সাধারণ জাপানি মেয়েদের চেয়ে অন্তত দুইঞ্চি বেশি লম্বা তোশি কুদো। দীর্ঘ, সুগঠিত পা; ঘন কালো লম্বা চুল, কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত, ত্রুটিহীন হালকা হলুদ রঙা ত্বক, চোখ যেন দুফোঁটা কফি, দেখে মনে হবে জেমস বন্ড সিনেমার একজন নায়িকা। শুধু দেখতেই সুন্দরী বা সেক্সি নয়, তোশির বুদ্ধিও খুব ধারাল। তার আইকিউ একশো পঁয়ষট্টি।
হিদেকি সুমা গাড়িতে উঠল, কিন্তু তার দিকে তাকাল না তোশি কুদো। তার মন ও চোখ আটকে আছে কোলের ওপর রাখা একটা কমপ্যাক্ট কমপিউটারের স্ক্রীনে।
মুরো কামাতোরি একটা টেলিফোনে কথা বলছে। তার বুদ্ধি তোশি কুদোর সমতুল্য না হতে পারে, তবে সুমার গোপন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত করার জন্যে যে নিষ্ঠুরতা, শয়তানি ও নোংরা চাতুর্য দরকার তা তার মধ্যে প্রচুর পরিমাণেই আছে। সমস্ত দুনম্বর কাজ তাকে দিয়েই করায় সুমা।
লালমুখো, রাগী বাঁদরের মত চেহারা মুরো কামাতোরির। তার ভুরু অত্যন্ত ঘন ও কালো, নিচে প্রাণহীন একজোড়া চোখ, চোখে মোটা লেন্সের বিমলেস চশমা। ঠোঁট দুটো পরস্পরের সাথে শক্তভাবে সেঁটে থাকে, মুরো কামাতোরিকে কেউ কখনও হাসতে দেখেনি। দয়া বা ভাবাবেগ বলে কিছু নেই তার ভেতর। একটা বিশেষ খেলার ভক্ত সে, খেলেও খুব ভাল, এ ব্যাপারে তাকে একটা প্রতিভাই বলা যায়। খেলাটার নাম, মানুষ শিকার।
দুনিয়ায় এক শুধু হিদেকি সুমার প্রতি অনুগত মুরো কামাতোরি। কেউ যদি হিদেকি সুমার কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তা সে যতই ধনী ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা হোক, যে কোন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হবে তাকে, দোষ চাপবে ব্যক্তিগত কোন শত্রু অথবা বিরুদ্ধ রাজনৈতিক দলের ওপর।
খুনী মুরো কামাতোরির একটা বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ একটা খাতায় লিখে রাখে সে। গত পঁচিশ বছরে দুশো সাঁইত্রিশটা খুনের বিবরণ লিখেছে।
টেলিফোনে কথা শেষ করে রিসিভারটা আর্মরেস্ট ক্রেডলে রেখে দিল সে, তাকাল সুমার দিকে। অ্যাডমিরাল ইতাকুরা কথা বললেন। অ্যাডমিরাল ইতাকুরা ওয়াশিংটনে রয়েছেন, জাপানি দূতাবাসে। তিনি তার সূত্র থেকে জানতে পেরেছেন, হোয়াইট হাউস নিশ্চিত যে বিস্ফোরণটা নিউক্লিয়ার এবং দায়ী হলো ডিভাইন স্টার।
মৃদু কাঁধ ঝাঁকাল হিদেকি সুমা। ওদের প্রেসিডেন্ট কি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মার্কিন সরকার অদ্ভুত আচরণ করছে, বলল মুরো কামাতোরি। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, টু-শব্দটিও করছে না। তবে নরওয়ে আর ব্রিটেন খুব চেঁচামেচি করছে, জাহাজ হারিয়েছে বলে।
মার্কিন নিউজ মিডিয়া?
