উন্মোচিত হল কৃষ্ণ কালো এক গম্বর।
এই খোলা মুখের পেছনে কী আছে কে জানে?
.
৭০. ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
বর্তমান সময়ের আফগানিস্তান
মানব থেকে দেবতা
পূর্বদিকে অভিযানে বেরোবার আগে মায়ের দেয়া পার্চমেন্টের দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন আলেকজান্ডার। পাশেই মশাল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ইউমেনিস। তিনি এখন সেনাবাহিনি নিয়ে যেখানে যাবেন সেখানকারই এক দার্শনিক নাকি অলিম্পিয়াসকে এটা দিয়েছেন। কিন্তু পার্চমেন্টের উৎস নিয়ে তার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। পৌরাণিক সেই কাহিনিই-দেবতাদের রহস্য তাঁকে সেনাবাহিনি নিয়ে এশিয়া পার হয়ে ইন্দাসভূমিতে যেতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তুলেছে।
চারপাশের গাঢ় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করলেন সে অঞ্চলের ভূ প্রকৃতিসহ পার্চমেন্টে উল্লেখিত পদ্যগুলোর অর্থ অনুধাবন করতে। ঠিক যেমনটা মা বলেছে।
“এটা এখানেই কোথাও হবে” বিড়বিড় করে নিজেকে আর ইউমেনিসকে শোনালেন আলেকজান্ডার, “আমরা তো এইমাত্রই পোসেডিনের যষ্ঠি পার হয়ে এসেছি।”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন ইউমেনিস, “আরেকটু আগে যাব? হয়ত সামনেই কোথাও আছে।”
রাজি হলেন আলেকজান্ডার। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অনুসন্ধান করলেও অসমান পাথুরে ভূমি আর অন্ধকার এসে তাদের কাজকে আরো কঠিন করে তুলেছে। কিন্তু আঁধারেই কাজ সারতে চেয়েছিলেন আলেকজান্ডার। তাহলেই পোসেডিনের ত্রিশূল পাওয়া যেত।
চমৎকারভাবে বুদ্ধি খাঁটিয়ে সেনাবাহিনিকে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। তাই সফলতার পথে আর কোনো বাধা চান না। প্রথমে সৈন্যদেরকে জানিয়েছিলেন যে তারা গৌরব লাভের জন্যই যুদ্ধ করছে। মেসিডোনিয়ার মহিমা বৃদ্ধির জন্য। পারসীয়দের হাতে তাদের অবমাননার প্রতিশোধ নেবার জন্য। তারা পারসীয়দেরকে পরাজিত করলে আলেকজান্ডারই হবেন এর শাসক। ফলে সৈন্যরাও মেনে নিয়েছে এ যুক্তি। বিশেষ করে পিতা দ্বিতীয় ফিলিপের অধীনস্থ অভিজ্ঞ সৈন্যের দল। তারা আলেকজান্ডারের পরিকল্পনায় ফিলিপের উচ্চাশা আর রাজ্য জয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিপালন দেখেছে। তাই আলেকজান্ডারকে পিতার যোগ্য পুত্র হিসেবে বরণ করে নিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শেষ কয়েক বছরে দারিউসের পিছু ধাওয়া করে পারস্যের শাসকবর্গের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী অভিজাতদেরকে মেরে ফেলে আলেকজান্ডারকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর ঠিক তখন, বাল্কে পৌঁছে সৈন্যরা যখন দেশে ফিরতে উদগ্রীব তখনই বোমা ফাটালেন আলেকজান্ডার। তারা এবার এশিয়ার দিকে অগ্রসর হবে। পৃথিবীর শেষ মাথা অব্দি জয় করে ইন্দাস ভূমিতে মেসিডোনীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার গল্প শোনালেন সৈন্যদেরকে। সৈন্যরা নিজেদের বিজয় থেকে প্রেরণা নিয়ে আর রাজার অজেয়তা দেখে আলেকজান্ডারের চারপাশে এসে জড়ো হল।
এবার তিনি এখানে আসার সত্যিকার কারণের কাছে পৌঁছে গেছেন। দেবতাদের রহস্য। সেনাবাহিনিকে দু’ভাগ করে পার্চমেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী এক অংশকে নিজে নেতৃত্ব দিয়ে কুনার উপত্যকায় নিয়ে এসেছেন। এর আগে সগডিয়ান পার্বত্যভূমিতে ব্যাকট্রিয়ার গোত্রদের সাথে লড়াই করার সময় পার্চমেন্টের নির্দেশানুযায়ী নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করে গেছেন ক্যালিসথিনস।
তাই পার্চমেন্ট অনুযায়ী সবকিছুই সাথে করে এনেছেন আলেকজান্ডার। এখন, তিনি এবং ইউমেনিস ক্যাম্প থেকে চুপিসারে বেরিয়ে সিক্রেট লোকেশনে যাবার সর্বশেষ চিহ্নটা খুঁজছেন।
খুব ধীরে অত্যন্ত সতর্কভাবে সামনে এগোলেন দু’জনে। রাতের নীরবতার মাঝে চারপাশে আর মাথার উপরকার সুউচ্চ পাথুরে কাঠামোগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কারো কবর। অনেক নিচে ঠিকমত দেখাও যাচ্ছে না, পর্বতের মাঝে লুকিয়ে আধারের চাদর গায়ে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী। এত রাজার যাওয়া আসা দেখেছে যে বর্তমানে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজেতার উপস্থিতিও যেন বিস্মৃত হয়ে গেছে।
উদ্বিগ্ন হয়ে চারপাশে তাকালেন ইউমেনিস। সাথে গার্ড আনার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন আলেকজান্ডার; সৈন্য হিসেবে নিজের তরবারি আর দক্ষতার উপরেই ভরসা করেছেন। “পুরো পৃথিবী জয় করে নিয়েছে এমন একজন মানুষকে কে আক্রমণ করবে?” সৈন্য নিয়ে আসার জন্য ইউমেনিসের মন্ত্রণায় তাই কর্ণপাত করলেন না আলেকজান্ডার। কিন্তু ইউমেনিস এতটা আত্মবিশ্বাসী নন। এই অঞ্চলের পাহাড়ি উপজাতিদেরকে প্রশমিত করার জন্য নিজের মনোবাসনা গোপন করেন নি আলেকজান্ডার। তর্ক করে বলেছেন তারা সেনাবাহিনির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু ইউমেনিস ঠিকই জানেন যে এটার কারণ ছিল আজ রাতের মিশনকে ঢেকে রাখার জন্য। তবে তাদের আগমনের কথা শুনে পালিয়ে গেছে স্থানীয় গোত্রের লোকজন। পিছু হঠে আর্নসে তাদের শক্ত ঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছে। পূর্ব দিকে যাবার জন্য প্রবেশ মুখ থেকে ঠিক কয়েক মাইল দূরে। কিন্তু যদি এমন হয় যে দলছুট এক গোত্রের কেউ পাথর আর গাছের আশ্রয়ে লুকিয়ে সভ্য দুনিয়ার শাসককে গোপনে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছে?
“এইতো!” জেনারেলের চিন্তায় বাধা দিল আলেকজান্ডারের তীক্ষ্ণ ফিসফিস।
গলা বাড়িয়ে তাকালেন ইউমেনিস। সামনে গজিয়ে উঠেছে আরেকটা অদ্ভুত পাথুরে বিন্যাস। তবে অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। মনে হচ্ছে দু’পাশেই থাকে থাকে ছড়িয়ে পড়েছে; মাথার উপরে বিশাল ঢেউয়ের মত ভেঙে পড়ে আকাশে উঠে গেছে।
