পিট লম্বা মানুষ; চওড়া কাঁধের শক্তিশালী শরীর ওর; সব সময় সতর্ক, নড়াচড়ায় চিতার ক্ষিপ্রতার আভাস। এমনকি একজন আগন্তুক পর্যন্ত প্রথম পরিচয়ে ওর মধ্যকার ধারালো ভাবটুকু টের পাবে, সরকারের কোনো মহলেই কোনোদিন। বন্ধুর অভাব হয় নি ওর। তার সততা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্যে নাম কিনেছে পিট। মেয়েমহলে তার জনপ্রিয়তা তুলনাহীন, কিন্তু নারী নয় পিটের প্রথম প্রেম হলো সমুদ্র।
নুমার বিশেষ প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে বেশিরভাগ সময়ই পানির উপর না হয়ে নিচে কাটে পিটের। প্রথমত, তার দায়িত্ব হলো ডাইভিং; জীবনে খুব কমই জিমে গিয়েছে ডার্ক। বহু বছর আগেই ধূমপান ছেড়েছে, অল্প সল্প পান করে, পরিমিত খাওয়া দাওয়া করে। কাজের কারণে দিনে পাঁচ মাইলেরও বেশি হাঁটতে হয় তাকে। পেশাগত চাকরির বাইরে সময় পেলে পানির নিচে ডুব দিয়ে পুরোনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করা তার শখ।
সাবমারসিবলের বাইরে, বৃত্তাকার দেয়াল ও ধনুক আকৃতির ছাদের নিচে মসৃণ মেঝে থেকে প্রতিধ্বনি তুলল পায়ের আওয়াজ। চেয়ারে ঘুরে বসল পিট, তাকাল নুমায় ওর পুরানো বন্ধু ও সহকর্মী অ্যাল জিওর্দিনোর দিকে। পিটের কাঁধ পর্যন্ত লম্বা সে, বলিষ্ঠ গড়ন, হাসিখুশি চেহারা। কি রকম দেখছ এটাকে? পিটকে জিজ্ঞেস করল সে। ব্রিটিশরা ভাল একটা জিনিস বানিয়েছে, প্রশংসার সুরে জবাব দিল। পিট, হ্যাঁচটা বন্ধ করে দিল অ্যাল জিওর্দিনো।
বিধ্বস্ত গম্বজটার চারদিকে চোখ বুলাল অ্যাল, মাথা নাড়ল। ওরা ভাগ্যবান বটে। আর পাঁচ মিনিট দেরি হলে আমরা ওদের লাশ দেখতে পেতাম।
কেমন আছে সবাই?
দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে, বলল অ্যাল। গ্যালিতে বসে আমাদের খাবার সাবাড়। করছে, বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারফেসে ওদের জাহাজে পৌঁছে দিতে হবে। জানতে চাইছে, আমরা কারা, কোত্থেকে এলাম, সাগরের এত গভীরে বিলাসবহুল জীবনযাপনের এত সব সুবিধে কিভাবে পাচ্ছি ইত্যাদি।
ওল্ড গার্টে চারদিকে আরেকবার তাকাল পিট, বলল, আমাদের এত বছরের গোপনীয়তা সব ভেস্তে গেল।
সেজন্যে তুমি দায়ী নও।
প্রজেক্ট গোপন রাখার স্বার্থে আমার বরং উচিত ছিল ওদেরকে মরতে দেয়া।
আরে শালা, কাকে বোকা বানাবার চেষ্টা হচ্ছে? অ্যাল জিওর্দিনাকে? গলা ছেড়ে হেসে উঠল সে। তোমাকে আমি আহত কুকুরকে রাস্তা থেকে তুলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে দেখেছি। এমন কি ডাক্তারের বিল পর্যন্ত দিতে দেখেছি, যদিও কুকুরটাকে তুমি গাড়ি চাপা দাওনি। ইউ আর আর বিগ সফটি, মাই ফ্রেন্ড। কিসের গোপন অপারেশন! কুষ্ঠ বা এইডস থাকলেও ওদেরকে তুমি উদ্ধার করতে।
ব্যাপারটা কি এতই পরিষ্কার?
