রেইমন্ড জর্ডানকে দেখে মনে হবে না যে তিনি প্রখর বুদ্ধির বা ফটোগ্রাফিক মেমোরির অধিকারী, সেই সাথে সাতটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই চেহারা তার। মাঝারি আকৃতি, বয়স ষাটের কাছাকাছি, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, নিরেট গড়ন, সামান্য একটা ভুঁড়ি আছে, চোখ দুটো শান্ত ও কোমল। বিয়ে করার পর সাঁইত্রিশ বছর ধরে স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত, তার দুই মেয়েই কলেজে মেরিন বায়োলজি পড়ে।
ডেইল নিকোলাস যখন পথ দেখিয়ে ওভাল অফিসে নিয়ে এলেন রেইমন্ডকে, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট তখন নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে আলাপ করছেন। পায়ের আওয়াজ পেয়ে সাথে সাথে তাকালেন তারা। রেইমন্ড জর্ডান লক্ষ করলেন, দুজনেই তারা ডেইল নিকোলাসের মতো উত্তেজিত হয়ে আছেন।
এসেছ বলে ধন্যবাদ, রেই, বললেন প্রেসিডেন্ট। হাত বাড়িয়ে একটা সোফা দেখালেন, সোফার উপরে অ্যানড্র জ্যাকসন-এর পোর্টেট।
কি ঘটছে?
যে-কোন সঙ্কটে উদ্বিগ্ন রাজনীতিকদের সাথে কথা বলার সময় কৌতুক বোধ করেন রেই জর্ডান। তিনি যে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী, এ কথা তারা জানা সত্ত্বেও স্বীকার করতে চান না। বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ধারণাও সীমিত, অন্তত তাঁর কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ছোট করে মাথা ঝাঁকিয়ে বসলেন তিনি, কোলের উপর ব্রীফকেসটা রেখে অসসভঙ্গিতে খুললেন। রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে, তাই একটা ফাইল বের করে হাতে রাখলেন।
আমরা কি একটা পরিস্থিতির মুখে পড়েছি? ধৈর্য হারিয়ে জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট, এখানে পরিস্থিতি একটা সাঙ্কেতিক শব্দ, বেসামরিক জনসাধারণ ভয়ঙ্কর কোন হুমকির মুখে পড়লে ব্যবহার করা হয় যেমন, পারমাণবিক আক্রমণ।
ইয়েস, স্যার, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি আমরা একটা পরিস্থিতির মুখে পড়েছি।
কি দেখতে পাচ্ছি আমরা?
ফাইলের দিকে তাকলেন না রেইমন্ড জর্ডান, রিপোর্টটা মুখস্ত হয়ে গেছে তার, পুরো ত্রিশটা পাতা। ঠিক এগারোটা চুয়ান্নতে মহাশক্তিশালী একটা বিস্ফোরণ ঘটেছে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে, মিডওয়ে দ্বীপ থেকে প্রায় নয়শো কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। আমাদের একটা পিরামিড স্পাই স্যাটেলাইট ফ্ল্যাশ ও অ্যাটমস্কেরিক ডিসটার্ন্যান্স-এর ছবি তুলেছে, আর শক ওয়েভ রেকর্ড করেছে গোপন হাইড্রোফোনি বয়ার সাহায্যে। সমস্ত ডাটা সরাসরি ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সিতে পাঠানো হয়েছে বিশ্লেষণ করার জন্যে। আরও পাঠানো হয়েছে সিসমোগ্রাফিক রিডিং। ল্যাংলিতেও রিপোর্ট করা হয়েছে।
উপসংহার?
বিস্ফোরণটা যে পারমাণবিক, এ ব্যাপারে সবাই একমত, শান্তভাবে বললেন রেইমন্ড জর্ডান।
আমরা কি ডেফকম অ্যালার্ট-এ রয়েছি? প্রশ্ন করলেন প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ জানতে চাইছেন পারমাণবিক আক্রমণ ঠেকাবার প্রস্তুতিতে কোন পর্যায়ে রয়েছেন তারা।
মাথা ঝাঁকালেন রেইমন্ড জর্ডান। নিজের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে নোরাডকে নির্দেশ দিয়েছি, ডেফকম অ্যালার্ট থ্রী ঘোষণা করতে হবে, তৈরি থাকতে হবে ডেফকম অ্যালার্ট-টুর জন্যে নির্ভর করে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ার ওপর।
ডেইল নিকোলাস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জর্ডানের দিকে। আমরা কি আকাশে?
নিশ্চিত হবার জন্যে, আরও তথ্য সংগ্রহের জন্যেও, বিশ মিনিট আগে এডওয়ার্ড এয়ার ফোর্স বেস থেকে একটা ক্যাপার এস আর-নাইনটি রেকন এয়ারক্রাফট টেক অফ করেছে।
শক ওয়েভের জন্যে নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশনই দায়ী, এটা কি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে? জানতে চাইলেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট। পঞ্চাশ বছর বয়েস, মোটাসোটা ভদ্রলোক, ছয়বছর কংগ্রেসে ছিলেন। পানির নিচে ভূমিকম্প থেকেও সৃষ্টি হতে পারে, কিংবা আগ্নেয়গিরির…।
মাথা নাড়লেন রেইমন্ড জর্ডান। তারপর তিনি ফাইল খুলে বিভিন্ন সায়েন্টেফিক রিপোর্টগুলো পড়ে শোনালেন। বললেন, আরও তথ্য পাবার পর বলা সম্ভব হবে কতটা শক্তিশালী ছিল বিস্ফোরণটা।
অনুমান?
দশ থেকে বিশ কিলোটন।
শিকাগোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট, মন্তব্য করলেন ডেইল। নিকোলাস।
কে, কারা, কেন? কঠিন সুরে জানতে চাইলেন প্রেসিডেন্ট। আমাদের নিজেদের কোন নিউক্লিয়ার সাবমেরিন হতে পারে, কোন কারণে বিস্ফোরিত হয়েছে?
চীফ অব ন্যাভাল অপারেশনস আমাকে জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের চারদিকে পাঁচশো কিলোমিটারের মধ্যে আমাদের কোন সাবমেরিন নেই।
রাশিয়ান সাবমেরিন?
না, রেইমন্ড জর্ডান বললেন। আমার রুশ প্রতিপক্ষ নিকোলাই গোলানভের সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলছেন, তাঁদের সমস্ত নিউক্লিয়ার জলযান নিরাপদে আছে। স্বভাবতই বিস্ফোরণের জন্যে আমাদেরকে দায়ী করছেন তিনি। আমার ধারণা, আমাদের মতো তারাও অন্ধকারে রয়েছেন।
নিকোলাই গোলানভ সত্যি কথা না-ও বলতে পারেন, সন্দেহ প্রকাশ করলেন ডেইল নিকোলাস।
তাঁর দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেন রেইমন্ড জর্ডান। নিকোলাইয়ের সাথে ছাব্বিশ বছরের সম্পর্ক আমার। পরস্পরকে ঘিরে আমরা প্রচুর নাচানাচি করলেও কেউ কখনও মিথ্যে কথা বলিনি।
আমরা দায়ী নই, রাশিয়া দায়ী নয়, তাহলে কে? প্রেসিডেন্টের গলা আশ্চর্য নরম।
আরও অন্তত দশটা দেশের হাতে অ্যাটম বোমা রয়েছে, বললেন ডেইল নিকোলাস। তারা কেউ টেস্ট করার জন্যে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
