ওরা আসবে, বিড়বিড় করল পিট। আমি জানি, আসবে ওঁরা।
.
১৭.
দশ মিনিট পেরিয়ে গেল। তারপর বিশ মিনিট। ভীতিকর একটা নিঃসঙ্গতা ঘিরে। ধরল ওদেরকে।
এখন কি হবে? জানতে চাইলেন প্লাঙ্কেট। ওরা তো আসছে না।
আমরা উদ্ধার পাব কি পাব না, নির্ভর করে অ্যালের ওপর, বলল পিট। সে যদি ধরতে পারে আমি কি ভাবছি, তাহলে একটা সাবমারসিবল নিয়ে নিচে নামবে সে, ইকুইপমেন্ট থাকবে…
কিন্তু আপনার বন্ধু ইতোমধ্যে আপনাকে একবার হতাশ করেছেন।
নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়ে আসতে পারেনি সে। নিজের চেয়ারে ফিরে এসে বসল পিট। বিগ জনের আলো পড়েছে বাইরে, আলোয় আকৃষ্ট হয়ে এক ঝাক মাছ কাছাকাছি চলে এসেছে। সেদিকে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল ও।
কি ব্যাপার?
যেন মনে হলো একটা শব্দ শুনলাম!
মনের ভুল, বললেন প্লাঙ্কেট। ধীরে ধীরে মরার চেয়ে হঠাৎ প্রাণ হারানোই ভাল বলে মনে করি, ডার্ক। কেবিনটা পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে, আসুন, ঝামেলা সেরে ফেলি।
হঠাৎ নিঃশব্দে হাসল পিট। চেয়ারে নড়ে বসল, তাকাল আপার ভিউইং উইন্ডোয়। বিগ জনের পিছনে, সামান্য ওপরে, ভাসছে নুমার একটা সাবমারসিবল? ভেতরে বসে রয়েছে অ্যাল, বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসছে সে। বড়, গোল পোর্টে অ্যাডমিরাল স্যানডেকারকেও দেখা গেল।
পিটকে প্রচণ্ড শক্তিতে আলিঙ্গন করলেন প্লাঙ্কেট, দম আটকে মারা যাবার অবস্থা হলো পিটের। নিজেকে ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে ও, প্লাঙ্কেট ওকে চুমো খেলেন।
আপনি আমার আপন ভাই!
ছাড়া পেয়ে দম নিচ্ছে পিট, স্পীকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে অ্যালের গলা ভেসে এল, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
কানে মধু বর্ষণ করছে হে!
দেরি করার জন্যে দুঃখিত, পিট। প্রথম সাবটা সারফেসে ওঠার পর ডুবে গেছে। এটার ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল, মেরামত করতে দেরি হয়ে গেল।
তোমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। গুড টু সী ইউ, অ্যাডমিরাল।
ড্রাগন তোমার স্ট্যাটাস জানাও, নির্দেশ দিলেন অ্যাডমিরাল।
একটা ফুটো তৈরি হয়েছে, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে পাওয়ার সোর্স বন্ধ। করে দেবে। কাবি সব ঠিক আছে।
তাহলে আর কোন কথা নয়, আমরা কাজ শুরু করছি।
অ্যাটাক সাবমেরিন টাকসন থেকে অক্সিজেন ক্যাটিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে এসেছে অ্যাল, সাবমারসিবলের যান্ত্রিক বাহুতে জোড়া লাগানো হয়েছে সেটা। সেই কাটিং ইকুইপমেন্টের সাহায্যে বিগ জনের সমস্ত মাউন্ট, ড্রাইভ শ্রাফট ইত্যাদি কেটে আলাদা করা হবে, উদ্দেশ্য মেইন ফ্রেমও ট্র্যাক মেকানিজম থেকে কন্ট্রোল হাউজিং বিচ্ছিন্ন করা।
পঁয়ত্রিশ মিনিট পর বিগ জনের শুধু কন্ট্রোল হাউজিংটা হুক দিয়ে আটকে পানির ওপর তোলা হল। পানিতে ভেসে অবাক হয়ে বিশাল সাবমেরিনের লেজের দিকে চেয়ে থাকে পিট। প্লাঙ্কেটকে ওদিকে টেনে তোলা হলো সাবমেরিনের উপরে। ইউএস নেভীর লোকেরা ঘিরে রেখেছে ব্রিটিশ ভদ্রলোককে।
নুমা সাবমারসিবল থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো অ্যাল। দুই কান বিস্তৃত হাসি হাসছে।
দেখলে তো, তোমার জন্যে এত্তো ঝামেলা! চারপাশের ব্যস্ততার দিকে ইঙ্গিত করলো সে। এর জন্যে বহু টাকা গচ্চা যাচ্ছে হে!
কিন্তু বেঁচে থাকার আনন্দ নয়, পিটের চেহারায় নির্দয় হিংস্রতা। টানটান, অস্বাভাবিক স্বরে সে বলে উঠলো, যেই দায়ী থাকুক এর জন্যে, চরম মূল্যই দিতে হবে তাকে।
.
দ্বিতীয় পর্ব
দ্য কেইটেন মিনেস
৬ অক্টোবর, ১৯৯৩, টোকিও, জাপান।
১৮.
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সুইসাইড স্কোয়াডের- জাপানি পাইলটরা প্লেনে ওঠার আগের মুহূর্তে পরস্পরকে বিদায় জানাবার সময় বলতে, আবার দেখা হবে ইয়াসুকুনিতে।
ইয়াসুকুনি হলো পবিত্র তীর্থ মন্দির। সেই ১৮৬৮ সাল থেকে সম্রাটের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে যারা মারা গেছে তাদের পবিত্র স্মৃতিতে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় মন্দিরটা। একটা ঢালের মাথায় বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে তীর্থভূমি, টোকিওর মাঝখানে। ঢালটার নাম কুড়ান হিল। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের জন্যে মূল হলটা তৈরি করা হয়েছে শিন্টো স্থাপত্য রীতি অনুসারে। ওখানে কোন রকম ফার্নিচার রাখা হয়নি।
প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা শিন্টো আসলে জাপানিদের একটা সাংস্কৃতিক ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শিন্টো আজ বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত, দল-উপদলের সংখ্যা-সীমা নেই। অবশেষে শিন্টো বলতে মানুষ বোঝে, বিভিন্ন দেবতা বা ঈশ্বরের মাধ্যমে ঐশ্বরিক ক্ষমতা অর্জনের উপায় বিশেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেখা গেল, শিন্টো হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় পূজা পদ্ধতি বা রাষ্ট্রীয় ধর্মবিশ্বাস ও নৈতিক দর্শন; প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের সাথে কোন মিলই নেই। আমেরিকানদের দখলে থাকার সময় শিন্টো তীর্থভূমি ও মন্দিরগুলো সরকারি সমর্থন হারায়, তবে পরে ওগুলোকে জাতীয় জাদুঘর, ধনভাণ্ডার ও পবিত্র সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়।
সমস্ত শিন্টো মন্দিরের ভেতরে, মূল উপসানালয়ে, প্রধান পুরোহিত ছাড়া আর কারও প্রবেশ নিষেধ। প্রতিটি উপাসনালয়ের ভেতরে একটা বস্তু থাকে, ঐশ্বরিক আত্মা বা ক্ষমতার প্রতীক বলে মনে করা হয় সেটাকে যা কিনা মহা-পবিত্র হিসেবে মর্যাদা পায়-ইয়াসুকুনিতে মহা-পবিত্র ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রতীক চিহ্ন হলো একটা আয়না।
