শিরার পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকল সুচ। আবার চেষ্টা করল পিট! তিনবারের বার শিরায় ঢুকল ওটা। পেশী শিখিল করে দিয়ে বসে থাকল ও, শরীরের রক্ত বেরিয়ে এসে জমা হচ্ছে ব্যাগে।
দূর থেকে ভেসে এলো কুকুরের অস্পষ্ট ডাক। বিস্ময়ের ধাক্কাটা প্রচণ্ড গুসির মতো আঘাত করল পিটকে, অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা অপ্রত্যাশিত কোন ব্যাপার নয়। কামাতোরিকে ছোট করে দেখায় ধিক্কার দিল নিজেকে। সে ব্লাড হাউন্ড লেলিয়ে দিতে পারে, এ-কথা একবারও মনে হয় নি ওর। অন্ধের মত ধরে নিয়েছিল শিকারকে খুঁজে পাবার জন্যে ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা রোবট ব্যবহার করবে সে।
অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে বসে থাকল পিট, কুকুরের রোমহর্ষক ডাক শুনছে আর দেখছে ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের ব্যাগটা ভরে উঠছে নিজের রক্তে। দ্রুত কাছে চলে আসছে শিকারী কুকুর। আর বোধহয় দুশো মিটার দূরেও নয়, এ সময় ব্যাগে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত জমল। হ্যাঁচকা টান নিয়ে হাত থেকে সুচটা খুলে নিল পিট। রক্ত ভরা ব্যাগটা পাথরের একটা স্তূপের লুকিয়ে রাখল, ঢেকে দিল কয়েক মুঠো ধুলো দিয়ে।
কামাতোরি যাদের খুন করেছে তারা বেশির ভাগই কুকুরের ভয়ে ছুটতে শুরু করে, চেষ্টা করে নাগালের বাইরে চলে যেতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে তারা, পড়ে যায় মাটিতে। শুধু সাহসী লোকেরা রুখে দাঁড়িয়ে লড়ার চেষ্টা করেছে কুকুরের সঙ্গে, হাতের কাছে যা পেয়েছে তা-ই দিয়ে।
এক পা সামনে বাড়লো পিট, এখনো জানে না কী ধরনের বিস্ময় অপেক্ষা করছে ওর জন্যে। লম্বা, মোটা একটা ডাল পেল ও। দুটো বেশ বড় সাইজের পাথরও নিল হাতে একটা বোল্ডারের ওপর রাখল ওগুলো, তারপর গা বেয়ে উঠে পড়ল মাথায়।
জমিন থেকে পা মাত্র তুলেছে, গাছগুলোর আড়াল থেকে তীরবেগে বেরিয়ে এলো কুকুরটা, পাশ কাটাচ্ছে পাহাড়-প্রাচীরকে।
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল পিট। লোমে ঢাকা কোনো হিংস্র প্রাণী নয়, ওকে ধাওয়া করছে ভয়াল-দর্শন একটা রোবট।
সন্দেহ নেই হিদেকি সুমার রোবোটিক ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে কুকুরটাকে। লেজ খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওটা আসলে একটা অ্যান্টেনা। পাগুলো হুইলের স্পোক-এর মতো ঘুরছে, শেষ প্রান্ত নব্বই ডিগ্রি বাঁকা করা, সহজেই যাতে মাটি কামড়াতে পারে। শরীর মানে হলো একটা আলট্রাসোনিক রেঞ্জার সেনসরকে ঘিরে ভিড় করে থাকা অসংখ্য ইলেকট্রনিক্সের সমষ্টি। এটা সম্ভবত রোবোটিক এঞ্জিনিয়ারিঙের সর্বশেষ আবিষ্কার। মানুষের গন্ধ, তাপমাত্রা ও ঘাম চিনতে পারে। একটা ডোবারম্যানের গতিতে যে-কোন