ভয়ে শুকিয়ে গেল লরেনের মুখ। আমাদের সাথে পিট ও অ্যাল ওয়াশিংটন যাচ্ছে না?
বড় করে শ্বাস টানল সুমা, ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। না, বলল সে। ওদেরকে আমি আমার বিশ্বস্ত বন্ধু মুরো কামাতোরির হাতে তুলে দিয়েছি।
ঠিক বুঝলাম না।
মুরো কামাতোরি অত্যন্ত দক্ষ শিকারী। মানুষ শিকার তার হবি। আপনার দুই বন্ধু ও বাকি তিনজন ইন্টেলিজেন্স অপারেটর যারা ধরা পড়েছে, সবাইকেই একবার করে দ্বীপ ছেড়ে পালাবার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এ সুযোগটা পাওয়া যাবে যদি তারা চব্বিশ ঘণ্টা ফাঁকি দিতে পারে মুরো কামাতোরিকে।
পিটের দিকে তাকালো মুরো কামাতোরি, ভুরু নাচিয়ে হাসল। আমাকে ফাঁকি দেওয়ার প্রথম সুযোগ পেয়েছেন ডার্ক।
অ্যালের দিকে ফিরল পিট, নিজ মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা।
দেখলে তো, আমি যা বলেছিলাম তাই।
.
৪৮.
পালাব? বিড়বিড় করল অ্যাল, ছোট্ট ঘরটারে ভেতরে পায়চারি করছে সে, রোবট গার্ড মুরাসাকির সামনে। কোথায় পালাব? তীব্র স্রোতের মধ্যে ষাট কিলোমিটার কী সতারানো সম্ভব? তারপরও হয়তো দেখা যাবে, মেইনল্যান্ডে পৌঁছুলে তুমি সুমার শিষ্যরা তীরে দাঁড়িয়ে আছে তোমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য।
তাহলে আমাদের রণকৌশল কী হবে? জানতে চাইল পিট, মেঝেতে ঘন ঘন ওঠবোস করছে।
যতক্ষণ সম্ভব বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। আর কি বিকল্পই বা আছে?
ঠিক আছে, নির্ভীক হৃদয়ে নিয়তির অমোঘ বিধানকে মেনে নেব আমরা।
একটা ভুরু উঁচু করে পিটের দিকে তাকালো অ্যাল, চোখে সন্দেহ। হ্যাঁ, তাই। উদোম বুক পেতে দাঁড়াব, চোখে পট্টি বাঁধতে অস্বীকার করব, কামাতোরি যখন তলোয়ার তুলবে আমরা তখন সিগারেট ফুকবো।
হ্যাঁ, শুধু শুধু লড়ে লাভ কী।
লাভ নেই সত্যি, তবে তোমাকে আমি এই প্রথম লড়াই শুরুর আগেই হেরে যেতে দেখছি, বলল অ্যাল, ভাবছে বন্ধুর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে কিনা।
দ্বীপের কোথাও লুকিয়ে থাকা যায়, কিন্তু কতক্ষণ? আমার ধারণা, কামাতোরি চিট করবে। আমাদেরকে খুঁজে বের করার জন্যে রোবোটিক সেনসর ব্যবহার করবে সে।
স্টেসির কী হবে? জানতে চাইল অ্যাল। তাকেও খুন করবে কামাতোরি, আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখবে তুমি?
