চুপচাপ লড়ছে পিট, যতটা সম্ভব শান্ত রেখেছে নিজেকে। কামাতোরি অস্থির ও উত্তেজিত, প্রতিটি আঘাতের সময় হুঙ্কার ছাড়ছে। ধীরে ধীরে পিছু হটিয়ে কামরায় আরেক প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে পিটকে। পিটের লম্বা করা তলোয়ার ধরা হাতে আলতোভাবে একবার স্পর্শ করল তার কাতানা, সরু একটা রক্তের রেখা দেখে ক্ষীণ হাসল সে।
কামরার চারদিকে চক্কর দিচ্ছে কামাতোরি, ঘন ঘন লাফ দিয়ে হামলা করছে। পিটকে নিয়ে খেলার একটা নেশা জেগেছে তার মধ্যে। পিট শুধু ঠেকাচ্ছে দেখে বেড়ে গেছে তার আত্মবিশ্বাস।
কামাতোরির চক্কর ও লাফ দেয়ার মধ্যে একটা ছন্দ খুঁজে পেল পিট। চক্কর দিচ্ছে বৃত্তাকারে, বৃত্তের এক চতুর্থাংশ পেরিয়ে লাফ দিচ্ছে এবার। এরকম একবার লাফ দিল কামাতোরি, ঠেকাল পিট, পর মুহূর্তে তলোয়ারটা সবেগে বাড়িয়ে দিল সামনের দিকে। কামাতোরির বাহুতে খোঁচা মারল তলোয়ারের ডগা, কিন্তু তবু কেনজুৎসু মাস্টারের গতি মুহূর্তের জন্যেও শ্লথ হলো না। লড়াই শুরুর আগে ধ্যানমগ্ন ছিল সে, সম্মোহনের সাহায্য নেয়ায় কোনো রকম ব্যথা অনুভব করছে না। পিছু হটল সে, তারপর আগের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটে এর পিটের দিকে, সগর্জনে আঘাত করল বারবার কাতানাটা খালি চোখে প্রায় দেখাই গেল না।
ক্লান্ত হয়ে পড়ছে পিট, সীসার মতো ভারী লাগছে তলোয়ার ধরা হাতটা হাঁপিয়ে উঠেছে ও, খাঁচার ভেতর ছটফট করছে হৃৎপিণ্ড।
প্রাচীন অস্ত্রটারও সময় হয়ে এসেছে। জাপানি কাতানার বিখাদ ইস্পাতের সঙ্গে ওটার কোনো তুলনা হয় না। ওর ফলার অন্তত পঞ্চাশ জায়গায় দাঁত বসিয়েছে। কাতানা। পিট জানে, চ্যাপ্টা অংশে মোক্ষম একটা আঘাত লাগলে ওর অস্ত্র দুটুকরো হয়ে যেতে পারে।
কামাতোরির মধ্যে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। খুনের নেশায় চকচক করছে। তার চোখ, প্রতিটি আঘাতের পেছনে ডুয়েল শুরু হবার সময় যে শক্তি ছিল এখনো তাই আছে। ক্লান্ত পিটকে কাবু করতে আর এক কি দুমিনিট দরকার তার।
চোখের কোণ দিয়ে স্টেসির গতিবিধি লক্ষ করার জন্যে এক মুহূর্ত বিরতি নিল কামাতোরি। স্টেসির দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা সন্দেহজনক স্থির হয়ে আছে সে, হাত দুটো পেছনে, যেন কিছু লুকিয়ে রেখেছে। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে ধরে নিয়ে তার দিকে এগোল কামাতোরি, এ সময় সামনে বাড়ল পিটমেঝেতে একটু হাঁটু গেড়ে শরীরটাকে লম্বা করল ও, সেই সঙ্গে লম্বা করা হাতের তলোয়ার আঘাত করল কাতানার তাহলে। কামাতোরির সামনের হাতটার আঙুলের ছাল উঠে এলো।
