গর্তের ভেতর দিয়ে ব্রিজ আর চার্টরুম দেখতে পেলেন তিনি। ভেতরে কেউ নেই, কিছু নেই, ছাল-চামড়া পর্যন্ত গায়েব হয়ে গেছে। হুইলহাউস পরিণত হয়েছে পোড়া আর হাড়ি ভাঙা মানুষের একটা পে, গর্তের কিনার থেকে নিচের কমপার্টমেন্টে ঝর ঝর করে নেমে আসছে তাদের রক্ত।
কাত হবার চেষ্টা করলেন জিমি নক্স, সাথে সাথে গুঙিয়ে উঠলেন তীব্র ব্যথায়? তিনটে ছাড় ভেঙেছে পাঁজরের, একটা পায়ের গোড়ালি মচকে গেছে, শরীরের অসংখ্য জায়গায় ছিঁড়ে গেছে চামড়া। কাটিয়ে উঠতেই ওল্ড গার্টে কথা মনে পড়ল তার। ক্রল করে ডেক পেরুলেন তিনি, থামলেন আন্ডারওয়াটার টেলিফোনের কাছে। ওল্ড গার্ট? ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলেন। ডু ইউ রিড?
কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন জিমি নক্স, কিন্তু কোন সাড়া পেলেন না। ড্যাম ইউ প্লাঙ্কেট। কথা বলুন।
তারপরও কোন সাড়া পাওয়া গেল না। ইনভিনসিবল-এর সাথে ওল্ড গার্টে সমস্ত যোগাযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি যা ভয় করেছিলেন, তাই ঘটেছে। সার্ভেশিপ ভেঙে চুরে তুবড়ে যাবার পিছনে কারণ যা-ই হোক, সেই একই কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে পানির তলায় ওল্ড গার্টও। মারা গেছে ওরা, বিড়বিড় করলেন। ছাতু হয়ে গেছে সবাই।
তারপর হঠাৎ সহকারী ও ক্রুদের কথা ভাবলেন তিনি। নাম ধরে চিৎকার শুরু করলেন। শুধু মানুষের গোঙানি আর মৃত্যুপথযাত্রী জাহাজের ধাতব কাতর ধ্বনি শুনতে পেলেন। খোলা দরজা দিয়ে তাকাতে দেখতে পেলেন, এলোমেলোভাবে পাঁচটা দেহ পড়ে রয়েছে, একটাও নড়ছে না।
শোকে বিহ্বল, বিস্ময়ে দিশেহারা, নড়ার শক্তি পেলেন না জিমি নক্স। অনুভব করলেন, জাহাজের খিচুনি উঠে গেছে। ইনভিনসিব-এর পিছন দিকটা পাক খাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে ঢেউয়ের ভেতর, যেন একটা ঘূর্ণিজলে ধরা পড়েছে জাহাজ। বুঝতে অসুবিধে হলো না, পানির নিচে তলিয়ে যাবে জাহাজটা।
জাহাজের পিছন দিকটা ডুবে যাচ্ছে, উঁচু হচ্ছে বো। কয়েক মুহূর্ত ওভাবে থাকার পর ডুবে গেল জাহাজের পিছনটা পানির নিচে। তারপর পুরো জাহাজটাই।
ইনভিনসিবল-এর ক্রুরা কেউ বাচল কিনা দেখার জন্যে চারদিকে তাকালেন জিমি। কোথাও কোন লাইফবোট নেই। পানিতেও কেউ সাঁতার কাটছে না। ব্যাখ্যাহীন বিয়োগান্তক ঘটনাটার তিনিই যেন একমাত্র সাক্ষী হয়ে বেঁচে রয়েছেন।
.
০৫.
