দেহরক্ষী ছাড়া তোমারই অসহায়বোধ করার কথা, বলল পিট, হাতের ম্যাগনেটটা ছুঁড়ে দিল স্টেসির দিকে। আমার কাছে তলোয়ার আছে, নিরস্ত্র বলছ কেন?
আমার আছে কাতানা, তুলনায় তোমার ওটা কোনো অস্ত্রই নয়। হাত দুটো তুলল কামাতোরি, পিঠে আটকানো কাপে ভরা কাতানার হাতল ধরল। কাতানার ফলা বাষট্টি সেন্টিমিটার লম্বা, শক্ত ইস্পাতের কিনারা। আমার কাছে আরো আছে একটা ছুরি। কোশনের কাপড়ের সাথে ঝুলে থাকা খাপ থেকে ছুরিটা বের করল সে। চব্বিশ সেন্টিমিটার লম্বা ওটা, আলো লেগে ঝিক করে উঠল।
দরজার দিকে পিছু হটল পিট, এ পথে কামাতোরির আন্টিক রুমে যাওয়া যায়। টান দিয়ে মেঝে থেকে তলোয়ারটা তুলল ও। আমার এটা পুরানো দিনের তলোয়ার, তা ঠিক, তবে তোমার মতো উঁদুর মারার কাজ চলবে।
কামাতোরির স্টাডি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর একটা ইটালিয়ান ডুয়েলিং সেইবার নিয়ে এসেছে পিট, হাতল থেকে ডগা পর্যন্ত নব্বই সেন্টিমিটার লম্বা। শখ করে মাঝে মধ্যে যে সেইবার দিয়ে প্রাকটিস করে ও, তার চেয়ে অনেক বেশি ভারী এটা, ফলে ব্যবহার করার সময় শক্তি বেশি ব্যয় হবে। কোনো বিপদে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে, ভাল করেই জানে পিট। কামাতোরি যে জাপানি অসি-যুদ্ধ কেনজুৎসু এক্সপার্ট, নিয়মিত চর্চা করে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ ও নিজে প্রায় বছর খানেক হলো কোনো তলোয়ার ছুঁয়েও দেখে নি। তবে এই যুদ্ধে জিততে না পারুক, শুধু যদি স্টেসিকে খানিকটা সময় দেয়ার জন্যে কিছুক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, তাহলেই খুশি ও। সময় ও সুযোগ পেলে টিম ওয়েদারহিল ও ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসোকে মুক্ত করে ফেলবে স্টেসি। তা যদি সম্ভব হয়, দ্বীপটা থেকে পালাবার ক্ষীণ একটু আশা এখনো আছে।
তুমি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছ? হিসহিস করে বলল কামাতোরি।
কেন করব না! কাঁধ ঝাঁকাল পিট। সামুরাই বীর মানে তো আসলে ফুলে ওঠা ব্যাং। আমার দারণা, একই নোংরা পুকুর থেকে এসেছ তুমিও।
অপমানটা গায়ে মাখল না, কামাতোরি। চোখ দুটো বন্ধ করল সে, তারপর হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে কার্পেটে হাঁটু গেড়ে মগ্ন হলো ধ্যানে। সামুরাই শ্রেণীর বীরদের মধ্যে এটা একটা প্রচলিত রীতি, অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি অর্জনের জন্যে ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করা।
অকস্মাৎ আক্রমণ হবে, বুঝতে পেরে পা ঝেড়ে অন-গার্ড পজিশন নিল পিট।
প্রায় দুমিনিট পেরিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে, লাফ দিয়ে সিধে হলো কামাতোরি, নড়াচড়ায় কোন বিরতি না দিয়ে হ্যাঁচকা টানে পিঠের খাপ থেকে নামিয়ে আনল কাতানা। মাথার ওপর তলোয়ারটা তুলে সেকেন্ডের ভগ্নাংশও নষ্ট করতে রাজি নয় যে, গতির মধ্যে কোনো ছন্দপতন না ঘটিয়ে পিটের কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত দুফাঁক করার জন্যে নামিয়ে আনা কাতানা ওপর দিকে তুলল।