অ্যালের চেহারা থেকে বিদ্রুপাত্মক ভাবটুকু মুছে গেল। তোমাকে ছোট্ট বেলা থেকে চিনি আমি, ডার্ক। কেউ একবার মারলে তুমি তিনবার মেরে প্রতিশোধ নাও। ভেবেছ তোমাকে চিনতে ভুল করব আমি। বাইরে তোমাকে পাষাণ বলে মনে হতে পারে, ভেতরটা আসলে কাদা।
তা হবে। তোমার জন্যে দুঃসংবাদ, একটা সাঙ্কেতিক মেসেজ এসেছে কমিউনিকেশন রুমে। ওয়াশিংটন থেকে আসছেন অ্যাডমিরাল, দুঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে তাঁর প্লেন। একটা সাবকে নির্দেশ দিয়েছি, সারফেসে উঠে গিয়ে তাঁকে যেন নিয়ে আসে।
ভুরু কুঁচকে তাকিলে থাকল পিট।
আমার ধারণা, তাঁর আকস্মিক আগমনের কারণ হলো ওই বিদঘুটে ডিস্টাব্যান্স।
ওল্ড গার্ট থেকে বেরিয়ে এসে গোলাকৃতি দরজাটার দিকে এগোল পিট, সাথে অ্যাল। কার্বন ও সিরামিক রিএনফোর্সড প্লাস্টিক দেয়ালগুলো সাগরের পাঁচ হাজার চারশো মাটির নিচেও সম্পূর্ণ নিরাপদ। সমতল মেঝেতে ওল্ড গার্ট ছাড়ও ট্রাক্টর এর মতো দেখতে বিশাল একটা ভেহিকেল রয়েছে, কাঠামোর উপর দিকটা চুরুট আকৃতির। পাশাপাশি রয়েছে আরও দুটো সাবমারবিসল, কয়েকজন লোক ওগুলো। সার্ভিসিং করছে।
গোল একটা সরু টানেল দিয়ে বেরিয়ে এল পিট, গম্বুজ আকৃতির দ্বিতীয় চেম্বার। এটাকে ডাইনিং কমপার্টমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। লম্বা একটা টেবিল, কয়েকটা চেয়ার, সবই অ্যালুমিনয়ামের। অতিথিদের ওপর নজর রাখছে। নুমার দুজন কু, কিচেন ও টানেলের দরজা থেকে।
টেবিলের এক ধারের তিনটে চেয়ারে বসে নিজেদের মধ্যে চাপাস্তরে আলোচনা করছেন ড. স্যালাজার, প্লাঙ্কেট ও স্টেসি ফক্স। ওদেরকে দেখে চুপ করে গেলেন সবাই।
উল্টোদিকের একটা চেয়ারে বসে একে একে সবার দিকে তাকাল পিট। সবিনয়ে জানতে চাইল, হাউ ডু ইউ ডু। আমি ডার্ক। একটা প্রজেক্ট অপারেশন চলছিল, আপনাদের আমরা দেখতে পাই। প্রজেক্টটার আমিই হেড।
থ্যাঙ্ক গড! কথা বলার মতো একজনকে পাওয়া গেল! স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন প্লাঙ্কেট।
ভাষাটাও ইংরেজি! হাঁফ ছাড়লেনও ড. স্যালাজার।
ইঙ্গিতে অ্যালকে দেখাল পিট। মি, অ্যাল জিওর্দিনো, চীফ অ্যাসিস্ট্যাট। ওই আপনাদের সব ঘুরিয়ে দেখাবে, কোয়ার্টার বরাদ্দ করবে, যা যা লাগে সব সাপ্লাই দেবে।
পরিচয়, করমর্দন ইত্যাদি শেষ হলো। সবাইকে কফি দিতে বলল অ্যাল। ধীরে ধীরে শিথিল হলো তিন আগন্তুকের পেশী।
সবার পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ, বললেন প্লাঙ্কেট। আমাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে।
আমি আর অ্যাল খুশি, সময়মত আপনাদের দেখতে পাওয়ায়।
আপনার উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে আমেরিকান, স্টেসি বললো।
