আলো জ্বাললেন প্লাঙ্কেট। কি ব্যাপার? ওটা কিসের শব্দ?
চোখ মেললেন ড. স্যালাজার, বিড়িবিড় করে বললেন, স্টেসি ভুল শুনছে।
ভুল শুনছি মানে? তবে গাওয়া হচ্ছে ভুল একটা গান, আসলে গান ধরা উচিত ছিল উই মে সেবার পাস দিস ওয়ে এগেইন।
স্টেসির দিকে তাকালেন প্লাঙ্কেট। হ্যাঁ, আমিও শুনতে পাচ্ছি…।
তাহলে বলব, দুজনেই হ্যালুসিনেশনের শিকার, হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন ড. স্যালাজার। অক্সিজেনের অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। হঠাৎ প্লাঙ্কেটের একটা হাত চেপে ধরে বললেন, ফর গডস সেক, ম্যান! সিস্টেমটা বন্ধ করে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলুন। দেখতে পাচ্ছেন না, স্টেসি কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সবাই কষ্ট পাচ্ছি।
বাতাসের অভাবে প্রাঙ্কেটের বুকটাও ব্যাখ্যা করছে। বাঁচার সম্ভাবনা একবোরেই নেই, তিনিও জানেন। কিন্তু তাই বলে মৃত্যুকে এগিয়ে আনার পক্ষপাতি তিনি নন। শেষ পর্যন্ত দেখব আমরা, ভারী গলায় বললেন। এমন হতে পারে, প্লেনে করে আরেকটা সাবমারবিসবল আনা হয়েছে ইনভিনসিবল-এ।
আপনি একটা পাগল! সাত হাজার কিলোমিটারের মধ্যে দ্বিতীয় কোন ডীপ ওয়াটার সাবসারবিসবল নেই। তবু যদি একটা আনা হয়, আর ইনভিনসিবল যদি ভেসে থাকে, এখানে নামাতে আরও আট ঘণ্টা সময় লাগবে ওদের।
আপনার সাথে তর্ক করব না। তবে আশা ছাড়তে রাজি নই আমি।
আশ্চর্য, আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? ড. স্যালাজারকে জিজ্ঞেস করল স্টেসি। শব্দটা আগের চেয়ে কাছে চলে এসেছে।
চুপ! ধমক দিলেন প্লাঙ্কেট। আরও কি যেন শুনতে পাচ্ছি।
গম্বুজের ওপর দিকে, অন্ধকারে তাকিয়ে থাকল স্টেসি, প্রাঙ্কেটের দেখাদেখি। ওল্ড গার্ট-এর ভেতরের আলোয় বাইরের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত আকৃতির একটা জীব দেখতে পেল সে। ওটার কোন চোখ নেই, তবে গম্বুজটাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে বলে মনে হলো, সারাক্ষণ দুই সেন্টিমিটার দূরত্ব বজায় রেখে।
হঠাৎ করে পানিতে কি যেন একটা চকচক করে উঠল। দূরে কি যেন একটা নড়াচড়া করছে, আভাস পাওয়া গেল দানবীর একটা আকৃতির। কালো অন্ধকার নীলচে হয়ে উঠল, সেই সাথে আরও স্পষ্ট ভাবে ভেসে এল গানের আওয়াজ।
আতঙ্কিত বোধ করলেন প্লাঙ্কেট। অক্সিজেনের অভাবে উল্টোপাল্টা কাজ শুরু করেছে ব্রেন, অবাস্তব দৈত্যের জন্ম দিচ্ছে। ওদের দিকে কিছু একটা এগিয়ে আসছে বলে মনে হলো, তা সত্যি হতে পারে না। মনে মনে ঠিক করলেন, আরও কাছে আসুক, তারপর বাইরের আলোটা জ্বালবেন শুধু শুধু ব্যাটারি খরচ করার কোন মানে হয় না।
ক্রল করে সামনে এগোল স্টেসি, গম্বুজের দেয়ালে ঠেকে গেল তার নাক। কানে ঢুকল অনেকগুলো গলা। কি, বলিনি? ফিসফিস করল সে। আমার কথাই ঠিক! শুনুন এবার, গান শুনুন!
