হিরাম ইয়েজারের গাড়ি হ্যাঙ্গারের বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে, হেডলাইটের আলো পড়েছে ওদের গায়ে। পটোম্যাক নদীর ওপার থেকে আলোকিত শহরের আভাও এসে পড়েছে এ দিকটায়। আর মাত্র একটি আলোর উৎস চোখে পড়ে দুশো মিটার উত্তরে জ্বলছে নিঃসঙ্গ একটি রোড ল্যাম্প। আশপাশে লোকবসতি নেই, রাস্ত টাও নির্জন।
লিফট দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ, বলল পিট। ধন্যবাদ সমস্যা সমাধানে সাহায্য করার জন্যে। সেই কবে শেষবার ঘুমিয়েছি মনে করতে পারছি না, আমাকেও বিছানায় উঠতে হবে।
গাড়িতে চড়ে হিরাম ইয়েজার বলল, তুমি কোন সমস্যা নিয়ে এলে তবেই আমার মাথা খোলে। যদি কোনদিন বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ভেদ করতে চাও, আমার কাছে চলে এসো। জানালা দিয়ে হাত বের করে নাড়ল সে, গাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হিরাম ইয়েজার চলে যাবার পর পকেট থেকে একটা স্পেয়ার ট্রান্সমিটার বের করল পিট। এটা নুমা অফিসে রাখে ও। কয়েকটা বোতামে চাপ দিয়ে হ্যাঙ্গারের সিকিউরিটি সিস্টেম বন্ধ করে দিল, তারপর ভেতরের আলো জ্বালাল। পাশের একটা দরজা খুলে হ্যাঙ্গারে ঢুকল, ঘুমে বুজে আসছে চোখ। ভেতরে মেঝেটা চকচক করছে, একটু ময়লা নেই কোথাও। কার মিউজিয়াম না বলে, এটাকে আসলে বলা উচিত ট্র্যান্সপোর্ট মিউজিয়াম। এক কোণে মান্ধাতা আমলের একটা রেলরোড পুলম্যান কার-এর পাশে দেখা যাচ্ছে। পুরানো ফোর্ড ট্রাইমোটর এরোপ্লেন। বাকি দশ হাজার বর্গ মিটার দখল করে রেখেছে পঞ্চাশটার ওপর মোটর গাড়ি। ব্রিটিশ গাড়ির মধ্যে রয়েছে দুর্লভ একটা হিসপানো-সুইজা। একটা মার্সিডিজ-বেঞ্জ রয়েছে ফিফটিফোর ওকে, আর একটা জর্ডান-লাগো। ওগুলোর পাশেই জায়গা করে নিয়েছে কয়েকটা আমেরিকান ক্লাসিক কার-একটা কর্ড এল টোয়েটিনাইন, একটা পীয়ার্স-অ্যারো ও পান্না সবুজ স্টাজ টাউন কার। পরিবেশের সাথে একেবারেই বেমানান এমন জিনিস একটাই দেখা গেল হ্যাঙ্গারে, তা হলো ঢালাই করা লোহার একটা বাথটাব, ব্যাকরেস্টে জোড়া লাগানো রয়েছে আউটবোর্ড মোটর।
প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি বেয়ে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে উঠে এল পিট, এখান থেকে ওর কালেকশনগুলো পরিষ্কার দেখা যায়। এককালে যেটা অফিস ছিল, নতুন করে সাজিয়ে সেটাকেই আরামদায়ক এক রূপের অ্যাপার্টমেন্টে বানিয়ে নিয়েছে ও, সাথে আছে বড় একটা লিভিং রুম সেটাকে স্টাডি হিসেবেও ব্যবহার করা চলে। শেলফে প্রচুর বই আছে, আর আছে জাহাজের অনেকগুলো মডেল।
কিচেন থেকে সুন্দর একটা গন্ধ ভেসে আসছে, জিভে পানি বেরিয়ে এল পিটের। ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা ফুলদানিতে একগাদা গোলাপ রয়েছে, মাঝখানে একটা কাগজ। ভাজ খুলে লেখাটা পড়ার সময় আপন মনে হাসল পিট।
