শেষ লোকটা লাফ দিয়ে পানিতে পড়ল, এবার অ্যালের পালা। ঢেউয়ের মাথায় চড়ে জাহাজের বো ওপরে উঠল, তারপর নেমে এল সরাসরি সাবের গায়ে। সংঘর্ষের ফলে যে প্রচণ্ড কোন আওয়াজ হলো, তা নয়। প্রায় কোন শব্দই হলো না। সাবটা এই ছিল, এখন নেই। দেরিতে হলেও, জাহাজের হেলমসম্যান ক্রুদের চিৎকার শুনতে পেয়েছে। সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব নয়, বুঝতে পেরে জাহাজ থামাবার চেষ্টা করছে সে। ক্রুরাও বসে নেই, পালগুলো নামিয়ে ফেলছে তারা। আবার চালু হলো জাহাজের এঞ্জিন, রেইলিং থেকে পানিতে ফেলা হলো লাইফ রিঙ।
অল্পের জন্যে রক্ষা পেল অ্যাল, ছিটকে দূরে না পড়লে জাহাজের খোলে বাড়ি খেত। নাক দিয়ে নোনা পানি ঢুকল, খক খক করে কাশছে সে। কয়েকটা মাথা ঢেউয়ের মাথায় ডুবছে আর ভাসছে। গুণে দেখল, ছয়টা। আশ্চর্য, জাহাজ চড়াও হলেও, কেউ তেমন মারাত্মকভাবে আহত হয়নি। সবাই লাইফ রিঙ ধরার জন্যে সাঁতার দিচ্ছে।
পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে চাইনিজ জাহাজ। নামটা পড়ল অ্যাল, সাংহাই শেলি। ভাগ্যকে ধিক্কার দিল সে বন্ধুকে ফিরিয়ে আনার কোন সুযোগই আর থাকল না।
না, একটা উপায় আছে। দ্বিতীয় সাবটা নিয়ে নামতে হবে তাকে।
তবে আগের কাজ আগে। চারদিকে তাকাল সে, চিৎকার করল, কেউ আহত হলে হাত তোলো!
তরুণ এক জিওলজিস্ট একা হাত তুলল। আমার একটা গোড়ালি মচকে গেছে।
ধীর ধীরে ঘুরে ফিরে এল জাহাজ, স্থির হলো ওদের দশ মিটার দূরে। রেইলিং থেকে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লেন পৌঢ় এক ভদ্রলোক।
কেউ আহত হয়েছেন? চিৎকার করলেন। আমরা কি বোট নামাব?
গ্যাংওয়ে নামান, নির্দেশ দিল অ্যাল। আপনাদের জাহাজে চড়ব আমরা। তারপর বলল, চারদিকে নজর রাখুন। নিচে থেকে আমাদের আরও একটা সাব উঠে আসছে।
শুনতে পেয়েছি।
পাঁচ মিনিট পর, একজন বাদে প্রথম সাবের সব কয়জন ক্রু সাংহাই শেলির ডেকে দাঁড়িয়ে আছে, একা শুধু তরুণ জিওলজিস্টকে জালে আটকে জাহাজে তোলার পর সিক-বেতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পৌঢ় লোকটা এগিয়ে এসে অ্যালের সামনে দাঁড়ারেন। গড, সত্যি আমরা দুঃখিত। একেবারে শেষ মুহূর্তে আপনাদের আমরা দেখতে পাই।
আপনাদের দোষ নয়। আমরা আপনাদের খোলের নিচে পড়ে গিয়েছিলাম।
কেউ নিখোঁজ হয়েছে?
ভাগ্যকে ধন্যবাদ, না।
ঈশ্বর মহান। তবে আজকের দিনটাই বিদঘুটে। এখান থেকে আঠারো-বিশ কিলোমিটার দূরে আরেক ভদ্রলোককে জাহাজে তুলেছি আমরা। তাঁর অবস্থা ভাল নয়। নাম বলছেন জিমি নক্স। উনি আপনাদের কেউ?
না, বলল অ্যাল। আপনাদের বাকি সবাই দ্বিতীয় একটা সাবমারসিবলে রয়েছে।
ক্রুদের নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন চোখ মেলে থাকে। খোলা সাগরের উপর চোখ বুলালেন পৌঢ়। আপনারা এলেন কোত্থেকে?
