আমরা কি এখনও অন্ধকারে? জানতে চাইলেন বিউ মরটন।
রেডিওঅ্যাকটিভিটি কোথাও বেশি, কোথাও কম ডিসট্রিবিউট করা হয়েছে, বললেন স্যাম হাউজার। তবে ম্যাক্সিমাম পারমিসিবল এক্সপোজার এর যথেষ্ট নিচে। হেভিয়েস্ট কনসেনট্রেশন উপর দিকে।
সারফেস ডিটোনেশন?
হ্যাঁ-জাহাজ, সাবমেরিন নয়। বাতাসই বেশিরভাগ দূষিত হয়েছে।
আমাদের উত্তরে যে চীনা জাহাজটা রয়েছে, ওটার কোন ক্ষতি হবে না তো?
মাথা নাড়লেন স্যাম হাউজার। অনেকটা দূরে রয়েছে ওরা, বাতাসের উল্টোদিকে। সামান্য একটু ছোঁয়া পাবে মাত্র।
কিন্তু এই মুহূর্তে বিস্ফোরণ এলাকার দিকে ভেসে আসছে যে?
বিস্ফোরণের আগে ও পরে প্রবল বাতাস ছিল, সাগরও ছিল অশান্ত, বললেন হাউজার। বেশিরভাগ রেডিয়েশন পূর্ব দিকে আকাশে উঠে গেছে। কমপার্টমেন্টের ফোনটা পিপ-পিপ করে উঠল। রিসিভার তুলে কানে ঠেকালেন তিনি। ইয়েস?
ক্যাপটেন কি ওখানে আছেন, স্যার?
রিসিভারটা বিউ মরটনের হাতে ধরিয়ে দিলেন হাউজার।
দিস ইজ দ্যা ক্যাপটেন।
স্যার, সোনারম্যান কাইজার। অদ্ভুত একটা কনট্যাক্ট, স্যার। আপনার শোনা উচিত।
এখুনি আসছি, বলে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন বিউ মরটন।
সোনারম্যানকে পাওয়া গেল তার কনসোলের কাছে, কানে এয়ারফোন আটকে কি যেন শুনছে, কুঁচকে আছে ভুরু জোড়া। বিউ মরটনের এক্সিকিউটিভ অফিসার, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তার দিকে একজোড়া স্পেয়ার ফোন বাড়িয়ে ধরলেন। তাড়াতাড়ি সেটা কানে আটকালেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন, কিন্তু কিছুই শুনতে পেলেন না। কোথায় কন্ট্রাক্ট?
সাথে সাথে জবাব না দিয়ে আরও কয়েক সেকেন্ড শোনার চেষ্টা করল সোনারম্যান কাইজার, তারপর বাম কান থেকে এয়ারফোন নামিয়ে বলল, আশ্চর্য ব্যাপার।
আশ্চর্য? কি আশ্চর্য?
দাঁড়ান, স্যার প্লীজ! স্পিকারটা অন করি।
অদ্ভুত যোগাযোগের কথা এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সাবমেরিনের সবখানে, সোনার এনক্লোজারের ভেতর অফিসারদের ভিড় কমে গেল। স্পিকার অন করা হতেই শোনা গেল আওয়াজটা। অস্পষ্ট, তবে দুর্বোধ নয়। কারা যেন কোরাস গাইছে।
অ্যান্ড এভরি নাইট হোয়েন দ্য স্টারফিশ কেইম আউট,
আই উড হাগ অ্যান্ড কিস হার সো।
ওহ, হোয়াট আ টাইম আই হ্যাড উইথ মিনি দ্য মারমেইড
ডাউন ইন হার সীমী বাংলো।
নিশ্চয় সাংহাই শেলি থেকে আসছে। বললেন বিউ মরটন।
না, স্যার। কোন জাহাজ বা কোন সারফেস ভেসেল থেকে আসছে না।
আরেকটা সাবমেরিন থেকে? রাশিয়ান নাকি?
