দ্য মহাভারত কোয়েস্ট : দ্য আলেকজান্ডার সিক্রেট

০. কৃতজ্ঞতা স্বীকার / মুখবন্ধ

দ্য মহাভারত কোয়েস্ট : দ্য আলেকজান্ডার সিক্রেট
মূল : ক্রিস্টোফার সি ডয়েল / অনুবাদ : মাসুম আহমেদ আদি

THE MAHABHARATA QUEST The ALEXANDER SECRET By CHRISTOPHER C DOYLE

দ্য মহাভারত কোয়েস্ট : দ্য আলেকজান্ডার সিক্রেট
মূল : ক্রিস্টোফার সি ডয়েল / অনুবাদ : মাসুম আহমেদ আদি

হাতের মাঝে চকচক করে উঠল উজ্জ্বল রত্ন;
চোখ নামালেন কাইজার; পেয়ে গেছেন যা ছিল কাঙ্ক্ষিত
রূপার মত
দৃশ্যমান হয়ে উঠল এ ঝর্না,
যেন পাথরের মধ্যে থেকে প্রবাহিত হচ্ছে এক রুপালি ধারা।
ঝর্না নয়-তার থেকেও বেশি কিছু;
কিংবা এ অগ্নিশিখা-আলোর ঝর্নাধারা।
কেমন দেখায় প্রভাতের তারা?
ভোরের আলোয় যেমন প্রভাতের তারা–
এটাও তেমন।
কেমন দেখায় রাতের ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের কিরণ?
এটাও তেমন।
কারণ চাঁদের চেয়েও বৃহৎ।

CANTO LAXIX-ESKANDAR NAMA

.

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

অসংখ্য ব্যক্তির কাছে ঋণী এই বই; যাদের সাহায্য ছাড়া হয়ত এর কোনো অস্তিত্বই থাকত না। তাই এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

তার আগে, বছরব্যাপী গবেষণা আর লেখালেখির কারণে আমার দীর্ঘ অনুপস্থিতি মেনে নেবার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি পরী শর্মিলা আর কন্যা শায়নায়াকে। তাদের সমর্থন আর সহযোগিতা ছাড়া কখনোই লিখতে পারতাম

এই বই। প্রথম বইয়ের মত এবারেও, বিশেষ করে পুরাণ আর ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে শায়নায়া।

ফাইনাল পান্ডুলিপি পড়ে, নিজ লক্ষ্যে অটুট থাকতে মূল্যবান সব মন্তব্য দিয়ে এই বইকে সাহায্য করেছেন আর্তিকা বকশি, আশা মিশিগান এবং আমার স্ত্রী শর্মিলা।

কতজ্ঞ ডব্লিউ এইচ ও রিজিওনাল অফিস ফর সাউথ ইস্ট এশিয়ার ডিপার্টমেন্ট ফর কমিউনিকেবল ডিজিসের ডিরেক্টর ডা. রাজেশ ভাটিয়া কাছে, যিনি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে বিজ্ঞানের বিভিন্ন থিওরি নিয়ে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যত্ন সহকারে পড়েছেন পান্ডুলিপি, আর শুধরে দিয়েছেন বিভিন্ন ভুল-ক্রটি। উনার সহযোগিতা পেয়েই নিখুঁত হয়ে উঠেছে বইয়ে তুলে ধরা বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত্র ঘটনা, আলোচনা এবং সাক্ষী প্রমাণ। তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির সাহায্যে সর্বশেষ ব্যাখ্যা আর অনুমান গঠন করা হলেও, এর মানে এই নয় যে আমার সমস্ত প্রকল্প আর থিওরি সম্পর্কেও উনি একমত পোষণ করেছেন।

মিসেস জ্যোতি ত্রিবেদী এবং মিসেস আশা মিশিগান, সংস্কৃত ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ এই দুজন আমাকে ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করেছেন প্রকৃত শ্লোক আর শুধরে দিয়েছেন এগুলোর অর্থ।

চমৎকার প্রচ্ছদের নকশা করেছেন আনন্দ প্রকাশ। ফলে জীবন্ত হয়ে উঠেছে পাতার পর পাতা মেলে ধরা গল্প।

অসংখ্য ধন্যবাদ জেরাল্ড নর্ডলী, জ্যাকুলিন শুম্যান, ফিলিস আইরিন র‍্যাডফোর্ড, কেভিন এন্ড্রু মারফি, ক্রিস্টি মার্কস, প্যাট ম্যাক ইওয়েন, ব্যারিট ফার্থ আর ডেভ ট্রবিজ ও লেখকদের গবেষণা দলের আমার সকল সহকর্মীবৃন্দ, যারা গবেষণার অতীত আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে এর নির্ভুলতা।

বইয়ে ব্যবহৃত মানচিত্র আর লোকেশন সৃষ্টির মাধ্যমে দু’হাজার বছর আগে আলেকজান্ডারের রুট তুলে ধরেছেন মায়াঙ্ক মেহতা। আমার বর্ণনাগুলোকে জীবন দান করেছে প্রিয়াঙ্কার গুপ্তের নিখুঁত চিত্র।

ওয়েস্টল্যান্ডের সবাইকে জানাচ্ছি আ বিগ থ্যাংক, বিশেষ করে গৌতম পদ্মনাভন, যিনি ফাইনাল পাণ্ডুলিপি পড়ে প্লট আর গল্পের জন্য মূল্যবান সব মন্ত ব্য দিয়েছেন। আমার সম্পাদক সংঘমিত্র বিশ্বাস, যিনি আমার লেখাকে ঘষামাজা করে তুলে ধরেছেন এর সত্যিকারের সৌন্দর্য।

গবেষণার কাজে ব্যবহৃত সব বই, ব্লগ, আর্টিকেল আর ভিডিওর কথা লিখতে গেলে হয়ত আরেকটি বই হয়ে যাবে; তবে এর প্রতিটি রেফারেন্সের কাছেই আমি অসম্ভব কৃতজ্ঞ। আমার চিত্রিত কল্পের পেছনকার বিজ্ঞান আর ইতিহাস সম্পর্কে অসংখ্য তথ্য ছাড়া অসম্ভব হয়ে পড়ত এসব থিওরি; বিভিন্ন প্রমাণ আর গবেষণার কারণেই সহজতর হয়ে গেছে এ কাজ।

অবশেষে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি কাঁধে তুলে নিচ্ছি এই বইয়ের সমস্ত ত্রুটি এবং কাহিনি বর্জনের দায়।

.

মুখবন্ধ

৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
পারস্যের গ্যাবিয়েন, বর্তমান ইরান

জেলখানার তাঁবুতে বিছানায় বসে নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে আক্ষেপ করছেন ইউমিনেস। দোড়গোড়ায় কড়া নাড়ছে মৃত্যু। বন্দী হয়েছেন সেই একচোখা অ্যান্টিগোনাসের হাতে, যার বিরুদ্ধে আগেও তরবারি হাতে লড়াই করেছেন। অথচ এবারের শেষ যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হয়েছেন তিনি। অ্যান্টিগোনাসের অপহরণকৃত ব্যাগেজ ট্রেনের বিনিময়ে এক-চোখা জেনারেলের হাতে তুলে দিয়েছে তারই নিজের প্রাদেশিক শাসনকর্তার দল।

বহুদিনের তিক্ত বৈরিতার সমাপ্তি হিসেবে জনসমক্ষেই ইউমিনেসকে বন্দী করার আনন্দ উৎসব উদযাপন করেছে অ্যান্টিগোনাস। কিন্তু দিন শেষে সূর্যাস্তের পরে আবার একান্তে ইউমিনেসের সাথে দেখা করতেও এসেছে।

আর ঠিক তখনি ইউমিনেস উপলব্ধি করলেন যে বিশাল ইন্দাস ভূমিতে আলেকজান্ডারের আক্রমণের সত্যিকার উদ্দেশ্য জানতে পেরেছে অ্যান্টিগোনাস। আলেকজান্ডার সেখানে কী খুঁজে পেয়েছিলেন তাও তার অজানা নয় আর দু’বছর পরে মহান বিজেতার মৃত্যুর কারণটাও স্পষ্টভাবেই জানে।

বন্ধু এবং সেক্রেটারি হিসেবে প্রথমে আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপের অধীনেই কাজ করেছিলেন ইউমিনেস। তারপর গুপ্তঘাতকের হাতে ফিলিপ মৃত্যুবরণ করার পর হয়ে উঠেন আলেকজান্ডারের চিফ সেক্রেটারি। “কিংস জার্নালস” বা রাজকীয় দিনলিপিতে রাজ্যের প্রতিদিনকার রেকর্ড রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন ইউমিনেস। কিন্তু জার্নাল ত্যাগ করার কারণটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আলেকজান্ডারের সত্যিকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক রেকর্ড এবং সেই মহারহস্য যা তাকে দেবতায় পরিণত করেছে।

যোলা বছর আগে, সিয়া মরুদ্যানে জিউস আমোনের মন্দিরে বিজেতার সঙ্গী হয়েছিলেন ইউমিনেস। আলেকজান্ডারকে বলা হয়েছিল যে তিনি জিউস আমোনের পুত্র। তার মানে তিনি নিজেই স্বয়ং একজন দেবতা।

আর তাই নিজের দেবতু প্রচারে একটুও সময় নষ্ট না করে পশ্চিম দিকে সিন্ধু নদীমুখে ছোটেন আলেকজান্ডার; যা তাকে সত্যিকার অর্থেই দেবতা বানিয়ে তুলবে। সেই মহারহস্য সম্পর্কে যত কাহিনি শুনেছেন সেসব থেকেই সঞ্চয় করেছেন গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একগুয়ে জেদ; এমনকি সৈন্যদের ঘরে ফেরার আকুতিতেও কান দেননি তিনি।

দেবতাদের রহস্য লুকিয়ে রাখা সেই ভূগর্ভস্থ গুহার বাইরে আলেকজান্ডারের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ইউমিনেস। কিন্তু ভেতরে আলেকজান্ডার একাই গেছেন। বের হয়ে আসার পর দেখা গেল জয়ের গৌরবে জ্বলজ্বল করছে তার চেহারা। যা খুঁজতে এসেছিলেন, পেয়েছেন।

গোপন এই অভিযানের সফলতার প্রমাণ হিসেবে ঘরে ফেরার পথে দখল করেছেন মালিজ। আক্রমণের পুরোভাগে ছিলেন আলেকজান্ডার নিজে, দেয়াল বেয়ে উঠার সময় মই ভেঙে পড়ে যান দস্যুদের মাঝে। ফলে সৈন্যদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু তার দ্বীপ্তিময় মুখমন্ডল আর দেহবর্মের উজ্জ্বলতা দেখে প্রথম দিকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় দস্যুর দল; ভেবেছিল বুঝি স্বয়ং এক দেবতাই নেমে এসেছেন তাদের মাঝে! তবে পরক্ষণেই দ্বিধা সামলে উদ্ধত অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসে। আলেকজান্ডারের দুপাশে ছিল দুই গার্ড। পাজরে গেঁথে যাওয়া তীরের আঘাত সত্ত্বেও মেসিডোনিয়ানরা এসে তাঁকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত বীরের মতই লড়াই করেছেন।

কিন্তু ভাঙ্গা তীর বের করে আনার অস্ত্রোপাচারের সময় ক্যাম্প জুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজা মৃত্যুবরণ করেছেন। নৌকার উপর তার কেবিনের বাইরে দিনের পর দিন উদ্বিগ্ন মুখে অপেক্ষা করেছেন ইউমিনেস। অবশেষে দুর্বলতা সত্ত্বেও ডেকের উপর বেরিয়ে এলেন জীবিত আলেকজান্ডার। ইউমিনেসের কানেও পৌঁছে গেল আলেকজান্ডারকে সারিয়ে তোলা সেই মিরাকলের ফিসফিসানি।

আঘাতটা অত্যন্ত মারাত্মক হওয়াতে প্রচুর রক্তক্ষরণও হয়েছে। চিকিৎসকেরাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। দেহের ভেতরকার ক্ষতের নিরাময় কিংবা রক্তক্ষরণের বিরুদ্ধেও কিছু করার ছিল না।

কিন্তু সবাই যখন অসহায়ের মত বসে বসে মৃত্যুর দিন গুনছিল, সেই সময়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলেন আলেকজান্ডার। অত্যন্ত ধীরে হলেও শুকাতে লাগল ক্ষত। তার আরোগ্য লাভ দেখে চিকিৎসকেরাও এবার তৎপর হয়ে উঠল। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সেরে উঠলেন রাজা। শুকিয়ে গেল ক্ষত এবং শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও দেখা দিলেন প্রজাদের সামনে।

রটনাগুলোকে যে কী বলা যায় তা ভেবে পেলেন না ইউমিনেস। কিন্তু সেদিন, বাকি সেনাবাহিনির মত নিজেও বিশ্বাস করে বসলেন যে আলেকজান্ডার সত্যিই একজন দেবতা। অমর, অবিনশ্বর। মানুষের জ্ঞাত কোনো অস্ত্রই তার কোনোরকম ক্ষতি করতে পারবে না। আর এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেবতাদের গুহার ভূমিকার কথাও জানতেন ইউমিনেস।

গুহাতে যে মহারহস্যই থাকুক না কেন, একাকি সে রাতে গুহার মাঝে আলেকজান্ডার যাই করে থাকুন না কেন এর প্রভাবেই ব্যাবিলনের শেষ দিনগুলোয় জ্বরে আচ্ছন্ন, অসম্ভব তৃষ্ণার্ত আলেকজান্ডার কথা বলার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। পূর্ণ হল আলেকজান্ডারের দেবতা হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা; কিন্তু বিনিময়ে দিতে হল জীবন।

ইউমিনেস এও জানেন যে এই রহস্যের কল্যাণেই ছয় দিন পার হয়ে গেলেও একটুও পচন ধরেনি আলেকজান্ডারের মৃতদেহে; এতটাই শ্বেতশুভ্র আর তরতাজা ছিল মনে হচ্ছিল যেন জীবিত আলেকজান্ডার ঘুমাচ্ছেন।

আর এখন তিনি নিজে বন্দী হয়ে আছেন আলেকজান্ডারের এক জেনারেলের হাতে। জানেন তাকে বাঁচতে দেয়া হবেনা।

সান্ত্বনা শুধু এটুকুই যে, সুরক্ষিত আছে আলেকজান্ডারের গোপণ রহস্য। ইউমিনেস অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে ক্যালিসথিনসের বই ‘ডিডস অব আলেকজান্ডার থেকে সবকিছু রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু এর পর পরই অফিশিয়াল জার্নাল থেকে এই বইয়ের সমস্ত অংশ সরিয়ে ফেলেছেন। যেখানে আলেকজান্ডারের হাতে মৃত্যুবরণের মাত্র কয়েকদিন আগেই উনার হয়ে সগডিয়ানের ভূমিতে এক গোপন মিশনের কথা লিখে গেছেন ইতিহাসবিদ ক্যালিসথিনস। এর পরিবর্তে ইউমিনেস নিজের গোপন জার্নালে আলেকজান্ডারের সাথে তার অভিজ্ঞতা আর ক্যালিসথিনসের মিশনের কথা লিখে লুকিয়ে রেখেছেন নিজের তাবুতে।

তাছাড়া অ্যান্টিগোনাসের সাথে যুদ্ধের আগেই ধ্বংস করে ফেলেছেন সমস্ত কাগজপত্র আর দলিল-দস্তাবেজ। “একপাল বন্য পশু” নামে নিন্দা করেছেন নিজ শাসনকর্তাদের দলকে। সিক্রেট জার্নালটাও এক বিশ্বস্ত দূতের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ক্যাসান্ডারের হাত থেকে মেসিডোনিয়ান সিংহাসন বাঁচাতে ব্যস্ত আলেকজান্ডারের মাতা অলিম্পিয়াসের কাছে।

অ্যান্টিগোনাস তাই কিছুই পায়নি।

তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন ইউমিনেস। যথাসাধ্য পালন করেছেন দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের প্রতি নিজ দায়িত্ব। অ্যান্টিগোনাস, টলেমি, ক্যাসাভার- আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য নিয়ে বিবাদে রত কেউই ইন্দাস ভূমির সেই মহারহস্য কখনোই জানতে পারবে না।

তেমনি জানতে পারবেনা বাকি দুনিয়া।

.

