মুরো কামাতোরিকে নিয়ে গোপন একটা এলিভেটরে চড়ল সে, নেমে এল মূল সিলিন্ডারের পাঁচতলায়। পাঁচতলার পুরোটা জুড়ে তার করপোরেট অফিস। প্রাইভেট অফিস ও অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সশস্ত্র প্রহরীরা সারাক্ষণ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। দরজা খুলে গেল, ভেতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সেক্রেটারি তোশি কুদো।
কামরাগুলোর জানালা-দরজা ও দেয়াল ঢাকা হয়েছে ব্রোকেড, সাটিন ও ক্রেপ দিয়ে। দেয়ালের ওপরের অংশে অনেকগুলো পেইন্টিং, বেশিরভাগই প্রাকৃতিক দৃশ্য। তবে ড্রাগন চিতা, হরিণ ও ঈগলও আছে।
মি. আশিকাগা ইনশু অপেক্ষা করছেন, সবিনয়ে জানাল মুশি ততশি।
নামটা তো আমার মনে পড়ছে না।
মি. ইনশু একজন ইনভেস্টিগেটর। দুর্লভ শিল্প খুঁজে বের করা ভদ্রলোকের পেশা, এ-ব্যাপারে তাকে একজন বিশেষজ্ঞ বলা যেতে পারে। শুধু খুঁজে বের করাই নয়, নিজের ক্লায়েন্টকে কিনে দেয়ার জন্যে মধ্যস্থতাও করেন, ব্যাখ্যা করল তোশি কুদো। আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, এমন একটা পেইন্টিং আবিষ্কার করেছেন তিনি, যেটা আপনার কালেকশনে নতুন একটা মাত্রা যোগ করবে। আপনার সাথে আলোচনা না করেই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করেছি আমি, ভদ্রলোক যাতে পেইন্টিংটা আপনাকে দেখানে পারেন।
কিন্তু আমার হাতে সময় খুব কম, বলে হাতঘড়ি দেখল হিদেকি সুমা।
কাঁধ ঝাঁকাল মুরো কামাতোরি। কি এনেছে দেখই না একবার, সুমা। এমন হতে পারে তুমি হয়তো এই পেইন্টিংটাই খুঁজছ।
ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও যাবতীয় অপকর্মের সহযোগীর দিকে একবার তাকাল সুমা, তারপর সেক্রেটারিকে বলল, ঠিক আছে, ডেকে পাঠাও তাকে।
আর্টডিলার কামরায় ঢুকতে তার উদ্দেশ্যে মাথা নত করে বাউ করল সুমা। মি. ইনশু, শুনলাম আপনি নাকি আমার জন্যে দুর্লভ একটা জিনিস যোগাড় করেছেন?
জী, আমার তাই ধারণা। আপনার জন্যে কি যোগাড় করেছি, দেখলে আমার ওপর ভারি খুশি হবেন আপনি। আশিকাগা ইনশুর মাথায় রূপালি কেশর, তার গোঁফ জোড়া অস্বাভাবিক চওড়া, ঘন ভুরু। সুমার চোখে চোখ রেখে হাসছে সে।
আলোয়, স্ট্যান্ডে রাখুন এটা, প্লীজ, বলল সুমা, হাত তুলে বড় একটা জানালার সামনে ইজেলটা দেখিয়ে দিল।
জানালার পর্দা আরেকটু তুলে দিতে পারি?
প্লীজ ডু সো।
জানালার পর্দা সামান্য সরিয়ে ইজেলে পেইন্টিংটা চড়াল আশিকাগা ইনশু, তবে সিল্কের আবরণটা সরাল না। ষোড়শ শতাব্দীর একটা মাসাকি শিমজু।
শ্রদ্ধেয় সীস্কেপ আর্টিস্ট, বলল কামাতোরি, গলার স্বরে চাপা উত্তেজনা। তোমার প্রিয় আর্টিস্টদের একজন, সুমা।
আপনি জানেন আমি শিমজুর একজন ভক্ত? আশিকাগ ইনশুকে জিজ্ঞেস করল সুমা।
আপনি যে তার কাজ সংগ্রহ করেন, শিল্প জগতের সবাই তা জানে। বিশেষ করে আমাদের চারপাশের দ্বীপগুলোর যে ছবি তিনি এঁকেছেন।
তোশি কুদোর দিকে ফিরল সুমা। তার ছবি কটা যেন আছে আমার কালেকশনে?