মাথা নাড়লেন ফাৎসিও। না। এদিকে রাশিয়ানদের কোন সাবমেরিন নেই।
রেঞ্জ? বিয়ারিং? জানতে চাইলেন বিউ মরটন।
ইতস্তত করছে সোনারম্যান কাইজার। যেন বাচ্চা একটা ছেলে বিপদে পড়েছে, ভয় পাচ্ছে সত্যি কথা বলতে। হরাইজেন্টাল কমপাস বিয়ারিং নেই, স্যার। কোরাসটা ভেসে আসছে সাগরের তলা থেকে, সোজা পাঁচ হাজার মিটার নিচ থেকে।
.
১২.
গিরিখাদের তলায়, যেখানে একসময় নুমার মাইনিং স্টেশন ছিল, পলি ও পাথর ধসে ঢাকা পড়ে গেছে। এবড়োখেড়ড়া, উঁচু-নিচু একটা প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। জায়গাটা, বোল্ডার স্তূপগুলোকে ঘিরে ভেসে বেড়াচ্ছে মিহি পলির মেঘ। ভূমিকম্পের কাঁপন ও গর্জন থেকে যাবার পর মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা নেমে আসার কথা, কিন্তু তা নামেনি, সাগরের অতল গহবরে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা গানের আওয়াজ।
শব্দের উৎস সন্ধানে কেউ যদি জঞ্জাল ভর্তি প্রান্তরের ওপর দিয়ে এই মুহূর্তে হাঁটে, নিঃসঙ্গ একটি অ্যান্টেনা শ্রাফট দেখতে পারে বসে বাঁকা ও মোচড়ানো, মাথাচাড়া দিয়ে আছে কাদার ওপর। একটা লালচে-খয়েরি র্যাটফিশ দুএক মুহূর্তের জন্যে পরীক্ষা করল অ্যান্টেনাটা, তারপর উৎসাহ হারিয়ে চোখা লেজ নেড়ে দূরে সরে গেল।
একটু পর অ্যান্টেনা থেকে কয়েক মিটার দূরে নড়ে উঠল পলিমাটির স্তূপ, শুরু হলো একটা ঘূর্ণি, ক্রমশ আকারে বড় হচ্ছে, ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে একা আলো। আলোর ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একটা যান্ত্রিক হাত, চ্যাপ্টা কোদাল আকৃতির, হাতলের কাছটা গিটসর্বস্ব। যান্ত্রিক হাতটা শিকারী কুকুরের মত সিধে হলো, তারপর যেন শিকারের সন্ধানে বাতাস শুঁকতে শুঁকতে চারদিকে তাকাল।
তারপর কোদালটা বাঁকা হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকল, গভীর একটা ট্রেঞ্চ কুঁড়ছে। ট্রেঞ্চের গা ঢালু হয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে। খোঁড়ার কাজ তখনও শেষ হয়নি, বড় একটা বোল্ডার বাধা হয়ে দাঁড়াল কোদালের তুলনায় বোল্ডারটা বড়। কোদালের পাশে চলে এল বিশাল একটা ধাতব থাবা। থাবার আঙ্কটাগুলো মোন পাখির বাঁকা নখের মত, চারদিক থেকে আঁকড়ে ধরল বোল্ডারটাকে, কাদা থেকে তুলে ফেলল টান দিয়ে, ফেলে দিল ট্রেঞ্চের বাইরে অনেকটা দূরে। আবার নিজের জায়গায় সরে গেল থাবা, নিজের কাজ শুরু করল কোদাল।
নাইস ওঅর্ক, ডার্ক, চীফ এঞ্জিনিয়ার প্লাঙ্কেট বললেন, পরম স্তস্তিতে নিঃশব্দে হাসছেন। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে বিকেলের চা খাওয়ার আগেই বাড়িতে পৌঁছে যাব।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রযেছে পিট, গভীর মনোযোগের সাথে তাকিয়ে আছে টিভি মনিটরের দিকে।এখনও আমরা রাস্তায় পড়িনি।
আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার কতিত্ব? ভাগ্যের, নাকি প্রতিভার? আমি বলব, প্রতিভার। ভূমিকম্পের মূল ধাক্কাটা লাগার আগেই আমরা আপনার একটা ডীপ সী মাইনিং ভেসেলে ঢুকে পড়ি, তারপর টুকি এয়ার প্রেশার লকে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেরি করলে এ যাত্রা আর বাঁচতে হত না।