শুনলাম শহরে তোমার শুভাগমন ঘটেছে। রেফ্রিজারেটরে কয়েক মাস আগে রাখা সমস্ত তরিতরকারি পচে গিয়েছিল, কাজেই সব ফেলে দিলাম। ভাবলাম তোমার খিদে পাবে, তাই এক প্লেট সালাড বানিয়ে রেখে গেলাম। স্টোভে গরম হচ্ছে কচি বাছুরের নরম কাঁধ। তোমাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্যে থাকতে পারছি না বলে দুঃখিত, হোয়াইট হাউসের ডিনারে উপস্থিত না থাকলেই নয়।
লাভ,
এল।
ওখানে দাঁড়িয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন মনটাকে একটা সিদ্ধান্তে আসার তাগাদা দিচ্ছে ডার্ক। আগে খাবে, তারপর শাওয়ার সারবে কিনা? নাকি প্রথমে ভিজবে? সিদ্ধান্ত নিল, পেটখালি রাখতে নেই। ঢোলা একটা আলখেল্লা পরল ও, তারপর টেবিলে বসে সালাদ ও ভরপেট মাংস খেল। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্লেটগুলো ধুচ্ছে, এই সময় ফোন এল।
হ্যালো? ^
মি. ডার্ক পিট?
হ্যাঁ, মি. রেইমন্ড জর্ডান, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডিরেক্টর-এর গলাটা চিনতে পেরে বলল পিট। আপনার জন্যে কি করতে পারি আমি?
আশা করি আপনার ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছি না।
আর দশ মিনিট পর শুতে যাব।
মি. অ্যাল জিওর্দিনের সাথে আপনার কথা হয়েছে কিনা জানার জন্যে ফোন করছি আমি।
হ্যাঁ, আপনার সাথে কথা হবার পরই ফোন করে সে আমাকে।
আমার অনুমতি ছাড়াই অন্যান্য লোকদের সাহায্য নিয়েছেন আপনি, তবু আবিষ্কারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার ওপর আমি অসন্তুষ্ট নই, বললেন রেইমন্ড জর্ডান। অন্যান্য লোক বলতে নুমার কমপিউটার বিজ্ঞানী হিরাম ইয়েজার ও পরমাণু বিজ্ঞানী ডক্টর ন্যাশের কথা বলছেন তিনি। ওদের দুজনেরই এ-প্লাস সিকিউরিটি ক্লিয়ার্যান্স আছে। একটা গাড়ির ঠিক কোথায় অ্যাটম বোমা লুকিয়ে রাখা যেতে পারে, জানার জন্যে ওদের সাহায্য নিয়েছে পিট।
আমাকে একটা দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেটা আমি নিজস্ব পদ্ধতিতে পালন করব। আপনি অসন্তুষ্ট হলেও আমার কিছু করার ছিল না, বলল পিট।
হ্যাঁ, বুঝতে পারছি একা কাজ করতে পছন্দ করেন আপনি।
আর কি জানতে চান, মি. রেইমন্ড জর্ডান? বিছানায় ওঠার জন্যে অস্থির হয়ে আছে পিট।
ভাবলাম আপনি জেনে খুশি হবেন যে বম্ব ক্যারিয়ারগুলো পেয়েছি আমরা।
ছটা গাড়িই? জিজ্ঞেস করল পিট, অবাক হয়ে গেছে। এত তাড়াতাড়ি?
হ্যাঁ। ওয়াশিংটনে, একটা জাপানি ব্যাংক বিল্ডিংয়ে লুকানো রয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টে সীল করে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনের সময় ধুলো ঝেড়ে নির্দিষ্ট টার্গেটে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর ডিটোনেট করা হবে।
