আমার তা মনে হয় না। আপনারও তা মনে হবে না, যদি স্মরণ রাখেন যে আপনাদের বাজেট ঘাটতির শতকরা পঞ্চাশ ভাগ যোগান দিচ্ছে জাপানি পুঁজিপতিরা, উদার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল ইচিরো সুবোই। আপনাদের কারেন্সির জায়গা দখল করবে আমাদের কারেন্সি, এটা তো স্রেফ সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আপনি বোধহয় বলতে চাইছেন, মি. ইচিরো, আমেরিকা ও জাপান আরও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুললে ডলারের জায়গা এমনিতেই দখল করে নেবে ইয়েন। কিন্তু আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিভাবে হতে পারে, বলবেন কি? আমেরিকায় জাপানের যে-সব শাখা ব্যাংক কাজ করছে, সমস্ত আমেরিকান ব্যাংকের সর্বমোট অ্যাসেট-এর চেয়ে ওগুলোর অ্যাসেট অনেক বেশি। এ-দেশে জাপানি মালিকদের অধীনে এক মিলিয়ন আমেরিকান চাকরি করছে। আপনাদের লবিস্টরা পারলে আমাদের সরকারকে কিনে ফেলেন। জাপানিরা চল্লিশ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইউএস রিয়েল এস্টেটের মালিক হয়েছে। এরপর আরও ঘনিষ্ঠ কিভাবে আমরা হতে পারি, বলবেন কি, মি. ইচিরো?
অমায়িক হাসি ফুটল ইচিরো সুবোইর মুখে। আপনাদের প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস আমাদেরকে আশ্বাস দিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হবার পথ খুলে দিতে পারেন–কথা দিতে পারেন, আমাদের পুঁজি ও পণ্য আপনাদের বাজারে কখনোই নিষিদ্ধ করা হবে না। আমরা আরও একটা ব্যাপারে নিশ্চয়তা চাই, বিনা ভিসায় জাপানিদেরকে আমেরিকায় ঢুকতে দিতে হবে।
কিন্তু যদি এ-ধরনের চিন্তাকে আমরা প্রশ্রয় না দিই?
কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিষ্ঠুর হাসি হাসল ইচিরো সুবোই। আমরা পাওনাদার জাতি। আপনারা দেনাদার, গোটা দুনিয়ায় আপনারাই সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছেন জাপানের কাছ থেকে। কাজেই, তখন বাধ্য হয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে আমাদেরকে। আমার ভয় হচ্ছে, সেটা আপনাদের জন্যে প্রীতিকর হবে না।
তার মানে আমেরিকা জাপানিদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে, আপনি বলতে চাইছেন?
এ-পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাবার রাস্তা আপনাদের জন্যে আমরা ভোলা রেখেছি, বলল ইচিরো সুবোই। আপনাদের এখন পতনের সময়। আর জাপানের সময় উত্থানের। কাজেই বাঁচতে হলে নিজেদের মেথড পরিহার করে আমাদের মেথড গ্রহণ করুন। আপনাদের নাগরিকদের উচিত আমাদের সংস্কৃতি আরও ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করা। তাহলে কিছু একটা শিখতেও পারে তারা।
সেজন্যেই কি নিজের দেশের বাইরেও জাপানি কোম্পানিগুলো শুধু জাপানিদের চাকরি দিচ্ছে?