ব্যায়াম শেষ করল পিট, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো। আমরা নিরস্ত্র, কাজেই উপায় কী। রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষে রোবটদের সাথে পারা সম্ভব নয়। তাছাড়া কামাতোরি অত্যন্ত দক্ষ একজন ফেনসার। গলায় ঝাঁঝ, বিস্ময় প্রকাশ করল অ্যাল, তোমাকে আমি চিনতে পারছি না। তুমি এভাবে হাল ছেড়ে দিচ্ছ, এ অবিশ্বাস্য।
খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগোল পিট, মুরাসাকিকে পাশ কাটিয়ে তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালো। তোমার পক্ষে বলা সহজ, বন্ধু। তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছ। পুকুরে ক্রাশ-ল্যান্ড করার সময় হাঁটুতে আঘাত পেয়েছি, হাঁটতে গেলে জান বেরিয়ে যাচ্ছে ব্যথায়। কামাতোরিকে ফাঁকি দেয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
পিটের ঠোঁটে নিঃশব্দ হাসি দেখে ভুল ভাঙলো অ্যালের। হঠাৎ করে নিজেকে তার বোকা হদ্দ বলে মনে হলো। মুরাসাকির সেনসর ছাড়াও কামরার ভেতর আরো অনেক আড়িপাতা যন্ত্র ও ভিডিও ক্যামেরা লুকানো আছে। পিটের মনোভাব বুঝতে পেরে সেও এবার অভিনয় শুরু করল। কামাতোরি একজন সামুরাই বীর, আহত ও অসহায় প্রতিপক্ষে শিকার করতে বাধবে তার। আমরা ধারণা, তোমার এ অবস্থা দেখে অস্ত্র ফেলে দেবে সে, তোমার সাথে খালি হাতে লড়বে।
মরতে আমার আপত্তি নেই, খালি হাতে মারুক বা তলোয়ার দিয়ে। শুধু ব্যথাটা কমলেই খুশি হই।
মুরাসাকি, রোবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল অ্যাল, বাড়িতে কোনো ডাক্তার আছে?
আমার কর্মসূচিতে সে-ধরনের কোনো তথ্য দেয়া নেই।
তাহলে তোমার রিমোট বসকে ডেকে জেনে নাও।
প্লীজ স্টান্ড বাই।
রোবটের কমিউনিকেশন সিস্টেম একটা অনুরোধ পাঠালো কন্ট্রোল সেন্টারে। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর চলে এল। অল্প কজন স্টাফসহ একটা ক্লিনিক আছে পাঁচতলায়। মি. পিটের কী চিকিৎসা সুবিধে দরকার?
দরকার, বলল পিট। মি. কামাতোরির সাথে খেলতে হলে একটা পেইনকিলার ইনজেকশন নিতে হবে আমাকে। আঁটসাঁট একটা ব্যান্ডেজও দরকার।
ঘণ্টা কয়েক আগেও তো আপনাকে আমি খোঁড়াতে দেখি নি, বলল রোবট গার্ড মুরাসাকি।
হাঁটুটা অসাড় লাগছিল, বলল পিট। এখন এমন ব্যথা করছে যে হাঁটতে পারছি না। সাবধানে সামনে বাড়লো ও, কুঁচকে উঠল চোখ-মুখ, যেন প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছে।
যা দেখল তাই রিপোর্ট করল গার্ড। ড্রাগন সেন্টার অনুমতি দিয়ে বললো, আহত ব্যক্তিকে পাহারা দিয়ে ক্লিনিক নিয়ে যেতে হবে। আরেকটা রোবো গার্ড হাজির হলো অ্যালের ওপর নজর রাখার জন্যে। আল ওটার নাম পাল্টে নিল দ্রুত। আবুল।
মুরাসাকির পিছু পিছু গোলকধাঁধার মতো অনেকগুলো প্যাসেজ পেরিয়ে এসে একটা এলিভেটরে চড়ল পিট। বোতামে চাপ দিল রোবট, নিচে নামতে শুরু করল এলিভেটর। পিট ভাবল, এটা একটা নতুন তথ্য, টিমগুলো জানে না। ড্রাগন সেন্টারে নামার জন্যে এলিভেটর আছে। কয়েক মুহূর্ত পর আলোকিত একটা প্যাসেজে বেরিয়ে এলো ওরা।
আপনার বাম দিকে চার নম্বর দরজা। ভেতরে ঢুকুন।
দরজাটা আগ্রাউন্ডের সব কিছুর মতো সাদা রঙ করা। কপাটের গায়ে ছোট একটা ক্রসচিহ্ন আঁকা। কোনো নব বা হাতল নেই, শুধু একটা বোম দেখল পিট। চাপ দিতেই খুলে গেল কবাট। পা টেনে ভেতরে ঢুকল ও। কামরার এক ধারে কয়েকটা বেড় দেখা গেল। ইউনিফর্ম পরা এক সুন্দরী নার্স ডেস্ক থেকে মুখ তুলল। কোনো কথা বলল না, ডেস্ক ছেড়ে পাশের কামরায় চলে গেল। ফিরে এলো একজন ডাক্তারকে নিয়ে। ডাক্তারের গলায় স্টেথস্কোপ ঝুলছে। ডার্ক? মি. ডার্ক পিট? ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল ডাক্তার, উচ্চারণ ভঙ্গি আমেরিকান।
