শক ওয়েভটা আপনারাও নিশ্চয়ই অনুভব করেছেন? জানতে চাইলেন প্লাঙ্কেট। আপনাদের কাছ থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে, গিরিখাদের আড়ালে ছিলাম আমরা। শক ওয়েভের যতটুকু অবশিষ্ট ছিল, আমাদের উপর দিয়ে চলে যায়। সামান্য স্রোত ও আলোড়ন ছাড়া আর কিছু আমরা অনুভব করিনি।
পিটের দিকে কটমট করে তাকাল স্টেসি। আপনাদের ইচ্ছেটা কি, আমাদেরকে বন্দী করে রাখবেন?
বন্দী শব্দটায় আপত্তি আছে আমার। তবে প্রজেক্টটা ক্লাসিফায়েড তো, আপনারা কটা দিন আমাদের অতিথি হিসেবে থাকলে খুশি হব আমরা।
কয়টা দিন বলতে কি বোঝাতে চান? সতর্ক সুরে জানতে চাইলেন ড. স্যালাজার।
আরও দুমাস ওপরে ওঠার কোন প্রান নেই আমাদের, বলল পিট।
স্তব্ধ হয়ে গেল পরিবেশ। ড. স্যালাজার, স্টেসি, তারপর পিটের দিকে তাকালেন প্লাঙ্কেট। ব্লাডি হেল! তিক্ত কণ্ঠে বললেন তিনি। দুমাস আপনি আমাদেরকে আটকে রাখতে পারেন।
আমার স্ত্রী…, ঢোক গিলে বললেন ড. স্যালাজার, ভাববেন আমি মারা গেছি।
আমার একটা মেয়ে আছে, কথাটা শেষ না করে পিটের দিকে তাকিয়ে থাকল স্টেসি।
এত হতাশ হবার কিছু নেই, বলল পিট। আগে আমাকে জানতে হবে, উপরে কি ঘটেছে। তারপর আমাকে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে হবে। একটা না একটা উপায় হবেই। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো পিট, দোরগোড়ায় কিথ হ্যারিসকে দেখে চুপ করে গেল। কিথ হ্যারিস ওদের সিসমোলজিস্ট, ইঙ্গিতে পিটকে ডাকছে।
ক্ষমা চেয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোল পিট, লক্ষ করল হ্যারিসের চেহারায় উত্তেজনা। সমস্যা? কঠিন সুরে জানতে চাইল ও।
ডিসটার্ব্যান্সটা সাগরের তলায় অনেকগুলো কাঁপন সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো ছোট আর মৃদু, আমরা আসলে প্রায় অনুভবই করিনি। কিন্তু ওগুলোর শক্তি ও ব্যাপকতা বাড়ছে।
রিডিং কি বলছে?
আমরা এমন একটা পাথুরে স্তরে রয়েছি, প্রায় নড়বড়েই বলা যায়, বলল কিথ হ্যারিস। এলাকাটা ভলকানিকও বটে। ক্রাস্টাল স্ট্রেইন এনার্জি যে হারে রিলিজ হচ্ছে, সাঙ্গাতিক ভয় পাচ্ছি আমি। আমার ধারণা, একটা ভূমিকম্প হতে যাচ্ছে। সিক্স-পয়েন্ট-ফাইভ।
আঁতকে উঠল পিট। তার মানে বাঁচার কোন উপায় থাকবে না। গম্বুজের মাথায় একটা পাথর ছিটকে এসে লাগলে পানির চাপে চিড়ে-চেপটা হয়ে যাবে সবাই।
কতক্ষণ সময় পাব আমরা? জানতে চাইল ও।
নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। তবে আমার আন্দাজ, বারো ঘণ্টা।
সরে যাবার জন্যে যথেষ্ট সময়।
আমার হিসেব ভুলও হতে পারে, বলল কিথ হ্যারিস, চেহারায় ইতস্তত একটা ভাব। প্রথমে সামান্য যে আলোড়ন আমরা অনুভব করব, সেটা আসল ভূমিকম্পের আগমন বার্তাও হতে পারে সেক্ষেত্রে মাত্র কয়েক মিনিট সময় পাব আমরা। আবার, আলোড়নটা থেকেও যেতে পারে।
পিট কিছু বলার আগেই পায়ের নিচে মৃদু কাঁপুনি অনুভব করল ওরা, পিরিচের ওপর টুংটাং আওয়াজ তুলে নাচতে শুরু করল কাপগুলো।
পিটের দিকে চোখ তুলে তিক্ত হাসল কিথ হ্যারিস। দেখা যাচ্ছে সময় আমাদের অনুকূলে নয়, ডার্ক।
.