অস্পষ্ট রিপোর্ট ছাপছে কাগজগুলো। টিভি নেটওঅর্কও পরিষ্কার কিছু বলছে না।
সামনের দিকে ঝুঁকল সুমা, তোশি কুদোর নাইলন ঢাকা হাঁটুতে টোকা দিল। এক্সপ্লোসন সাইটের ছবিটা দেখাও তো, প্লীজ।
সমীহের সাথে মাথা ঝাঁকাল তোশি, চাপ দিল কমপিউটারের বোম। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে ডিভাইডার ওয়াল-এর ফিট করা ফ্যাক্স মেশিন থেকে রঙিন একটা ফটো বেরিয়ে এল। ডিভাইডার ওয়ালটা ড্রাইভার ও প্যাসেঞ্জার কমপার্টমেন্টের মাঝখানে। ফটোটা সুমার হাতে ধরিয়ে দিল তোশি, সুমা ভেতরের একটা আলো জ্বালাল, তারপর মুরো কামাতোরির বাড়িয়ে দেয়া হাত থেকে ম্যাগরিফাইং গ্লাসটা নিল।
ইনফ্রারেড ফটোটা দেড় ঘণ্টা আগে আমাদের আগাগি স্পাই স্যাটেলাইট থেকে, চোখে প্রশ্ন। একটা নিউক্লিয়ার হান্টার কিলার অ্যাটাক সাবমেরিন, আর একটা চাইনিজ জাংক? আমি যেমন আশা করেছিলাম, আমেরিকা তো সেরকম আচরণ করছে না। অদ্ভুত, ওরা ওদের প্যাসিফিক ফ্লিটের অন্তত অর্ধেকটা তো পাঠাবে।
এক্সপ্লোসন এরিয়ার দিকে কয়েকটা ন্যাভাল শিপ যাচ্ছে, বলল মুরো কামাতোরি। ওদিকে একটা ওশেন সার্ভে বেসেলও আছে, নুমার।
হোয়াই অ্যাবাউট স্পেস সার্ভেইল্যান্স?
মাকিনীরা তাদের পিরামিড়ার স্পাই স্যাটেলাইট ও এস আর-নাইনটি এয়ার ক্রাফটের সাহায্যে এই মধ্যে যথেষ্ট ডাটা সংগ্রহ করেছে।
ফটোয় গায়ে ছোট একটা বিন্দুর ওপর আঙুলের টোকা দিল সুমা। দুটো ভেসেলের মাঝখানে একটা সাবমারসিবল ভাসছে। কোত্থেকে এল ওটা?
ফটোর দিকে ঝুঁকে পড়ল মুরো কামাতোরি। জাংক থেকে অবশ্যই আসেনি। নিশ্চয়ই সাবমেরিনটা থেকে এসেছে।
যত চেষ্টাই করুক, ডিভাইন স্টারের কিছুই ওরা খুঁজে পাবে না, বিড় বিড় করে বলল হিদেকি সুমা। বিস্ফোরণে নিশ্চয়ই ওটা অণুতে পরিণত হয়েছে। ফটোটা তোশির দিকে ছুঁড়ে দিল সে। আরেকটা রিড আউট, প্লীজ যেসব ক্যারিয়ার আমাদের তৈরি গাড়ি বহন করছে, ওগুলোর বর্তমান স্ট্যাটাস ও গন্তব্য।
মুখ তুলে তার দিকে তাকাল তোশি, সমস্ত তথ্য আমার কাছে আছে, মি. সুমা।
ইয়েস?
কাল রাতে বোস্টনে অটো কার্গো খালাস করেছে ডিভাইন মুন, রিপোর্ট করল তোশি, ডিসপ্লে স্ক্রীনের জাপানি লেখাগুলোর ওপর চোখ। ডিভাইন ওয়াটার…আট ঘন্টা আগে লস অ্যাঞ্জেলেস পোর্টে ভিড়েছে ওটা, এই মুহূর্তে কার্গো খালাস করছে।
বাকিগুলো?
আর দুটো। ডিভাইন স্কাই নিউ অরলিয়নস-এর ভিড়বে আঠারো ঘণ্টার মধ্যে। লস অ্যাঞ্জেলেসে ডিভাইন লেক পৌঁছাবে পাঁচ দিন পর।
আমাদের বোধহয় জাহাজগুলোকে জরুরি নির্দেশ পাঠানো উচিত, বলল মুরো কামাতোরি। আমেরিকার দিকে না গিয়ে অন্য কোন দিকে চলে যাক। মার্কিন কাস্টমসকে হয়তো সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, রেডিয়েশন আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখবে ওরা।
