সম্ভাবনা কম, বললেন রেইমন্ড জর্ডান। গ্লোবাল ব্লক ও ওয়েস্টার্ন ইন্টেলিজেন্সকে লুবিকে প্রস্তুতি শেষ করার কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আমার ধারণা, শেষ পর্যন্ত জানা যাবে, এটা একটা দুর্ঘটনা। একটা নিউক্লিয়ার ডিভাইস, বিস্ফোরিত হবার কথা নয়, কিন্তু হয়েছে।
কয়েক সেকেন্ড পর প্রেসিডেন্ট জানতে চাইলেন, এলাকায় যেসব জাহাজ ছিল, সেগুলোর পরিচয় জানা গেছে?
সমস্ত তথ্য এখনও আসেনি, তবে জানা গেছে আশপাশে তিনটে জাহাজ ছিল। নরওয়ে একটা প্যাসেঞ্জার-কার্গো লাইনার, একটা জাপানি অটো-ক্যারিয়ার, একটা ব্রিটিশ ওশেনোগ্রাফিক শিপ গভীর সাগরে সার্ভে পরিচালনা করছিল ওরা।
তার মানে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে।
ঘটনার আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি থেকে জানা গেছে, তিনটে জাহাজেই ডুবে গেছে বিস্ফোরণের সময় বা বিস্ফেরেণের পরপরই। কোন মানুষ বেঁচেছে বলে মনে হয় না। ফায়ার বল আর শক ওয়েভে যদি মারা নাও যায়, রেডিয়েশনে মারা গেছে।
ধরে নিচ্ছি রেসকিউ মিশন পাঠানো হচ্ছে? ভাইস-প্রেসিডেন্ট বললেন।
গুয়াম আর মিডওয়ের ন্যাভ্যাল ইউনিটকে অনুস্থলে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
একদৃষ্টে কার্পেটের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট। ব্রিটিশরা আমাদেরকে কিছু না জানিয়ে বোমা টেস্ট করবে, এ আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
এ কথা নরওয়ে সম্পর্কেও বলা যায়, মন্তব্য করলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট।
কিংবা জাপান সম্পর্কে, বিড়বিড় করলেন প্রেসিডেন্ট। ওরা নিউক্লিয়ার বোমা বানাবার চেষ্টা করছে, এ ধরনের কোন রিপোর্ট আমরা পাইনি।
ডিভাইসটা চুরি করাও হয়ে থাকতে পারে, বললেন ডেইল নিকোলাস। হয়তো গোপনে নরওয়ে বা জাপানের জাহাজে করে পাচার করা হচ্ছিল।
কাঁধ ঝাঁকালেন রেইমন্ড জর্ডান। ওটা চুরি করা বলে মনে হয় না আমার। আমার ধারণা, নির্দিষ্ট একটা গন্তব্যে নিয়ে আসা হচ্ছিল ওটাকে তদন্তে সেটাই প্রমাণিত হবে।
নির্দিষ্ট গন্তব্যে?