পরে ব্যাখ্যা করব। আপনাদের রেডিওটা কি ব্যবহার করতে পারি?
অবশ্যই। ভাল কথা, আমি ওয়েন মারফি।
অ্যাল জিওর্দিনো।
কোয়ার্টার ডেকের একটা বড় কেবিন দেখিয়ে পৌঢ় বললেন, ওদিকে চলে যান মি. জিওর্দিনো। আপনি রেডিওতে কথা বলুন, ইতোমধ্যে আপনার লোকদের শুকনো কাপড়ের ব্যবস্থা করি আমি।
অসংখ্য ধন্যবাদ, তাড়াতাড়ি কেবিনটার দিকে এগোল অ্যাল। সাগরের তলায় আটকা পড়ে আছে পিট ও মি, প্লাঙ্কেট, দৃশ্যটা কল্পনা করে শিউরে উঠল সে।
নুমার দ্বিতীয় সাবমারসিবল সাংহাই শেলির আধ কিলোমিটার দূরে ভেসে উঠল। পানিতে না ভিজে জাহাজে উঠতে পারল ক্রুরা।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অ্যাডমিরাল স্যানডেকারকে একটা ধারণা দিয়ে আগেই ডেকে বেরিয়ে এসেছে অ্যাল, ফ্লাইং বোটে চড়ে রওনা হয়ে গেল সাবমারসিবলের উদ্দেশ্যে। সাব থেকে অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে ডেভ, তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করল অ্যাল, স্ট্যান্ড বাই! ওটাকে আমি নিচে নিয়ে যেতে চাই।
মাথা নাড়ল ডেভ। সম্ভব নয়। ব্যাটারি কেসিং-এর লিক দেখা দিয়েছে। চারটে ব্যাটারি শেষ। আরেকটা ডাইভ দেয়ার মত শক্তি নেই।
হতাশায় মুষড়ে পড়ল অ্যাল, রেইলিং ঘুসি মারল সে। নুমার বিজ্ঞানী ও এঞ্জিনিয়ার, স্টেসি ও ড. স্যালাজার, এমন কি সাংহাই শেলির ক্রুরাও বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল তার দিকে।
নট ফেয়ার, বিড়বিড় করছে অ্যাল। নট ফেয়ার।
অনেকক্ষণ ওখানেই, একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকল অ্যাল, তাকিয়ে আছে সাগরের দিকে, যেন পানির তলায় কি ঘটছে দেখার চেষ্টা করছে। আকাশে অ্যাডমিরাল স্যানডেকারের এয়ারক্রাফট উদয় হলো, চক্কর দিচ্ছে সাংহাই শেলিকে ঘিরে, তখনও রেইলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাল।
.
কোন রকম জ্ঞান আছে জিমি নক্সে, কেবিনে ঢুকল ড. স্যালাজার ও স্টেসি। বেডের পাশে এক ভদ্রলোক বসে আছেন চেয়ারে, ওদেরকে দেখে দাঁড়ালেন তিনি। হ্যালো, আমি হ্যারি ডিয়ারফিল্ড। আপনারা কি মি. জিমি নক্সেকে চেনেন?
আমরা বন্ধু, একই ব্রিটিশ সার্ভে শিপের সহকর্মী, জবাব দিলেন ড. স্যালাজার। কেমন আছেন উনি?
সুস্থ হতে সময় নেবেন, বললেন হ্যারি ডিয়ারফিল্ড। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন।
আপনি কি ডাক্তার।
পিডিঅ্যাট্রিকস, আসলে। ছয় সপ্তার ছুটি নিয়ে ওয়েনকে সাহায্য করছি এই ভয়েজে। জিমি নক্সের দিকে ফিরলেন তিনি। মি. নক্স, আপনার বন্ধুরা আপনাকে দেখতে এসেছেন।
চোখ না খুলে একটা হাত তুলে একবার আঙুল নাড়লেন জিমি নক্স। তার মুখ ফুলে আছে, কয়েক জায়গায় আঁচড়ের দাগ। ধীরে ধীরে চোখ মেললেন তিনি। ড. স্যালাজার ও স্টেসিকে চিনতে পেরে উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখ দুটো। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আপনারা নিরাপদে আছেন। ভাবিনি আবার আপনাদের দেখতে পাব। সেই উন্মাদ ভদ্রলোক…মি. প্লাঙ্কেট কোথায়?
