মানে? দাড়িতে হাত বুলাচ্ছিলেন পার্সিভাল ন্যাশ, হাতটা স্থির হয়ে গেল। কি বলছেন?
জাপানের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, ফলে জাপান আমাদের জীবন-প্রদীপ নিভিয়ে দিল, এরকম একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে,– তাই না? কিন্তু ওরা আমাদের সমস্ত ডিফেন্স ধ্বংস করে দিতে পারবে না, বিশেষ করে আমাদের নিউক্লিয়ার সাবমেরিনগুলো অক্ষতই থাকবে। আমাদের রিট্যালিয়েশেন ফোর্সদের গোটা আইল্যান্ড চেইন ছিন্নভিন্ন করে দেবে। আমার দৃষ্টিতে গোটা ব্যাপারটাই অসম্ভব ও সুইসাইডাল। বিরাট একটা ব্লাফ।
আপনার ধারণার মধ্যে ছোট্ট একটা ত্রুটি আছে, বললেন পার্সিভাল ন্যাশ, হাসছেন। দুনিয়ার সেরা ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসগুলোকে বোকা বানিয়েছে জাপান, দুনিয়ার মুরুব্বিরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা খেয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে পরিণতি অতটা ধ্বংসাত্মক হতে যাচ্ছে না। জাপান আমেরিকাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিল, আমেরিকা তা গ্রহণ করে নি। ইনকামিং মিসাইল ও অরহেড ধ্বংস করার জন্যে স্ট্রাটেজিক ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তুলতে গোপনে একটা কাজ শুরু করে জাপান। আমাদের নেতারা অত্যন্ত খরচবহুল ও অকার্ডকর বলে বাতিল করে দেয় গবেষণা। আমার ধারণা, জাপান একটা সিস্টেম খাড়া করেছে, আমাদেরকে ঠেকাতে পারবে।
তার মানে কি জাপান অজেয় হয়ে উঠেছে? জিজ্ঞেস করল হিরাম ইয়েজার, চোখ দুটো কুঁচকে আছে।
মাথা নাড়লেন পার্সিভাল ন্যাশ। এখনও নয়। কিন্তু আরও দুবছর সময় দিন ওদেরকে, ওদের হাতে থাকবে স্বয়ংসম্পূর্ণ স্টার ওঅরস সিস্টেম। কিন্তু আমাদের বা আর কারও হাতে থাকবে না।
.
২৪.
ক্যাপিটল বিল্ডিং-এর একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে মিটিং বসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জাপানের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তদন্ত ও মূল্যায়ন করাই মিটিংয়ের উদ্দেশ্য। কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য রাগে কাঁপছেন, কারণ তাঁদের ধারণা জাপানের পুঁজি ও ব্যবসায়িক নীতির কাছে এমন মার খাচ্ছে আমেরিকা, বলা যায় ওদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন তারা।
ইচিরো সুবোই, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সিকিউরিটি কোম্পানি কানোইয়া সিকিউরিটিজ-এর চীফ ডিরেক্টর, একটা টেবিলে বসে আছে। তার সামনে কাউন্টার আকৃতির একটা ডেস্কে বসেছেন কংগ্রেশন্যাল সাব-কমিটির সদস্যরা। ইচিরো সুবোইর দুদিকে রয়েছে চারজন উপদেষ্টা। ইচিরো প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে নিজেদের মধ্যে চাপাস্বরে কিচিরমিচির করছে তারা, ফলে কমিটির সদস্যরা ভারী অস্বস্তিবোধ করছেন।
ইচিরো সুবোইকে দেখে মনে হবে না যে সে একজন ধনকুবের। আমেরিকার প্রথম সারির পাঁচজন ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসায় যে পরিমাণ পুঁজি খাটান, সে তার কানোইয়া সিকিউরিটিজ-এর একটি তারচেয়ে অনেক বেশি পুঁজি ঢেলেছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, প্রথম সারির অন্তত দশজন ব্যবসায়ীর বিভিন্ন কোম্পানিতে তারও মোটা শেয়ার আছে। বেঁটেখাট, রোগা মানুষ। সব সময় হাসিখুশি থাকে।
তার হাসিখুশি ভাবটা আসলে কৃত্রিম আবরণ। ভদ্রবেশী এই টাকার কুমীর যেমন হিংস্র তেমনি প্রতিশোধপরায়ণ। জাপানে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে যমের মত ভয় ও ঘৃণা করে, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে। অন্যান্য জাপানি ব্যবসায়ীদের সাথে ইচিরো সুবোইর পার্থক্য হলো, আমেরিকা ও ইউরোপ সম্পর্কে তার রাগ ও বিদ্বেষ সে গোপন করে না।
সিলেক্ট সাব-কমিটির সামনে বসে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে সে, সারাক্ষণ সবিনয়ে হাসছে, হাবভাবে উত্তেজনার লেশমাত্র নেই।
কংগ্রেস যে প্রস্তাব করতে যাচ্ছে তার সারমর্ম হলো, যে-সব জাপানি কোম্পানি আমেরিকায় ব্যবসা করছে তাদেরকে বেশিরভাগ শেয়ার সংশ্লিষ্ট আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে হবে। এ সেফ জাতীয়করণ ছাড়া কিছু নয়। আমেরিকার ব্যবসা-নীতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, কোন সন্দেহ নেই। ইন্টারন্যাশনাল কারেন্সির সাথে ব্যাংকিং সিস্টেম ধসে পড়বে। শিল্প-সমৃদ্ধ দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে। কিন্তু কেন এই সর্বনাশা আঘাত? আমি সবিনয় বলতে চাই, আমেরিকানদের জীবনে ভাল যা কিছু ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে সেরা হলো জাপানি পুঁজিপতিদের এ-দেশে আগমন।
আপনি যে আইনের কথা বললেন, কংগ্রেস সে-ধরনের কোন আইন এখুনি প্রয়োগ করতে বলছে না, কঠিন স্বরে জানালেন সিনেটর মাইক ডিয়াজ। আমি শুধু বলেছি, আমেরিকার মাটিতে আপনাদের যে কোম্পানিগুলো ব্যবসা করে প্রফিট করছে, সে-সব কোম্পানির জন্যেও আমাদের শুল্ক ও ইনকাম ট্যাক্স নীতি প্রযোজ্য হবে। আপনাদের দেশে আমেরিকানরা রিয়েল এস্টেট কিনতে পারে না, পারে না ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র মালিক হতে, অথচ আমাদের দেশে ব্যবসা করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে কেটে পড়ছেন আপনারা, মি. ইচিরো সুবোই…।
অন্তত একজন মানুষ ইচিরো সুবোইকে চিনতে ভুল করেন নি, তিনি হলেন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর মাইক ডিয়াজ। জাপানিদের ব্যবসায়িক নীতির সবচেয়ে কড়া সমালোচক তিনি, পারলে আজই আইন করে জাপানি পন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
মি. চেয়ারম্যান? সাব-কমিটির মহিলা সদস্য মাত্র একজন, কথা বলার জন্যে হাত তুলল সে। ইয়েস, মিস স্মিথ, বলুন।
মি. ইচিরো, শুরু করল লরেন, এর আগে আপনি উল্লেখ করেছেন, ডলারকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিতে হবে ইয়েনকে। আপনার মনে হয় না, এখানে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছেন আপনি?