ক্যালফোর্নিয়ার দুটো বন্দরের যে-কোন একটায়।
ঠাণ্ডা, গভীর দৃষ্টিতে রেই ট্যাবলটের দিকে তাকালেন সবাই। গোটা ব্যাপারটার বিশালত্ব এতক্ষণে যেন উপলব্ধির মধ্যে ধরা দিতে যাচ্ছে।
ডিভাইন স্টার সাত হাজার মুরমটো অটোমোবাইল নিয়ে কবে থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে আসছিল, বললেন রেইমন্ড জর্ডান। নারভিক আসছিল কোরিয়ায়ৎর পুসান থেকে, বহন করছিল কোরিয়ান জুতো, কমপিউটার, কিচেন সরঞ্জাম ও একশো ত্রিশ জন প্যাসেঞ্জার। গন্তব্য ছিল সান ফ্রান্সিসকো।
গুড গড! বিড়বিড় করলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট। ভীতিকর একটা চিন্তা! বিদেশী এক জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রে নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে আসছে।
তোমার পরামর্শ, রেই? জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট।
এখুনি ফিল্ড টিম পাঠাতে হবে। নেভীর ডীপ-সী স্যালভেজ ভেসেল হলে ভাল হয়, তলিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো সার্ভে করে জানতে চেষ্টা করবে কোন জাহাজে বোমাটা ছিল।
প্রেসিডেন্ট ও ডেইল নিকোলাস দৃষ্টি বিনিময় করলেন, তারপর প্রেসিডেন্ট বললেন, ডীপ-ওয়াটার অপারেশনের জন্যে নুমার অ্যাডমিরাল স্যানডেকার আর তার কর্মীরা সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করি আমি। তাকে ব্রিফ করার দায়িত্ব আমি তোমাকে দিতে চাই, রেই।
মি. প্রেসিডেন্ট, এ ব্যাপারে আপনার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই দ্বিমত পোষণ করি আমি, চেহারা গম্ভীর করে বললেন রেইমন্ড জর্ডান। এ ধরনের একটা অপারেশনে আমরা শুধু নেভীকে বিশ্বাস করতে পারি…।
ক্ষীণ হাসি ফুটল প্রেসিডেন্টের ঠোঁটে। তোমার উদ্বেগ আমি বুঝতে পারি, রেই। কিন্তু আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। কোন রকম নিউজ লিক ছাড়াই কাজটা করতে পারবে নুমা, আমি জানি।
সোফা ছাড়লেন রেইমন্ড জর্ডান, অস্বস্তিবোধ করছেন, কারণ বুঝতে পেরেছেন যে নুমা সম্পর্কে এমন কিছু জানেন প্রেসিডেন্ট যা তিনি জানেন না। ডেইল যদি অ্যাডমিরালকে জানিয়ে রাখেন, তার অফিসের উদ্দেশ্যে এখুনি আমি বেরিয়ে পড়তে চাই।
ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট। ধন্যবাদ, রেই। তুমি আর তোমার লোকজন অল্প সময়ের ভেতর অনেক কাজ করেছ।
ওভাল অফিস থেকে জর্ডানকে বিদায় দেয়ার সময় আশাপাশে কেউ নেই দেখে ডেইল নিকোলাস নিচু গলায় জানতে চাইলেন, তোমার কি ধারণা, বোমাটা কারা পাচার করছিল?
এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন রেইমন্ড জর্ডান। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাব। যে প্রশ্নটা আমাকে আতঙ্কিত করে তুলছে, সেটা হচ্ছে কি উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল বোমাটা?
.
০৭.
সাবম রসিবলের ভেতর পরিবেশ স্যাতসেতে ও ভ্যাপসা হয়ে উঠল। গম্বুজের দেয়াল ঘামছে, ঝরে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। অক্সিজেন বাঁচাবার জন্যে কেউ নড়ছে না, কথা বলছে খুব কম। সাড়ে এগারো ঘণ্টা পর ওদের লাইফ-প্রিজারভিং অক্সিজেন সাপ্লাই প্রায় শেষ হয়ে গেল।
ভয় ও আতঙ্কের জায়গা দখল করল হতাশা, হাল ছেড়ে দিয়েছে ওরা। ড. স্যালাজার পাথুরে মূর্তির মতো বসে আছেন নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে। মনে মনে নিয়তিকে মেনে নিয়েছেন তিনি, অপেক্ষা করছেন মৃত্যুর।
ছেলেবেলায় ফিরে গেছে স্টেসি, কল্পনা করছে অন্য কোন জায়গায় অন্য কোন সময়ে রয়েছে সে। ভাইদের সাথে বাড়ির সামনে রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে, ক্রিসমাসে উপহার পাওয়া সাইকেল চালাচ্ছে। এক সময় মাথাটা একদিক কাত করে কিছু শোনার চেষ্টা করল সে। প্রথমে সন্দেহ হলো, তার বোধহয় মাথা ঠিক নেই। তা না হলে কোরাস শুনতে পাবে কেন। চোখ মেলল সে। গম্বুজের ভেতর অন্ধকার, কাউকে দেখতে পেল না। গান গায় কে? ফিসফিস করে জানতে চাইল।