৩৯১ খ্রিস্টাব্দ
এক রহস্যের সমাধি

নির্জন গ্রামের রাস্তায় হেলেদুলে চলছে একটা খালি ওয়াগন। আধ ভাঙ্গা চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় ফুটে উঠেছে ভ্রমণক্লান্তি। ঘোড়াটাও এমন দুলকি চালে এগোচ্ছে, যেন জেনেই গেছে যে শেষ হয়েছে মিশন। তাড়াহুড়া করার আর কোনো প্রয়োজন নেই। অথচ মাত্র তিনদিন আগেও বহু মূল্যবান এক সম্পদ বহন করেছে এই ওয়াগন। অত্যন্ত দামি সেই জিনিসটাকেই গত ৫০০ বছর ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছে পৃথিবী।

নিরাপত্তার অভাব দেখা দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে উদয় হওয়া এক নব ধর্ম খুব দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। খ্রিস্ট নামে একজন মানুষের জীবন এবং মৃত্যুর উপর ভিত্তি করে মিশন অব্দি পৌঁছে গেছে, যেখানে ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লুকিয়ে আছে সেই পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। নব ধর্মমতাবলম্বীরা, যারা নেতাকে মনে করে ঈশ্বরের পুত্র আর তারই নামানুসারে নিজেদেরকে খ্রিস্টান নামে ডাকে তারা এবার পুরাতন দেবতাদের সম্পর্কে প্রশ্ন শুরু করেছে। ভেঙে ফেলছে মূর্তি, নষ্ট করছে প্রতিচিত্র আর ধ্বংস করে ফেলছে সব মন্দির।

আলেকজান্দ্রিয়ার সেই পবিত্র স্থানেও যেকোনো মুহূর্তে পৌঁছে যাবে এই ঢেউ, যেখানে গত পাঁচ শতক ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে উপাসনার বস্তু।

তবে যেকোনো মূল্যেই একে রক্ষা করতে হবে। অর্ডার’ (গুপ্তসভা) নিজে থেকেই কাঁধে তুলে নিয়েছে এই দায়িত্ব। আলেকজান্দ্রিয়ার আদি বাসস্থান ছেড়ে, বর্তমানে খালি ওয়াগনের সমস্ত কিছুই অর্ডারের চিহ্ন সম্বলিত নৌকা, জাহাজ, গরুর গাড়ি আর ওয়াগনে ভরে বিভিন্ন নদী আর সমুদ্র পার করে রেখে আসা হয়েছে।

অর্ডারের সেই চিহ্নটা হলো, ঠিক যেন ছোবল মারার জন্য ফণা তুলেছে পাঁচ মাথাঅলা একটা সাপ।

যাত্রাপথে সম্পদের উপর থেকে কৌতূহলী চোখগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখেছে এই চিহ্ন। সবাই আসলে একে ভয় পায়। অত্যন্ত গোপনীয় এই অর্ডার সম্পর্কে কেউই কিছু জানে না, এর উৎপত্তি কিংবা সদস্য সম্পর্কেও কারো কোনো ধারণা নেই-তবে এর কাজকর্ম কারো অজানা নয়।

অবশেষে দায়িত্ব সম্পন্ন করে খালি ওয়াগন নিয়ে মরুভূমির দিকে ফিরে যাচ্ছে এর ড্রাইভার কারমাল। তবে শেষ আরেকবারের জন্য থামতে হবে।

নিস্তব্ধ একটা গ্রামের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে ওয়াগন। ঘুমে অচেতন পুরো গ্রাম। আবার ওয়াগনের পাশে আঁকা সর্প চিহ্নের জন্যও এমনটা হওয়া অসম্ভব কিছু না।

এবার বিশাল একটা বাড়ির সীমানা প্রাচীরের কাছে এসে খোলা গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল ওয়াগন; যেন কারমালের আগমনের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ড্রাইভওয়ের একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ইট আর পাথরের তৈরি বহুতল একটা কাঠামো।

সদর দরজার সামনে ওয়াগন থামিয়ে লাফ দিয়ে নামল কারমাল। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। খুলে গেল দরজা। দেখা দিল ক্লোক (আলখেল্লা) পরিহিত, মাথা ঢাকা, লম্বা এক লোক।

“কাজ সমাধা হয়েছে?” ভারী স্বরে জানতে চাইলেন মাথা ঢাকা আগন্তুক।

মাথা নাড়ল কারমাল। দীর্ঘ এই ভ্রমণে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

“গুড। এখন কী করতে হবে তাও নিশ্চয় জানো।” চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন আগন্তুক।

“একটু দাঁড়ান” হাত বাড়িয়ে দিল কারমাল।

অবাক হয়ে তাকালেন ঘোমটা টানা লোকটা, “কী হয়েছে?”

“এটা রাখুন।” লোকটার হাতে কিছু একটা দিয়েই ওয়াগনে ফিরে গেল কারমাল। আরেকটা কাজ বাকি আছে এখনো।

গেইট দিয়ে ওয়াগন অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত কারমালের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন লম্বা আগন্তুক। শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন কামালের দেয়া ধাতব জিনিসটা। ত্রস্তপায়ে বাসায় ঢুকে ফেলে দিলেন মাথার কাপড়। দেখা গেল কোটরে বসা চোখ আর পাতলা ঠোঁটের এক কৃশকায় মুখাবয়ব।

মুঠো খুলে হাতের তালুয় ধরা ছোট্ট তামার ক্যাপসুলটার দিকে তাকালেন। তারপর আবার হাত মুঠো করে একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে চলে এলেন দোতলার গবেষণা কক্ষে।

দরজা আটকে ধপ করে ডেস্কে বসতেই মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে কাঁপতে লাগল আঙুল।

বোকা কারমালটা করেছে কী?

জানেন যে কারমাল অর্ডারের বাইরে কিছু করবে না। আরো কয়েক মাইল বিশ্বস্তভাবে ওয়াগন চালিয়ে গিয়ে মরুভূমির মাঝে ঘোড়াকে ছেড়ে দিয়ে কেটে ফেলবে নিজের গলা। কারণ রেলিকের (পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন) অবস্থান কাউকেই জানানো যাবে না। অর্ডারের আদেশ হল চিরতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে ফেলতে হবে এই রেলিক।

ছুরি দিয়ে খুব সাবধানে ক্যাপসুলের একপ্রান্তের ক্যাপটা আলগা করতেই ডেস্কের উপর গড়িয়ে পড়ল পাতলা একটা ভেড়ার চামড়ার টুকরো। গুঙ্গিয়ে উঠলেন কৃশকায় লোকটা। না দেখেই বলে দিতে পারবেন এটা একটা ম্যাপ।

খুব দ্রুত আবার ভাজ করে আমার ক্যাপসুলের ভেতরে ঢুকিয়ে রেখে দিলেন। অর্ডারকে এই ম্যাপের অস্তিত্ব সম্পর্কে কখনোই জানানো যাবে না। চিরতরে লুকিয়ে ফেলা সেই সিক্রেট লোকেশনের একমাত্র সূত্র হল এই ম্যাপ।

একবার ভাবলেন একেবারে ধ্বংস করে ফেলবেন। তারপর কী মনে হতেই নিজেকে থামালেন। একমাত্র উনিই জানেন এর অস্তিত্ব। তাই ভবিষ্যতে অর্ডারের সাথে কোনো ঝামেলা হলে হয়ত এ ম্যাগকে কাজে লাগানো যাবে।

তবে খুব সাবধানে আর চতুরতার সাথে লুকিয়ে রাখতে হবে, যেন তিনি ছাড়া আর কেউ না জানে এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও কেউ খুঁজে না পায়।

ভালোভাবেই জানেন কোথায় লুকাতে হবে এই ক্যাপসুল।

.

জুন, ১৯৯০
সেন্ট জেমস কলেজ
ফিলাডেলফিয়া, ইউ এস এ

দাঁতে দাঁত চেপে ফটোকপিয়ার মেশিনটাকে আরো দ্রুত কাজ করার জন্য মনে মনে তাগাদা দিলেন মাইক অ্যাশফোর্ড। একেবারে লেটেস্ট মডেলের ব্র্যান্ড নিউ মেশিনটা প্লেইন পেপার ব্যবহার করেই ফটোকপি করতে পারে। কিন্তু তারপরেও তিনি যতটা চাইছেন কাজ ততটা আগাচ্ছে না।

দু-ঘন্টা আগের ফোন কলটার কথা মনে পড়তেই কপালের ভ্রু বেয়ে গড়িয়ে নামল ঘাম।

“মাইক অ্যাশফোর্ড?” জানতে চাইল অপর প্রান্তের লোকটা।

“ইয়েস। হু ইজ দেয়ার?”

“নেভার মাইন্ড, সেটা তেমন জরুরি না। তবে এখন যা বলব মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনার কাছে এমন কিছু জিনিস আছে যা আমার দরকার। গতকাল যে জিনিসটা আবিষ্কার করেছেন, সেই প্যাপিরাস ডকুমেন্টস।”

দ্বিধায় পড়ে গেলেন অ্যাশফোর্ড। ক্ল্যাসিকস ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি ছাড়া লাইব্রেরির বেজমেন্টের একটা বাক্সে পাওয়া প্যাপিরাস জার্নালের কথা তো আর কাউকে বলেননি। তবে কি ডিপার্টমেন্টের কেউ খবরটা চাউর করে দিয়েছে? এমনটাও তো হবার কথা নয়। তাহলে কিভাবে জানে এই অজানা কণ্ঠ?

“কোন ডকুমেন্টস?” লোকটাকে পরীক্ষা করতে চাইলেন মাইক।

কঠিন হয়ে গেল ওপাশের কলার, “আমার সাথে চালাকি করার চেষ্টা করবেন অ্যাশফোর্ড। একটা ঠিকানা দিচ্ছি, সেখানে ডকুমেন্টসগুলো পাঠিয়ে দেবেন। মুখবদ্ধ খামে করে জার্নাল পাঠাবেন, প্যাপিরাসগুলো যেন ছিঁড়ে না যায়। যদি এগুলোর কন্ডিশন ভালোও হয় তারপরেও এভাবেই পাঠাবেন।” গড়গড় করে ফিলাডেলফিয়ার ডাউন টাউনের একটা অ্যাড্রেস বলে গেল লোকটা।

পাথরের মত জমে গেলেন অ্যাশফোর্ড। জার্নাল সম্পর্কে সবকিছুই জানে লোকটা। এমনকি প্যাপিরাসের কন্ডিশনও!

“আর যদি আমি তা না করি?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লেন মাইক, “এই জার্নালগুলো কলেজের সম্পত্তি। লাইব্রেরিয়ান হিসেবে আমার দায়িত্ব হল এগুলোকে সুরক্ষিত রাখা। ফোন পেয়ে যার তার কাছে বিলিয়ে বেড়ানো নয়।”

অধৈর্য হয়ে উঠলেন কলার, “ফাইন। আপনাকে সুযোগ দেয়া হয়েছে কিন্তু সেটা আপনি গ্রহণ করেননি। ঠিক আছে।”

হঠাৎ করেই কেটে গেল ফোন। অ্যাশফোর্ডের কানে গুনগুন করে উঠল এনগেজ টোন।

এর পয়তাল্লিশ মিনিট পরে ভয়াবহ সেই নিউজটা না পেলে এটাকে একটা ভূতুড়ে কল হিসেবেই বাতিল করে দিতেন। নিজ বাড়ির সামনের রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়েছেন ক্লাসিক ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি মেম্বার কার্ল ড্রন। উনাকেই সবার আগে প্যাপিরাস জার্নালের কথা জানিয়েছিলেন মাইক। ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন ড্রন। উধাও হয়ে গেছে ঘাতক গাড়ি, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় আর কখনোই এটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

খবরটা শোনার সাথে সাথেই অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন অ্যাশফোর্ড। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন ড্রন। ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক হিসেবে জেসুইট লিবারেল আর্ট কলেজে ভালই মানিয়ে গেছেন। তাহলে কি সেই অচেনা কলারই ঘটিয়েছে এই অ্যাকসিডেন্ট!! কাকতালীয় বলে তো মনে হচ্ছে না।

একই সাথে মনে পড়ে গেল দুই সপ্তাহ আগে কলেজের ডীন আর ক্ল্যাসিকসের প্রাক্তন প্রফেসর লরেন্স ফুলারের রহস্যময় অন্তর্ধানের কথা। শিকাগো ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটের সেমিনার শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ফুলার। কিন্তু হোটেল থেকে চেক আউট করার পরই যেন বাতাসে মিলিয়ে যান। হোটেলের ডোর ম্যান ও বেল বয় তাকে ক্যাবে উঠতে দেখলেও এয়ারপোর্টে পৌঁছাননি তিনি। এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্টের শর্তানুযায়ী তার সমস্ত কাগজপত্র আর জার্নালের কাস্টডি পেয়েছে কলেজ। ক্যাটালগ না করে সাথে সাথে সবকিছু বাক্সে ভরে রেখে দেয়া হয়েছে বেজমেন্টে। জিনিসপত্রের বিস্তারিত বিবরণ লিখতে গিয়ে এরকমই একটা বাক্সে

প্যাপিরাসগুলো খুঁজে পেয়েছেন অ্যাশফোর্ড।

এবার তাহলে কার পালা? জেদি স্বরে কলারের অনুরোধ পায়ে ঠেললেও তিনিই কি এটার পরবর্তী লক্ষ্য?

খুব দ্রুত চিন্তা করে মনস্থির করে ফেললেন অ্যাশফোর্ড। কলারের চেয়েও তিনি এক ধাপ এগিয়ে আছেন। প্যাপিরাসের সাথে যে দুটো জার্নালও পেয়েছেন সে কথা কেউ জানে না। এমনকি ড্রন কিংবা অন্য কাউকেও বলেননি। দুটো জার্নালই ইংরেজিতে লেখা তারমধ্যে একটা আবার প্যাপিরাসের বিষয়বস্তুর অনুবাদ; জার্নালের প্রথম পাতায় যা সবিস্তারে স্বহস্তে লিখে গেছেন ফুলার। অনুবাদটা দেখে অবাক হলেও দ্বিতীয় জার্নালটা দেখে রীতিমত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন অ্যাশফোর্ড। মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন।

তিনি যা ভাবছেন এই দুটো জার্নাল মিলে যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তো এই আবিষ্কার শুধুমাত্র হাজার বছরের পুরাতন কোনো অর্থহীন ডকুমেন্টস নয়।

ঝুঁকির মাঝে পড়তে যাচ্ছে পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ!!

একেবারে শেষ কপিটা উগরে দিল ফটোকপি মেশিন। তাড়াহুড়া করে কাগজগুলোকে একত্র করে স্টেপল করে রাখলেন অ্যাশফোর্ড। দুই সেট কপি একসাথে খামে পুরে কাঁপা কাঁপা হাতে লিখলেন প্রাপকের ঠিকানা। কিছুক্ষণ এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন, যেন খতিয়ে দেখছেন নিজের কাজ।

তারপর আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের কলিগকে ডেকে ডাউন টাউনে ফেডেক্সের অফিসে পাঠিয়ে দিতে বললেন প্যাকেজটা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে গেল প্যাকেজ।

কলিগ প্যাকেটটাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই ধপ করে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন অ্যাশফোর্ড। জার্নালের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত শেষতম ব্যক্তিটি যেন তিনিই না হন সেজন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। সাদাসিধে মানুষ হলেও তার দায়িত্ববোধ অত্যন্ত প্রখর। এরকম একটা অবস্থাতেও জার্নালগুলোকে বন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেবার কথা মাথাতেই আসেনি। এগুলো কলেজের সম্পত্তি আর তাই এখানেই থাকবে। ফলে একমাত্র সমাধান হিসেবে ফটোকপি করে পাঠিয়ে দিয়েছেন দূরে।

নিজের ভবিতব্য ভালোভাবেই জানেন অ্যাশফোর্ড। রহস্যময় সেই কলারের গলার স্বর শুনেই বুঝতে পেরেছেন যে, সে বাকবিতন্ডা পছন্দ করে না। নিজেকে বাঁচাবার কোনো ধারণা নেই। পালিয়ে যাবার কথা মাথায় এলেও কোথায় যাবেন? গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এই কলেজই তার জীবন। ১৯৮৩ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে একটা কনফারেন্সে যোগদান ব্যতীত এই পুরো সময়ে একবারও ক্যাম্পাসের বাইরে যাননি। সে সময়েই তার একমাত্র বন্ধু, ভারত থেকে আগত সেই ইতিহাসবিদ প্রাচীন দলিল সংরক্ষণের বিষয়ে কনফারেন্সে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে অবাক ব্যাপার হল দুজনে ঠিকই যোগাযোগ রেখেছেন। এই বন্ধুর কাছেই এইমাত্র ফটোকপিগুলো পাঠিয়েছেন অ্যাশফোর্ড।

যা ঘটবে ঘটুক ভেবে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা শুরু করলেন। ক্যাথলিক হিসেবে সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য এই একটি মাত্র পথই জানা আছে।

তবে একটু পরেই অফিসের দিকে এগিয়ে আসা পদশব্দ শুনে চোখ মেলে তাকালেন। রুমের ভেতরে ঢুকে দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে গেল পাঁচজন লোক। জ্যাকেটের ফুলে উঠা কাঁধ দেখে বুঝতে পারলেন সবাই সশস্ত্র। কেবল মাঝখানের সেই লম্বা লোকটা ছাড়া। কয়লাকালে চোখ জোড়া আর চেহারার গভীর ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো দার্শনিক চিন্তায় মত্ত। তবে সে-ই যে এই দলের নেতা সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই। অ্যাশফোর্ডের ডেস্কে প্যাপিরাসের ডকুমেন্টসগুলো দেখে ধক ধক করে জ্বলে উঠল লোকটার চোখ। “আহ, আমার জন্য তো দেখি একেবারে তৈরি করেই রেখে দিয়েছেন।” মনে হল প্রশংসা করছে কিন্তু চেহারার ব্যঙ্গ ভাবটা কাটলনা। ইশারা করতেই একজন এগিয়ে এসে খুব সাবধানে প্যাপিরাসগুলো তুলে নিয়ে চামড়ার ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে ফেলল।

উদ্ধতভাবে তাকিয়ে রইলেন অ্যাশফোর্ড। তুরুপের তাস এখনো তার হাতে। যে জার্নাল দুটো ফটোকপি করেছেন সেগুলো নিরাপদেই ডেস্কের ড্রয়ারে শুয়ে আছে।

“আমার জন্য বোধহয় আপনার কাছে আরো কিছু আছে, তাই না?” জানতে চাইল লিডার।

“মানে? প্যাপিরাস ডকুমেন্টসগুলো তো দিয়েছি।” মনে মনে আশা করছেন নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা ছাড়াই সব শেষ করতে পারবেন। মিথ্যে বলাতে তিনি একেবারেই অভ্যস্ত নন।

“এই ডকুমেন্টসগুলোর সাথে আরো যে দুটো ইংরেজি জার্নাল পেয়েছেন?” তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল লোকটার গলা। “আমাকে তো জানাতেও চান নি, তাই না? ভেবেছেন আমরাও জানি না।”

ঝুলে পড়ল অ্যাশফোর্ডের চোয়াল। ওরা কিভাবে জানে? উনি নিজে তো কাউকে বলেননি।

লিডার মাথা নাড়তেই হাত মুঠো পাকিয়ে এগিয়ে এলে এক সাগরেদ। গুভাটার আঘাতে নাক ভেঙে যাওয়ায়, ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন অ্যাশফোর্ড। মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল রক্ত।

“ডেস্ক খুঁজে দেখো।” আদেশ দিল লিডার। দ্রুত হাতে সব ড্রয়ার ঘেটে দেখল তিনজন। একজন জার্নালগুলো পেতেই ব্রিফকেসে ঢোকাবার আগে নেড়ে দেখাল।

সামনে ঝুঁকে একদৃষ্টে অ্যাশফোর্ডের দিকে তাকাল লিডার, “ডকু্যমন্টসগুলো নেয়ার পর আপনাকে খুন করার কথা ছিল; কিন্তু না, আমি সিদ্ধান্ত বদলেছি। আপনি আমাদের সাথে যাবেন। সাথে সাথেই হাওয়া হয়ে যাবেন। ঠিক ফুলার বুড়োটার মত। এখন আর মরণ কামনা করলেও কোনো লাভ হবে না।”

১. বর্তমান সময়

প্রথম দিন। গ্রিস, কারিনসের উত্তরে আর মারকিজিয়ালসের দক্ষিণে

কানে সেলফোন ধরে আছে এলিস। ওপ্রান্তের অন্তহীন রিং যেন আর শেষই হচ্ছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চেহারায় ফুটে উঠল হতাশা। এতগুলো কল করার পরেও ফোন না ধরাতে এখন অসম্ভব রাগ হচ্ছে।

নো আনস্যার!!

