ভাগ্যের কৃতিত্ব হচ্ছে, এয়ার-লকের দেয়াল টিকে গেছে, ভেঙে পড়েনি, বিড়বিড় করে বলল পিট, ভেহিকেলের কমপিউটারকে নির্দেশ দিচ্ছে কোদালটাকে আরও একটু বাঁকা করতে।
ডিএসএমভি-র চারদিকে তাকালেন প্লাঙ্কেট। সত্যি, অদ্ভুত একটা মেশিন। এর শক্তির উৎসটা কি?
ছোট একটা নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর।
নিউক্লিয়ার? মাই গড! আমার ধারণা, সাগরের তলা দিয়ে ইচ্ছে করলে আমরা এটা নিয়ে ওয়াইকিকি সৈকতে পৌঁছে যেতে পারি, কি বলেন?
বিগ জনের রিয়্যাক্টর ও লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম সাহায্য করবে আমাদের, তবে এটার গতি খুব কম, ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ মাইল। পৌঁছবার আগে না খেতে পেয়ে মারা যাব আমরা।
এখানে কোন খাবার নেই, বলতে চাইছেন?
একটা আপেলও না।
না খেয়ে মরি, তাতে আফসোস নেই, বললেন প্লাঙ্কেট। মরার সময় গান শুনতে পারব, এটাই বা কম কিসে!
টেলিফোন হাউজিং চুরমার হয়ে গেছে, কাজেই সারফেসের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম জলো অ্যাকুসটিক রেডিও ট্রান্সমিটার। আলাপ করার জন্যে রেঞ্জ অবশ্য যথেষ্ট নয়, তবে এটা ছাড়া আর কিছু নেই আমাদের। কোরাসটা কেউ যদি শুনতে পায়, বুঝতে পারবে এখানে কেউ বেঁচে আছে।
তাতে যে কতটুকু উপকার হবে, বলা মুশকিল, ম্লান কণ্ঠে বললেন প্লাঙ্কেট। ধরুন, একটা রেসকিউ মিশন পাঠানো হলো, কিন্তু প্রেশার-লক না থাকায় এই ভেহিকেল থেকে একটা সাবমারসিবলে আমরা ঢুকব কিভাবে? পকেট থেকে একটা ফাস্ক বের করে পিটের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন তিনি। নিন, আর চার পাঁচ ঢোক অবশিষ্ট আছে।
ডিগিং অপারেশন শুরু করার পর পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। এতক্ষণে টিভির পর্দার সরু তবে প্রায় পরিচ্ছন্ন একটা করিডর দেখতে পেল পিট, ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠে গেছে মেঝেটা। কমপিউটারকে দায়িত্ব থেকে আপাতত অব্যাহতি দিয়ে ম্যানুয়াল কন্ট্রোল চালু করল ও।
থ্রটল কন্ট্রোল ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঠেলল পিট। বিগ জনের দুধারের চওড়া ট্র্যাক ঘুরতে শুরু করল। গতি ধীরে ধীরে বাড়াল পিট। এ ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে এগাল বিগ জন। তারপর কাদায় আটকে গেল একটা চাকা।
কাদা সরাতে হবে, বলল পিট।
তারপর আবার ওই কাদাতেই আটকা পড়বে, মন্তব্য করলেন প্লাঙ্কেট, হতাশা চেপে রাখতে পারছে না।
আমাদের গোটা প্রজেক্ট ভেস্তে গেছে, গম্ভীর সুরে বলল পিট। আপনারা আপনাদের সাবমারসিবল, সাপোর্ট শিপ ও ক্রুদের হারিয়েছেন। এ-সবের জন্যে কেউ না কেউ দায়ী।
বেশ, দায়ী! তো কি হলো?