অবিশ্বাস্যই বটে, কয়েকটা আঙুলের সাদা হাড় বেরিয়ে পড়েলেও চেহারায় ব্যথার কোন ছাপ নেই, বিপুল বিক্রমে আক্রমণ শুরু করল কামাতোরি। ব্যথা পাচ্ছে না, নাকি না পাবার ভান করছে বোঝা কঠিন। তার প্রতিটি আক্রমণে হাতে ঝাঁকি লাগায় ঝর্ণার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। আচরণে উন্মত্ত ভাব আগের চেয়ে বেড়েছে।
হঠাৎ তার মাথাটা একদিকে ঝাঁকি খেল, ভারী একটা ইস্পাত সরাসরি আঘাত করেছে ডান চোখে। অব্যর্থ লক্ষ্য, চেইনে আটকানো তালাটা ছুঁড়ে মেরেছে স্টেসি। সুবর্ণ সুযোগটা কাছে লাগাল পিট, তলোয়ারের ডগা প্রতিপক্ষের পাঁজরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল, ফুটো করল একটা ফুসফুস।
আক্রমণের ধারায় মুহূর্তের জন্যে ছন্দপতন ঘটল মাত্র, আবার নতুন শক্তিতে পিটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কামাতোরি। আগের মতোই হুঙ্কার ছাড়ছে, তবে মুখ থেকে লাল ফেনা গড়াতে শুরু করেছে, যদিও তার গতি ও শক্তি এতোটুকু কমেনি। আঘাতগুলো যে-কটা পারা গেল ঠেকালো পিট, বাকিগুলো এগিয়ে গেল।
সুযোগ না দেখলে আক্রমণ করছে না পিট। ঠেকাবার ফাঁকে পিছু হটছে ও, কামাতোরি জানে এখন কোনো আক্রমণ হবে না। তাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ সামনে বাড়ল পিট, ঝট করে তার কাতানার নিচে বসে পড়ল, ফলাটাকে বাতাস কাটতে দিল মাথার ওপরে, তির্যকভাবে লম্বা করল হাতের তলোয়ার। এবার কামাতোরির ডান বাইসেপ চিরে দিল ও। কাতানা ধরা হাতটা কেঁপে উঠল, নিচের দিকে নামল অস্ত্রের ডগা।
সামনে বাড়ল পিট, শরীরের সমস্ত্র শক্তি দিয়ে আঘাত করল। কামাতেরির হাত থেকে পড়ল কাতানা। ছিটকে দূরে সরে যাচ্ছে ওটা, চিলের মতো ছোঁ দিয়ে তুলে নিল স্টেসি।
কামাতোরির দিকে তলোয়ার তাক করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পিট। তুমি হেরে গেছে, হাঁপিয়ে গেলেও, গলাটাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল।
কামাতোরির সামুরাই রক্তে আত্মসমর্পণের অনুমোদন নেই, অন্তত যতক্ষণ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা অদ্ভুতভাবে বদলে গেল। ঘৃণা ও জিঘাংসার মুখোশটা খসে পড়েছে, চেহারায় এ মুহূর্তে আশ্চর্য একটা প্রশান্ত ভাব। বলল, একজন সামুরাই পরাজয়ের মধ্যে কোনো মর্যাদা দেখতে পায় না। ড্রাগনের এক-আধটা দাঁত তুমি ভাঙতে পারো, কিন্তু একটার বদলে হাজারটা দাঁত গজাবে। পর মুহূর্তে সেটা ঘুরিয়ে কোপ মারল কামাতোরির কব্জিতে।
চোখ ভরা অবিশ্বাস, নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল কামাতোরি। এই প্রথম তার চেহারায় ব্যথার ছাপ ফুটল। উপলব্ধি করল, হেরে গেছে সে। ধীরে ধীরে মুখ তুলে পিটের দিকে তাকাল, কব্জিহীন হাতটা শরীরের পাশে ঝুলছে, ঝর ঝর করে রক্ত ঝরেছে কার্পেটে।
আমি আমার পূর্বপুরুষদের অসম্মান করেছি। আমাকে তুমি দয়া করে একটা সুযোগ দাও, আমি অন্তত হারিকিরি করে মুখ রক্ষা করি।
