ডেপথ মিটারের দিকে এমন কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্টেসি তার মনে হলো ডায়ালের ওপর কাঁচটা ফেটে যাবে। গো…গো…, বিড়বিড় করে আবেদন জানাচ্ছে সে।
দুঃস্বপ্নটা গ্রাস করল ওদেরকে বিনা নোটিশে। ইলেকট্রিক্যাল ও অক্সিজেন ইকুইপমেন্ট ভরা গম্বুজটা সাগরের মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে তুবড়ে গিয়েছিল, পানির নির্দয় চাপে ডিমের মত ভেঙে পড়ল সেটা।
ব্রাডি হেল! খসে পড়ল সাবমারসিবল, সাগরের মেঝেতে লেগে ঝাঁকি খেল। তারপরই একবার ইতস্তত করে নিভে গেল আলোটা। নিশ্চিদ্র অন্ধকার কি রকম আতঙ্ক সৃষ্টি করে তা একমাত্র অন্ধজনই বলতে পারে; প্রাঙ্কেটের মনে হলো, অন্ধকার জ্যান্ত একটা প্রাণী, চারপাশ থেকে তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে।
নিস্তব্ধতা ভাঙলেন ড. সালাজার, মাদার অভ জেসাস, আমাদের সত্যি কোন আশা নেই।
কে বলেছে? ধমকের সুরে কথা বললেন প্লাঙ্কেট। কন্ট্রোল গম্বুজ আলাদা করে নিয়ে এখনও আমরা উপরে উঠে যেতে পারি। কনসোলে হাত বুলালেন তিনি, নির্দিষ্ট সুইচটা খুঁজে নিলেন। ক্লিক করে শব্দের সাথে ইমার্জেন্সি লাইট জ্বলে উঠল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্টেসি বলল, থ্যাঙ্ক হেভেন। আমরা অন্তত দেখতে পাচ্ছি। সামান্য একটু ঢিল পড়ল তার পেশীতে।
জরুরি অবস্থা, উঠে যেতে হবে ওপরে, সেভাবে নির্দেশ দিয়ে কমপিউটারের প্রোগ্রাম সেট করলেন চীফ এঞ্জিনিয়ার প্লাঙ্কেট। রিলিজ মেকানিজম সেট করে স্টেসি ও ড. সালাজারের দিকে তাকালেন। শক্ত হয়ে বসতে হবে। উঠতে শুরু করলে কি ঘটে বলা যায় না।
আমি তৈরি, ভয়ে ভয়ে বলল স্টেসি।
রিলিজ হ্যান্ডেল থেকে সেফটি পেগ সরিয়ে নিলেন প্লাঙ্কেট, তারপর শক্ত হাতে ধরে টান দিলেন।
কিছুই ঘটল না।
নিয়ম ধরে তিনবার চেষ্টা করলেন প্লাঙ্কেট, কিন্তু সাবমারসিবলের মেইন সেকশন থেকে কন্ট্রোল গম্বুজ গোঁয়ারের মতো আলাদা হতে অস্বীকার করল। মরিয়া হয়ে উঠে কমপিউটরকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথাও কোন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা। দিয়েছে কিনা। চোখের পলকে উত্তর পাওয়া গেল স্ক্রীনে। সাগরের তলার সাথে ধাক্কা খাওয়ার সময় রিলিজ মেকানিজমস মুচড়ে বাঁকা হয়ে গেছে, মেরামতের অযোগ্য।
আমি দুঃখিত, হতাশায় মুষড়ে পড়ে বললেন প্লাঙ্কেট। কেউ এসে উদ্ধার না করা পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে আমাদের।
সম্ভাবনা কম, বিড়বিড় করলেন ড. স্যালাজার, স্কি জ্যাকেটের হাতা দিয়ে। মুখের ঘাম মুছলেন।
অক্সিজেনের অবস্থা কি? জানতে চাইল স্টেসি।
মেইন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কন্ট্রোল গম্বুজে ইমার্জেন্সি সাপ্লাই থেকে যা পাওয়া যাবে তাতে দশ থেকে বারো ঘণ্টা টিকে থাকতে পারবে ওরা।