আরো একবার ফোন কেটে যেতেই বিরক্তিতে চুকচুক শব্দ করল এলিস। বুঝতে পারছে আর কোনো আশা নেই।

আমিই বা কেন এত কষ্ট করে ফোন করছি? কিসের এত ঠেকা আমার?

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটাকে পকেটে চালান করে দিল এলিস। লং ডিসট্যান্স সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা আসলে অত সোজা না। গত বারো মাসের বেশিরভাগ সময় জুড়েই গ্রিক-আমেরিকান অ্যার্কিওলজিক্যাল মিশন অব- পিডনার হয়ে একটা আন্তর্জাতিক দলের সাথে এখানে ক্যাম্পিং করছে এলিস। মিশনের উদ্দেশ্য হল প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে গুঢ় রহস্যগুলোর একটিকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। এর মূল্য হিসেবে ভাঙতে বসেছে ওর সম্পর্ক। সপ্তাহ দুই আগে অবস্থা বেশ খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তখন থেকে ওর বয়ফ্রেন্ড আর একবারও কল করেনি এবং ওর ফোনও ধরেনি।

ব্লাডি ইডিয়ট। নিজে যদি ক্ষমা চাইতে না পারে অন্তত এলিসের ফোন তো ধরতে পারে যেন সবকিছু আবার জোড়া লাগাবার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। তবে যদি না…মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটাকে দূর করে দিল।

উত্তেজিত এক ছাত্রের চিৎকার শুনে গভীর চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে এল এলিস; উধশ্বাসে টানেল দিয়ে ছুটে আসছে ছেলেটা। ২০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আড়ালে থাকা একটা সমাধি, যেটি কি-না হতে পারে শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এমন এক সমাধি যেটিকে নিয়ে গত ১৫০ বছর ধরে চলছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। E-75 টোল রোড থেকে ৫০ কি. মি. ভেতরে থেসালোনিকিতে স্থাপিত এই টিমে গ্রিক আর আমেরিকান দুজন কো ডিরেক্টরের অধীনে প্রজেক্টের খনন কাজে সাহায্য করছে ৫০ জনেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীর কন্টিন্টে আর স্থানীয় শ্রমিকদের এক সেনাবাহিনি।

“এলিস, আমরা সমাধির প্রবেশ মুখ ভেঙে ফেলেছি!” ছেলেটার উত্তেজনা এলিসের মাঝেও সঞ্চারিত হল, “কাম অন, জলদি চলুন!” কোনোমতে শব্দগুলো উচ্চারণ করেই দুদ্দাড় সিঁড়ি বেয়ে আবার খোলা শ্যাফট দিয়ে নেমে গেল মাটির গহীনে।

উধাও হয়ে গেল বয়ফ্রেন্ডের চিন্তা। ব্যাকপ্যাক ঠিক করে ছাত্রের পিছু নিল এলিস। মনে পড়ে গেল আঠারো মাস আগে এই দলটাতে যোগ দেবার সময়কার একটা মুহূর্তের কথা।

ভাগ্যটাও এমনি যে, যখন নিমন্ত্রণটা পেল তখনই দেখা হয়েছে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। সে সময় এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়েছিল যা নিয়ে আর কথা বলতে চায় না ও। অবশেষে বহুকষ্টে শতবর্ষের পুরনো কোনো সিক্রেটের মতই নিজের অন্তরে মাটি চাপা দিয়েছে সেই বেদনা। এরকম এক মুহূর্তে বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে সত্যিকারের সাপোর্ট পেয়ে যারপরনাই কৃতজ্ঞ এলিস। তারপর কয়েক মাস ডেট করার পরেই পেল এই খনন কাজের আমন্ত্রণ। অথচ আজ যখন প্রাচীন গ্রিসের সর্বশেষ মহারহস্যগুলোর একটির দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে তখন আর এলিসের পাশে সে নেই।

সমাধির দিকে যেতে যেতে স্মরণ করল বিলিওনিয়ার মানবদরদী কার্ট ওয়ালেসের কথা। প্রাচীন সভ্যতা আর প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকার্যে উৎসর্গকত সংস্থা ওয়ালেস অ্যার্কিওলজিক্যাল ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি এই খনন কাজের ফান্ডিং করেছেন। “ফরগটেন রুটস” নামক আন্দোলনের পেছনেও আছেন এই ভদ্রলোক। এক্ষেত্রে তার লেখা পাঁচটা বইয়ের উপর ভিত্তি করেই ট্রাস্ট বিবর্তন-মতবাদের বিরুদ্ধে এই অবস্থান নিয়েছে। বইগুলোর কমন থিম হল, মানবতা তার শেকড় ভুলে গিয়ে ক্রমশ বিবর্তনবাদের ভিত্তিতে নির্মিত এক ভয়ংকর থিওরির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ মানবজাতির প্রকৃত উৎসবিন্দু লুকিয়ে আছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিগুলোর প্রাচীন লোকগাঁথার মাঝে।

এলিস ভদ্রলোকের কথা শুনেছে এবং তাঁর লেখাও পড়েছে। কিন্তু থিওরিগুলো নিয়ে কখনোই তেমন একটা মাথা ঘামায়নি। অথচ লোকটার সাথে দেখা হবার পর মুগ্ধ হয়ে গেছে তার বুদ্ধিমত্তা আর কেতাদুরস্ত পরিশীলিত আচরণ দেখে। তাছাড়া যেখানে মিটিং করেছে, সুদৃশ্য সেই রাজপ্রাসাদ তো যেন এলিসকে বশ করে ফেলেছে।

দশমিনিটের সেই মিটিংটাতে শুরুতেই কাজের কথা তুলেছিলেন ওয়ালেস। “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল আর তার মৃত্যু পূর্ব ও পরবর্তী সময়কাল নিয়ে তোমার দক্ষতার জন্যই এ দলে যোগদানের অনুরোধ করছি” শুরু করলেন বিলিওনিয়ার, এর আগেই অবশ্য সম্ভাষণের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নাশতার প্রস্তাবও দিয়েছেন।

শুরুতেই এমন মন্তব্য শুনে কৌতূহলী হয়ে ওঠে এলিস। একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখে গবেষণা কক্ষের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়ালেসের লম্বা দেহাবয়ব, সুদর্শন স্যুট পরিহিত অভিজাত ভাব, কুঞ্চিত চেহারা আর মরচে রঙা চুল।

এলিস টোপ গিলেছে বুঝতে পেরে হাসলেন ওয়ালেস, “দেখো, ট্রাস্টে আমার রিসার্চ টিম প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে মূল্যবান এক রহস্যের সূত্র পেয়েছে। আর এর সবকিছুই দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারকে ঘিরে।”

তারপর ব্যাখ্যা করে শোনালেন মিশনের উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও দলের গঠন। শেষ করার আগেই প্রজেক্টে যোগদানের ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলল এলিস।

“সাবধানে পা ফেলুন” আরো একবার তাকে গভীর চিন্তা থেকে ফিরিয়ে আনল সেই ছাত্র। এখান থেকে টানেলের ছাদ নিচু হয়ে গেছে।” শ্যাফটে নেমে টানেল ধরে পোর্টেবল ল্যাম্পের আলোর দিকে এগিয়ে চলল দুজন।

ছেলেটার হাতে ধরা টর্চ লাইটের আলোতে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে অবশেষে পৌঁছে গেল মসৃণ পাথুরে দেয়াল-অলা একটা কিউব আকৃতির চেম্বারে। চেম্বারের দু-প্রান্তে জ্বলতে থাকা দুটো পোর্টেবল এলইডি পোল লাইটসের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে ছোট্ট জায়গাটা।

“থ্যাংক ইউ, মারকো।” ছেলেটা ফ্লাশলাইট অফ করতেই ওর দিকে তাকিয়ে হাসল এলিস।

চোখ পড়ল ড্যামনের দিকে। দলের আরেকজন অ্যার্কিওলজিস্ট; মাথায় কালো চুল আর বয়স মধ্য চল্লিশের কোঠায়। গত বারো মাস ধরে বিভিন্ন ঝড় ঝাঁপটা সহ্য করে খনন করা সমাধিমুখটার দিকে ইশারা করলেন।

চেম্বারে বিভিন্ন কন্টেইনারের স্তূপ দেখতে পেল এলিস। এগুলোতে ভরে বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্ট খনি থেকে তুলে নিরাপদে পাঠিয়ে দেয়া হবে ল্যাবের উদ্দেশ্যে; যেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বসানো হবে নির্দিষ্ট তারিখ। “এখান থেকে সবকিছু বাক্সে ভরে ফেলতে হবে?” খানিকটা অবাক হয়ে গেল এলিস। কারণ স্ট্যান্ডার্ড অ্যার্কিওলজিক্যাল প্রসিডিউর অনুযায়ী সাইট থেকে সরানোর আগেই প্রতিটা আর্টিফ্যাক্টের ছবি তুলে ট্যাগ লাগিয়ে, ম্যাপ আর মেজারমেন্টের কাজ করে সম্পূর্ণ বিবরণ লিখে রাখতে হয়।

“হেডকোয়ার্টার থেকে অর্ডার এসেছে। ডিরেক্টরেরা আমাকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যেন প্রতিটি আর্টিফ্যাক্ট নিরাপদে কুঁড়েঘরে নিয়ে জড়ো করা হয়।” উত্তর জানিয়ে কৌতূহল নিয়ে এলিসের দিকে তাকালেন ড্যামন, “আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?”

নিজের অনুভূতিকে বুঝতে না দিয়ে মাথা নাড়ল এলিস, “মনে হচ্ছে আপনি বাকিদেরকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।” শ্যাফট দিয়ে আসতে আসতে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রী আর শ্রমিকদেরকে বিপরীত দিকে যেতে দেখে বুঝতে পেরেছে যে ড্যামন সমাধিতে একা ঢোকার প্ল্যান করছেন।

“ওদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছি কারণ…” দাঁত বের করে হাসলেন ড্যামন, “ভেবেছি আপনি আর আমিই এটার দাবিদার।” ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে মারকোর সাহায্যও পেয়েছি। লাকি গাই।” চোখ পিটপিট করে ইশারা করতেই পাল্টা দাঁত দেখাল মারকো।

“কিন্তু কোনো দরজা তো দেখা যাচ্ছে না” দ্রুভ্রু-কুঁচকে ফেলল এলিস, “অন্যান্য হেলেনিস্টিক (আলেকজান্ডার ও ক্লিওপেট্রার মধ্যবর্তি গ্রীক সভ্যতা) সমাধিগুলোতে দরজা আছে।”

কাঁধ ঝাঁকালেন ড্যামন, “চলুন তাহলে দেখি, কি বলেন?” চেহারায় ফুটে উঠল উদ্বেগ। এতটা মাসের পরিশ্রম না শেষে বৃথা যায়।

লম্বা দম নিল এলিস। এই সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত!ড্যামনের উদ্দেশ্যে মাথা নাড়তেই মারকো’কে ইশারা করলেন গ্রিক অ্যার্কিওলজিস্ট। টান দিয়ে একটা পোল লাইট নিয়েই সমাধিমুখে দৌড় লাগাল ছেলেটা। এলিস আর ড্যামন ঢুকতেই দৌড়ে গেল আরেকটা ল্যাম্প আনতে, উত্তেজনায় চকচক করছে চোখ।

“এখানে দুটা চেম্বার আছে।” ফিসফিসিয়ে জানালেন ড্যামন। “ঠিক অন্য মেসিডোনিয়ান সমাধিগুলোর মতন গোলাকার ভল্ট। হেলিনিস্টিক যে তাতে কোনো সন্দেহই নেই।”

ছোট্ট একটা অ্যান্টিচেম্বারে নিজেকে আবিষ্কার করল এলিস। দেয়াল জুড়ে রঙিন পোশাক পরিহিত এক নারীর মুরাল; সেনাবাহিনিকে নেতৃত্ব এবং পুরুষদেরকে আদেশ দিচ্ছেন। অবয়বে ফুটে উঠেছে লিভারের সমস্ত গুণ।

ড্যামনের দিকে তাকাতেই স্পষ্ট চোখে পড়ল নোকটার অন্তরের উত্তেজনা। তাদের ধারণাই সঠিক। “এটি এক রানির সমাধি!” চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফেললেন ড্যামন, “অবশেষে দুনিয়া তার শেষ আবাস দেখতে পাবে।”

অ্যান্টিচেম্বার থেকে সমাধি চেম্বারের দরজার দিকে এগোল এলিস। পিছু নিলেন ড্যামন।

কিন্তু চেম্বারে ঢুকতেই মনে হল দম বন্ধ হয়ে যাবে। ভেবেছিল কোনো একটা পাথরের শবাধার, কিংবা নিদেনপক্ষে একটা মমি পাবে। অথচ যা দেখল তাতে সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল মাথার চুল।

২. আর. কে. পুরাম, নিউ দিল্লি

বাসায় ফেরার সময় সারাদিনের ঘটনাগুলো ভেবে দেখলেন ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর স্পেশাল ডিরেক্টর ইমরান কিরবাঈ।

ছয় মাস আগে জি-টুয়েন্টি দেশগুলোর উপর সন্ত্রাসী হুমকি আর মহাভারতের মাঝে লুকায়িত এক প্রাচীন রহস্য আবিষ্কারের ধুলিঝড় থামার পর, টেকনোলজি বেসড় সন্ত্রাসবাদের মনিটর আর তদন্ত করার জন্য যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনে একমত হয়েছে ভারত আর ইউএস সরকার। মহাভারতের এক সিক্রেটের উপর ভিত্তি করে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক আধিপত্য সৃষ্টির জন্য সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়েছিল এক গোপন গ্লোবাল গ্রুপ। সেখান থেকেই এই টাস্ক ফোর্স গঠনের আইডিয়ার সূত্রপাত। পুরো পরিকল্পনাটা ভেস্তে দেয়া সম্ভব হলেও শক্ররা কিন্তু এখনো টিকে আছে। সমস্ত ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারেও এরা দ্বিধা করবে না।

তাই টাস্ক ফোর্সের ধারণাকে সানন্দে সম্ভাষণ জানিয়েছেন ইমরান। এর ফলে রাজনৈতিক স্বীকৃতি থাকায় টেকনো-টেররিজম সম্পর্কে তদন্ত করার অধিকার আর দায়িত্ব দুই-ই পাওয়া গেল। কিন্তু টাস্ক ফোর্সের লিডারদের সাথে আজই মাত্র প্রথম দেখা হল। এবং যা দেখলেন তা মোটেই পছন্দ হয়নি। জঘন্য ব্যাপার হচ্ছে এখন আর টাস্ক ফোর্স থেকে পিছিয়ে আসারও উপায় নেই। পুরো অবস্থাটাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে এখন।

মনে পড়ে গেল ব্ল্যাকবেরিতে পাওয়া ইমেইল সতর্কবার্তার কথা। নাহ, আজ রাতে আর না। সাধারণত অফিস আওয়ারের পরের যেকোনো ইমেইলের চ্যালেঞ্জকে স্বাগত জানান ইমরান। যার মানে হল মাথা ঘামানোর জন্য নতুন একটা সমস্যা পাওয়া গেল। আর এ কাজে তার জুড়ি মেলা ভার। মিথুন রাশির জাতক হিসেবে এই ধরণের চ্যালেঞ্জ তার অনেক পছন্দের। এতে রুটিন ওয়ার্কের বাইরে গিয়ে নিজের প্রকৃতিকে কাজে লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ পাওয়া যায়।

মেইল ইনবক্সে চোখ বোলালেন ইমরান। সাথে সাথে সিধে হয়ে বসলেন নিজের সিটে। ভূতুড়ে একটা ইমেইল এসেছে।

.

