দেখার দরকার নেই, বলল লরেন। আমি তার গন্ধ পেয়েছি।
বললে বিশ্বাস করবে, সে আমার ম্যাসাঞ্জার ছিল?
কফির কাপটা পিটের নাগালের মধ্যে বাড়িয়ে ধরল লরেন। মন্দ নয়। তোমার উদ্ভাবনী শক্তি এ-প্লস।
আমাকে ঠকানো হয়েছে, অভিযোগ করল পিট। কাপটা মাত্র অর্ধেক ভর্তি।
নিশ্চয় তুমি চাওনি গোটা চাদরে ছলকে পড়ক কফি? হেসে উঠল লরেন। চাদরটা কোমরে জড়িয়ে যাও, বাথরুমে গিয়ে ঢোকো, গোসল করে গা থেকে ধয়ে ফেলো সমস্ত পারফিউম। গন্ধটা খারাপ নয়, স্বীকার করছি। বেশ দামী। ইতোমধ্যে আমি ব্রেকফাস্ট তৈরি করে ফেলি।
আট ঘণ্টায় দ্বিতীয়বার শাওয়ার সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে পিট দেখল, রুটিতে মাখন লাগাচ্ছে লরেন। কোমরে মুদু তোয়ালে, তাড়াতাড়ি বেডরুমে ঢুকে কাপড় পরে নিল ও। কিচেন থেকে ডাক দিল লরেন, এত দেরি করছ কেন?
অনেকদিন পর দেখা হলো, কিচেনে ঢুকে লরেনের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল পিট। কেমন আছ তুমি, লরেন?
ভাল। অ্যাডমিরাল স্যানডেকার আমাকে বললেন, তোমার একটা প্রজেক্ট নাকি ভেস্তে গেছে। মারাই যেতে, একটুর জন্যে বেঁচে গেছ।
ব্যাপারটা গোপন থাকার কথা, বলল পিট।
গোপন তথ্য জানার বিশেষ অধিকার আছে কংগ্রেস সদস্যদের। মুখে এক টুকরো আপেল ফেলল লরেন। প্রজেক্টটা নষ্ট হওয়ায় সত্যি আমি দুঃখিত। তোমাকে হারাতে হয়নি, তাতেই আমি খুশি।
প্রজেক্ট নষ্ট হলেও, সবগুলো টেস্টের রেজাল্ট রক্ষা করা গেছে।
লরেনের নিয়ে আসা দৈনিক পত্রিকাটা তুলে নিয়ে চোখ বুলাল পিট। এক মিনিট পর বলল, জাপানি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আবার দেখছি বিবৃতি দিচ্ছে তুমি। মুখ তুলে হাসল ও।
কফির কাপে চুমুক দিল লরেন। আমাদের ব্যবসার মালিকানা এক তৃতীয়াংশ চলে গেছে টোকিয়োতে। তারই সাথে চলে গেছে জাতির গর্ব, সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা। আমেরিকা এখন আর আমেরিকানদের নেই। আমরা এখন জাপানের অর্থনৈতিক উপনিবেশ।
সত্যি এতটা খারাপ?
কতটা খারাপ সাধারণ মানুষের ধারণা নেই, বলল লরেন, পিটের জন্যে কফি ঢালল কাপে। বাজেটে বিপুল ঘাটতি আমাদের অর্থনীতিতে প্রকাণ্ড একটা গর্তের সৃষ্টি করেছে, সেটা দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়েছে জাপানি টাকা।
কফির কাপটা তুলে নিয়ে পিট বলল, সেজন্যে আমরাই দায়ী। আমরা বেশি ভোগ করি, ওরা কম ভোগ করে, ফলে দিনে দিনে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে তোমাদের। টেকনলজির যে-সব শাখায় আমরা এগিয়ে আছি, ফমূলাগুলো হয় চুরি যায়, না হয় আমরা ওদের কাছে বিক্রি করে দিই।
কী ব্যাপার? এতো বড় ভাষণ? সিনেটে যোগ দেবে নাকি?