কি হল মানে? যদি বাঁচি তো দেখতে পাবেন! ব্যাটাদের ঠিকই আমি খুঁজে বের করব! অদ্ভুতদর্শন যান্ত্রিক হাতটার সাহায্যে কাদা সরাবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল পিট। ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন ব্রিটিশ সার্ভে টিমের চীফ এঞ্জিনিয়ার প্লাঙ্কেট।
.
০৮.
হাজার কিলোমিটার দূরে, ম্যানিলা বে-র মুখের কাছে একটা পাথুরে দ্বীপ। পাহাড়ের ঢালে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে খাড়া একটা সুড়ঙ্গ, বাঁকা হয়ে নেমে গেছে নিচে। বিশজন শ্রমিক নিচে দাঁড়িয়ে পাথর ও মাটি কেটে একটা গর্ত তৈরি করছে, দুজন ভদ্রলোককে এগিয়ে আসতে দেখে সরে দাঁড়াল তারা। ফ্লাডলাইটের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে সুড়ঙ্গের ভেতরটা। খানিক সামনে একটা টানেল দেখা গেল, ভেতরে একটা পুরানো ও মরচে ধরা ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাহাড়ের গভীর গহরে নামার জন্যে এক সময় আঁকাবাঁকা টানেল ব্যবহার করা হত, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে ডিনামাইট ফাটিয়ে টানেলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ইয়ামাশিটার গুপ্তধন-এর সন্ধানে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে এখানে। ১৯৪৪ সালের অক্টোবরের পর জাপানি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল ইয়ামাশিটা। যুদ্ধের সময় চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটা দেশ, ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ ও ডেইলপইন থেকে বিপুল সোনা, মূল্যবান পাথর, অলঙ্কার, রূপো, প্রাচীন মূর্তি ইত্যাদি লুট করা হয়। শুধু সোনাই লুট করা হয় কয়েক হাজার মেট্রিক টন। ম্যানিলা ছিল কালেকশন পয়েন্ট, ওখানে সংগ্রহ করে রাখার পর জাপানে সরিয়ে নিয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে আমেরিকান সাবমেরিনগুলো আক্রমণ শুরু করায় শতকরা বিশ ভাগের বেশি টোকিয়োতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজেই জাপানি তস্কররা লুজান দ্বীপের চারদিকে অন্তত একশো জায়গায় ওগুলো লুকিয়ে রাখার প্ল্যান করে, আশা ছিল পরে এক সময় ফিরে এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।
কয়েক বছর গবেষণা করে সেই গুপ্তধন কোথায় আছে জানতে পেরেছেন ওঁরা। চলতি বাজারে ওগুলোর দাম আন্দাজ করা হয়েছে, সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আজ চার মাস ধরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। সিআইন এ হেডকোয়ার্টার ল্যাংলিতে পুরানো যে ও এস এস ম্যাপগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলোর সাহায্য নিয়ে গুপ্তধনের সন্ধান করছে মার্কিন ও ডেইলাইন ইন্টেলিজেন্স-এর এজেন্টরা। ম্যাপে জাপানের একটা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, প্রচুর সময় ও ধৈর্য লেগেছে অনুবাদ করতে। পাহাড়ের নিচে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ডিনামাইট ফাটিয়ে ধসিয়ে দেয়া হয়েছে টানেলগুলো। প্রথমে পাথর কেটে একটা খাড়া শ্যাফট তৈরি করতে হয়েছে, নিচে টানেল পাবার পর কাটতে হয়েছে মাটি, পাথর ও কংক্রিটের পাঁচিল। অবশেষে গভীর একটা গর্তের ভেতর চওড়া একটু টানেলের মুখ দেখা গেল। টানেলের মুখ থেকে ভেতর দিকে ছড়িয়ে রয়েছে নিচু ঝোঁপ। সেদিকে আলো ফেলার পর দুই ভদ্রলোকের একজন, যিনি একটু বেশি লম্বা, ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো, হঠাৎ আঁতকে উঠলেন। নিচু ঝোঁপগুলো আসলে কি, বুঝতে পেরেছেন তিনি।