রানির সমাধি

দরজা দিয়ে বাইরের চেম্বারের একমাত্র ল্যাম্পের যেটুকু আলো ইনার চেম্বারে পৌঁছাচ্ছে সেই অস্পষ্টতার মাঝে চারপাশে আতঙ্কময় সব দৃশ্য দেখল এলিস আর ড্যামন।

রুমের একেবারে মাঝখানে পাথরের কেন্দ্রটা সাদাসিধে আর কারুকার্যবিহীন। এছাড়া আর কোনো কিছুই নেই। কিন্তু চেম্বারের শূন্যতা বা সাধারণ দিকটা কারো নজর কাড়েনি।

বরঞ্চ বিস্মিত হতে হবে দরজার দিকে মুখ করে থাকা চেম্বারের দেয়ালটা দেখে। সমাধির একেবারে মেঝে থেকে ফণা তুলে রেখেছে এক বিশাল পাথরের সাপ। চেম্বারের ছাদ আর দূরের দেয়াল অব্দি পৌঁছে গেছে কুণ্ডুলি পাকানো দেহ। মেঝের পাথরের উপর ঝুলে আছে তিন ফুট উঁচু পাঁচ-মাথাঅলা হূড। খোলা চোয়াল দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নগ্ন বিষদাঁত। অনাহুত অতিথিদেরকে দেখে যারপরণাই বিরক্ত।

কুণ্ডুলি পাকানো দেহটা ঠিক যেন সমাধিটাকে পাহারা দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে এলিসের মনে হল, জীবিত অবস্থায় জীবন যেভাবে কাটিয়েছেন মৃত্যুর পরেও সেরকমই রয়েছেন এই রানি।

খাপছাড়া দৃশ্যটার সাথে আরো যোগ হয়েছে চেম্বারের বাকি দেয়ালের কারুকার্য। সর্বত্র কেবল সাপ আর সাপ। কোনোটা পাকানো, কোনোটা হিসহিস করছে। কিছু আবার চুপ করে শুয়ে আছে। আরো কয়েকটা একেবারে লম্বা করে খোদাই করা হয়েছে। ঝাপসা আলোতে মনে হচ্ছে পাথরের ছায়াগুলো দেয়াল থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য তৈরি।

পোল লাইটস নিয়ে দৌড়ে এলেও সমাধির এই অদ্ভুত সাজসজ্জা দেখে দোরগোড়াতেই থেমে গেছে মারকো।

“ওহ গড, এসব কী!” ফিসফিসিয়ে উঠল বিস্মিত ছেলেটা।

দুই সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ল এলিস, “কোনো সন্দেহই নেই। ইট ইজ হার টুম্ব!” আবিষ্কারের শিহরণে কাঁপছে গলার স্বর। গত বারো মাস ধরে কেবল আশাই করেছে যেন তাদের ধারণা সত্যি হয়। আর আজ তা একেবারে প্রমাণিত হয়ে গেল।

“উমম…এদিকে দেখুন” দেয়ালের কারুকাজ দেখতে দেখতে পুরো চেম্বারে হেঁটে বেড়াচ্ছে মারকো। বড় সড় চেম্বারটা কম করে হলেও পঞ্চাশ ফুট চওড়া। এবার গিয়ে দাঁড়াল মাথার উপরে টাওয়ারের মত উঁচু হয়ে থাকা বিশাল এক কুণ্ডুলি পাকানো সাপের ঠিক নিচে, প্রবেশ মুখের বিপরীত দিকের কর্ণারে।

কী পেয়েছে দেখার জন্য তাড়াহুড়া করে এগিয়ে গেল এলিস আর ড্যামন। সাপের পিছনেই দেয়ালের মাঝখানে একটা ভোলামুখ দেখা যাচ্ছে। পরস্পরের দিকে তাকাল সবাই। তৃতীয় আরেকটা চেম্বার আছে নাকি!! হেলেনিস্টিক সমাধিগুলোতত এরকমটা হবার কথা না।

মারকোকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই হাতের বাতিটা উঁচু করে ধরে গোপন দরজাটায় আলো ধরল। ছোট্ট একটা চেম্বারে দুই সারি ভর্তি পাথরের মূর্তি আর বিভিন্ন সাইজের স্ল্যাব।

পরীক্ষা করে দেখার জন্য এগোল এলিস আর ড্যামন। “সাপ নিয়ে নিশ্চয় উনার বাড়াবাড়ি রকমের এক মুগ্ধতা ছিল।” পাঁচ ইঞ্চি লম্বা এক সুন্দরী তরুণীর মূর্তি হাতে নিয়ে মন্তব্য করলেন ড্যামন। নারীদেহের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেঁচিয়ে আছে এক বিশাল সাপ।

মাথা নাড়ল এলিস, “কেন শোনেন নি? তৃতীয় আলেকজান্ডারের পিতা তো নাকি একটা সাপ। আমার ধারণা, সাপ নিয়ে উনার প্রবল আকর্ষণের গল্পগুলো আসলে সত্যি।”

“সত্যিই বিস্ময়কর।” প্রায় দশ ইঞ্চি লম্বা চারকোণা একটা ট্যাবলেটের উপর খোদাইকৃত লেখা পড়ে জানালেন ড্যামন। “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে এখান থেকে অনেক কিছুই জানা যাবে।”

সারির পর সারি মূর্তি আর ট্যাবলেটগুলো দেখে এলিসও সম্মত হল।

ঘড়ির দিকে তাকালেন ড্যামন। “হেডকোয়ার্টারকে ইনফর্ম করতে হবে। ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নিশ্চয় এক্ষুনি এসে দেখে যেতে চাইবে সবকিছু।”

“উমম, আপনি না হয় হোটেলে গিয়েই ওদের জন্য অপেক্ষা করুন। এই ফাঁকে আমি সমাধির ছবি তুলে ফেলছি।” এর মাঝেই ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে হাতে নিয়ে নিয়েছে এলিস। “আর্টিফ্যাক্ট গুলোতে ট্যাগ লাগিয়ে কন্টেইনারে ভরে রেখে দেব।”

“থ্যাংকস। আমি মারকোকে পাঠিয়ে দেব আপনাকে সাহায্য করার জন্য।” ছেলেটাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ড্যামন।

চারপাশে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল এলিস। অ্যার্কিওলজিস্ট হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারের হাই পয়েন্ট হতে চলেছে এ সমাধি। চেম্বার আর মুরালের ছবি নিয়ে তাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে।

ক্যামেরার কাজ শেষ করে গোপন চেম্বারে মনোযোগ দিল। এখানেও খুব সাবধানে সবকিছুর ছবি তুলে ফেলল। তারপর প্যাডেড কন্টেইনারে ঢুকিয়ে রাখল।

“আরে, এটা আবার কী!!” একেবারে সবার শেষে হলুদ একটা কিউব নিয়ে হাতের মাঝে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে পাঁচ পাশেই খোদাইকৃত লেখা পেল। এতক্ষণ মূর্তি আর মাটির ট্যাবলেটগুলোর পেছনে লুকিয়ে ছিল। প্রথমে মনে হল প্রাচীন হাড়ের তৈরি জিনিসটার এত শত বছর পরে রঙ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আলোর নিচে নিয়ে হাত ঘোরাতেই বুঝতে পারল একেবারে সত্যিকারের আইভরি দিয়ে বানানো হয়েছে এ কিউব। এমনকি বাতির শক্তিশালী আলোতে আইভরির তরঙ্গায়িত প্যাটার্নটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

“দুই হাজার চারশ বছর আগে মেসিডোনিয়াতে আইভরী ছিল?” আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল এলিস, “অদ্ভুত তো। ওই অংশে তোত হাতিই নেই।”

হঠাৎ এতটাই চমকে গেল যে আরেকটু হলে হাতের কিউবটাই পড়ে যেত। পিছু ঘুরতেই দেখল যে মারকো হাসছে।

“তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।” হালকা স্বরে জানাল এলিস, “প্রাচীন কোনো সমাধিতে একাকি থাকা আর কারো সাথে এমনটা করো না।” ||||||||||| “সরি,” আবার দাঁত বের করে হাসলেও বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা কতটা উত্তেজিত হয়ে আছে। এরকম এক আবিষ্কারের অংশ হতে পারার মতন ঘটনা তো আর প্রতিদিন ঘটেনা। “আপনি একা একা কথা বলছিলেন দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। ড্যামন হেড কোয়ার্টারের সাথে কথা বলেছেন। তারাও রওনা হয়ে গেছে। আরেকটা কথা, ড্যামন বলেছেন কিউবটা যেন আপনার কাছেই থাকে। ডিরেক্টরেরা দেখতে চাইবেন।” এলিসের হাতে ধরা আইভরি কিউবটার দিকে ইশারা করল।

“শিউর। শুধু এটার ছবি তুলে ট্যাগ লাগানো বাকি আছে।” কিউবটার প্রতিটা পাশের ছবি তুলে অন্যান্য আর্টিফ্যাক্টের মতই একটা কন্টেইনারে ভরে ক্যামেরাসহ ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর জানাল,

“যাক। এখানকার, কাজ শেষ। চলো এগুলো কুঁড়েঘরে নিয়ে যাই।” এবার আগে আগে এলো এলিস। দুজনে মিলে কন্টেইনারগুলোকে বয়ে এনে একেবারে মাঝখানের টেবিলের উপর রেখে দিল। এলিসের ধারণা ডিরেক্টর দুজন এক্ষুনি এসে এগুলো দেখতে চাইবেন।

“ডান।” সাদা গ্লাভস খুলে এলিসের দিকে উৎসাহী চোখে তাকাল মারকো।

এলিসও মাথা নাড়ল। “চলো।” ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। সাইটে দুজন গার্ড আছে আর লোকালয় থেকে দূরে হওয়াতে এখানে কেই বা আর চুরি করতে আসবে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ আবিষ্কারের পর কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না।

একগাদা মরচে পড়া ছোট ছোট ভিলা মিলে তৈরি হোটেলে ফিরে নিজের রুমের পথ ধরল এলিস, আর মারকো গেল ড্যামনের খোঁজে। “পাঁচ মিনিটের মাঝেই তোমাদের সাথে দেখা করব।” ছেলেটাকে জানাল এলিস। নিজে ভালভাবেই জানে যে কী করতে চাইছে। খনন কাজের পুরো সময়টুকুতেই যতদূর সম্ভব চেষ্টা করেছে যেন দুই ডিরেক্টরের মুখোমুখি না হতে হয়। ড্যামনই ওদেরকে ব্রিফ করে রিপোর্ট পাঠাতেন আর প্রয়োজনের সময় নির্দেশনা চেয়ে আনতেন। কিন্তু আজ রাতে তো এড়িয়ে যাবার আর কোনো উপায় নেই। মিশনের দুজন কো-ডিরেকক্টর স্ট্যাভরস আর পিটারকে নিয়ে সমাধিতে যেতে হবে। দুজনের একজনকেও দেখতে পারে না এলিস। জানে ওদের মনোভাবও একইরকম। কিন্তু এই মিশনের লিডিং অ্যার্কিওলজিস্ট হওয়াতে ওদেরকে এড়াবারও পথ নেই। সমাধিটার নির্মাণকালের উপর একজন এক্সপার্ট হওয়াতে এও জানে যে এলিসের কাছ থেকে নিশ্চয়ই এই উদ্ভট সমাধিচিত্রের ব্যাপারে ওর নিজস্ব মতামত ওরা জানতে চাইবে।

ভাবতেই বিতৃষ্ণায় ছেয়ে গেল মন। আর ঠিক তখনই এক ধরনের কড়কড় বাতাসে ভরে উঠল রাতের আকাশ। মাথার উপর খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেছে একটা হেলিকপ্টার। খানিকক্ষণ একটানা শব্দ হবার পর হঠাৎ করেই আবার থেমে গেল আওয়াজ। যেন মেশিনটা কাছেই কোথাও ল্যান্ড করেছে।

কিন্তু এলিসের মাথায় ঘুরছে একটু পরের অস্বস্তিকর কাজটার কথা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপ আর ক্যামেরা বের করে রুমের ডেস্কের উপর রেখে দিল। এরপর কোমরের পাউচে মোবাইল ফোন আর ক্যামেরার মেমোরি স্টিক রেখে উঠে দাঁড়াল ড্যামনের ভিলার উদ্দেশ্যে।

কিন্তু ভোরনবে হাত রাখতেই মনে হল বাগানের দিকে মুখ করে থাকা। জানালাতে কেউ শব্দ করছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মারকোর ভয়ার্ত চেহারা। ছেলেটার চেহারা পুরো সাদা হয়ে গেছে; যেন কেউ সবটুকু রক্ত শুষে নিয়েছে। আবারো নক করে জানালাটা খুলে দেবার জন্য ইশারা করল মারকো।

এস্তপায়ে এগিয়ে গিয়ে মারকোকে ভেতরে নিয়ে এলো এলিস। “কী…” বলার আগেই চিৎকার করে কেঁদে ফেলল আতঙ্কিত ছেলেটা।

৩. তপ্ত কড়াই থেকে বাইরে

“ওরা ড্যামনকে খুন করেছে মেঝের উপর ধপ করে বসেই হড়বড় করে বলে উঠল মারকো, “পিটার গুলি করেছে। যেন এটা কোনো ঘটনাই না।” মারকো যে কী বলছে কয়েক মিনিট ধরে এলিস তা বুঝতেই পারল না। কী বলছে এসব হাবিজাবি!! পিটার কেন ড্যামনকে খুন করবে?

ক্রন্দনরত ছেলেটার পাশে বসে কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিতে চাইল এলিস। “খুলে বলো কী হয়েছে; নিশ্চয়ই তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।”

“আমি নিজের চোখে দেখেছি!” ফুঁপিয়ে উঠল মারকো। “ড্যামনের দিকে তাকিয়ে সমানে চিৎকার করছিল স্ট্যাভরস; জানতে চাইছিল কেন ছবি তোলার জন্য আপনাকে একা ছেড়ে এসেছেন। আর ওদেরকে দেখানোর জন্য ড্যামনই কেন কিউবটা আনেন নি সেটা নিয়েও ঝাড়ি দিয়েছে।” ভয়ে ব্যাকুল চোখজোড়া যেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।

এক বক্স টিস্যু এগিয়ে দিয়ে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে এলিস। হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে যেন কোনো স্বপ্ন দেখছে। মনে মনে চাইছে এক্ষুনি এই দুঃস্বপ্ন ভেঙে যাক।

শব্দ করে নাক মুছে মারকো জানালো, “এর পর পরই পিটার পিস্তল বের করেছে। তারপর ড্যামনকে বলল যে নির্দেশ না মানাতে এখন আর উনাকে ওদের দরকার নেই। খানিক চুপ করে থেকে ড্যামনের ভিলার খোলা জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যগুলো স্মরণ করে নিল। “ড্যামন ও অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। আরেকটা সুযোগ দেবার জন্য পিটারকে অনেক অনুনয় করলেন। এত কাঁদছিলেন। কিন্তু পিটার কিছু শুনেনি। ঠাস করে গুলি করে দিয়েছে।” আবারো ফুঁপিয়ে উঠল মারকো।

ছেলেটার কথা শেষ হতেই এলিসের কানে এলো বেশ কয়েকজনের করিডোরে দৌড়ে আসার পদশব্দ। করিডোর দিয়ে ওর ভিলার কাছেই আসছে মনে হচ্ছে। স্ট্যাভরস আর পিটার নয়তো!! নিজের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করে মনে হল যেন শীতের মাঝে ঠাণ্ডা শাওয়ার নিচ্ছে। বুঝতে পারল কী করতে হবে।

দৌড় দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে তুলে দিল জোড়া হুড়কো। কিছুটা সময় তো অন্তত পাওয়া যাবে। যদি ড্যামনকে মেরে ফেলে তাহলে তার আর মারকোর ভবিষ্যৎও আন্দাজ করা যাচ্ছে।

‘আমাদেরকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।” তাড়াতাড়ি মারকোকে জানালো, “এক্ষুনি।”

ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়তেই শুনতে পেল দরজায় কেউ এসেছে।

“তালা দেয়া!” বলে উঠল পিটার।

“ভেঙে ফেলো” জানালো স্ট্যাভরস।

দরজাতে আঘাতের শব্দও কান এড়ালো না। তবে ল্যাচটা কেঁপে উঠলেও খুলল না।

প্রথমে দরজার দিকে তারপর মারকোর দিকে তাকাল এলিস। জঙ্গলের রাস্তায় হেডলাইটের আলোতে ধরা পড়া হরিণের মতই তাকিয়ে আছে ভয়ে জমে যাওয়া ছেলেটা। বুঝতে পারছে হাতে আর বেশি সময় নেই। “মারকো!” চিৎকার করার সাহস হারিয়ে হিসহিস করে উঠল এলিস। পিটার যদি জানে যে ও সবকিছু টের পেয়ে গেছে তাহলে থামানোর জন্য যেকোনো কিছু করতে দ্বিধা করবে না। “ওখান থেকে বের হয়ে আসো, খোদার দোহাই মারকো।”

এলিসের কথা শুনে যেন ঝাঁকুনি দিয়ে বাস্তবে ফিরে এল মারকো। কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে এগিয়ে এল। পিছলে ঘাসের লনে নামার সাথে সাথে ল্যাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল পিটার।

“লনের দিকে গেছে!” জানালার দিকে তাকিয়েই জানিয়ে দিল সঙ্গীকে।

পেছনে কী হয়েছে দেখার জন্য না থেমেই মারকোর হাত ধরে লাফাতে লাফাতে ভিলা থেকে দূরে সরে এলো এলিস। দুজন কো-ডিরেক্টরের সাথে আর কেউ আছে কিনা না জানলেও অনুমান করছে তারা একা আসেনি।

হালকা কাশির মত শব্দ করে কানের পাশ দিয়ে চলে গেলো দুটো বুলেট।

এলিসের বুঝতে একটুও অসুবিধা হল না যে কেউ সাইলেন্সার লাগানো অস্ত্র দিয়ে গুলি করছে।

মারকোকে পেছনে নিয়ে লনের উপর দিয়ে দৌড় লাগাল তাদের অফিসিয়াল ট্রান্সপোর্ট ল্যান্ড ক্রুজারের দিকে।

কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হল মারকে অনেক ভারী হয়ে গেছে। আরো একবার সামনে এগোতে যেতেই পাথরের মত অনড় আর নিশ্চল হয়ে পড়ে গেল ছেলেটা।

পিছু ফিরে মাটিতে পড়ে থাকা দোমড়ানো দেহটার দিকে তাকাল এলিস। পুরো মুখ আর চুলগুলো রক্তে ভিজে গেছে, মনে হচ্ছে যেন লাল মুখোশ পরে আছে মারকো। জায়গা মত গেথে গেছে বুলেট।

কী ঘটেছে বুঝতে পেরে কেঁদে ফেলল এলিস। চলে গেল মূল্যবান কিছু মুহূর্ত। নিজের নিরাপত্তার কথা মাথায় এলেও পা দুটো যেন নড়তে চাইছে না। নির্দয়ভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে ছেলেটার জীবন। কিন্তু কেন?

আরো কয়েকটা কাশির আওয়াজ হতেই সম্বিৎ ফিরে পেল এলিস। মারকোর হাত ছেড়ে দিয়ে লাফ দিয়ে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল।

চাবিটা ইগনিশনেই ঝুলছে। নির্ঘাৎ কো-ডিরেক্টরদেরকে নিয়ে সমাধি সাইটে যেতে হবে ভেবে রেখে গেছে মারকো। গুঙ্গিয়ে উঠলেও চালু হল ইঞ্জিন। এক্সিলারেটরে পা রাখতেই মাটির রাস্তায় নেমে এল গাড়ি। সমাধির দিকে ছুটল এলিস।

পেছনেই শোনা গেল চিৎকার। এখনো আশপাশ দিয়ে বাতাসে শিস কেটে যাচ্ছে বুলেট। মেঝের সাথে এক্সিলারেটর চেপে ধরতেই ল্যান্ড ক্রুজারের গায়েও লাগল একটা। যে করেই হোক ওকে সমাধিতে পৌঁছাতে হবে। ওখানে থাকা দুজন সশস্ত্র গার্ড নিশ্চয়ই ওকে এই হঠাৎ ভেঙে পড়া নরক থেকে উদ্ধার করতে পারবে।

সাইটে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না। কিন্তু অবাক হয়ে গেল গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা নিশ্চুপ চারপাশ দেখে। ফ্লাডলাইটস আর জেনারেটর কিছুই কাজ করছে না। সব বন্ধ।

গার্ডরা কোথায়?

লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমেই এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে ছুটল এলিস। বহুবার এখানে এলেও এতটা অন্ধকারে কখনো পথ চলতে হয়নি। মাথার উপর জ্বলতে থাকা তারার আলোই ভরসা।

হঠাৎ করেই মাটির উপর পড়ে থাকা ভারী কিছুর সাথে ঠোক্কর খেয়ে পা বেধে পড়ে গেল। কোনোমতে ব্যালান্স ফিরে পেতেই মনে হল দম আটকে মরে যাবে।

জর্ডি!, দুজন গার্ডের একজন। নিচু হয়ে চেক করলেও কোন পালস পেল না। একেবারে নিথর হয়ে পড়ে আছে অসাড় দেহটা।

উদ্বিগ্ন মুখে উঠে দাঁড়াল এলিস। কী ঘটছে জানার প্রয়োজন থাকলেও মন বলছে এক্ষুনি পালাতে হবে।

নিজের সাথে যুদ্ধ করছে, এমন সময় আন্ডারগ্রাউন্ড সমাধির প্রবেশ মুখের উপর নেমে এলো গভীর একটা ছায়া।

পুরোপুরি জমে গেল এলিস। এতক্ষণে দেখতে পেয়েছে হেলিকপ্টার।

হাজার চিন্তার মাঝেও একটা কথা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে; ফাঁদে পড়ে গেছে ও!

৪. সাহায্য প্রার্থনা

আনোয়ার!

হা করেই ইমেইলটার দিকে তাকিয়ে আছেন ইমরান। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।

পিতা-মাতাকে হারানোর পর লক্ষ্ণৌতে চাচার কাছে চলে যাবার আগ পর্যন্ত মীরাটে একসাথে বেড়ে উঠেছেন আনোয়ার আর ইমরান। বহুবছর আগের কথা হলেও এখনো অটুট আছে দুজনের সম্পর্ক। ইমরান আইপিএস এ জয়েন করেছেন আর আনোয়ার লক্ষ্ণৌতে নিজের ছোট একটা ব্যবসা শুর করলেও তেমন সুবিধে করতে পারেননি। তারপরেও টিকে আছে এ বন্ধুত্ব।

কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই উবাও হয়ে গেছে আনোয়ার।

আর এখন আবার এমনভাবে উদয় হয়েছে যেন অতীতের কোনো ছায়া।

পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হবার কথা ভাবতেই উদ্বেলিত হয়ে উঠল হৃদয়। অথচ ইমেইলটা খোলার সাথে সাথে মনে হল মুখে কারো ঘুষি খেয়েছেন।

মাত্র দুটো শব্দ লেখা আছে।

সাহায্য, আনোয়ার।

.

…আগুনের মধ্যে ঝাঁপ

শ্যাফট থেকে উঠে আসা ছায়াটাকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে পাথরের মত নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল এলিস। লোকটার এক হাত কোমরে দেখেই বুঝতে পারল পিস্তল ধরে আছে।

কী ঘটছে খুঁজে দেখার সব চেষ্টা বাদ দিয়ে দৌড় লাগাল। গাড়ির কাছে ফিরে এসে ড্রাইভারের দরজা খুলে গাড়ির ভেতরে সেঁধিয়ে যেতেই পিস্তলের গর্জনে খান খান হয়ে গেল রাতের নীরবতা। এই অস্ত্রটাতে কোনো সাইলেন্সার নেই। অর্থাৎ গোপন করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি।

চুরমার হয়ে গেল জানালার কাঁচ।

কানের পাশ দিয়ে গিয়ে প্যাসেঞ্জার সিটে বিধে গেল আরেকটা বুলেট।

এতক্ষণে জীবন্ত হয়ে উঠল ল্যান্ড ক্রুজারের শক্তিশালী ইঞ্জিন। টপ স্পিডে রিভার্স করতেই নুড়ি পাথরের উপর ক্যাচকোচ শব্দ তুলল টায়ার। ফরোয়ার্ড গিয়ারে চাপ দিয়ে সমাধি থেকে বের হবার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা শুরু করল এলিস। স্টেরিও সিস্টেমের উপর গুলি লাগতেই হুইলের উপর মাথা নামিয়ে ফেলল। ভয়ে হিস্টিরিয়া রোগীর মত অবস্থা। তারপরেও আতঙ্ক দমাতে গিয়ে মাথার মাঝে কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

যেমন করেই হোক পালাতে হবে।

পেছনে সচল হয়ে উঠল হেলিকপ্টার। জানে ঠিকই তাকে পিছু ধাওয়া করে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু বুঝতে পারছে না এরা কারা আর কী চায়?

ফোঁপাচ্ছে এলিস। কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি ছোটাল E-75 টোল রোড ধরে থেসালোনিকির উদ্দেশ্যে।

এদিকে হেলিকপ্টারের শব্দও কাছে চলে এসেছে। চেপে ধরল স্টিয়ারিং হুইল, যেন তাহলেই আরো জোরে ছুটবে ল্যান্ডক্রুজার।

এও জানে হেলিকপ্টারকে এড়াবার উপায় নেই। কিছুক্ষণের মাঝেই তাকে ওভারটেক করবে উড়ন্ত দানব।

.

আনোয়ারের খোঁজে

“অফিসে ফিরিয়ে নিয়ে চলো” ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়লেন ইমরান, “বীকন অন্ করো!”

বাধ্য ছেলের মত ঘুরে গেল ড্রাইভার। গতি বাড়িয়ে জ্বালিয়ে দিল আলোক সংকেত। কর্মক্ষেত্রে প্রাপ্ত সুবিধা এভাবে কখনো ব্যবহার করেননা ইমরান। কিন্তু এ মুহূর্তের কথা আলাদা। যে মেসেজ পেয়েছেন সেখান থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে তার বন্ধু বিপদে পড়েছে।

তাই সাহায্য করার জন্য যা কিছু সম্ভব তিনি করবেন।

ঝড়ের বেগে আইবি হেডকোয়ার্টারে ফিরতে ফিরতেই ফোনে বিভিন্ন আদেশ দিয়ে দিলেন। গাড়ির উপর লাল আলো জ্বলতেই পথ ছেড়ে দিল অন্যান্য যানবাহন। কাকতালীয়ভাবে যেন সরে গেছে সব ট্রাফিক জ্যাম; মহাপ্লাবনের তোড়ে ভেসে গেছে তুষার।

অফিসে পৌঁছেই নিজের দলকে ডেকে পাঠালেন।

“তো, আমাদের হাতে কী কী আছে?” অসম্ভব শান্ত শোনাচ্ছে তার গলা। প্রচন্ড রেগে থাকলেও আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ভাব দিয়ে ঢেকে রেখেছেন নিজের উদ্বেগ; খুব বেশি দেরি হয়ে যায় নি তো! বুঝতে পারছেন বাধা পেয়ে মেসেজটাও ঠিকভাবে টাইপ করতে পারে নি অনোয়ার।

“আইপি অ্যাড্রেস ট্রেস করতে পেরেছি” রিপোর্ট করল এক অধস্তন। “দিল্লির সার্ভার। সম্ভাব্য একটা লোকেশনও জানা গেছে।” রেডমার্ক দিয়ে লোকেশন চিহ্নিত করা একটা ম্যাপের প্রিন্টআউট তুলে দিল ইমরানের হাতে, “কিন্তু এ জায়গাটার ৫০ কি. মি. রেডিয়াসের যেকোনো লোকেশনও হতে পারে।”

চোখ তুলে তাকালেন ইমরান, “আমি সঠিক লোকেশনটাই জানতে চাই। আই ওয়ান্ট দ্য ফিজিক্যাল অ্যাড্রেস।”

“স্যার, আপনি তো জানেন, সেক্ষেত্রে কোর্টের অর্ডার লাগবে। আমি অবশ্য আই এস পি’কে ফোন…”।

“কোর্ট অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না” লোকটাকে থামিয়ে দিলেন ইমরান। প্রতিটা মুহূর্তই অত্যন্ত দামি। আলোচনা করার মত সময় নেই, “আই এস পি’কে ব্যাখ্যা করার মতন যথেষ্ট সময়ও নেই। দিস ইজ অ্যান ইমারজেন্সি।”

হা হয়ে গেল তার এজেন্ট, “আপনি কি আইএসপি’র ডাটাবেইজ হ্যাঁক করার কথা বলছেন?”

“ঠিক তাই। আর এর সকল দায়দায়িত্ব আমার।” ইমরান ভালভাবেই জানেন যে কতটা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। কিন্তু অতশত ভেবে লাভ নেই। বিপদে পড়েছে আনোয়ার। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের কখনোই এমনটা না। করলেও আজ রাতে সব নিয়ম ভেঙে ফেলবেন।

বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে কাজে লেগে গেল পুরো টিম। নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ফুস করে দম ফেললেন ইমরান। শুধু এটুকুই আশা করছেন যে, তারা সময়মতই সবকিছু খুঁজে পাবে।

৫. শিকার ধরার অভিযান

শকওয়েভ ব্লাস্টের ঠিক পরের সেকেন্ডেই এলিসের কানে এলো বিস্ফোরণের গর্জন। প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকি খেলো গাড়ি। কাদামাটির রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে পৌঁছাবার জন্য অ্যাসফাল্ট রোডে উঠে পড়েছে ল্যান্ডক্রুজার। অনিচ্ছাসত্ত্বেও গলা চিরে বের হল আর্তচিৎকার।

চোখের পানির ভেতর দিয়েও রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পেল খনন সাইটের ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যাওয়া আগুনের বল। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে তারা সমাধিটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ভাগ্য ভালো যে ও সবকিছুর ছবি তুলে রেখেছিল। ক্যামেরার মেমোরি স্টিক এখনো ওর সাথেই আছে। নিজেকে এই বলে সানা দিল যে সমাধিটা ধ্বংসের মাধ্যমে ইতিহাস আর প্রত্নতত্তের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলেও কিছুটা তো অন্তত বাঁচাতে পেরেছে।

তখনই মাথায় এল চিন্তাটা। এই লোকগুলো যারাই হোক না কেন যদি সমাধিটাকেই এভাবে উড়িয়ে দিতে পারে তাহলে এর সাথে জড়িত কোনোকিছুই আর টিকতে দেবে না।

আর সমাধিস্থানে যা পাওয়া গেছে তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী হল এলিস। তাই ওকে মেরে না ফেলা পর্যন্ত এরা ক্ষান্ত হবে না।

হঠাৎ করেই ল্যান্ড ক্রুজারের ছাদের উপর কিছু একটা বাড়ি খেলো। হেলিকপ্টারের ধাতব শরীর দিয়ে ছাদটাকে সমানে আঘাত করছে পাইলট। নিজের সিটে লাফিয়ে উঠল এলিস। সারা সন্ধ্যার ঘটনায় সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে নার্ভ। আতঙ্কে চিৎকার করলেও বুঝতে পারছে এক্ষুনি ধরে ফেলবে ওকে।

গিয়ার শিফট করে আবারো এক্সিলেটারে চাপ বাড়াল। কপালে যাই থাকুক না কেন এত সহজে হাল ছাড়বেনা। সবশেষে হয়ত ওরাই জয়ী হবে; কিন্তু তার আগে কিছুতেই সারেন্ডার করবে না ও।

হেলিকপ্টারের পাইলটও এই নারীর জেদ টের পেয়ে হঠাৎ করেই গতি বাড়িয়ে সামনে চলে গেল। তারপর ডানদিকে খানিকটা কাৎ হয়ে সোজা ল্যান্ডক্রুজারের উপর নামতে চাইল যেন।

হেলিকপ্টারটাকে সোজা ওর দিকেই উড়ে আসতে দেখে আতঙ্কে বোবা হয়ে গেল এলিস। বুঝতে পারল পাইলটের অভিপ্রায়। রাস্তার উপর ল্যান্ড করার পাশাপাশি লোকটার প্ল্যান হল এলিসকে ভয় পাইয়ে দেয়া। যেন হেলিকপটারের অজেয় শক্তিকে সে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।

বহুকষ্টে নিজেকে সংযত করল এলিস। কেউ একজন তাকে এতটা অসহায় ভাবছে, তাকে নিয়ে খেলতে চাইছে ভাবতেই শক্ত হয়ে উঠল সমস্ত সত্তা।

“ওকে দোস্ত” কঠোর হয়ে উঠল গলার স্বর, “এই খেলাটা দুজনই খেলে। তুমি রুলেট চাইছো তো? তবে তাই হোক।” গিয়ার শিফট করে খানিকক্ষণের জন্য গতি ধীর করে আবারো স্পিড বাড়িয়ে সোজা হেলিকপ্টারের দিকে ধেয়ে চলল। মাটি থেকে মাত্র কয়েক মিটার উপরে ভাসছে উড়ন্ত দানব। “দেখা যাক কে আগে চোখের পাতা ফেলে।”

কয়েক মুহূর্তের জন্য গর্জন করতে করতে একে অন্যের দিকে ছুটল হেলিকপ্টার আর এস ইউ ভি। এই বুঝি সংঘর্ষ ঘটে।

যাই হোক, আজগুবি খেলাটা বাদ দিয়ে রাস্তার উপর ল্যান্ড করল পাইলট। এগিয়ে যাচ্ছে ল্যান্ড ক্রুজার। মনস্তাত্ত্বিক কলাকৌশল বাদ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল হেলিকপ্টার।

রোটরের ঘূর্ণন থামতেই দেখা গেল ভেতরে একজন মাত্র লোক। এলিসও বুঝতে পারল যে পাইলটের সাথে আর কেউ নেই। জালের উপর মাছি দেখে অপেক্ষারত মাকড়সার মতই একপাশে দাঁড়িয়ে আছে পাইলট; যেন জানেই যে মাছিটা তার সিল্কের ফাঁদ ছেড়ে আর কোথাও যেতে পারবে না।

হন্যে হয়ে চারপাশে তাকাল এলিস। পালানোর জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে রাস্তার উপরে এতবড় হেলিকপ্টার দেখে কিছুতেই বুকের ধুকপুকানি থামাতে পারছে না। অথচ জানে যে আতঙ্কে অন্ধ হয়ে গেলে কোনো লাভই হবে না। যদি কোনো সম্ভাবনা থেকেও থাকে, তাও হারাবে।

চোখের পানি আটকে মনযোগ দিল সামনের দিকে। যদিও ভেতর থেকে একটুও উৎসাহ পাচ্ছে না।

তখনই চোখে পড়ল ব্যাপারটা। সুযোগটা ক্ষীণ হলেও মনে খানিকটা আশা জাগল। জানে সবকিছুই ওর বিরুদ্ধে; তারপরেও বিনা চেষ্টায় হার মানবে না।

গতি কিছুটা কমিয়ে এনে মনে মনে কয়েকটা হিসাব করে নিল। ভাবনাটা কাজে দিতেও পারে।

অন্যদিকে এলিসের গাড়ি ধীর হতে দেখে পাইলট ভাবল মেয়েটা বুঝি থামতে যাচ্ছে; তাই সেও সামনে এগোল।

.

