পুরানো নৈতিক মূল্যবোধকে।
দুঃখিত, কামাতোরি। তীর্থ মন্দিরে গিয়ে বাবার জন্যে প্রার্থনা করি বটে, তবে পৌরাণিক কাহিনীর ঈশ্বরতুল্য সম্রাটের ওপর আমার কোন শ্রদ্ধা নেই। চা পান অনুষ্ঠানে গিয়ে গেইসাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, কাবুকি খেলায় অংশগ্রহণ করা, কানোইয়া কুস্তি দেখা, কিংবা জাতীয় কালচারকে শ্রেষ্ঠ বলে গর্ব বোধ করা, কোনটাই আমার দ্বারা সম্ভব নয়। নতুন যে থিওরিটা আজকাল শোনা যাচ্ছে ঐতিহ্য, ইন্টেলিজেন্স, আবেগ, ভাসা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের তুলনায় আমরা শ্রেষ্ঠ, এর সঙ্গেও আমি একমত নই। এই সব আইডিয়া বা মতবাদ আমি সমর্থন করি নিজের স্বার্থের কথা ভেবে, কিন্তু এ সবে আমার বিশ্বাস নেই। সত্যি কথা বলতে কি, আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছোট করে দেখতে রাজি নই। আমিই আমার ঈশ্বর, বিশ্বাস করি টাকা আর ক্ষমতায়। তুমি কি রেগে যাচ্ছ, মুরো?
কোলের ওপর পড়ে থাকা হাত দুটোর দিকে তাকাল কামাতোরি। চুপচাপ বসে থাকল সে, চোখে বিষাদের ছায়া। অবশেষে সে বলল, না, মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি সম্রাটকে শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি আমাদের ঐতিহ্যবাহী কালচারকে। তার পরিবারের উৎস বা রুটস যে পবিত্র স্বর্গ, এ আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি আমাদের এই দ্বীপগুলোর ওপর ঈশ্বরের বিশেষ দৃষ্টি ও ভালবাসা আছে। আমাদের রক্তে কোন ভেজাল নেই, আমাদের গোটা জাতির আত্মা এক সুতোয় গাঁথা। তবে আমি তোমাকেও অনুসরণ করি, হিদেকি। কারণ আমরা পুরোনো বন্ধু। কারণ, তোমারে আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশন আমার পছন্দ না হলেও, জাপানকে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত করার জন্যে বিরাট অবদান রয়েছে তোমার।
