মুখে যা-ই বলুক, আসলে লোকটা মোটেও দুঃখিত নয়, মনে হলো ড্যানের। তার হাতের রাইফেলের দিকে সতর্ক নজর রাখছে সে। চেহারায় উদ্বেগ ও অস্থিরতা চাপা থাকছে না। শিকার করারও ইচ্ছে ছিল নাকি? জানতে চাইল সে।
না, মানে স্রেফ টার্গেট শূটিং।
কিন্তু আমার অনুমতি নেই। এদিকে আমার গরু-বাছুররা ঘুরে বেড়ায়। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে যান এবার।
মাথা ঝাঁকিয়ে রাজি হলো লোকটা। সার্ভেয়ারের ট্রানজিট ও তেপায়া ভরল ট্রাঙ্কে, রাইফেলটা রাখল গাড়ির ব্যাকসীটে। আবার গাড়ির সামনে এসে খোলা হুডের ভেতর উঁকি দিল। এঞ্জিনটা ঠিকমতো কাজ করছে না।
স্টার্ট নেবে তো? জানতে চাইল ড্যান।
মনে হয় নেবে, বলে জানালা দিয়ে গাড়ির ভেতর মাথা গলাল লোকটা, ইগনিশন কী ঘোরাল। প্রথমবারেই স্টার্ট নিল গাড়ি। গেলাম, বলল সে।
ড্যান লক্ষ করল না, হুডটা নামানো হলেও তালা দেয়া হয় নি। পারেন যদি গেটটা বন্ধ করে দেবেন, বলল সে।
অবশ্যই।
মাউজারটা কেসে ভরে বাড়ির পথ ধরল ড্যান। চার কিলোমিটার ছুটতে হবে তাকে।
গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে রওনা হলো সুবুরু মিয়া, গেটের দিকে যাচ্ছে। এ ধরনের নির্জন, প্রায় পরিত্যক্ত এলাকায় একজন রেঞ্জারের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতে পারে নি সে। তবে এতে করে তার মিশন ব্যর্থ হবে না। দুশো মিটার এগিয়ে এসে হঠাৎ করে ব্রেক করল মিয়া, লাফ দিয়ে নিচে নামল, ব্যাকসিট থেকে ছোঁ দিয়ে তুলে নিল রাইফেলটা, তারপর হুডটা তুলল আবার।
এঞ্জিনের আওয়াজ থেকে গেছে শুনে কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল ড্যান।
ঘামে ভেজা হাতে রাইফেল তুলে লক্ষ স্থির করল মিওয়া, এয়ারকন্ডিশনারের কমপ্রেসর প্রায় ছুঁয়ে আছে মাজল। আত্মহুতি দেয়ার এই মিশনে স্বেচ্ছায় রাজি হয়েছে সে, প্রস্তাব পাবার সঙ্গে সঙ্গে, কারণ নতুন সাম্রাজ্যের জন্যে জীবনদান করা তার দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানজনক। রাজি হবার পেছনে আরো কয়েকটা বিবেচনা গুরুত্ব পেয়েছে। গোল্ড ড্রাগন-এর প্রতি অনুগত সে। তাছাড়া, কোরোরি ইয়োশিশু স্বয়ং তাকে আশ্বাস দিয়েছেন, সে মারা গেলেও তার স্ত্রী সারা জীবন আর্থিক সচ্ছলতার মধ্যে দিন কাটাবে, তার তিন ছেলেমেয়েকে নিজেদের পছন্দ মতো ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পথে টোকিও ত্যাগ করার সময় কোরোরি ইয়োশিশু তাকে কী বলেছেন মনে পড়ে গেল তার। কোটি কোটি স্বদেশবাসীর উন্নত ভবিষ্যতের স্বার্থে আত্মত্যাগ করছ তুমি। শত শত বছর তোমার এ আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করবে জাপানিরা।
ট্রিগার টেনে দিল মিওয়া।
.
৬৪.