বাধা এড়াতে সক্ষম। আসল কুকুরের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এটা যান্ত্রিক চোয়াল কুৎসিত দর্শন ও ভয়ঙ্কর। দাঁতগুলো ধনুকের মতো বাঁকা করে সাজানো হয় নি, সাজানো হয়েছে গোল করে। ওটার ধাতব নাকের ভেতর হাতের ডালটা ঢোকাবার চেষ্টা করল পিট। চোখের নিমেষে হাত থেকে বেরিয়ে গেল ডাল, দাঁতের কামড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
তবে কৃত্রিম কুকুরটা পাথরের গা বেয়ে বোল্ডারের ওঠার কোন চেষ্টা করল না। বোল্ডারের গায়ে পা দিয়ে স্থির হয়ে থাকল। মিনিয়েচার ভিডিও ক্যামেরা পিটের অবস্থান ও গতিবিধি রেকর্ড করে নিচ্ছে। তার মানে, পিট ধারণা করল, ওটার কাজ হলো শিকারকে খুঁজে বের করে কোণঠাসা করে রাখা, এরপর যাতে ছুটে এসে খুনটা করতে পারে কামাতোরি।
মাথার ওপর একটা পাথর তুলে ছুঁড়ল পিট। ক্ষিপ্রগতিতে লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল যান্ত্রিক কুকুর। দ্বিতীয় পাথরটা তুলল পিট। এটাই ওর শেষ অস্ত্র তুলে ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি করল, হাত থেকে ছাড়ল না। এবারও লাফ দিল রোবট, সেই ডান দিকেই। আবারও একই ভঙ্গি করল পিট, লাফটা ডান দিকেই দিল প্রতিপক্ষ। তৃতীয়বার ভান নয়, পাথরটা ছেড়ে দিল পিট। অব্যর্থ লক্ষ্য, সময়ের হিসেবে ভুল করে নি। পাথরটা ছুঁড়েছেও খুব জোরে। ইতোমধ্যে ওর জানা হয়ে গেছে, হামলার সময় শুধু ডান দিকে সরে যাবার প্রোগ্রাম করা আছে রোবটটার।
কুকুরটা ডাক ছাড়ল না, গোঙালও না। নীলচে বা গোলাপি আগুনের ফুলকি কিংবা আলোও দেখা গেল না। দুর্বলভাবে নেতিয়ে পড়ল শুধু। কাত হলো না, নিচের দিকে যেন ডেবে গেল, কমপিউটার ও মনিটরিং-সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছে বোন্ডার থেকে নেমে ওটার ইলেকট্রনিক পেটে ঝেড়ে একটা লাথি মারল পিট, ফেলে দিল পাথুরে জমিনে। ভিডিও ক্যামেরা কাজ করছে না, নিশ্চিত হলো ও। তারপর ধুলো সরিয়ে রক্তের ব্যাগটা বের করল।
পিট আশা করল শরীর থেকে রক্ত বের করায় দুর্বল হে য় পড়ে নি। সামনে। কঠিন কাজ, শরীরের সবটুকু শক্তি দরকার হবে ওর।
হঠাৎ করে কব্জিতে বাঁধা খুদে টিভি মনিটর থেকে অদৃশ্য হলো ছবিটা। ভুরু জোড়া কুঁচকে উঠল মুরো কামাতোরির, উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল সে। যান্ত্রিক কুকুরের সেনসর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে তীর ঘেঁষা বেড়ার কাছে রয়েছে পিট। পুর্বদিকে, কম বেশি একশো সত্তর মিটার দূরে। নিজেকে এতো তাড়াতাড়ি কোণঠাসা হতে দিয়েছে পিট, বিস্মিত না হয়ে পারে নি সে। পুর্বদিকে রওনা হয়ে ভাবল, রোবটের কোথাও বোধহয় যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে। গন্তব্যের কাছাকাছি এসে তার সন্দেহ হলো, যান্ত্রিক কুকুরটা কাজ না করার জন্যে পিটই বোধহয় দায়ী।
