ইলেকট্রিফায়েড কাঁটাতারের বেড়ায় গায়ে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এলো পিট। সেই সঙ্গে চেহারা থেকে খসে পড়ল নির্লিপ্ত ভাবটুকু। রিসর্ট ঘিরে থাকা গাছের সারিগুলো দূরে লম্বা, একটা রেখা তৈরি করেছে, সেদিকে ছুটলো ও। অদম্য রাগে লালচে হয়ে উঠেছে মুখ। গাছগুলোকে পেরিয়ে এসে নগ্ন, কর্কশ ও বৈরী-দর্শন পাথর আর কালো ছায়ার দিকে ছুটছে। অনুভব করতে পারছে ও, নিজের ভেতর মানুষটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ইন্দ্রিয়গুলো হয়ে উঠেছে অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ, মাথাটা অসম্ভব ঠাণ্ডা। সমগ্র অস্তিত্ব আশ্চর্য সচেতন হয়ে উঠেছে, একটা মাত্র চিন্তা পরিচালিত করছে ওকে।
বাকি সবাইকে বাঁচানোর জন্যে নিজেকে বাঁচতে হবে ওর।
শুধু মোজা পায়ে ছুটতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। পাতুরে জমিনে ভেজা মাটির পাতলা আস্তরণ জমেছে, পায়ে জুতো থাকলে বরং অসুবিধে হত।
ছুটছে পিট প্রাণ হাতে করে। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত ও, এ ধরনের কৌশল আগে কোনো দুর্ভাগা শিকার অবলম্বন করে নি। অপ্রত্যাশিত চমক ওর পক্ষে। অন্যান্যারা চেষ্টা করেছে রিসর্ট ও তাদের মাঝখানে যতটা সম্ভব দূরত্ব সৃষ্টি করার, তারপর উন্মত্তের মতো খুঁজে ফিরেছে লুকাবার মতো একটা জায়গা। কিন্তু সবাই তারা ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থতার খেসারত দিতে হয়েছে প্রাণ দিয়ে। কাজেই তারা যা করেছে পিট তা করবে না।
আরো একটা সুবিধে রয়েছে পিটের। মেল পেনারকে ধন্যবাদ, তার তৈরি দ্বীপের মডেলটায় খুঁটিনাটি সব কিছুই ছিল, তার মানে দ্বীপটাকে পিটের অচেনা বলা যায় না। দ্বীপটা কোন দিকটা বেশি উঁচু জানে ও, জানে ওদিকেটায় তার যাওয়া চলবে না।
ধাওয়া খেয়ে পলায়নরত ব্যক্তির একটা সাধারণ প্রবণতা হলো, ওপর দিকে উঠে যাওয়া। সিঁড়ি দেখলে ছাদে ওঠে, গাছ দেখলে মগডালে পাহাড় দেখলে চুড়ায়। ওগুলো যে আসলে শেষ মাথা, তারপর আর পালাবার জায়গা নেই, এক কথা মনে থাকে না।
বাঁক ঘুরে পুব দিকে ছুটলো পিট, তীরে পৌঁছুতে চায়। বাক ঘোরার সময় কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল, একবার এদিক গেল একবার ওদিক, যেন কোনো দিকে যেতে হবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বাঁক ঘঘারার পরও বার কয়েক পিছিয়ে এল, চক্কর মারল, যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। জমিন যেন চাঁদের পিঠ, আবছা অস্পষ্ট আলোয় দিক সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বোঝা যায় না, তবে তারাগুলো এখনো ম্লান হয় নি আকাশে, ফলে উত্তর দিকটা চিনতে কোনো অসুবিধে হলো না। একবার দাঁড়ালো পিট, বিশ্রাম নেয়ার ফাঁকে চারদিকটা ভালো কলে দেখে নিল।
