ব্রোঞ্জের তৈরি বিশাল তোরণ পেরিয়ে যুদ্ধে নিহত বীরদের সমাধি-মন্দিরে কোন বিদেশী ঢুকতে পারে না। বীর যোদ্ধারা যেখানেই মারা গিয়ে থাকুক, মনে করা হয় তাদের সবার আত্মা এই মন্দিরে অবস্থান করছে। সংখ্যায় তারা আড়াই লাখের কম নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়াসুকুনি স্রেফ সামরিক স্মৃতিমন্দির থাকল না। রক্ষণশীল ডানপন্থী রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের গোপন মিটিং বসতে শুরু করল এখানে। এখনও তারা স্বপ্ন দেখেন, গুণে মানে শ্রেষ্ঠ জাপানি কালচার পৃথিবীর বুকে বিশংশাল এক সাম্রাজ্যের জন্ম দিতে পারে, সে সাম্রাজ্যে শুধু জাপানিরাই কর্তত্ব করবে। প্রতি বছর একবার অন্তত জাপানের প্রধানমন্ত্রি তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য ও পার্টি নেতাদের নিয়ে ইয়াসুকুনিতে আসেন, ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয় বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে। তাঁর এই আগমন টিভি ও রেডিওতে ফলাও করে প্রচার করা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত তীব্র প্রতিবাদ জানায়, তাদের সাথে যোগ দেয় বামপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনীতির সমর্থকরা, শিন্টো-বিরোধী ধর্মীয় দল-উপদল এবং প্রতিবেশী দেশগুলো, যুদ্ধের সময় জাপানিদের দ্বারা যারা নির্যাতিত হয়েছে।
সমালোচনা এড়াতে উগ্র মৌলবাদী ও ডানপন্থী রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা ইয়াসুকুনিতে আসেন রাতের অন্ধকারে, সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে। ভূত বা চোরের মত আসা-যাওয়া করেন তারা, যদিও কেউই তারা সমাজের সাধারণ মানুষ নন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন জাপানের শিল্পপতি, ব্যাংকার, ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা।
এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হলো হিদেকি সুমা।
.
ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, ব্রোঞ্জ তোরণ পেরিয়ে ইয়াসুকুনি উপাসনালয়ের দিকে ধীরে পায়ে হাঁটছে হিদেকি সুমা। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই, চারদিকে অন্ধকার, শুধু টোকিওর উজ্জ্বল আলো মেঘে প্রতিফলিত হয়ে স্নানআভা ছড়িয়ে রেখেছে কুড়ান হিলের ওপর। অবশ্য অন্ধকারেও ইয়াসুকুনির পথ চিনতে হিদেকি সুমার কোন অসুবিধে হয় না, পবিত্র মন্দিরের প্রতিটি ইঞ্চি তার চেনা। বড় একটা গাছের নিচে দাঁড়াল সে, উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিশাল উঠানের চারদিকে চোখ বুলাল। কোথাও কিছু নড়ছে না।
কেউ লক্ষ করছে না, বুঝতে পেরে স্বস্তিবোধ করল সুমা। আরও খানিক এগোল সে, একটা পাথুরে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে রীতি অনুসারে হাত ধুলো, তারপর কাঠের হাতা দিয়ে পানি তুলে মুখে পুরল, কুলকুল শব্দ করে মুখের ভেতরটাও ধুলো। মন্দিরের ভেতর ঢুকে থামল না সে, করিডর ধরে হনহন করে এগোল। প্রধান পুরোহিত অপেক্ষা করছেন তার জন্যে। উপাসনালয়ে পৌঁছে পুরোহিতের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল সে। দুজনের মধ্যে কোন বাক্যবিনিময় হলো না, মাথা নত করে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করল হিদেকি সুমা, রেনকোটের পকেট থেকে টিস্যু পেপারে মোড়া এক তোড়া নোট বের করে পুরোহিতের হাতে ধরিয়ে দিল। প্যাকেটটা বেদির ওপর রাখলেন পুরোহিত।
মন্দিরের ভেতর ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠল, হিদেকি সুমার নির্দিষ্ট ঈশ্বরকে আহ্বান করা হচ্ছে। এরপর দুইজোড়া হাত এক হলো। সুমার নিজের আত্মশুদ্ধির জন্যে পুরোহিত সুমার সাফল্যের জন্যে প্রার্থনা করলেন।
প্রার্থনা শেষে পুরোহিতের সাথে এক মিনিট আলাপ করল সুমা, নিচুস্বরে। টিস্যু পেপাটা পুরোহিতের হাত থেকে নিয়ে পকেটে ভরল, তারপর বেরিয়ে এল মন্দির থেকে।
গত তিনদিনের মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেল হিদেকি সুমা। প্রার্থনা শেষ হতেই নতুন শক্তি ও অনুপ্রেরণা লাভ করেছে সে। তার ঈশ্বর তাকে ঐশ্বরিক ক্ষমতা দান করেছেন, অন্তরে জ্বেলে দিয়েছেন আশার আলো। হিদেকি সুমার গোটা জীবনটাই একটা ধর্মযুদ্ধে নিবেদিত। দুটো যুদ্ধক্ষেত্রে লড়ছে সে। পশ্চিমা বিষাক্ত প্রভাব থেকে জাপানি সংস্কৃতিকে মুক্ত করতে হবে। এবং জাপান যে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, সেটাকে গোটা দুনিয়ার বুকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। হিদেকি সুমা বিশ্বাস করে, এই যুদ্ধে তাকে সাহায্য করছে ঐশ্বরিক একটা ক্ষমতা।
ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে এখন যদি কেউ দেখে ফেলে হিদেকি সুমাকে, কোন গুরুত্ব দেবে বলে মনে হয় না। পরনে শ্রমিকদের ওভারাল, রঙচটা সস্তাদরের নেরকোট, মাথায় কোট হ্যাট নেই, দেখে মনে হবে নিতান্তই সাধারণ একজন লোক। খুবই লম্বা তার চুল, খুলির পিছনে ইচ্ছে করলে একটা খোঁপা বাধা যায়। ঊনপঞ্চশ বছর বয়েস, তবে কালো চুলের জন্যে আরও অনেক কম বয়েসী বলে মনে হয় তাকে। জাপানিদের তুলনায় একটু বেশি লম্বা সে, একশো সত্তর সেন্টিমিটার।
শুধু তার চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই লোক সাধারণ কেউ নয়। নীল চোখ জোড়ায় অদ্ভুত এক সম্মোহনী শক্তি, যেন একবার তাকালেই বশ্যতা স্বীকার না করে উপায় নেই। চিরকালই রোগা-পাতলা সে, তবে পনেরো বছর বয়েস থেকে ওয়েট লিফটিং চর্চা করছে। অমানুষিক পরিশ্রম ও দৃঢ় প্রত্যয়ে সে তার শরীরটাকে পরিণত করেছে পেশীসর্বস্ত একটা কঠিন পাথুরে মূর্তিতে।
মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাবার পর হিদেকির দেহরক্ষী তথা শোফার তোরণের গেটটা বন্ধ করে দিল। মুরো কামাতোরি, সুমার পুরানো বন্ধু ও প্রধান সহকারী, তোশি কুদো, সুমার সেক্রেটারি, তোরণের দিকে পিছন ফেরা একটা কালো মুরমটো লিমুজিনে বসে আছে। গাড়িটাকে চালায় বারো সিলিন্ডারের, ছয়শো ঘোড়ার একটা এঞ্জিন। ধীর পায়ে হেঁটে এসে পিছনের সীটে বসল হিদেকি সুমা।
