আবার শুরু হলো কাঁপন, এবার অনেকক্ষণ স্থায়ী হলো, প্রায় দশ সেকেন্ড। সেই সাথে গুরুগম্ভীর একটা আওয়াজ ভেসে এল। তারপর আবার সব থেমে গেল, নিস্তব্ধ হয়ে গেল পরিবেশ।
বন্ধুর চোখের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল অ্যাল। ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। পিটকে আশ্চর্য নির্লিপ্ত দেখল সে। তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে পিট মিথ্যে কথা বলছে। দ্বিতীয় সাবের পাইলট হবার কোন ইচ্ছেই ওর নেই। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সবাইকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে থেকে যাবে।
কিন্তু এখন আর তর্ক করার সময় নেই। অ্যালকে ধরল পিট, প্রায় ধাক্কা দিয়ে প্রথম সাবমারসিবলের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। অ্যাডমিরালকে আমার শ্রদ্ধা জানিও, বলল ও।
পিটের কথা শুনতে পেল না অ্যাল, পাথর ধসের শব্দে চাপা পড়ে গেল। হ্যাঁচটা বন্ধ করে দিল পিট।
সাবের ভেতর সাতজন মানুষ গাদাদাদি করে বসেছে। কেউ কথা বলল না, কেউ কারও দিকে তাকাল না। সবার কাঁধ ও ঘাড়ের ওপর দিয়ে সামনে এগোল অ্যালি, বসল পাইলটের সীটে। ইলেকট্রিক মটন স্টার্ট দিল সে, রেইল টপকে এয়ারলকে চলে এল সাব।
রওনা হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে অ্যাল, ওদিকে দ্বিতীয় সাবে লোকজনকে তুলে দিচ্ছে পিট। ওর নির্দেশে নুমার মহিলা সদস্যরা প্রথমে ভেতরে ঢুকল। তারপর স্টেসির দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল ও।
হ্যাচের সামনে পৌঁছে ইতস্তত করছে স্টেসি, প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল পিটের দিকে। আপনি মারা যাবেন, আমি আপনার জায়গা দখল করায়? নরম সুরে জিজ্ঞেস করল সে।
হনলুলুর হেইলকালানি হোটেলে একটা টেবিল রিজার্ভ করে রাখবেন, সন্ধ্যের দিকে।
উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিল স্টেসি, কিন্তু পিছনে দাঁড়ানো লোকটা তাকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। ঘুরল পিট, প্রজেক্টের চীফ ভেহিকেল এঞ্জিনিয়ার ডেভলওডেন সামনে দাঁড়াল।
চশমাটা নাকে ভাল মত বসিয়ে নিয়ে পিটের দিকে ঝুঁকল। আপনি আমাকে কো-পাইলট হিসেবে দেখতে চাইছেন, ডার্ক?
না, তুমি একাই ওটাকে নিয়ে যাবে, বলল পিট। অ্যাল ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব আমি।
চোখ থেকে বিষণ্ণ ভাবটা গোপন করতে পারল না ডেভ। আপনি কেন, আপনার বদলে আমিই বরং অপেক্ষা করি।
তোমার সুন্দরী একটা বউ ও তিনটে বাচ্চা আছে। আমি একা। তাড়াতাড়ি ওঠো! তার দিকে পিছন ফিরে সামনে এগোল পিট, দাঁড়াল প্লাঙ্কেট আর ড. স্যালাজারের সামনে।
প্লাঙ্কেটের চেহারাতেও ভয়ের লেশমাত্র নেই।
মি, প্লাঙ্কেট, আপনি কি বিবাহিত? জানতে চাইল পিট।
আমি? দূর, কনফার্মড ব্যাচেলর!
