তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন রিকো একোস্টা, ডেইলাইন সিকিউরিটি ফোর্স-রে একজন মাইনিং এঞ্জিনিয়ার। মাইনিং দেখছ, ফ্রাঙ্ক? জানতে চাইলেন তিনি।
হাড়, ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো বললেন ফিসফিস করে। কঙ্কাল। গড, কম করেও কয়েকশো হবে! পিছিয়ে এসে জায়গা করে দিলেন রিকো একোস্টাকে।
ছোটখাট ভদ্রলোক শ্রমিকদের নির্দেশ দিলেন, গর্তটা আরও চড়া করো।
গর্ত বড় করার পর নিচে মানুষ নামার সুযোগ হলো। টানেলের গা সস্তা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, দেখে মনে হলো যে-কোন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। টানেলের মুখের কাছে থামলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, পকেট থেকে পাইপ বের করে তামাক ভরলেন।
কলোরাডো স্কুল অভ মাইনস থেকে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করার পর কর্মজীবনের শুরুতে দীর্ঘ কয়েক বছর মূল্যবান পাথরের খোঁজে দুনিয়ার প্রায় সমস্ত এলাকার খনিতে কাজ করেছেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। অস্ট্রেলিয়ায় ওপাল, কলম্বিয়ায় এমারেল্ড, তাঞ্জানিয়ায় রুবি আবিষ্কার করেছেন। সিআইএ তাঁকে বিশেষ একটা এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে ফিলিপাইনে পাঠায় ইয়ামাশিটা গুপ্তধনের সন্ধান! অত্যন্ত কড়া গোপনীয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, গুপ্তধন পাওয়া গেলে ফিলিপাইনের বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তা ব্যবহার করা হবে।
গল্পটা তাহলে সত্যি! তার পাশ থেকে বিড়বিড় করে বললেন রিকো একোস্টা।
মুখ তুলে তাকালেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। গল্প?
মিত্র বাহিনীর বন্দী সদস্যদেরকে দিয়ে তৈরি করানো হয় এই টানেলগুলো, টালে তৈরি হবার পর তাদের সবাইকে মেরে ফেলে জাপানিরা, কেউ যাতে এগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে না পারে।
সেরকমই মনে হচ্ছে। ভেতরে ঢোকার পর নিশ্চিত হতে পারব।
আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে, জাপানিরা আবার ফিরে আসেনি কেন? গুপ্তধন উদ্ধার করার জন্যে?
চেষ্টা করেনি, একথা বলা যাবে না, জবাব দিলেন ম্যানকিউসো। যুদ্ধের পর নির্মাণ কাজে সহায়তার নাম করে অনেক জাপানি ঠিকাদারি কোম্পানি ফিলিপাইনে ঢুকতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, একবার ঢুকতে পারলে গোপনে সব সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু মার্কোস গুপ্তধনের কথা জানার পর জাপানিদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন, নিজেই খুঁজতে শুরু করেন।
মার্কোস সব না হলেও অংশবিশেষ উদ্ধার করেন। উৎখাত হবার আগে কয়েক দফায় যে ত্রিশ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার করেন তিনি, বলা হয় তার বেশিরভাগটাই গুপ্তধন বেচা টাকা। ঘৃণায় মুখ কুঁচকে থুথু ফেললেন রিকো একোস্টা। মার্কোস আর তাঁর স্ত্রীর লোভ আমাদের যে ক্ষতি করেছে, তা পূরণ করতে একশো বছর লাগবে আমাদের।
নাকে-মুখে কাপড় বড়িয়ে নিয়ে সামনে বাড়লেন ওঁরা, তা না হলে দুর্গন্ধে জ্ঞান হারাবেন। টানেলের ভেতর কোথাও কোথা পানি জমে রয়েছে। একবার দাঁড়ালেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, লক্ষ করলেন সিলিং থেকে পানির ধারা গড়িয়ে নিচে নামছে। হাতের টর্চটা জ্বাললেন, আলো ফেললেন নিচের দিকে।
একটা কঙ্কাল পড়ে রয়েছে সামনে, কঙ্কালের একটা হাতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। কঙ্কাল, তবে পরনের ইউনিফর্মটা চেনা গেল। গলায় একটা চেইন, চকচক করছে টর্চের আলোয়। লকেটের ওপর আলো ফেললেন ম্যানকিউসো, তারপর ঝুঁকে ভাল করে তাকালেন। লুকেটে নাম লেখা রয়েছে, উইলিয়াম মিলার। নামের নিচে লেখা রয়েছে আর্মি সিরিয়াল নম্বর। সিধে হলেন ম্যানকিউসো, আলোটা চারদিকে ঘোরালেন। টানেলের চারদিকে শুধু কঙ্কাল আর কঙ্কাল। কোথাও কোথাও অনেকগুলো কঙ্কাল স্তূপ হয়ে আছে।
মিত্র বাহিনীর সদ্য ছিল এরা সবাই, বিড়বিড় করলেন রিকো একোস্টা। আমেরিকান, ফিলিপিনো, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান। দেখে মনে হচ্ছে অন্যান্য যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকেও বন্দীদের ধরে এনেছিল জাপানিরা কাজ করানোর জন্যে। কিন্তু একসাথে এতগুলো মানুষকে খুন করা হলো কিভাবে?
বুলেটের কোন চিহ্ন নেই। টানেল বিধ্বস্ত হওয়ায় ওরা বোধহয় দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। প্রথম ট্রাকটাকে পাশ কাটিয়ে সামনে বাড়লেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। এক সারিতে অনেকগুলো ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি ট্রাকের চাকা বসে গেছে, পচে গেছে প্রতিটি ক্যানভাস টপ। একটা ট্রাকের ভেতর টর্চের আলো ফেললেন তিনি। ভাঙা কাঠের বাক্স ছাড়া আর কিছু নেই। এভাবে কয়েকটা ট্রাক পরীক্ষা করা হলো। সবগুলোই খালি।
দুশো মিটার এগিয়ে বাধা পেলেন ওঁরা। দেখেই বোঝা যায়, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধসিয়ে দেয়া হয়েছ টানেল। বাধার সামনে ছোট একটা অটো হাউজ টেইলার দেখা গেল, অ্যালুমিনিয়ামের গা এখনও চকচক করছে। ১৯৪০ সালে এধরনের অটো ট্রেইলার ছিল না। গাড়িটার পাশে কোন মার্কা নেই, তবে টায়ারের গায়ে লেখাগুলো পড়া গেল।
ধাতব ধাপ বেয়ে ওপরে উঠলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভেতরে টর্চের আলো ফেললেন। ভেতরটা দেখে অফিস বলে মনে হলো। ঠিকাদাররা এধরনের সচল অফিস ব্যবহার করে।
চারজন লোককে নিয়ে গাড়িটার কাছে এসে দাঁড়ালেন রিকো একোস্টা। ফ্লাডলাইটের তার বহন করছে লোকগুলো উজ্জ্বল আলোয় ভেসে গেল চারদিক। এটা আবার এল কোত্থেকে! বিস্ময়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন তিনি।