জোনগড় কেল্লা, নিউ দিল্লি থেকে ১৩০ কি. মি. দূরে, ভারত।

“এরকম উন্নতিতে আমি যে খুব খুশি হয়েছি তা কিন্তু না” অসন্তুষ্ট হয়ে বিড়বিড় করে উঠল কলিন।

বিজয়ের পারিবারিক কেল্লার ব্যালকনিতে বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে চারপাশের চমৎকার দৃশ্য। শীত এখনো তেমন জাঁকিয়ে না বসলেও রাতের বেলা বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। বিশেষ করে কৃষি জমির উপর টাওয়ারের মত উঁচু হয়ে থাকা পাহাড়ে অবস্থিত কেল্লাটাতে আর পাশের ছোট্ট গ্রামটাতে। দুৰ্গটা বিজয় পেয়েছে ওর আঙ্কেলের কাছ থেকে। বছর খানেক আগে নিষ্ঠুরভাবে খুন হয়েছেন রিটায়ার্ড নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্ট বিক্রম সিং। খুনের সূত্র ধরেই উন্মোচিত হয়েছে দ্য গ্রেট অশোক আর মহাভারতের এক গোপন রহস্য।

কলিনের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে ফেলল বিজয়, “লোকটাকে তোমার পছন্দ হয় নি? আমার তো বেশ মজার মনে হচ্ছে।”

ভ্রু-কুঁচকে বন্ধুর দিকে তাকাল কলিন, “ঠিকই ধরেছ, ওকে আমার একটুও সহ্য হয় না। কিরবাঈ যখন জানালেন যে ইউ এস আর ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট মিলে এই জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স বানাচ্ছে, তখন তো ভেবেছিলাম আইডিয়াটা বেশ চমৎকার হবে।”

“হ্যাঁ, সেটাই তো” সম্মত হল বিজয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ একদল সায়েন্টিস্ট আর ইঞ্জিনিয়ারদেরকে জড়ো করে টেকনোলজি বেসড টেররিজমের তদন্ত করার জন্য সহায়তা দেবে দু’দেশের সরকার। এ সময়ে এরকম একটা আইডিয়ার চেয়ে ভালো আর কিইবা হতে পারে।”

“ইয়াহ্‌; কিন্তু এখন বুঝতে পারছি যে জঙ্গলে হাঁটার সময় রেড রাইডিং হুডের কেমন লেগেছিল। একটা নেকড়ে গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত সবকিছুই ভাল লাগে।”

মিটিমিটি হাসছে বিজয়। গত বছর তাদের অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গী সি আই এ’র অপারেটর মাইকেল ব্লেকের সাথে দেখা করার জন্য দুই বন্ধুকে আজ সকালে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর হেডকোয়ার্টারে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ব্লেকের সাথে ইউ এস প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নির্বাচিত জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের আমেরিকান হেডও এসেছিল। আর এই মিটিংয়ের জন্যই মাত্র দুদিন আগে ইউএস থেকে উড়ে এসেছে কলিন।

৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা পেশিবহুল বিল প্যাটারসনের মেধাও কম নয়। কেমিকেল আর মলিকিউলার বায়োলজীতে পি এইচ ডি আছে। প্রাক্তন আমেরিকান নেভী সিল এই আফ্রিকান-আমেরিকান বিল সবাইকে খোঁচা দিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। আর নিজের অধস্তন প্রত্যেককেই সন্দেহের চোখে দেখে।

স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহী স্বভাবের কলিন তাই প্রথম দেখাতেই প্যাটারসনকে অপছন্দ করে বসে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা স্বাধীনতা থাকবে সেটা নিয়ে তো দুজনের তুমুল ঝগড়াই বেঁধে গেছে। এখনো সে রাগ মাথা থেকে যায়নি। বলে উঠল, “শোনো, যদি ইউএস প্রেসিডেন্ট ভাবে যে সে খুব ভালো, ঠিক আছে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো কিছু করার আগেই তার কাছে ছুটতে হবে সেটার তো কোনো মানে হয় না।” রক্তচক্ষু নিয়ে বিজয়ের দিকে তাকাল কলিন।

“আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমার মাথা আবার চিবিয়ে খেও না! আর সবকিছুর জন্যই তার পারমিশন লাগবে তা তো না। শুধু যদি কোনো সামরিক কিংবা বিশেষ ট্রেনিং সম্বলিত কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় তখন। চলল, এটুকু মেনে নেই। ৯-এর সিক্রেট নিয়ে যদি ফারুক পালিয়ে যেত তাহলে তোমার আমার কিছু করার ছিল না।” গত বছরের কথা মনে করিয়ে দিল বিজয়। “শেষ পর্যন্ত কমান্ডোরাই সবকিছু সামলেছে। এই টাস্ক ফোর্সের হয়ে আমাদের কাজ হবে বিভিন্ন ধারণাকে তদন্ত আর পরীক্ষা করে দেখা। যদি কোনো অ্যাকশনের প্রয়োজন হয় তাহলে যারা এ কাজে দক্ষ তাদের উপর ছেড়ে দেয়াই ভাল হবে।”

কথাগুলো কলিনও মেনে নিল। জানে বিজয় সত্যি কথাই বলছে; কিন্তু তারপরেও স্বীকার করতে মন চাইছে না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, চলো ঘরে যাই” এখনো ঘোঘোৎ করছে, “শুধু রাতের বেলা প্যাটারসন ব্যাটাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন না দেখলেই হয়।”

.

৬. সাহায্যের জন্য আকুতি

হেলিকপ্টারের পাইলট মাঝ রাস্তায় চলে আসতেই ডানদিকে গাড়ি নিয়ে জোরে এক্সিলারেটর চেপে ধরল এলিস। মনোযোগ কেবল হেলিকপ্টারের নাক আর হাইওয়ের সীমানার মাঝখানের ছোট্ট গ্যাপটার দিকে। রাস্তার কিনারে পৌঁছাতেই গাড়ির গতি বেড়ে গেল।

স্তম্ভিত পাইলটের পাশ দিয়ে হুশ করে পার হয়ে আসতেই এসইউভি-র পেছনে দৌড় লাগালো লোকটা। অন্যদিকে এলিস প্রাণপণে প্রার্থনা করছে যেন তার ফন্দিটা কাজে লাগে। গ্যাপটা সত্যিই এতটা চওড়া তো?

পর মুহূর্তেই ল্যান্ড ক্রুজারের দুপাশে ধাতব কিছুর ঘষা খাওয়ার শব্দে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল রাতের নীরবতা। গাড়ির একপাশে হেলিকপ্টার অন্যপাশে হাইওয়ের রেলিং।

দীর্ঘ একটা মুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেল সময়। হেলিকপ্টার আর রেলিং এস ইউ ভি’কে চেপে ধরে গোলাগুলি থেকে বেঁচে যাওয়া অক্ষত জানালাগুলোকেও চুরমার করে দিল।

দু’চোখ বন্ধ করে ইচ্ছেশক্তির জোরে গাড়ি ছোটাল এলিস। তীক্ষ্ণ আর কর্কশ শব্দের চোটে মাথা ছিঁড়ে যাবার জোগাড়।

হঠাৎ করেই লাফ দিয়ে আগে বাড়ল ল্যান্ডক্রুজার। মুক্ত হয়েছে দুপাশের ধাতব বাঁধন থেকে। চমকে গিয়ে তাকাতেই দেখল যে সামনে বিছিয়ে আছে দিগন্ত বিস্তৃত হাইওয়ে।

নতুন উদ্যমে ফিরে এলো আশা। এক্সিলারেটরকে মেঝের সাথেই গেঁথে ফেলল। যেন হেলিকপ্টার থেকে যত দূরে সম্ভব সরে যাওয়া যায়।

পেছনে, এস ইউ ভি-র কাঁচবিহীন জানালা দিয়ে ভেসে আসছে পাইলটের শাপ-শাপান্ত; তাড়াতাড়ি তাই গুলির আশঙ্কায় সিটের উপর কুঁজো হয়ে বসে গেল। আর ঠিক সাথে সাথেই মাথার আশপাশ দিয়ে শিস কেটে বেরিয়ে গেল বুলেট। সামনের উইন্ডস্ক্রিনে দেখা গেল মাকড়সার জালের মতন রূপালি ফাটল।

কোনো মতে ড্রাইভ করলেও জানে যে এরকম অস্পষ্ট উইন্ডস্ক্রিন নিয়ে বেশি জোরে গাড়ি চালাতে পারবে না। আবারো ফিরে এলো হতাশা। গতি কিছুটা কমিয়ে মনোযোগ দিল রাস্তার দিকে।

প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে এই বুঝি হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা যাবে। কিন্তু নাহ, একের পর এক মিনিট কেটে যাচ্ছে। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে এস ইউ ভি-র কেবিনে বয়ে যাওয়া বাতাস আর ইঞ্জিনের গর্জন ছাড়া আর কিছু কানে আসছে না। গাড়ির সাথে সংঘর্ষে হেলিকপ্টারটার কোনো ক্ষতি হল, নাকি পাইলটই হাল ছেড়ে দিল কে জানে।

মাথার মধ্যে আবার ঘুরপাক খেতে লাগল গতরাতের রহস্যময় ঘটনাগুলো। প্রথমে তো ভেবেছিল হয়ত কোনো অ্যান্টিক চোরাচালানকারী মাফিয়া দল হামলা করেছে। ছবি তোলার কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠার কারণও বোধহয় তাই। কেননা এতে করে কালো বাজারে দাম কমে যাবার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে সমাধিটা যখন এতটাই বিখ্যাত।

কিন্তু তাতে করে তো পুরো সমাধিটাকে উড়িয়ে দেবার রহস্যের কিনারা হচ্ছে না। কোনো যুক্তিই মাথায় আসছে না। দুই হাজার বছরের পুরনো একটা সমাধি ধ্বংস করে কার কী লাভ হল?

গাড়ি এখন লুডিয়াস নদীর উপরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থেসালোনিকি পৌঁছে যাবে। তাই যা ঘটে গেছে তার চিন্তা বাদ দিয়ে সামনে কী আছে সেটা নিয়েই ভাবার মনস্থির করল।

পাইলট যদি স্ট্যাভরস আর পিটারের সাথে জড়িত হয় তাহলে নিশ্চয় থেসালোনিকিতেও তাদের আরো সাগরেদ আছে। একারণেই এলিসের পিছু ধাওয়া বন্ধ করে ওদেরকেই ফোন করে তৈরি করে রাখাটা বেশি সহজ মনে করেছে। তার মানে ওর বিপদ এখনো খাড়া হয়ে ঝুলছে।

এসইউভি থামিয়ে বাইরে বের হয়ে এলে এলিস। কিছুতেই কান্না আটকাতে পারছে না। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। মারকো মারা গেছে। ড্যামনও। ওকে অন্তত জীবিত থাকতে হবে। রেইলের ধারে দাঁড়িয়ে সমানে ঘুষি মারতে লাগল। যেন ব্যথার সাথে ঝরে পড়বে হতাশা। মারকো আর তার অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুর কথা মনে পড়ল। এত তাড়াতাড়ি কেন ছেলেটার ভাগ্যটা এমন হল?

অশ্রুমাখা মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল অসংখ্য তারা। নাহ, কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে পারবে না এখন।

শক্ত করে ব্রিজের রেইল আঁকড়ে ধরে ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু ভাবতে চাইল। থেসালোনিকিতে একটা ইউ এস কনস্যুলেট আছে। ওখানে যেতে হবে। একমাত্র ওই জায়গাতেই হয়ত সত্যিকারের নিরাপত্তা পাবে। হোটেলে পাসপোর্টটা ফেলে এলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে আছে। ফলে আইডেনটিটি প্রমাণ করে আশ্রয় চাইতে কোনো কষ্টই হবেনা।

মোবাইল ফোন বের করে কনস্যুলেটের ঠিকানা দেখে নিল। ৪৩ তিমিস্কি স্ট্রিট। যাক, খানিকটা সাহস পাওয়া গেল।

এবার মনে হল কাউকে ফোন করে সাহায্য চাওয়া যায়।

ওর বয়ফ্রেন্ড। কিন্তু কেন যেন দ্বিধা হচ্ছে। ছেলেটা কি আদৌ তার বয়ফ্রেন্ড আছে? জানার কোনো উপায় নেই। তারপরও ও-ই ভরসা। আরো কয়েকজন বন্ধু থাকলেও বিশ্বাস করার মত কেউ নেই।

নাম্বার ডায়াল করল। বরাবরের মতই কয়েকবার রিং বেজেই ডিসকানেক্ট হয়ে গেল। সময়ের দিকে খেয়াল করতেই মনে হল এখন তো স্টেটসে ভোর। দ্বিতীয়বারের চেষ্টাতেও ফলাফল একই। কয়েকটা রিং বাজার পরেই বিজি টোন শোনা যাচ্ছে। ব্যাকুল হৃদয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই চোখ পড়ল মেসেজ। ওকে জানাল যে নাম্বারে চেষ্টা করছে তা এখন ব্যস্ত আছে।

তার মানে ছেলেটা জেগে আছে। ইচ্ছে করে ফোন ধরছে না বুঝতে পেরে দ্বিগুণ হয়ে গেল কষ্ট। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুলছে এরকম একটা মুহূর্তে যে কিনা ওর পাশে থাকার কথা ছিল সে-ই হঠাৎ করে নাই হয়ে গেল! বুকের মাঝে উথলে উঠল কান্না। বহুকষ্টে নিজেকে সামলাল এলিস।

জয়ী হতে হলে ওকে শক্ত হতেই হবে।

আরেকটা নাম স্মরণ হতেই তাড়াতাড়ি নাম্বার ডায়াল করল। এবার কোন মোবাইল নয়, ল্যান্ডলাইন নাম্বার। কার্ট ওয়ালেসের পার্সোনাল সেল ফোনের নাম্বার পাবার মত ঘনিষ্ঠতা এখনো হয় নি।

দুটো রিংয়ের পরেই উত্তর দিল এক মহিলা কণ্ঠ।

“মিঃ ওয়ালেসের অফিস। আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” ক্লারা, ওয়ালেসের অ্যাসিস্ট্যান্ট।

এত ধরনের অভিজ্ঞতা হওয়ায় কেঁপে উঠল এলিসের গলা, “আমি মিঃ ওয়ালেসের সাথে কথা বলতে চাই প্লিজ, ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট।”

“মিঃ ওয়ালেস একটা মিটিং করছেন আর তাই এখন উনাকে বিরক্ত করা। যাবে না।”

‘ব্যাপারটা সত্যিই জীবন আর মৃত্যুর সাথে জড়িত। প্লিজ, আমাকে ব্যবস্থা করে দিন।” আকুতি জানালেও ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল এলিসের অন্তর। শেষ খড়কুটোটাও হারিয়ে গেল।

“আপনার নাম আর ফোন নাম্বার বলুন, মিঃ ওয়ালেস ফ্রি হবার সাথে সাথে কল ব্যাক করবেন।”

মনে হল হাতুড়ির বাড়ি খেয়েছে। এখন থেকে সে একেবারেই একা। আর কারো কাছ থেকে সাহায্যের আশা নেই।

.

৭. থেসালোনিকির কাছে E-75, গ্রিস

ক্লারার কথাগুলো শুনে যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেল এলিস। তারপর মনে হল আচ্ছা যদি সবকিছু খুলে বলে…”।

“আমার নাম এলিস টার্নার। মিঃ ওয়ালেস গ্রিসে যে মিশন ফান্ড করেছেন সেখানে আমিও আছি। প্লিজ… প্লিজ উনাকে জানান যে সমাধিটা ধ্বংস হয়ে গেছে। দলের সদস্যদের দুজন খুন হয়েছে আর আমার পেছনেও লোক লেগেছে। আমি…আমি অনেক ভয় পাচ্ছি।” ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনোরকমে শেষ করল এলিস।

নরম হল ক্লারার কণ্ঠস্বর। “মিস টার্নার আপনার অবস্থার কথা শুনে আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি এক্ষুনি মিঃ ওয়ালেসকে মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছি। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হল যে তিনি পার্সোনাল মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননা। তাই আমার খানিকটা সময় লাগবে। আর আপনাকে অনুরোধ করছি ইনকামিং কলের জন্য ফোনটাকে বার বার চেক করবেন।”

মাথা নেড়ে ক্লারাকে থ্যাংকস জানাল এলিস। তারপর চোখ মুছে আবার ড্রাইভারের সিটে চড়ে বসল। ও এখন সম্পূর্ণ একা। শুধু যদি ওয়ালেস ফোন করে কোনো সাহায্যের আশা দেয়!

কিন্তু তার আগ পর্যন্ত নিজের বুদ্ধিতেই পথ চলতে হবে। আতঙ্কিত হয়ে কোনো লাভ নেই। পরিষ্কার মাথা নিয়ে ভাবতে হবে পরবর্তী কর্মপন্থা।

দ্য ইউ এস কনস্যুলেট। হ্যাঁ, এখন সেটাই ওর লক্ষ্য।

ল্যান্ড ক্রুজারের জিপিএস সিস্টেমে কনস্যুলেটের কো-অর্ডিনেট সেট করে মনোযোগ দিল সামনের দিকে।

“ইন্টারেস্টিং” জিপিএস রুট দেখে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল এলিস। খানিক আগেই পার হয়ে এসেছে E-75 এর সাথে এসে মিশে যাওয়া A2 মোটরওয়ে। আবার কিছুক্ষণ গেলেই এক্সিওস ইন্টারচেঞ্জ যা থেসালোনিকি পর্যন্ত চলে গেছে। গালিকস ব্রিজ থেকে কয়েক মাইল সামনে A2 মিশে গেছে। নিয়া ডিটিকি ইসিদোসের সাথে যা নিয়ে যাবে নাভারচো কোনটুরিওটো’র দিকে; যেখানে থেকে আবার কিছুদূর এগিয়ে বামদিকে মোড় নিলেই তিমিস্কি। জিপিএস তো তাই বলছে।

কিন্তু যেটা বেশি মনোযোগ কেড়েছে তা হল, বিকল্প দুটো রাস্তা। প্রথম রাস্তাটা নিয়া ডিটিকি ইসিদোস থেকে ২৬ অক্টোভ্রিরু পর্যন্ত গিয়ে জংশনে মিশেছে যেখান থেকে নাভারচো যাওয়া যাবে।

কিন্তু এই রাস্তাগুলো ওর কাজে লাগবে না। যতটুকু মনে হচ্ছে জংশনে ওর আশায় ওঁৎ পেতে বসে আছে সশস্ত্র লোকগুলো।

দ্বিতীয় বিকল্প রাস্তাটাকে তাই মনে ধরল। ২৬ অক্টোভিরুতে না গিয়ে এলিস যদি নেক্সট এক্সিট দিয়ে মোটরওয়ের পাতাল হয়ে ২৮ অক্টোভিরু পর্যন্ত যায় তাহলে খানিক পরেই মোনাসট্রিরিউতে টার্ন নিয়ে ইগনাশিয়া আর তারপর ডানদিকে গেলেই তিমিস্কি পৌঁছে যাবে।

হুম, তাহলে এই রাস্তাতেই যাবে বলে মনস্থির করে ফেলল। পুরোটাই একটা বাজি বলা যায়। কোনো গ্যারান্টি নেই যে অন্যেরা এ রাস্তা দেখবে না। কিন্তু ওর হাতে তো তেমন আর অপশনও নেই।

গাড়িতে উঠতেই মাথায় এলো আরেকটা নাম। যার উপর ভরসা করা যায়। অন্তত তাই মনে হচ্ছে। ওর কলেজের বয়ফ্রেন্ড। বেস্ট রিলেশনশিপগুলোর একটা। কিন্তু বহুদিন কোনো যোগাযোগ নেই। যদিও ছেলেটা কয়েকবার ফোন করেছে, মাঝে মাঝে ইমেইলও পাঠিয়েছে; কিন্তু এলিস উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করে নি। আর কোনো আশা নেই ভেবে ক্ষান্ত দিয়েছে বেচারা।

এমনভাবে সম্পর্কটা শেষ হয়েছিল যে তাতেও খানিকটা বিরক্ত ছিল এলিস। সবসময় ভাবত সম্পর্কটা বুঝি টিকবে। বিয়ে করে দুজনে সারাজীবন একসাথে থাকবে। কিন্তু নাহ, সেরকম কিছু তো হয় নি।

আজ এরকম একটা সমস্যার মাঝে একাকী হয়ে মন চাইছে কারো সাথে কথা বলতে। প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড ছাড়া এক্ষেত্রে আর কেউ নেই। এত বছর পরে এমনটা করা উচিত হবে কিনা তাও জানে না। কেন ওর নামটাই মনে পড়ল সেটাও বুঝছে না। সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে দিয়েছে সেই ব্রেকআপ।

কিছুক্ষণ তাই কন্ট্রাক্ট লিস্টের আরো কয়েকটা নাম ভেবে দেখল। তারপর কী মনে হতেই দ্রুত হাতে ডায়াল করল নাম্বার। কাম অন, ফোনটা ধরো। এমন না যে এলিসের নাম্বার চিনবে না। যদি না অবশ্য ডিলিট করে দেয়। এত বছর পরে সেটার সম্ভাবনাও কম নয়।

.