প্লাঙ্কেটের জবাব শুনে মাথা নাড়লেন ড. স্যালাজার। দুনিয়ার সমস্ত গির্জা, মসজিদ ও মন্দিরে আমাদের জন্যে প্রার্থনা করা হলেও সময়মত আমরা উদ্ধার পাব না। সাইটে আরেকটা সাবমারসিবল নিয়ে আসতে সময় লাগবে বাহাত্তর ঘণ্টা। ওটা আনার পরও সন্দেহ আছে, ওরা আমাদেরকে সারফেসে তুলতে পারবে কিনা।
আশাব্যঞ্জক কিছু শোনাবেন, এই আশায় প্লাঙ্কেটের দিকে তাকাল স্টেসি, কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। তার নির্লিপ্ত চেহারা দেখে মনে হলো, অন্য কোন জগতে চলে গেছেন। তারপর, স্টেসির দৃষ্টি অনুভব করে, চোখ মিটিমিট করলেন, ফিরে এলেন বাস্তবে। বললেন, ড. স্যালাজার ঠিকই বলছেন। বলতে ঘৃণাবোধ করছি, তবে কথাটা সত্যি, মিরাকুলার কিছু একটা না ঘটলে কোনদিন আমরা আর বোদ দেখতে পাব না।
কি বলছেন! ইনভিনসিবল আমাদের সন্ধানে সাগর তোলপাড় করে ফেলবে না! প্রতিবাদ জানাল স্টেসি।
মাথা নাড়লেন প্লাঙ্কেট। সারফেসে নিদারুণ কিছু একটা ঘটেছে। শেষ যে শব্দটা আমরা শুনেছি, ওটা ছিল জাহাজ ভাঙার।
কিন্তু আমরা যখন পানিতে নামি, আশপাশে আরও দুটো জাহাজ ছিল, বলল স্টেসি। কোনটা ভেঙেছে কে জানে।
একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে চুপ করে থাকলেন প্লাঙ্কেট। গম্বুজের পরিবেশ হতাশায় ভারী হয়ে উঠল। জীবিত উদ্ধার পাবার যে-কোন আশা ফ্যান্টাসি ছাড়া কিছু নয়। শুধু ধরে নেয়া যায়, পরে হয়তো ওল্ড গার্ট এবং ওদের লাশগুলো উদ্ধার করা হবে।
.
০৬.
ডেইল নিকোলাস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী, পাইপে ঘন ঘন টান দিয়ে গলগল করে ধোয়া ছাড়ছেন, রেইমন্ড জর্ডানকে অফিসে ঢুকতে দেখে চশমার ওপর দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকালেন তিনি।
তামাকেরও গন্ধ ও ধোঁয়া অপছন্দ করেন রেইমন্ড জর্ডান, নাক কুঁচকে হাসলেন তিনি, বললেন, গুড আফটারনুন, ডেইল।
এখনও বৃষ্টি হচ্ছে? জানতে চাইলেন ডেইল নিকোলাস।
ঝিরঝির করে। রেইমন্ড জর্ডান লক্ষ করলেন, ডেইল নিকোলাস উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছেন। তাঁর কফিরঙা চুল এলোমেলো, কপালে চিন্তার রেখা।
প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট অপেক্ষা করছেন, তাড়াতাড়ি বললেন ডেইল নিকোলাস। প্যাসিফিক ব্লাস্ট সম্পর্কে সর্বশেষ খবর জানার জন্যে অস্থির হয়ে আছেন তাঁরা।
লেটেস্ট রিপোর্ট আমি নিয়ে এসেছি, শান্ত গলায় আশ্বাস দিলেন রেইমন্ড জর্ডান। অফিশিয়াল ওয়াশিংটনে যে পাঁচ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাধর উনি তাঁদের অন্যতম হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ তাকে চেনে না। চেনেন না বেশিরভাগ বুরোক্র্যাট বা পলিটিশিয়ানরাও। জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের ডিরেক্টর হিসেবে ন্যাশনাল সিকিউরিট সার্ভিসেরও প্রধান তিনি, রিপোর্ট করেন সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে।