তার আকা দ্বীপের ছবি মোট তেরোটা, তার মধ্যে এগারোটা আছে আমাদের সংগ্রহে। আরও আছে হাইড়া পাহাড়ের ওপর করা চারটে ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টি।
আর একটা যোগ হলে দ্বীপের ছবি হবে মোট বারোটা?
জী।
শিমজুর আঁকা কোন দ্বীপের ছবি এনেছেন আপনি আমার জন্যে, মি. ইনশু? জিজ্ঞেস করল সুমা, আগ্রহে চকচক করছে তার চোখ জোড়া। আজিমা?
না, কেচি।
হতাশায় মগ্ন হয়ে গেল সুমার চেহারা। আমি আশা করেছিলাম ওটা আজিমা হবে।
সত্যি আমি দুঃখিত, বলল আশিকাগা ইনশু, আজিমা সংগ্রহ করতে না পারাটা যেন তার ব্যক্তিগত পরাজয়। সভ্যতার দুর্ভাগ্য, জার্মানির পতনের সময় আজিমা হারিয়ে গেছে। ওটাকে শেষবার দেখা গেছে আমাদের বার্লিন দূতাবাসে, অ্যামব্যাসাডরের অফিসের দেয়ালে, উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালের মে মাসে।
আপনি খোঁজ করতে রাজি হলে সমস্ত খরচ আমি বহন করব।
ধন্যবাদ, বলল আশিকাগা ইনশু, সুমার উদ্দেশ্যে মাথা নত করল। ইউরোপ ও আমেরিকায় আমার লোকজন অনেক আগে থেকেই ওটা খুঁজছে।
গুড। এবার কেচি আইল্যান্ড দেখান আমাদের।
নাটকীয় ভঙ্গিতে সিল্ক আবরণটা সরাল আশিকাগা ইনশু পাখির চোখ দিয়ে দেখা একটা দ্বীপের ছবি, উজ্জ্বল রঙের বিপুল সমাহার চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
শ্বাসরুদ্ধকর, বিড় বিড় করল তোশি কুদো, মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
একমত হয়ে মাথা ঝাঁকাল ইনশু। শিমজুর এত ভাল কাজ আমি আর দেখি নি।
তোমার কি মনে হয়, সুমা? জানতে চাইল কামাতোরি।
হা মাস্টারওয়ার্ক, বলল সুমা, শিল্পীর প্রতিভা প্রায় বিহ্বল করে তুলেছে তাকে। এ স্রেফ অবিশ্বাস্য! ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে আকাশের অত ওপর থেকে দেখা এ রকম একটা দৃশ্য তিনি আঁকলেন কিভাবে। ছবির প্রতিটি বিবরণ কি নিখুঁত, লক্ষ করেছ? যেন মনে হয় একটা বেলুনে ভাসমান অবস্থায় এঁকেছেন।
কিংবদন্তী আছে, উনি নাকি একটা ঘুড়ির ওপর বসে এটা এঁকেছিলেন, বলল মুশি তোশি।
ঘুড়িতে বসে সম্ভবত স্কেচ করেছিলেন, শুধরে দেয়ার সুরে বলল আশিকাগা ইনশু। দৃশ্যটা আসলে আঁকা হয়েছে মাটিতে দাঁড়িয়েই।
অবাক হবার কিছু নেই। মুহূর্তের জন্যেও পেইন্টিং থেকে নড়ছে না সুমার চোখ। বিশাল আকৃতির ঘুড়ি তৈরি করার হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে আমাদের। অবশেষে ঘাড় ফিরিয়ে আশিকাগা ইনশুর দিকে তাকাল সে। সত্যি একটা কাজের কাজ করছেন আপনি, মি. ইনশু। এটা আপনি পেলেন কোথায়?