পিট উপলব্ধি করল, স্যান্ডেল পায়ে ধাওয়া করে কামাতোরি তার শিকারকে কখনোই মাত্র আট ঘণ্টায় ধরতে পারে নি। শক্ত-সমর্থ যে-কোনো লোক, তার যদি বন-জঙ্গল সম্পর্কে খানিকটা অভিজ্ঞতা থাকে এবং ভাগ্য খানিকটা সহায়তা করে, দুই বা তিন দিন অনায়াসে প্রতিপক্ষের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে, এমনকি তাকে খোঁজার জন্যে কুকুর লেলিয়ে দিলেও। আট ঘণ্টার মধ্যে ধরা সম্ভব, শিকারী যদি ইলেকট্রনিক বডি সেন্সর ব্যবহার করে। পিটের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে ওকেও সেন্সর বহুল একটা রোবট ধাওয়া করবে। আবার রওনা হলো ও, তবে এবার কোনো উত্তেজনা বা ক্লান্তি নেই।
এক ঘণ্টা শেষ হলো। সাগর থেকে উঠে আসা পাহাড় প্রাচীরটাকে পাশ কাটাচ্ছে পিট। খোটা পুঁতে বেড়া তৈরি করা হয়েছে, প্রতিটি বেড়া ঘেঁষে জন্মেছে গাছ ও ঝোঁপ। ছোটার গতি কমিয়ে বেড়ার গায়ে কোনো ফাঁক আছে কিনা লক্ষ করছে ও, বিশ মিটার নিচে সফেন সাগর ফুঁসছে। ওর তীক্ষ্ণ নজরে কোথাও কোনো ভিডিও ক্যামেরা বা বডি হিট সেনসর ধরা পড়লো না। দাঁড়ালো পিট, এখানটায় ছোট একটা ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে, বড় বড় পাথরের স্তূপ আড়াল করে রেখেছে জায়গাটাকে। একেবারে কিনারায় ছোট একটা পাইন গাছ, কয়েকটা শিকড় বেরিয়ে রয়েছে পাথুরে জমিনের ওপর।
পিট প্রায় নিশ্চিত, কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছে না। বাহু ও কাঁধের চাপ দিয়ে গাছের কাণ্ডটা পরীক্ষা করলো ও। কাত হলো গাছ, পাইন বহুল মগডাল সাগরের ও নিচের দিকে আরো পাঁচ সেন্টিমিটার ঝুকল। ওর হিসেবে, ও যদি মগডালের শাখায় উঠে যায়, ওর ভারে জমিনে বেরিয়ে থাকা শিকড়গুলো নিচে থেকে ছিঁড়ে যাবে, পিটকে নিয়ে শাখাটা পাহাড়-প্রাচীর ঘেঁষে পড়ে যাবে অশান্ত সাগরে।
এরপর কালো পানির দিকে তাকাল পিট। পাথরের দুটো স্তূপের মাঝখানে সাগর সম্ভবত তিন মিটার গভীর। গভীরতা চার মিটারে দাঁড়াবে ঢেউ ছুটে এলে। ঢেউ, ঢেউয়ের ভেঙে পড়া, পাল্টা স্রোত, ইত্যাদি লক্ষ করার সময় পিটের মাথায় যে আইডিয়াটা এলো, সুস্থ কোনো মানুষ তা বিবেচনা করে দেখতে না। ড্রাই বা ওয়েট স্যুট ছাড়া ওই ঠাণ্ডা পানিতে একজন সাতারু বিশ মিনিটও টিকবে না, আক্রান্ত হবে হাইপোথারমিয়ায়, পতনের ফলে যদি সঙ্গে সঙ্গে মারা না যায়।
একটা পাথরে বসে স্নাস্টিকের ব্লাড ব্যাগটা বের করল পিট, পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল বাম হাতটা লম্বা করল, আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠো পাকার, চাপ দিল ডান হাতের আঙুল দিয়ে যতক্ষণ না কনুইয়ের উল্টোদিকে চিনতে পারল শিরাটাকে। কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিল ও, মনের পর্দায় দেখতে পাচ্ছে শিরাটাকে, একটা হোস পাইপ হিসেবে কল্পনা করছে ওটাকে। এরপর ব্লাড ব্যাগের সাথে সংযুক্ত সূচটা তেরছাভাবে ধরে চাপ দিল শিরায়।