৮. জোনগড় কেল্লা

নিজের রুমে বসে একদৃষ্টে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে কলিন। এগারো বছর ধরে মেয়েটার সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না। ব্রেকআপের পর ওর কোনো ইমেইলের উত্তরও দেয়নি মেয়েটা। যদিও এতে তেমন অবাক হবার মত কিছু ছিল না। কারণ প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের সাথে সে কোনো সম্পর্কই রাখতে চায়নি। অথচ আজ কিনা নিজেই কলিনকে ফোন করেছে। কী এমন ঘটল যে এত বছর পরে ওর মাইন্ড চেঞ্জ হয়ে গেল?

নাম্বার দেখে প্রথমেই মনে হয়েছে যে ফোনটা রিসিভ করবে। কিন্তু পুরনো কথা মনে পড়ে যাওয়ায় দ্বিধায় পড়ে গেল। ভয়ও পেল। যদি মেয়েটা সত্যিই ভাঙ্গা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে চায়, অবস্থা তাহলে আরো জটিল হয়ে যাবে।

যাইহোক। যা আছে কপালে ভেবে লম্বা একটা দম নিয়ে কলটা রিসিভ করল কলিন।

.

টানেলের শেষ মাথায় আশার আলো

“এলিস?” কলিনের কণ্ঠস্বর আর কখনো এতটা মধুর লাগেনি।

‘কলিন! আমি…আসলে আর কাকে ফোন করব বুঝতে পারছিলাম না।” হঠাৎ করেই কেঁপে উঠল গলা। সাথে খানিকটা স্বস্তিও পেল। কারণ জানে যে হাজার মাইল দূরে ইউএসে বসে থাকা কলিন এ মুহূর্তে তার কোনো কাজেই আসবে না।

“হেই, কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? মনে হচ্ছে কলিনও বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে। এলিসের উদ্বেগ ধরতে পেরে জানতে চাইল, “তুমি ঠিক আছে তো?”

আতঙ্ক আর অপরাধবোধে জর্জরিত এলিস খুলে বলল গত রাতের ঘটনা। একেবারে সমাধিতে ঢোকা থেকে শুরু করে এখন হাইওয়েতে ছুটে বেড়ানো। পর্যন্ত সবকিছু।

শোনার পর কিছুক্ষণ নীবর থেকে অবশেষে কলিন বলল, “থেসালোনিকিতে মিশনের আর কেউ নেই যার কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারো?”

“কাকে যে বিশ্বাস করব আমি জানি না কলিন। যদি সত্যিই স্ট্যাভরস আর পিটারই এসবের কারণ হয় তাহলে অন্যেরা যে সাধু তা তো নিশ্চিত নই। আর আমার মনে হচ্ছে ড্যামনও এটার অংশ ছিল। “নির্দেশ পালন না করাতেই খুন হয়েছে। পিটার তো তাই বললছে।”

“ওকে। তাহলে বলব বিকল্প রাস্তা ধরে থেসালোনিকিতে ঢোকার তোমার আইডিয়াটাই ভালো। ওরা নিশ্চয় এটা আশা করছে না। সোজা কনস্যুলেটে চলে যাও। আমি এখন ভারতে আছি। তবে ইউএসএতে কয়েকটা ফোন করে দিচ্ছি। আশা করছি তোমার জন্য কিছু একটা সাহায্যের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

“তুমি ভারতে কী করছ?”

খুব বেশি ব্যাখ্যায় না গিয়ে শুধু আঙ্কেলের কাছ থেকে বিজয়ের কেল্লা পাবার কথা জানাল কলিন। “ওহ, আচ্ছা। থ্যাংকস, কলিন, এতসব কিছু হয়ে যাবার পরে তুমি সাহায্য…”

“আরে ধুর বাদ দাও। এ কারণেই তো বন্ধুরা। সম্পর্ক থাকা না থাকা কোনো ব্যাপার না।” তারপর একটু দ্বিধাজড়িত স্বরে জানতে চাইল, “বিজয়কে কিছু জানাবো?”

“উমমম…না, থাক। এখন না। ওর কেমন প্রতিক্রিয়া হবে আমি জানি না।”

“টেক কেয়ার। পরে আবার কথা হবে।”

ফোন কেটে দিল।

ইঞ্জিন স্টার্ট করল এলিস। সামনে এগোল গাড়ি। কিন্তু এক কি. মি.ও যেতে পারল না। তার আগেই বেজে উঠল মোবাইল।

ছোঁ মেরে তুলেই স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ওয়ালেস নয় তো?

“এলিস?”

“মিঃ ওয়ালেস!” কত যে স্বস্তি পেল যা বলে বোঝানো যাবে না।

“শুনলাম তোমার নাকি আর্জেন্ট সাহায্য দরকার।” ওয়ালেস সত্যিই উদ্বেগে আছেন।

বুক খালি করে সব কথা বলে দিল এলিস। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না গত এক ঘণ্টায় এতকিছু ঘটে গেছে।

সবকিছু শোনার পর নীরব হয়ে গেলেন ওয়ালেস। তারপর আবার যখন কথা বলা শুরু করলেন কণ্ঠে বেশ কর্তৃত্বের ভাব টের পাওয়া গেল, “তোমার কথানুযায়ী জিপিএস দেখাচ্ছে আর আধ ঘণ্টা গেলেই ইউএস কনস্যুলেট। তার মানে কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় আছে হাতে।” ভদ্রলোকের গলার স্বর বেশ বিনয়ী। অন্য সময় হলে হয়ত অতি উৎসাহী মনে হত; কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে জীবিত উদ্ধারের জন্য ওয়ালেসই সবচেয়ে ভাল অপশন। “ডোন্ট ওরি, মাই ডিয়ার। কথা দিচ্ছি, তোমার আর কোনো ভয় নেই। গাড়ি চালাতে থাকো। দশ মিনিটের মাঝেই আরেকটা ফোন পাবে। কনস্যুলেটে পৌঁছেই। আমাকে ফোন দিও। এখন রাখছি।”

ওয়ালেস ফোন কেটে দিতেই বিড়বিড় করে থ্যাংকস জানাল এলিস। আজ রাতে প্রথমবারের মত খেয়াল করল যে হাইওয়েতে আর কেউ নেই। এতক্ষণ পর্যন্ত আর কোনো গাড়ি চোখে পড়েনি। কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল পুরো ব্যাপারটা।

ওয়ালেসের সাথে কথা বলার পর থেকে শান্ত হয়ে গেছে ভেতরটা। তাই শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরল এলিস। এস্কিওস নদী পার হতেই বেজে উঠল ফোন।

“মিস টার্নার? আমি থেসালোনিকির জেনারেল পুলিশ ডিরেক্টরেট থেকে ফোন করছি।” কানের কাছে কথা বলে উঠল এক ভারী গ্রিক কণ্ঠ।

মনে হল হার্ট না ফেইল হয়ে যায়। সত্যিই শুনছে তো? ওয়ালেস এরই মাঝে লোকাল পুলিশকেও ফোন করে দিয়েছেন! “ইয়েস” বিস্ময় চাপতে গিয়ে তোতলাতে লাগল এলিস।

লাইনের ওপাশে থাকা পুলিশ অফিসার খুব দ্রুত হড়বড় করে বলে দিল পুরো প্ল্যান। নিয়া ডিটিকি ইসিদোসের ইন্টারসেকশনে মোটর সাইকেল আরোহী তিন পুলিশ ওর সাথে দেখা করে আমেরিকান কনস্যুলেট নয়, বরঞ্চ এমন এক হোটেলে নিয়ে যাবে যেখানে রুম আর লবিতে সশস্ত্র পাহারা থাকবে। থেসালোনিকি থেকে সরাসরি ইউএসে যাবার কাগজপত্র তৈরি করে কনস্যুলেট ওর সাথে হোটেলেই যোগাযোগ করবে।

কী বলবে বুঝতে পারছে না এলিস। এতক্ষণ আতঙ্কে প্রায় অবশ হয়েছিল হাত-পা-মাথা। মনে হচ্ছে খটখটে খরার মাঝে শুরু হল বর্ষা। ফোন কাটার আগে তাই পুলিশসদস্যকে বহুবার ধন্যবাদ জানাল। আবারো গাড়ি থামিয়ে নেমে এলো রাস্তায়। হাঁটু ভেঙে বসে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তবে এবার আর ভয়ে নয় বরঞ্চ স্বস্তির জল এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সারা দেহ। জানে এখন আর কোনো চিন্তা নেই।

.

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো হেডকোয়ার্টার, নিউ দিল্লি

ত্রস্ত্র পায়ে এক অধস্তনকে ঢুকতে দেখে চোখ তুলে তাকালেন ইমরান। কী ঘটেছে জানার জন্য ভ্রু উঁচু করতেই ডেস্কের উপর একতোড়া কাগজ রেখে দিল লোকটা।

“ওকে, লেটস গো।” পেপারস পড়ে আদেশ দিলেন। দরজার দিকে যেতে যেতেই জানালেন, “কমান্ডোদেরকে অ্যালার্ট করে দাও।” এরই মাঝে একদল কমান্ডোকে স্ট্যান্ড বাই থাকার আদেশ দেয়া হয়েছে। মিনিটখানেকের মধ্যেই আই এস পি ডাটাবেইজ থেকে পাওয়া ঠিকানানুযায়ী ছোটার জন্য তৈরি হয়ে গেল আইবি টিম।

এমন সময়ে এক এজেন্টের ফোন বেজে উঠল; ওপাশের কথা শুনে ইমরানকে জানাল, “স্যার আমাদের টার্গেট মেডিকেল ফ্যাসিলিটিতে এইমাত্র আগুন লাগার ঘটনা রিপোর্ট করেছে ফায়ার ডিপার্টমেন্ট।”

দাঁতে দাঁত ঘষে সময়মত পৌঁছে দেবার জন্য প্রার্থনা করলেন ইমরান।

.

০৯. থেসালোনিকি, গ্রিস

বিছানায় নিঃসাড় হয়ে পড়ে থেকে বাঁচার আনন্দে মুখ ডুবিয়ে দিল এলিস। কথা মতই পুলিশ এসকর্ট তাকে এ হোটেলে নিয়ে এসেছে। তারপর ভুয়া একটা নাম নিয়ে হোটেলে চেক ইন করেছে। অবস্থা সম্পর্কে ওদেরকে কী বলা হয়েছে না জানালেও এটুকু বুঝতে পারছে যে ওর সত্যিকারের পরিচয় গোপন রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পুলিশ একটা কেস ফাইল করে স্ট্যাভরস আর পিটারকে ধরার জন্য তদন্তও শুরু করেছে। কিন্তু, এলিসের কেন যেন মনে হচ্ছে যে ওরা কখনো ধরা পড়বে না।

এরই মাঝে কনস্যুলেটও ফোন করে জানিয়েছে যে আগামীকাল দুপুরের আগেই এদেশ ছেড়ে যাবার সমস্ত কাগজপত্র তৈরি হয়ে যাবে। নিশ্চয়তা দিয়েছে যে এখন আর কোনো ভয় নেই। এ সবকিছুই ওয়ালেসের জন্য সম্ভব

হয়েছে ভাবতেই কৃতজ্ঞতায় ছেয়ে গেল মন।

কেবল একটা কাজ বাকি আছে। টিকেট বুক করতে হবে। আগামীকালও করা যাবে। কিন্তু ইউএস এ ফিরবে না। সেটা মোটেও ভালো আইডিয়া হবে

। স্ট্যাভরস আর পিটার ওর আদ্যোপান্ত সবকিছু জানে। হয়ত বাসার ঠিকানাও। এখানে এতটা নিরাপত্তা পেলেও ইউএস-এ ওকে কে বাঁচাবে? সারাক্ষণ তো আর ওয়ালেসের কাছে ছুটে যাওয়া যাবে না। এমনিতেই লোকটা যথেষ্ট করেছে।

তাহলে আর কোথায় যাবে? শাওয়ার নিতে নিতে বহুক্ষণ ভাবল। এখন চারদোনের গ্লাস হাতে নিয়ে রিল্যাক্স করলেও প্রশ্নটার কোনো উত্তর পেল না।

টিভির সুইচ অন করতেই লোকাল একটা গ্রিক চ্যানেল এল। কিন্তু হেডলাইনের সাথে সাথে ফুটে উঠা ইমেজ বোঝার জন্য ভাষাটা জানার কোনো প্রয়োজন নেই। খবরে বলা হল, থেসালোনিকির হাইওয়ের দুপাশে অ্যাকসিডেন্টের খবর পাওয়াতে সমস্ত যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভুয়া একজন কলারের ফোন পেয়ে পুলিশ পৌঁছে গেলেও জড়িত কাউকেই পাওয়া যায় নি।

শোনার সাথে সাথেই শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল ভয়ের একটা শীতল স্রোত।

কিসের মাঝে জড়িয়ে ফেলেছে নিজেকে?

এটা তো কোনো সাধারণ ষড়যন্ত্র নয়। যা-ই হোকনা কেন বড় বড় রথী মহারথী জড়িত আছে। খনন সাইট থেকে কেউ যেন জীবিত বেঁচে ফিরতে না পারে সে কারণে কয়েক ঘণ্টা হাইওয়ে আটকে দেয়ার মত পাগলামো যদি করতে পারে তাহলে তাদের মূল পরিকল্পনা আরো কতটা ভয়ংকর!

কিন্তু সেটা কী? মাথা খাটাতে চাইলেও জুৎসই কোনো ব্যাখ্যা পেল না।

ফোন বেজে উঠতেই কেটে গেল চিন্তার সুতো।

“এলিস?” ভেসে এলো ওয়ালেসের মসৃণ স্বর।

“মিঃ ওয়ালেস, আপনাকে যে কিভাবে ধন্যবাদ জানাব।” কৃতজ্ঞতায় নুয়ে। পড়ল এলিস। “আমি থেসালোনিকির একটা হোটেলে উঠেছি।”

“হ্যাঁ, আমি জানি।” উত্তরে জানালেন ওয়ালেস। “বাই দ্য ওয়ে, তোমাকে বোধহয় আগেও বলেছিলাম যে আমাকে কার্ট ডাকবে। যাই হোক, তুমি নিরাপদে আছো জেনে খুশি হয়েছি।”

“আমিও তাই” উত্তর দিল এলিস, “কিন্তু এখনো ভয় পাচ্ছি।” টেলিভিশনে দেখা হাইওয়ে, হাইওয়ে অ্যাক্সিডেন্টের কথা জানাল। “কাল সকালে প্রথমেই আগে টিকেট বুক করব। এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব চলে যেতে চাই।”

“আহ, আমিও এ কারণেই ফোন করেছি। নিশ্চিত না হয়ে কিছু প্রমিজ করতে চাইনি। মনে হয়না এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রিসের কোনো কমার্শিয়াল। এয়ারলাইনে সিট পাবে। কিন্তু পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলে তোমাকে ইউএসে ফিরিয়ে আনার জন্য একটা প্রাইভেট জেট রেডি করেছি। আগামীকাল দুপুরেই রওনা হতে পারবে।”

আপনা থেকেই হা হয়ে গেল এলিসের মুখ। প্রাইভেট জেট? কার্ট ওয়ালেসের বন্ধুরা নিশ্চয় বেশ উঁচু স্তরের মানুষ। ভদ্রলোক ওকে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দেবার প্ল্যান করছেন বুঝতে পেরেই নিজেকে শক্ত করে ফেলল।

“এ ব্যাপারে আসলে আমিও চিন্তা করেছি কার্ট।” হঠাৎ করেই ঠিক করে ফেলল গন্তব্য। ইউএস সম্পর্কে সন্দেহের কথা জানিয়ে খুব নম্রভাবে কিন্তু কঠোর হয়েই নাকচ করে দিল ওয়ালেসের প্রস্তাব।

“এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত?” এলিসের অভিপ্রায়ের কথা শুনে অবশেষে জানতে চাইলেন ওয়ালেস।

“অবশ্যই।” অন্তত এ ব্যাপারে আর কোনো দ্বিধা নেই। “আর যদি সম্ভব হয় তো আরেকটা অনুরোধ করতে চাই।” ওয়ালেসকে আরো কিছু প্রয়োজনের কথা জানিয়ে দিল।

“ফাইন, দেন। সবকিছু রেডি হয়ে যাবে। সকাল দশটার দিকে একটা ফোনের জন্য অপেক্ষা করো। হ্যাভ আ সেফ ফ্লাইট আর অন্য কোনো দরকার হলেও জানিয়ে দিও।”

“আই উইল।”।

কল কাটতেই মাথার ভেতর ফেনিয়ে উঠল আরেকটা সন্দেহ। যা করছে তা ঠিক হচ্ছে তো?

জোর করেই চিন্তটাকে দূরে সরিয়ে দিল। এ শয়তানগুলোর সাথে ওকে লড়তেই হবে। বহুদিন ধরেই কেবল পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

.

১০. আর্য ল্যাবরেটরি, নিউ দিল্লি

দমকলবাহিনি আর কমান্ডোদের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন ইমরান; বেদনার ভারে নুইয়ে পড়েছে দুই কাঁধ।

তিন ঘণ্টা আগে মেডিকেল স্টেন্টারে পৌঁছে দেখেন ভয়ংকর এক আগুনের সাথে যুঝছে সবাই। চারতলা ফ্যাসিলিটির উপরের তিন তলাই দাউ দাউ করে জ্বলছে।

চার ঘণ্টা ধরে পনেরোজন দমকলকর্মী অমানুষিক পরিশ্রম করে অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ইমরান, আইবি টিম আর কমান্ডোরা অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। দমকল বাহিনি নিজেদের কাজ ভালভাবেই জানে, এখানে ওদের কিছু করার নেই।

তাই দালানে ঢোকার অনুমতি পাবার সাথে সাথে কমান্ডো, তার দল আর ফায়ারম্যানদেরকে চিৎকার করে কয়েকটা নির্দেশ দিয়েই দৌড়ে ছুটে গেলেন ইমরান। উপরের তলাগুলো ঝলসে গেলেও নিচের তলা কেমন করে যেন পুরোপুরি অক্ষত রয়ে গেছে।

“এই জায়গাটাতে কি রাখা হত?” ডেপুটি অর্জুনের কাছে জানতে চাইলেন ইমরান। “এটা একটা ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি। ওয়াশিংটনের সিয়াটলে অবস্থিত টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের হয়ে ওরা প্যাথলজিক্যাল ডিজিজ নিয়ে রিসার্চ করত।”

ভ্রু-কুঁচকে ফেললেন ইমরান, “ইউএস মাল্টিন্যাশনাল ফার্মা কোম্পানি?”