তৈরি ছিল পিট, তা নাহলে ঠেকাতে পারতে না। ঠেকাবার পরপরই পিছু না হঠে নিজের তলোয়ার দিয়ে খোঁচা মারল ও কামাতেরির উরুতে। প্রতিপক্ষের ধারণা ছিল তার আঘাত ঠেকাতে পারলে মুহূর্ত মাত্র দেরি করবে না পিট, পিছু হটবে। ফলে নিজের জায়গা ছেড়ে নড়ে নি সে। তার উরুটা অরক্ষিত পেয়ে গেল পিট। খোঁচাটা মারার পর লাফ দিয়ে পিছিয়ে এল, প্রতিপক্ষের পরবর্তী হামলার জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি।
কামাতোরির গতিবিধি বাঘের মতো ক্ষিপ্র। সে জানে, পিটের মাংসে কোন রকমে একটা কোপ লাগাতে পারলেই হয়, তারপর আর ওর লড়ার শক্তি থাকবে না। তার হাতে পড়লে কেটে দুটুকরো করাই একমাত্র কাজ কাতানার। ঘনঘন জায়গা বদল করছে সে, পিটের মনোযোগ নষ্ট করার জন্যে গালি-গালাজ করছে, দুর্বোধ্য অথচ অশ্লীল শব্দ করছে। উন্মত্ত গণ্ডারের মতো বারবার ছুটে এলো সে, পিটের প্রতিটি আঘাত প্রায় অনায়াসে সরিয়ে দিল একপাশে। উরুর আঘাতটা সম্পর্কে সে যেন সচেতন নয়, তার ক্ষিপ্রতায়ও কোনো ভাটা পড়ে নি।
দুহাতে ধরা কামাতোরির কাতানা বাতাস কাটছে এক হাতে ধরা পিটের সেইবারের চেয়ে সামান্য দ্রুতবেগে।
তবে দক্ষ একজন ফেনসারের হাতে পুরানো ডুয়েলিং ব্লেড কাতানার চেয়ে সামান্য দ্রুত দিক বদলাতে পারে। লম্বায় ও কাতানার চেয়ে প্রায় ত্রিশ সেন্টিমিটার বেশি, ফলে কামাতোরির প্রতিটি আঘাত নিরাপদ দূরত্বে থেকে ঠেকাতে পারছে পিট, শুরুতর কোনো জখমের ঝুঁকি না নিয়ে। সেইবারের আরেকটা সুবিধে হলো, ডগা দিয়ে আঘাত করা যায়। কাতানার কাজ কোপ মারা।
কামাতোরির সুবিধে হলো, প্রতিদিন নিয়মিত চর্চা করে সে। পিটের চর্চা নেই, তবে কামাতোরির চেয়ে বয়েসে ছোট। খানিকটা রক্ত বেরিয়ে গেলেও সম্পূর্ণ সুস্থ ও সবল আছে শরীরটা।
বিস্ময়ের বিহ্বল হয়ে ওদের যুদ্ধ দেখছে স্টেসি, ড. টিমোথি ওয়েদারহিল ও ফ্রাঙ্ক ম্যানকিউসোর চোখেও পলক পড়ছে না। পরস্পরের দিকে ছুটে আসছে যযাদ্ধারা, লাফ দিয়ে সরে যাচ্ছে, দুই তলোয়ারের সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছুটছে ঘন ঘন। মাঝে মধ্যেই আক্রমণ বাদ দিয়ে পিছু হটছে কামাতোরি, পজিশন বদলে ম্যানকিউসো বা টিমোথি ওয়েদারহিল ও স্টেসির মাঝখানে চলে আসছে, স্টেসি যাতে ওদেরকে মুক্ত করার কিংবা পেছন থেকে তাকে আক্রমণ করার সুযোগ না পায়।
শুধু ঠেকাচ্ছে পিট, আক্রমণ প্রায় করছেই না। ঠেকাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে ও কামাতোরির প্রতিটি আঘাতের পেছনে এতো বেশি শক্তি যে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে বা এক পলক দেরি করলে মৃত্যু অবধারিত। এই সঙ্গে চেষ্টা করছে স্টেসির দিকে থেকে কামাতোরিকে সরিয়ে আনার। কিন্তু কামাতোরি বোকা নয়, ওর প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল এসব। স্টেসি জুড়োয় এক্সপার্ট হলেও, নাগালে পেলে চোখের পলকে তাকে দুটুকরো করে ফেলবে সে।