অনেক দূরে ও অস্পষ্ট তবু গানের কথাগুলো এবার শুনতে পেলেন প্লাঙ্কেট। মনে হলো, তিনি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছেন। অক্সিজেনের অভাব ঘটলে মানুষ চোখে ভুল দেখতে পারে, কানেও ভুল শুনতে পারে। তবে নীল আলোটা আরও উজ্জ্বল হচ্ছে, গানটাও তিনি চিনতে পারছেন।
ওহ হোয়াট এ টাইম আই হ্যাড উইথ মিনি দ্য মারমেইড।
ডাউন অ্যাট দ্য বটম অভ দ্য সী।
আই ফরগট মাই ট্রাবলস দেয়ার অ্যামাং দ্য বাবলস।
জী; বাট শি ওয়াজ অফুলি গুড টু মি।
বোতাম টিপে বাইরের আলোটা জ্বাললেন তিনি। এক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকলেন। সমস্ত শক্তি হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছেন তিনি, পৌঁছে গেছেন ক্লান্তির চরম সীমায়। কালো অন্ধকার থেকে যে জিনিসটা তার চোখের সামনে বেরিয়ে এল, সেটাকে বাস্তব বলে মেনে নিতে পারলেন না। জ্ঞান হারালেন সাথে সাথে।
বিস্ময়ের আঘাতে অসাড় হয়ে গেল স্টেসি, গম্বুজের দিকে এগিয়ে আসা জিনিসটার ওপর থেকে চোখ দুটো সরাতে পারল না। দানবই বটে, তবে যান্ত্রিক দানব। নিচের দিকটা ট্র্যাক্টর-এর মত, গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে, মূল কাঠামো থেকে বেরিয়ে আছে আলাদা দুটো বাহু, সেগুলোও আকারে বিশাল। ওল্ড গার্টের আলোয় এসে থামল অদ্ভুত আকৃতির কাঠামোটা। ঝাপসা, মনুষ্য আকৃতির দিক যেন একটা বসে আছে বিদঘুটে মেশিনটার স্বচ্ছ নাকে, গম্বুজ থেকে মাত্র দুমিটার দূরে। চোখ বন্ধ করে আবার খুলল স্টেসি।
ঝাপসা আকৃতিটা এবার পুরোপুরি মানুষের আকৃতি পেল। আসমানি রঙের জাম্পস্যুট পরে আছে লোকটা, সামনের দিকে আংশিক খোলা। মুখের গড়ন অত্যন্ত পুরুষালী, সুদর্শন; অসাধারণ সবুজ চোখ জোড়ার সঙ্গে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা দারুণ মানিয়েছে।
স্টেসির দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা, দৃষ্টিতে কৌতুক। পিছন দিকে হাত লম্বা করে একটা ক্লিপবোর্ড টেনে আনল কোলের ওপর, একটা প্যাডে কি যেন লিখল। তারপর কাগজটা ছিঁড়ে উল্টো করে সেটে ধরল নিজের ভিউ উইন্ডোয়।
শব্দগুলো পড়ার জন্যে চোখ কুঁচকে তাকাল স্টেসি। লেখা রয়েছে, সগি একর-এ স্বাগতম। অক্সিজেন লাইন জোড়া লাগাচ্ছি, ততক্ষণ টিকে থাকুন।
কোত্থেকে এল লোকটা? মৃত্যুর সময় এরকমই হয় বুঝি, অবাস্তব সব দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের সামনে? স্টেসি অনেককে বলতে শুনেছে, মারা যাবার ঠিক আগের মুহূর্তে নিকটাত্মীয়দের দেখতে পায় মানুষ। কিন্তু এ লোকটা তো সম্পূর্ণ অচেনা তার।
ধাঁধার কোন উত্তর পেল না স্টেসি, জ্ঞান হারাল।
.
০৮.
বড় একটা বুদবুদ আকৃতির ঘরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে ডার্ক পিট, হাত দুটো নুমার জাম্পস্যুটের পকেটে ঢোকানো, তাকিয়ে আছে ওল্ড গার্টের দিকে। মসৃণ ও কালো লাভা মোড়া মেঝেতে ভাঙা একটা খেলনার মতো পড়ে রয়েছে সাবমারসিবলটা। নির্লিপ্ত চেহারা, হ্যাঁচ বেয়ে ওপরে উঠে পাইলটের চেয়ারে বসল ও, কনসোলে সাজানো ইস্ট্রমেন্টগুলো পরীক্ষা করল।
