অবশেষে কথা বলে উঠলেন, প্লাঙ্কেট, মনে হলো তাঁর কণ্ঠস্বর অনেক দূর থেকে ভেসে এল। তারা যে-ই হোক, এ দুনিয়ার কেউ নয়। অন্তত মানুষ নয়।
.
০৪.
চেহারায় নগ্ন আতঙ্ক, নিজের হাত দুটোয় ফোঁসকা পড়তে দেখছেন অসকার স্টিন। প্রচণ্ড মানসিক আঘাত ও আকস্মিক পেট-ব্যথায় আধ পাগলা হয়ে উঠলেন তিনি, শরীরের কাঁপুনি থামাতে পারছেন না। সামনের দিকে ঝুঁকে বমি করলেন হাপরের মত হাঁপাচ্ছেন। চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাঁর হার্টবিট হঠাৎ করে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।
সাংঘাতিক দুর্বল লাগছে, কমিউনিকেশন রুমে গিয়ে ক্যাপটেন কার্নি কোরভোল্ডকে সাবধান করা সম্ভব নয়। কোরভোল্ড সিগন্যাল পাঠিয়ে কোন সাড়া না পেলে কি ঘটেছে দেখার জন্যে আরও একটা বোর্ডিং পার্টি পাঠাবেন ডিভাইন স্টারে। অহেতুক আরও কিছু লোক মারা যাবে।
ইতোমধ্যে ঘামে ভিজে গেছেন অসকার স্টিন। হুড তোলা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি, অদ্ভুত এক ঘৃণায় চকচক করছে তার চোখ দুটো। অসাড় একটা ভাব গ্রাস করে ফেলেছে তাকে, তার বিপর্যস্ত মন ইস্পাত, লেদার চামড়ার ভেতর অবর্ণনীয় একটা অশুভ কিছু দেখতে গেল।
যেন আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে, নিষ্প্রাণ গাড়িটার ওপর হিংস্র হয়ে উঠলেন অসকার, ক্যাপটেনের কোয়ার্টার থেকে পাওয়া পিস্তলটা ওয়েস্টব্রান্ড থেকে বের করে গাড়ির সামনের দিকটায় একের পর এক গুলি করলেন তিনি।
দুকিলোমিটার পূর্ব দিকে রয়েছে নারভিক, ব্রিজে দাঁড়িয়ে ডিভাইন স্টারের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্যাপটেন কার্নি কোরভোল্ড, চোখে দূরবীন, এই সময় বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব হারালো জাপানি জাহাজটা। চোখের পলক পড়ল না, গোটা জাহাজটা যেন বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।
দানবীর আকৃতির একটা আগুনে বল লাফ দিয়ে উঠল, সেটার নীল উজ্জ্বলতা সূর্যের চেয়েও গাঢ়। এক পলকেই চার কিলোমিটার জুড়ে বিস্ফোরিত হলো উত্তপ্ত সাদা গ্রাস। আকাশে জন্ম নিল একটা হেমিস্ফোরিক কনডেনসেশন ক্লাউড, ছড়িয়ে পড়ল বিশাল ছাতার আকৃতি নিয়ে।
সাগরের গা তিনশো মিটার জুড়ে ডেবে গেল গভীর একটা গামলার মতো। তারপর কয়েক মিলিয়ন টন পানিসহ আকাশের দিকে খাড়া হলো একটা থাম, থামের গা থেকে কয়েক হাজার পানির মোটা ধারা বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এল, একেকটা এসটাডা লোভার চেয়েও বড় আকারে।
আগুনে বলটা থেকে ছুটল শক ওয়েভ, শনিকে ঘিরে থাকা রিঙের মত, দ্রুত বড় হচ্ছে আকারে, প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ কিলোমিটার গতিতে। নারভিকের আঘাত করল শক ওয়েভ থেতলে, মুচড়ে দলা পাকিয়ে আকৃতিহীন করে দিল জাহাজটাকে।