পানির নিচে বৃত্তাকার শক ওয়েভের গতি ঘণ্টার কমবেশি সাড়ে ছয়হাজার মাইল, সেটার পথে পথে সমস্ত সামুদ্রিক প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেল। গিরিখাদের আড়াল পাওয়ার ওল্ড গার্ট সাথে সাথে বিধ্বস্ত হলো না, তবে অবিশ্বাস্যা দ্রুতবেগে বারবার ডিগবাজি খেতে শুরু করল সেটা। একটা পড়-এ মেইন ব্যাটারি আর প্রোপালশন সিস্টেম রয়েছে, পাথরের শক্ত নডিউলের সাথে বাড়ি খেল সেটা, ভেঙে ডেবে গেল ভেতর দিকে। ভাগ্য ভাল যে সংযুক্ত টিউবের দুপাশের হ্যাঁচ কভার ভাঙল না, ভাঙলে কন্ট্রোল গম্বুজের তেলে পানি ঢুকে রক্তাক্ত ছাতু বানিয়ে ফেলত ওদের।
বজ্রপাতের মতো বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এল আন্ডারওয়াটার টেলিফোনে, প্রায় একই সাথে শোনা গেল শক ওয়েভের আওয়াজ, যেন সগর্জনে ছুটে আসছে একটা এক্সপ্রেস ট্রেন। তারপর নেমে এল ভৌতিক নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধতা আবার ভাঙল, শোনা গেল ইস্পাতের যন্ত্রণাকাতর কর্কশ আওয়াজ, অশান্ত পানির ওপর জাহাজটা টুকরো টুকরো হয়ে নেমে আসছে সাগরের তলায়।
কি ঘটছে? চিৎকার করল স্টেসি, পড়ে যাওয়ার ভয়ে চেয়ারটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে আছে।
আতঙ্কেই হোক, কিংবা দায়িত্বের প্রতি শর্তহীন নিষ্ঠা, নিজের কনসোল থেকে চোখ তুললেন না ড. রাউল স্যালাজার। ভূমিকম্প নয়। কমপিউটার বলছে। সারফেস ডিসটাৰ্যান্স।
ওল্ড গার্ট-এর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন ক্রেইগ প্লাঙ্কেট। নডিউল ভর্তি মাঠে অনবরত বাড়ি খাচ্ছে সাবমারসিবল, অসহায়ভাবে দেখা ছাড়া তার কিছু করার নেই। সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা ভুলে আন্ডারওয়াটার টেলিফোনে চিৎকার করছেন তিনি। সারাফেস কন্ট্রোলার, এখানে আমরা প্রচণ্ড একটা আলোড়নের মধ্যে পড়েছি। কারণটা বুঝতে পারছি না। থ্রাস্ট পথ হারিয়েছি। প্লীজ সাড়া দিন!
জিমি নক্সের কথা শুনতে পাবার কথা নয়। বেঁচে থাকার জন্যে পানির সাথে যুদ্ধ করছেন তিনি।
তখনও টেলিফোনে চিৎকার করছেন প্লাঙ্কেট, ডিগবাজি খাওয়া বন্ধ হলো ওল্ড গার্ট-এর। সাগরের তলায় ধাক্কা খেয়ে স্থির হলো সাবমারসিবল, ইলেকট্রিক্যাল ও অক্সিজেন ইকুইপমেন্ট ভরা গম্বুজটার উপর ভর দিয়ে।
সব শেষ, বিড়বিড় করলেন ড. স্যালাজার, ঠিক কি বলতে চাইছেন নিজেও জানেন না, বিস্ময় ও আতঙ্কে মাথাটা ঠিকমত কাজ করছে না।
কিসের শেষ! কর্কশ স্বরে বললেন প্লাঙ্কেট। ব্যালাস্ট ফেলে দিয়ে এখনও আমরা উপরে ভেসে উঠতে পারব। যদিও জানেন, পড়ে যে পানি ঢুকেছে তার চেয়ে আয়রন ব্যালাস্টের ওজন কমই হবে। তবু সুইচ অন করলেন তিনি, সাবমারসিবলের পেট থেকে কয়েকশো পাউন্ড বোঝা খসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত কিছুই ঘটল না, তারপর এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে সাগরের মেঝে থেকে ওপর দিকে উঠতে শুরু করল ওল্ড গার্ট।
দশ ফুট ওপরে উঠেছি, ত্রিশ সেকেন্ড পর ঘোষণা করলেন প্লাঙ্কেট, যদিও মনে হলো সুইচ টেপার পর এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে সিধে হলো সাবমারসিবল, এতক্ষণে আবার নিঃশ্বাস ফেললেন ওরা। জিমি নক্সের সাথে আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন প্লাঙ্কেট।