০৯.
কাঁপনটা এত দ্রুত বাড়ছে যে আতঙ্ক বোধ করল ওরা। গুরুগম্ভীর একটা আওয়াজ আসছে দূর থেকে। তারপর ভেসে এল হুড়মুড় করে পাথর ধসের শব্দ গিরিখাদের ঢাল বেয়ে নামছে। সবাই ওরা মুখ তুলে তাকিয়ে আছে ইকুইপমেন্ট চেম্বারের ছাদের দিকে, পাথর ধসের আঘাতে যে-কোন মুহূর্তে ছাদ বা দেয়াল চুরমার হয়ে যেতে পারে। ছোট্ট একটা ফুটো হলেই যথেষ্ট, এক হাজার কামানের গর্জন তুলে ভেতরে ঢুকবে পানি।
আতঙ্কিত হলেও, বাইরে তার প্রকাশ নেই। প্রজেক্টের কমপিউটার রেকর্ড ছাড়া কেউ কিছু বহন করছে না। ইকুইপেমন্ট চেম্বারে জড়ো হয়ে ডীপ-সী ভেহিকেলে উঠতে আট মিনিট সময় নিল ক্রুরা।
পিট জানে, সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। দুটো সাবমারসিবলে খুব বেশি হয়ে চোদ্দজন লোককে জায়গা দেয়া যাবে। ওর দলের ওই চৌদ্দজনই রয়েছে। সমস্যা সৃষ্টি করবে ইনভিনসিবল-এর ক্রুরা।
কাঁপনগুলো আগের চেয়ে শক্তিশালী, আসছেও আগের চেয়ে ঘন ঘন। সারফেসে পৌঁছে লোকজনকে নামিয়ে আবার ফিরে আসবে সাবমারসিবল, তা সম্ভব নয়, অত সময় পাওয়া যাবে না। যেতে-আসতে সময় লাগবে চার ঘণ্টা, অথচ খুব বেশি হলে সময় পাওয়া যাবে কয়েক মিনিট।
ডার্কের থমথমে চেহারা দেখে অ্যাল বলল, এক ট্রিপে সম্ভব নয়, দুই ট্রিপ লাগবে। আমি বরং দ্বিতীয় ট্রিপের জন্যে অপেক্ষা করি…।
দুঃখিত, দোস্ত, তাকে থামিয়ে দিল পিট। প্রথম সাবটা তুমি চালাচ্ছ, দ্বিতীয়টা নিয়ে তোমাকে অনুসরণ করব আমি। সারফেসে উঠে যাও, ইনফ্লেটেবল র্যাফটে প্যাসেঞ্জারদের নামাও, তারপর দ্রুত ফিরে এসে এখানে যারা রয়ে যাবে তাদের নিয়ে যাও।
ফিরে আসার সময় পাব না।
বেশ, এরচেয়ে ভাল একটা প্ল্যান দাও।
পরাজয় স্বীকার করে মাথা নাড়ল অ্যাল। এখানে থাকবে কারা?
ব্রিটিশ সার্ভে টিমের সদস্যরা।
আড়ষ্ট হয়ে গেল অ্যাল। কাউকে সিন্ধান্ত নেয়ারও সুযোগ দেবে না? কেউ যদি ভলেন্টিয়ার হতে চায়? তুমি একটা মেয়েকে রেখে যেতে চাইছ, এ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
প্রথমে আমি নিজের দলের লোকদের বাঁচাতে চাইব, ঠাণ্ডা সুরে বলল পিট।
কাঁধ ঝাঁকাল অ্যাল, চেহারায় অসন্তোষ। এত কষ্ট করে বাঁচালাম ওদের, অথচ মৃত্যুর মুখে রেখে যাচ্ছি।