টপ পজিশনে নয়। শুধু নিস্তরের ম্যানেজার, সেক্রেটারি, ক্লার্ক আর পিয়নদের চাকরি দেন। তা-ও শুধু পুরুষদের, মহিলারা বাদ পড়ে যাচ্ছে। আরেকটা কথা বলা দরকার, জাপানি কোম্পানিগুলো শ্রমিক ইউনিয়নকে কোন পাত্তাই দিতে চায় না।
উত্তর দেয়ার আগে উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করল ইচিরো সুবোই। অবশেষে বলল, আপনাকে বুঝতে হবে যে আমরা সংস্কারকে প্রশ্রয় দিই না। পশ্চিমারা আমাদের পদ্ধতির ভক্ত নয়, কাজেই তাদেরকে টপ পজিশনে বসিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক ক্ষতি করতে রাজি নই আমরা। এ-কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পশ্চিমারা আমাদের কালচারকে ভাল চোখে দেখে না। আপনিই বলুন, আমাদের কালচারের ওপর যাদের ভক্তি নেই, তাদেরকে আমরা কিভাবে টপ পজিশনে বসাই?
আমাদের দেশে বসে ব্যবসা করতে এসে আমাদেরকেই আপনারা অবজার্ভ করবেন, এমন আচরণ করবেন যেন আমরাই বিদেশী, এটা কি মেনে নেয়ার মত একটা ব্যাপার, মি. ইচিরো?
এটা দুর্ভাগ্যজনক, মিস লরেন। আমরা আপনাদের অবজ্ঞা করি, এটা ঠিক নয়। আমরা ব্যবসায়ী, বোকার মত কোন ঝুঁকি না নিয়ে লাভ করতে ভালবাসি।
হ্যাঁ, জাপানি ব্যবসায়ীদের স্বার্থপরতা সম্পর্কে আমরা সচেতন। ব্যবসা করার নামে আপনারা সাপের গালেও চুমো খান, ব্যাঙের গালেও। পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ান ব্লকে আপনারা স্ট্রাটেজিক মিলিটারি কমপিউটার টেকনলজি বিক্রি করছেন। আপনার মত করপোটে এক্সিকিউটিভের কাছে রাশিয়া, জার্মানি, কিউবা, ইরান, লিবিয়া, স্রেফ খদ্দের।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা মতাদর্শ আমাদের মাথাব্যথা নয়। ব্যবসায়িক স্বার্থেই ও-সব আমরা তুচ্ছ জ্ঞান করি।
আর একটা প্রশ্ন, বলল লরেন স্মিথ। এ-কথা কি সত্যি, আপনাদের সরকার গোটা হাওয়াই রাজ্য কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিতে চাইছেন, জাপানের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি ব্যালান্স করার জন্যে?
উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ না করে সাথে সাথে জবাব দিলেন ইচিরো সুবোই, হ্যাঁ, সরকারকে প্রস্তাবটা বিবেচনা করার প্রস্তাব দিয়েছি আমি। হাওয়াই-এ জাপানিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ওখানে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার শতকরা বাষট্টি ভাগ আমরা নিয়ন্ত্রণ করছি। আমি আরও প্রস্তাব দিয়েছি, ক্যালিফোর্নিয়াকে আমাদের দুদেশের কম্বাইন্ড ইকোনমিক কমিউনিটিতে পরিণত করা হোক। আমরা জাপানি লোকদের ওখানে পাঠাব, সবাই তারা দক্ষ। কয়েকশো ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী গড়ে তোলার মত পুঁজি দেব আমরা।
আপনার প্রস্তাব অত্যন্ত তিক্ত লাগছে আমার, বলল লরেন স্মিথ। জাপানি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের দ্বারা ক্যালিফোর্নিয়াকে রেপ করার দুরাশা কোনদিনই সফল হবে না। এ সত্যি দুর্ভাগ্যজনক যে হাওয়াই-এর কোন কোন এলাকা শুধু জাপানিদের জন্যে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। শুনতে পাই, অনেক ক্লাব ও-রেস্তোরাঁয় শুধু জাপানিরা ঢুকতে পারে, আমেরিকানদের ঢোকা নিষেধ করা হয়েছে। জাপানিদের এই আচরণ কোন আমেরিকান মেনে নিতে পারে না। অন্তত আমি মেনে নিতে পারি না। দরকার হলে আমি একাই লড়ে যাব, যাতে…।