দুদিন গাড়িগুলোর একটা যত্ন নেব, বলল পিট। স্টাজটাকে ঘষেমেজে ঠিক করে নিতে পারলে ক্লাসিক কার রেসে অংশগ্রহণও করতে পারি।
গায়ে-হাতে গ্রীজ লাগানোর চেয়ে অনেক ভালো একটা কাজ আমার জানা আছে, আচমকা খসখসে গলায় বলে লরেন।
দারুণ একটা আকর্ষণ বোধ করছে পিট। ধীরে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো উঠে দাঁড়ায় সে। এগিয়ে যায় লরেনের দিকে।
বিছানায় নয়, রুদ্ধস্বরে লরেন বলে। অন্তত, চাদরটা না পাল্টালে নয়!
.
২৭.
মুরমটো টিল্ট-রোটর এক্সিকিউটিভ জোন থেকে নেমে এল হিদেকি সুমা, তার ঠিক পিছনেই হয়েছে মুরো কামাতেরি। প্লাস্টিকের প্রকাণ্ড একটা গম্বুজের পাশে হেলিপোর্টে ল্যান্ড করল প্লেন। ঘন গাছপালায় ঢাকা পার্কের মাঝখানে পঞ্চাশ মিটার। উঁচু গম্বুজটা আসলে মাটির নিচে এড়ো সিটি-তে নামার একটা প্রবেশ পথ।
এডো সিটিকে জাপানের নতুন আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্রন্টিয়ার বিবেচনা করা হয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও যুদ্ধ পরিচালনার মূল ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এডো সিটির ধারণা হিদেকি সুমার মাথা থেকে বেরোয়, নকশা ও নির্মাণও তার নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ষাট হাজার লোক কাজ করছে এখানে। মাটির নিচে প্রকাণ্ড সিলিন্ডার আকৃতির, বিশতলা বিল্ডিংটায় বিজ্ঞানীরা সপরিবারে বাস করেন। এক হাজার সদস্যের একটা সিকিউরিটি ফোর্সও আছে শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে।
মাটির নিচে একই আকৃতির আরও কয়েকটা সিলিন্ডার আছে, প্রধান সিলিন্ডারের সাথে সেগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করা হয় টানেলের মাধ্যমে। কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট, হিটিং ও কুলিং সিস্টেম, টেমপারেচার ও তিউমিডিটি নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ওয়েস্ট প্রসেসিং মেশিনারির জন্যে আলাদা আলাদা বিল্ডিং। গোটা এভো সিটি সিরামিক কংক্রিট দিয়ে তৈরি, মাটির নিচে একশো পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত গভীর।
সরকারী কোন সাহায্য ছাড়াই প্রজেক্টের কাজ শেষ করেছে হিদেকি সুমা। আইনগত বাধা বা অন্যান্য ঝামেলার কারণে নির্মাণ কাজে যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় নি তা নয়, তবে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব খাঁটিয়ে সে সব সমস্যা দূর করেছে সে। টোকিওর কুখ্যাত ক্রিমিন্যালরা তাকে গুরু হিসেবে মান্য করে। স্মাগলার ও হেরোইন ব্যবসায়ীদের পুঁজি সরবরাহ করে সে। ঘুষখোর সরকারী কর্মকর্তারা তার ভক্ত। দুর্নীতিপরায়ণ অসৎ রাজনীতিকরা তার কাছ থেকে সাহায্য ও নিরাপত্তা পেয়ে অভ্যস্ত। তাছাড়া, জাপানি কালচারের প্রতি অন্ধ ভক্ত ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ফ্যানাটিকরা তো আছেই। হিদেকি সুমা নিজেই একটা সরকার, তার কাজে বাধা দেয় এমন শক্তি জাপানে নেই।