ক্যাপটেন কার্নি কোরভোল্ট খোলা ব্রিজ উইং-এর দাঁড়িয়ে ছিলেন, ধ্বংসকাণ্ডটা দেখেননি। তাঁর চোখ ও মস্তিষ্ক ঘটনাটা রেকর্ড করার সময় পায়নি। থারমল রেডিয়েশনে এক মাইক্রো সেকেন্ডের মধ্যে কার্বনে পরিণত হয়েছে তিনি। তার গোটা জাহাজ পানি থেকে লাফ দিয়ে শূন্যে উঠল, ছিটকে পড়ল একধারে। প্রাইড অব ম্যানের ইস্পাত ও ধুলো তরল বৃষ্টিরমত ঝরে পড়ল নারভিকের বিধ্বস্ত ডেকে। ফাটল ধরা খোল থেকে বেরিয়ে এল আগুনের লেলিহান শিখা, গ্রাস করে ফেলল ভাঙাচোরা জাহাজটাকে। তারপর ভেতর দিকে বিস্ফোরণ ঘটল। কার্গো ডেকের কন্টেইনারগুলো চারদিকে ছুটে গেল ঝড়ের মুখে পড়া গাছের পাতার মত।
যন্ত্রণাকাতর, কর্কশ চিৎকার দেয়ার সময়টুকুও পাওয়া গেল না। যারা ডেকে ছিল, দেশলাইয়ের কাঠির মত জ্বলে উঠল দপ করে, চড়চড় আওয়াজ তুলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল হাড়, পরমুহূর্তে উবে গেল কর্পূরের মতো। দুশো পঞ্চাশ জন প্যাসেঞ্জার ও ক্রু চোখের পলকে নেই হয়ে গেল।
ডিভাইন স্টার বাস্প হয়ে উড়ে যাবার প্রায় সাথে সাথে থেমে গেল ব্যাপারটা। আগুনে বলের ওপর ফুলকপি আকৃতির যে মেঘটা জমেছিল, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল সেটা, সাধারণ মেঘের সাথে মিশে যাওয়ায় আলাদাভাবে চেনা গেল না। ধীরে ধীরে শান্ত হলো আলোড়িত পানি, ঢেউ বাদ দিলে সাগরের উপরটা এখন আগের মতই মসৃণ। বারো মাইল দূরে এখনও ভেসে রয়েছে ইনভিনসিবল। সার্ভেশিপে যখন আঘাত হানল, শক ওয়েভের অবিশ্বাস্য চাপ তখনও শক্তি হারাতে শুরু করেনি। ইনভিনসিবল-এর সুপারস্ট্রাকচার উপড়ে নিল ওটা, বাইরে থেকে ভেতরের বাল্কহেডগুলো দেখা যাচ্ছে। উপড়ে পানিতে পড়ল চিমনি, ফুটন্ত পানির সাথে ঘুরছে সেটা। চোখের পলক পড়ল না, অদৃশ্য হলো ব্রিজ, সাগরে ছড়িয়ে পড়ল ইস্পাত ও মাংস কণা।
ইনভিনসিবল-এর মাস্তুল কাত হয়ে ভেঙে গেছে। ভেঙে গেছে বড় ক্রেনটা, যেটার সাহায্যে ওল্ড গার্টকে পানির উপর ভোলা হয়। খোলের প্লেটগুলো ভেঙে ঢুকে পড়েছে জাহাজের ফ্রেম ও লংগিচ্যুড়াইনাল বীমাগুলোর মাঝখানে। নারভিকের মতই, বুবার্ডকে চেনা যায় না, আকৃতি হারিয়ে ফেলেছে। কালো, তেলতেলে ধোয়া বেরিয়ে আসছে বিধ্বস্ত পোর্ট সাইড থেকে। যারা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, উত্তাপে পুড়ে গেছে সবাই। ডেকের নিচে এমন কেউ নেই যে আহত হয়নি।
প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে একটা বাল্কহেডের গায়ে ছিটকে পড়লেন জিমি নক্স, বাল্কহেড থেকে ফুটবলের মত ড্রপ খেয়ে ফিরে এলেন মেঝেতে। বাতাসের তীব্র অভাবে দম আটকে মারা যাচ্ছেন তিনি। হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে পড়ে আছেন, হা করে তাকিয়ে আছেন সিলিঙে সদ্য তৈরি একটা গর্তের দিকে।