এক মিলি সেকেন্ডে মিওয়া, ড্যান, গাড়ি ও ঘোড়াটা বাষ্প হয়ে গেল। ঝলসে উঠল বিশাল একটা অত্যুজ্জ্বল হলুদ আলো, তারপর বিস্ফোরিত হয়ে সাদা হয়ে গেল সেটা। অদৃশ্য শক ওয়েভ ছুটে গেল চারদিকে। বিস্তৃত হলো ফায়ারবল, দিগন্ত থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের মতো বাড়ছে, ওপরে উঠছে।
মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে পড়ল ফায়ারবল, মেঘের মাঝখানে পড়ে ম্লান হয়ে গেল সেটা, জ্বলজ্বলে রেডিয়েশন ওটাকে রক্তবর্ণ করে তুলল। পিছু পিছু টেনে নিল ঘূর্ণি আকৃতির মাটি ও আবর্জনার একটা প্রকাণ্ড স্বম্ভকে, দ্রুত ত্রিশ কিলোমিটার পর্যন্ত খাড়া হলে সেটা।
মানুষ বলতে মারা গেল শুধু ড্যান ও মিওয়া। বেশ কিছু খরগোশ, বুনো কুকুর, সাপ ও ড্যানের বিশটা গরু-বাছুর মারা গেল, বেশির ভাগই শক ওয়েভে। চার কিলোমিটার দুরে মিসেস কিগান আর তিনজন শ্রমিক ছুটে আসা ভাঙা কাঁচ লেগে সামান্য আহত হলে শুধু। বিস্ফোরণের বেশিরভাগ ধাক্কা থেকে দালানটাকে আড়াল করল পাহাড়। জানালার কাঁচ ভাঙা ছাড়া দালানের তেমন কোনো ক্ষতি হল না।
আগুনে বিস্ফোরণ একশো মিটার চওড়া ও ত্রিশ মিটার গভীর একটা গর্ত তৈরি করল। শুকনো ঝোঁপ আর ঘাসে আগুন ধরে গেল, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, খয়েরি ধুলোর মেঘের সঙ্গে মিশে গেল কালো ধোঁয়া।
নিস্তেজ হয়ে আসা শক ওয়েভ বাড়ি খেল পাহাড়ে। ঘর-বাড়ি কাঁপিয়ে দিল, ঝাঁকি দিল গাছপালায়, তারপর পৌঁছুল একশো বারো কিলোমিটার উত্তরে লিটল বিগহর্নে।
শেরিডান শহরের বাইরে, একটা ট্রাক স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক জাপানি লোক, পাশে বাড়া করা কার। চারদিকে মানুষের ভিড় ও শোরগোল, সবাই উত্তেজিতভাবে হাত তুলছে দূর আকাশে উঠে আসা ব্যাঙের ছাতা আকৃতির মেঘটার দিকে। তাদের দিকে খেয়াল নেই জাপানি লোকটার, চোখে দূরবীন তুলে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে। এক সময় চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে, ঢুকল একটা টেলিফোন বুদে। খুচরো পয়সা বের করে ডায়াল করল সে, কয়েকটা কথা বলল জাপানি ভাষায়, তারপর নামিয়ে রাখল রিসিভার। গাড়িতে ফিরে এসে স্টার্ট দিল সে, মেঘটার দিকে একবারও না তাকিয়ে চলে গেল।
দুনিয়ার অনেকগুলো সিসমোগ্রাফ স্টেশনে রেকর্ড হয়ে গেল বিস্ফোরণটা। কলোরাডোর স্কুল অব মাইনস-এর, ন্যাশনাল আর্থকোয়েক সেন্টারের স্টেশনটাই সবচেয়ে কাছে, গ্রাফ রেকর্ডারে সিসমোগ্রাফিক ট্রেসিং সামনে পেছনে ছুটোছুটি করছে দেখে সতর্ক হয়ে উঠল জিওফিজিসিস্ট ক্লেইটন সোর্স। ভুরু কুঁচকে কমপিউটারে ডাটা যোগান দিল সে, তারপর ফোন করল সেন্টারের ডিরেক্টর রজার স্টিভেনসনকে। বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত, স্যার। এইমাত্র একটা আঘাত রেকর্ড করেছি আমরা।
