কামরায় ঢুকল তোশি কুদো, ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করল। হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে দাঁড়াল সুমা, বলল আপনাদের রওনা হবার সময় হয়েছে।
ধীরে ধীরে দাঁড়াল লরেন, চোখে কঠিন দৃষ্টি। ডার্ক ও মি. অ্যাল ভালো আছেন কিনা, তাঁদের সাথে দ্র আচরণ করা হচ্ছে কিনা না জেনে এখান থেকে কোথাও আমরা যাব না।
আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমাদের মাটিতে বিদেশি স্পাই হিসেবে ধরা পড়েছেন ওঁরা, বলল সুমা, ঠোঁটের কোণ বেঁকে গেল।
এসপিওনাজ সম্পর্কে আমাদের ও জাপানের আইন একইরকম, বলল লরেন। আমার দাবি, নিরপেক্ষ বিচারের জন্যে ওদেরকে কোর্টে পাঠানো হোক।
বিদ্বেষে ভরপুর তৃপ্তির হাসি ফুটল সুমার মুখে। এ ব্যাপারে আলোচনা করে আর কোনো লাভ নেই। আপনাদের ওই দুই বন্ধু, তাদের স্পাই টিমের বাকি সবাইও, আমার বন্ধু মুরো কামাতোরির হাতে নিহত হয়েছেন। আইনের কথা যদি বলেন, নতুন জাপানে আমিই আইন। আমার আইন হলো, স্পাই হিসেবে ধরা পড়লে বিনা বিচারে হত্যা করা হবে।
লরেনের মনে হলো, তার হৃৎপিণ্ড বরফের একটা টুকরোয় পরিণত হয়েছে। শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ল সে, ধরে নিয়েছে কথাটা সত্যি। মুখে এক ফোঁটা রক্ত নেই, টলে উঠল শরীরটা, মাথার ভেতরটা ফাঁকা লাগছে।
তোশি কুদো ধরল তাকে, দরজার দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে এলো। আসুন, একটা এয়ারক্রাফট আপনাদের এডো সিটিতে নিয়ে যাবে। ওখানে মি. সুমার প্রাইভেট জেটে চড়বেন আপনারা।
ভবন থেকে বেরিয়ে এলো ওরা, এলোমেলো পা ফেলে হাঁটছে লরেন। ছোট একটা পুকুরকে পাশ কাটাল ওরা। সিনেটর ডিয়াজ খোঁড়াচ্ছেন, হাঁটছেন একটা ছড়ির ওপর ভর দিয়ে। তার পেছনে রয়েছে চকচকে টিল্ট-টারবাইন এয়ারক্রাফট, লনটাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে সুন্দর করে ঝাঁটা ঝোঁপ। জেট এঞ্জিনগুলো আগেই স্টার্ট দেয়া হয়েছে, দূর থেকেই শোনা গেল যান্ত্রিক গুঞ্জন। লাল নাইলনের ফ্লাইট স্যুট পরা দুজন কুকে দেখা গেল, মাথায় ক্যাপ, সিঁড়ির দুদিকে দাঁড়িয়ে। এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে দুজনেই তারা সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন সিনেটর ডিয়াজ। ওয়াশিংটনে ফিরে আমি একটা সাংবাদিক সম্মেলন ডাকব। আপনার ক্রাইম সম্পর্কে বিস্তারিত সব জানিয়ে…।
আপনার লেকচার আমি আর শুনতে চাই না, বাধা দিল সুমা। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, আপনাদের অনেক আইন প্রণেতা আমার পক্ষে কথা বলার জন্যে এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে, কারণ তাদের অনেক অবৈধ স্বার্থ আমার দ্বারা উদ্ধার হয়। কথা শেষ করে ফেরার জন্যে ঘুরল সে।
এক পাও এগোয়নি, ক্রুদের দুজোড়া হাত থপ করে ধরে ফেলল তাকে, তুলে নিল শুন্যে, খোলা দরজা দিয়ে প্রায় ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিল কেবিনের ভেতর। ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটল যে ডিয়াজ ও লরেন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, বিশ্বাস করতে সময় নিচ্ছে। প্রতিক্রিয়া হলো শুধু তোশি কুদোর। ক্রুদের একজনকে লক্ষ করে পা চালাল সে।
এটাকে কোনোভাবেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের শুভ সূচনা বলা যাবে না। হেসে উঠল অ্যাল, খপ করে ধরে ফেলল তোশির পা। তাকেও কেবিনের ভেতর ছুঁড়ে দেওয়া। হলো, প্রায় লুফে নিলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো ও টিমোথি ওয়েদারহিল।
হাঁপিয়ে উঠল লরেন, কি যেন বলল অ্যালকে। ইতোমধ্যে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে স্টেসি, তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওপরে। জলদি, মিস লরেন! ঘাড় ফিরিয়ে নিটেরের দিকে তাকালো সে। দাঁড়িয়ে থাকবেন না, প্লীজ! দেরি। করলে সবাই আমরা মারা পড়ব!