নার্ভাস ভঙ্গিতে হাত দুটো কচলাচ্ছেন ড. স্যালাজার, চোখে ভয়ের ছায়া। মৃত্যু যে অবধারিত, এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ নেই।
তখন বলছিলেন, আপনার বউ আছে, তাকে বলল পিট।
একটা বাচ্চাও আছে, ঢোক গিলে জানালেন ড. স্যালাজার।
আর একজনের জায়গা আছে। লাফ দিয়ে উঠে পড়ুন।
আমাকে নিয়ে আটজন হবে, বললেন ড. স্যালাজার। কিন্তু আপনার সাবমারসিবলে জায়গা হবে সাতজনের।
প্রথমটায় আমি মোটাসোটা লোকগুলোকে পাঠিয়ে দিয়েছি, বলল পিট। এটায় তুলেছি রোগা-পাতলা লোকদের ও তিনটে মেয়েকে। আপনার মতো ছোটখাট একজন মানুষ এখনও উঠতে পারবে।
একটা ধন্যবাদও দিলেন না, তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন ড. স্যালাজার। হ্যাঁচটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল পিট।
আপনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ, ডার্ক। ঈশ্বরের ভূমিকায় এত ভাল অভিনয় করা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
দুঃখিত, আপনার জন্যে কোন ব্যবস্থা করতে পারলাম না।
নো ম্যাটার। ভাল একজন মানুষের সাথে মরতে গর্ববোধ করব আমি।
সামান্য বিস্মিত হয়ে প্রাঙ্কেটের দিকে তাকাল পিট। মৃত্যু সম্পর্কে কে কি বলল আপনাকে?
আমাকে মিথ্যে অভয় দেবেন না, প্লীজ। সাগরকে আমি চিনি।
মি. প্লাঙ্কেট, পাথর ধসের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠল পিটের কণ্ঠস্বর, আমার ওপর আস্থা রাখুন?
পিটের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন প্লাঙ্কেট। এমন কিছু আছে যা আপনি জানেন, আমি জানি না?
শুধু জেনে রাখুন, সগি একর থেকে সবার শেষে রওনা হচ্ছি আমরা।
বারো মিনিট পর। বিরতিহীন হয়ে উঠল শক ওয়েভ। গিরিখাদের ঢাল থেকে টন টন পাথর নেমে এল, গোলাকার কাঠামোটাকে আঘাত করল নির্দয়ভাবে। অবশেষে মানুষের তৈরি সাগরতলের আশ্রয়টাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলল কয়েক বিলিয়ন লিটার হিমশীতল কালো পানি।
১০. দুই ঢেউয়ের মাঝখানে
১০.
দুই ঢেউয়ের মাঝখানে, পানি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল প্রথম সাবমারসিবল। আকাশ স্বচ্ছ নীল, সাগর প্রায় শান্ত। ঢেউগুলো খুব বেশি হলে এক মিটারের মত উঁচু। হ্যাঁচ খুলে গোলকার টাওয়ারের উঠল অ্যাল। ভেবেছিল খালি সাগর দেখতে পাবে কিন্তু চারদিকে তাকাতে গিয়ে বিস্ময় ও আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে গেল তার চোখ।
চল্লিশ মিটার দূরে একটা জাহাজ, সরাসরি ভাসমান সাবমারসিবলের দিকে এগিয়ে আসছে। বো-র ওপর চারকোণা ডেক, পিছনটা গোল মতো ও উঁচু, দেখেই বোঝা যায় ওটা একটা চাইনিজ জাহাজ। বো-তে একটা চোখ আঁকা, অ্যালের দিকে নিস্পলকে তাকিয়ে আছে।
টাওয়ারের উপর থেকে নিচের দিকে তাকাল অ্যাল, চিৎকার করল, এভরিবডি আউট! জলদি, জলদি।
ঢেউয়ের মাথায় উঠল খুদে সাবমারসিবল, জাহাজের দুজন ক্রু দেখতে পেল ওটাকে। চিৎকার জুড়ে দিল তারা, হেলমসম্যানকে স্টারবোর্ডের দিকে গুঁড়িয়ে নিতে বলছে জাহাজ। কিন্তু মাঝখানের ব্যবধান কমে গেছে। চকচকে খোল সদ্য পানিতে লাফিয়ে পড়া প্যাসেঞ্জারদের ওপর চড়াও হলো। জাহাজের ক্রুরা রেইলিঙে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পাথরের মূর্তি। কারও মনে কোন সন্দেহ নেই, জাহাজের বো ধাক্কা দিয়ে সাবমারসিবলটাকে ডুবিয়ে দেবে এখুনি।