আপ-আপনারা কো-কোত্থেকে…? শেষ করতে পারলেন না সিনেটর, ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো ও টিমোথি ওয়েদারহিল তাকে টেনে নিল কেবিনের ভেতর।
জবাব দিলেন ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসো। সমস্ত কৃতিত্ব মি. পিট ও মি. অ্যালের। ক্রুদের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ওঁরা। কার্গো কমপার্টমেন্টে বেঁধে রাখা হয়েছে।
কেবিনের দরজা বন্ধ করার আগে রোবো গার্ডদের দিকে ফিরে স্যালুট করল অ্যাল। সায়োনারা! দরজা বন্ধ করে লক করল সে, ককপিটের দিকে ফিরে চিৎকার করল, গো!
গর্জে উঠল জোড়া টারবাইন এঞ্জিন, ভেজা মাটি থেকে এয়ারক্রাফটের চাকা খাড়াভাবে শূন্যে উঠে পড়ল। খানিকটা উঠে বাতাসে ভেসে থাকল, ধীরে ধীরে দিক বদলাল, পুর্বে ঘুরে ছুটল সাগরের দিকে।
অ্যালকে দুহাতে ধরে ঝাঁকি দিল লরেন। ডার্ক কোথায়?
কোথায় আবার! ইঙ্গিতে ককপিটটা দেখিয়ে হাসতে লাগল অ্যাল।
ছুটে গেল লরেন, ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল ককপিটের দরজা। পাইলটের সীটে বসে রয়েছে পিট, প্লেন চালানোর কাজটায় এতো বেশি মনোযোগ যে অন্য কোনো দিকে খেয়াল নেই। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্লেন এটা, চালানো এতো দূরের কথা, আগে কখনো দেখেও নি। লরেন ওর গলাটা জড়িয়ে ধরল, চুমো খেল ডজনখানেক তবু ওর চোখের পাতা নড়লো না বা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো না।
তুমি বেঁচে আছ! আনন্দে মুখর হলো লরেন। অথচ সুমা বলছিল তোমাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
লরেনের চুমোর ফাঁকে সুযোগ করে নিয়ে পিট বলল, এর মানে কি আমাকে বেঁচে থাকতে দেখে খুশি হয়েছ তুমি?
পিটের কান মুচড়ে দিল লরেন। ফাজলামি ছাড়তে পারলে না আর!
সাগরে সাঁতার কাটতে না চাইলে চুমো খাওয়া বন্ধ করো, বলল পিট। এ ধরনের প্লেন আগে কখনো চালাই নি, মনোযোগ ছুটে গেলে অ্যাক্সিডেন্ট করব। তুমি বরং কো-পাইলটের সীটে বসো, রেডিওটা সামলাও। সুমার এয়ার ফোর্স ধাওয়া করার আগে সাহায্য চাইতে হবে। জেট ফাইটারের সাথে পাল্লা দিয়ে পারব না আমরা।