“ইয়েস। আরো তথ্য পাবার জন্য এরই মাঝে যোগাযোগও করেছি। তবে এই সেন্টারে মনে হচ্ছে ওরা নিজেদের রিসার্চ প্রোগ্রামের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দিত। এর পাশাপাশি এমন কিছু মলিকিউল তৈরির চেষ্টা করছে যা কিনা মেডিসেনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অবদান সৃষ্টি করবে।”

জীবন্ত হয়ে উঠল ইমরানের ওয়াকিটকি, “স্যার, এক্ষুনি চতুর্থ তলায় একটু আসবেন প্লিজ।” জানাল এক এজেন্ট।

লাফিয়ে সিঁড়ি পার হতে গিয়েও ভয় পেয়ে গেলেন ইমরান। মধ্য চল্লিশেও নিয়মিত পরিশ্রম করা শরীর এখনো এত ফিট যে একেকবারে দুটো করে ধাপ পার হলেন।

চার তলায় পা রাখতেই জমে যাবার দশা। সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে গেছে পুরো ফ্লোর। আর যা কিছু আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে তাও দমকল বাহিনির পানি থেকে রেহাই পায় নি।

মেঝের উপর পড়ে থাকা বিভিন্ন স্তূপ বাঁচিয়ে কোনোমতে ঢুকে পড়লেন আইটি ল্যাব টাইপের একটা কামরাতে। টর্চ আর দমকল কর্মীদের মাথার ল্যাম্পে আলোকিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। নজরে পড়ল অঙ্গার হয়ে যাওয়া ফার্নিচার আর কালো কম্পিউটার টার্মিনাল।

এতক্ষণ যে ভয়টা পাচ্ছিলেন তা-ই সত্যি হল। কম্পিউটার টার্মিনালের সামনের চেয়ারে বসে আছে কৃষ্ণকালো এক মৃতদেহ।

“আনোয়ার?” কোনোমতে নামটা উচ্চারণ করলেন ইমরান।

“আয়্যাম সরি, স্যার। এই মুহূর্তে কোনো পজিটিভ আইডেন্টিটি পাওয়া সম্ভব নয়। পুরোপুরি জ্বলে গেছে।”

নিশ্চুপ হয়ে গেলেন ইমরান। তারপর বহুকষ্টে নিজেকে সামলে বললেন, “অর্জুন, আমি একটা কমপ্লিট ইনভেস্টিগেশন চাই। কে এই জায়গার মালিক? তারা এখানে কী করছিল? আগুন লাগার কারণ? আর…” মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এর পরিচয়।”

কড়কড় করে উঠল ওয়াকিটকি, “স্যার, আপনি একটু গ্রাউন্ড ফ্লোরে আসলে ভালো হয়। একটা জিনিস পাওয়া গেছে।”

দ্রুত আবার নিচে নেমে এলেন ইমরান। পিছনে এলো অৰ্জুন। এলিভেটর শ্যাফট চেক করতে গিয়ে একজন এজেন্ট আবিষ্কার করেছে যে লিফট গ্রাউন্ড লেভেলে থামেনি। মনে হচ্ছে আরো নিচে নেমে বেসমেন্টেও গেছে।

অদ্ভুত কিছু একটা আছে বুঝতে পেরে এজেন্ট বরুণ ঝা জোর করে এলিভেটর ওপেন করেছে। ফ্লোর বেছে নেবার প্যানেলে সাধারণ বাটনের পরিবর্তে আছে ইলেকট্রনিক টাচ প্যানেল। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে প্যানেলে বেসমেন্টের কোনো উল্লেখ নেই।

ঝা’র চোখে পড়ল আসলটার নিচে প্রায় লুকানোই বলা চলে দ্বিতীয় ছোট্ট আরেকটা প্যানেল। ব্ল্যাংক হলেও তার ধারণা কেউ যদি সঠিক অথেন্টিফিকেশন লাগানো কার্ড ঢোকায় তাহলে হয়ত নিচে যাবার জন্য আরো কয়েকটা ফ্লোর পাওয়া যাবে।

অত্যন্ত মেধাবী এজেন্ট তাই দমকল বাহিনির সাথে শেয়ার করল নিজের এক আইডিয়া। যদি দালানের নিচে কোনো গুপ্ত বেসমেন্ট থাকে তাহলে নিশ্চয় লিফটের ব্যাকআপ হিসেবে সিঁড়িও থাকবে।

ফায়ারফাইটাররা তৎক্ষণাৎ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করল চারকোণা একটা ছোট্ট খালি রুম। এরপরে আর কিছু নেই। সিঁড়ির তিনদিকের দেয়াল ভেঙে ফেলার আদেশ দিল ঝ। ফলও পেল হাতেনাতে। সিঁড়ির ঠিক সামনে দেয়ালের পেছনেই খানিকটা খোলা জায়গা আছে। সাথে সাথে ইমরানকেও ফোন করে দিল।

“সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে দেয়াল ভাঙ্গা দেখলেন ইমরান। ছড়িয়ে পড়ল বিভিন্ন ধরনের তার। এটা এখন স্পষ্ট যে কোনো এক ধরনের ইলেকট্রনিক সিস্টেম যার মাধ্যমে দেয়ালের মাঝে লুকায়িত দরজা খোলা যাবে।

কাজ শেষ হতেই দেখা গেল আরেকটা ল্যান্ডিং। ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে।

কী পাবেন ভাবতে গিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন ইমরান। বেজমেন্টকে লুকানোর জন্য যদি কেউ এতটা কষ্ট করে থাকে তার মানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোপন করা হয়েছে। মনে পড়ে গেল গত বছরের এক অদৃশ্য দেয়ালের কথা। মহাভারতের আড়ালে থাকা সিক্রেট উন্মোচন করতে গিয়ে আরেকটু হলেই জানটাই খোয়াতেন।

টর্চ হাতে নিয়ে আইবি এজেন্ট আর দমকলকর্মীরা খুব সাবধানে নিচে নেমে গেল। কর্তাব্যক্তিরা যে পালিয়ে গেছে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু হয়ত সাহায্যের আশায় নিচে কেউ আটকা পড়ে আছে।

কিন্তু যা পেল তাতে যারপরনাই বিস্মিত হল রেসকিউবাহিনি। বেজমেন্টেও তিনটা লেভেল আছে। নিচের দুই লেভেলে মনে হচ্ছে বসবাসের ব্যবস্থাও আছে। সংকীর্ণ করিডোরে এক সারি ঘোট ঘোট কিউবিকল। কিন্তু কোনো হোটেল কিংবা ডরমিটরি নয়। কেননা ইলেকট্রনিক তালা লাগানো প্রতিটা সেল বাইরে থেকে আটকানো।

তবে সব কজন বাসিন্দাই মৃত। যদিও কারণটা যে শ্বাসকষ্ট নয় এটা বুঝতে ফরেনসিক রিপোর্টের দরকার নেই। আগুন এখানে স্পর্শ না করলেও একজনও জীবিত নেই। বুলেট কেড়ে নিয়েছে প্রাণ।

অর্জুনের দিকে ফিরলেন ইমরান, “একটা আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল, হাহ? ওয়েল, দেখা যাক তাদের ফ্যাসিলিটিতে শ’খানেকেরও বেশি মৃতদেহ নিয়ে কী বলে। ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে হ্যাঁন্ডেল করব। এই ফাঁকে তাদের সিইও আর চিফ মেডিকেল অফিসারের সাথে মিটিং করতে চাই। ভারতে তাদের অপারেশন ইতিহাস আর ট্রায়ালের সব তথ্য এনে দাও। ওই দুজনের সাথে দেখা করার আগেই আমি তাদের আগাগোড়া সবকিছু জানতে চাই।”

মাথা নাড়ল অর্জুন, “কাল বিকেলের মাঝেই রিপোর্ট করবো।”

এরপর ইমরানের ইশারা পেয়ে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে সরে এলো। “আরো দুটো কাজ করতে হবে।” ফিসফিসিয়ে জানালেন আইবি ডিরেক্টর। ধৈর্য ধরে শুনল অর্জুন।

ইমরান শেষ করতেই একেবারে অবাক হয়ে গেল। কিন্তু তারপরও কিছু বলল না; শুধু জানাল, “ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি।” দায়িত্ব পালন করতে চলে গেল অর্জুন।

চারপাশের মৃতদেহ আর সেলগুলোর দিকে তাকালেন ইমরান। গোপন বেজমেন্ট। বুলেট বিদ্ধ শরীর। এখানে আসলে কী হচ্ছিল? যার কারণে ধ্বংস করে দিল পুরো দালান। কোনো প্রমাণ কি মুছে দিতে চেয়েছে? কিসের প্রমাণ? আনোয়ারের সাথে কী ঘটেছে? ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালায় এরকম একটা ফ্যাসিলিটিতেই বা ও কী করছিল?

এত্ত এত্ত প্রশ্ন। কিছু যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। নিজের এই অনুভূতি ইমরান ভালোভাবেই চেনেন। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু একটা বলতে চাইছে। গভীর আর গূঢ় এক উদ্দেশ্যের কাভার-আপ ছিল এই বিশাল স্থাপনা।

পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতেই শক্ত হয়ে গেল চোয়াল। যতদূর যেতে হোক না কেন এই রহস্যের কিনারা তিনি করেই ছাড়বেন।

.

জোনগড় কেল্লা

মাত্র গত সপ্তাহে আবিষ্কৃত রুমটার একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিবুক চুলকালো বিজয়। অত্যন্ত বিশাল এই দুর্গের পাঁচটা তলাতে পঞ্চাশটিরও বেশি কামরা আছে। আর এক বছর আগে এর উত্তরাধিকার পেলেও সবকটি কক্ষ সাথে সাথেই ঘুরে দেখার চিন্তা মাথাতেও আসেনি। এছাড়া দ্বিতীয় তলার স্টাডি আর তৃতীয় তলায় নিজের বেডরুমেই কেটে যায় বেশিরভাগ সময়। তাই কেল্লার কয়েকটা কামরা দেখলেও বাকিগুলো এখনো অদেখাই রয়ে গেছে।

গত ছয় মাস আগে ভেবে দেখল যে দুৰ্গটা ভালোভাবে চেনা দরকার। আর তা করতে গিয়ে ইন্টারেস্টিং কয়টা রুমও পেয়েছে। তবে মহাভারতের সিক্রেট লুকিয়ে রাখা কামরার মত অতটা চমৎকার নয়। এতে আরেকটা লাভ হয়েছে। জানতে পেরেছে আংকেলের পছন্দ আর অভিপ্রায়সমূহ।

যাই হোক, দুই সপ্তাহ আগে যা পেয়েছে তা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিতই বলা চলে। ছাদের ঠিক নিচেই পাঁচতলার একটা কামরা। বৈশিষ্ট্যহীন রুমটাকে দেখে প্রথমে স্টোররুমই মনে হয়েছে। বাদামি কাগজ মোড়ানো বড়সড় কিছু প্যাকেজের পাশাপাশি একগাদা কার্টন স্তূপ করে রাখা।

কৌতূহলের বশে কয়েকটা কার্টন চেক করতেই ‘থ’ বনে গেল। বিজয়ের পনের বছর বয়সে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়া ওর পিতা-মাতার ব্যবহার্য কিছু জিনিস পাওয়া গেল। আঙ্কেলের কাছে শুনেছে একেবারে সরাসরি সামনে থেকে এসে গাড়িটাকে আঘাত করেছে দ্রুত গতির এক ট্রাক। বাবা-মা দুজনেই ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। কী কারণে এতদিন পর ভুলে গেলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে বাসায় রয়ে গিয়েছিল বিজয়। ফলে বেঁচে গেছে তার জীবন।

কয়েকটা কার্টন পরীক্ষা করতেই বুঝতে পারল বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত সবকিছু প্যাক করে এই কেল্লায় এনে রেখে দিয়েছেন আঙ্কেল। তারপর থেকে এগুলো এই রুমেই আছে।

হঠাৎ করে এতদিন পর বাবার কাগজপত্র আর মায়ের জানাল দেখে বুঝতে পারল যে ওদের জন্য ভেতরে কতটা শূন্যতা রয়ে গেছে। আঙ্কেল ভ্রাতুস্পুত্রের যথেষ্ট খেয়াল রেখেছেন। হায়ার স্টাডিজের জন্য এমআইটিতে পাঠানো ছাড়াও ছেলেটাকে কখনো নিজেকে অনাথ ভাবার সুযোগ দেননি। আর বিজয়ও প্রথমে পড়াশোনায় মন দিয়েছে তারপর কাজের ভেতর ডুবে গিয়ে ভুলে গেছে সব ট্র্যাজেডি।

এবারই প্রথম পিতা-মাতার সাক্ষাৎ স্মৃতি চাক্ষুস করে মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছে; বিশেষ করে এখন যখন আঙ্কেলও আর পাশে নেই।

সে মুহূর্তেই ঠিক করে ফেলল যে কার্টনগুলোকে শিফট করে বাবা-মায়ের সমস্ত স্মৃতি সযত্নে লালন করবে। কিশোর বয়সেই দুজনকে হারিয়ে ফেলায় ভালভাবে জানার সুযোগও পায়নি। শুধু এটুকু জানে যে তাঁরা দুজনেই এ্যাকাডেমিক হিস্টোরিয়ান আর রিসার্চার ছিলেন। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে কাজ করতেন। এর বেশি কিছু আর মনে নেই। বয়ঃসন্ধিকালের ভালোবাসা আর দ্বন্দের মাঝে দিয়ে তৈরি হওয়া সে সম্পর্ককে এখন অনেক মিস করে। তাই এ রুমে থাকা জিনিসগুলো হয়ত তাকে তার পিতা-মাতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। হোক না তা তাদের মৃত্যুর পর!

তখন থেকেই প্রতিদিন এ ঘরে এক থেকে দু’ঘণ্টা করে কাটায়। কার্টন হাতড়ে বের করে পড়ে পেপারস আর জার্নাল। বুঝতে চায় বাবা-মায়ের দর্শন যা টিনএজ থাকাকালীন মোটেও পাত্তা দেয় নি।

এ উদ্দেশ্যে লাগানো ল্যাম্পের সুইচ অন করে একগাদা কাগজপত্র নিয়ে এসে বসল ডেস্কে। আজ রাতে কি এমন কিছু পাবে যা গত কয়েক রাতে পায় নি?

২. দ্বিতীয় দিন

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো হেডকোয়ার্টারনিউ দিল্পি

ভিডিও ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অ্যাংগেল অ্যাডজাস্ট করে নিলেন ইমরান। অপেক্ষা করছেন প্যাটারসনের জন্য। কয়েক ঘণ্টা আগে স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের লিডারকে ফোন করার পর ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত হয়েছেন। কারণ ওয়াশিংটনে এখন ভোর। ইমরান তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছেন। কিন্তু আইবি অফিসারের মনে হয়েছে যে অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। হাতে আসা সূত্র ধরে এগোবার জন্য প্রস্তুত। আর যদি এর জন্য ইন্দো-ইউএস টাস্ক ফোর্সের লিডারকে মাঝ রাতেও ঘুম থেকে জাগাতে হয়, তিনি তাই করবেন।

ইমরানের পাঠানো ইমেইল দেখেই মন বদলে ফেললেন প্যাটারসন। এক ঘণ্টার ভেতরে ভিডিও কনফারেন্স করার জন্য রাজি হয়ে গেলেন।

কেঁপে কেঁপে জীবন্ত হয়ে উঠল টেলিভিশনের পর্দা। বাক্সের অর্ধেক পর্দা জুড়ে দেখা গেল প্যাটারসনের কঠোর চেহারা। বাকি অর্ধেকে এক পাড়ুর মুখাবয়ব। হালকা গড়নের লোকটার মাথার পাতলা চুলগুলোও ধূসর রঙা। ইমরান জানেন ইনি কে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল আর প্রিভেনশনের ওয়াশিংটন অফিস থেকে ডা. হ্যাংক রয়সন। কনফারেন্স নিশ্চিত করে ইমেইলে রয়সন আসার সম্ভাবনাও জানিয়েছিলেন প্যাটারসন।

“মর্নিং” আমেরিকান দুজনকে অভিবাদন জানালেন ইমরান।

“মর্নিংএকযোগে উত্তর দিলেন অপর প্রান্তের দুইজন।

“ডা, রয়সন, এতটা শর্ট নোটিসে কনফারেন্সে যোগ দেবার জন্য ধন্যবাদ। সোজা পয়েন্টে চলে এলেন প্যাটারসন, “কিরবাঈ যেটা পাঠিয়েছে প্লিজ সেই রিপোর্টের উপর আপনার মন্তব্য বলুন।”

“ওয়েল” খুকখুক করে গলা পরিষ্কার করে শুরু করলেন রয়সন, “প্রথমত, আপনাদেরকে বুঝতে হবে যে রিপোের্টগুলো বেশ প্রাথমিক পর্যায়ের আর তাই কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছানো যায়নি। তবে টক্সিকোলজী রিপোর্টস আর ডিএনএ সিকোয়েন্স করাটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের কাছে যা আছে তা হল প্রাথমিক টক্সিকোলজী রিপোর্ট আর পলিমেরাজ চেইন রিঅ্যাকশন টেস্টিং অর্থাৎ পিসিআর টেস্টিং এর ফলাফল। যার মাধ্যমে ডিএনএ টার্গেট সিকোয়েন্স পূর্ণতা পায়।”

“পিসিআর টেস্টিং কী তা আমরা জানি” বাধা দিলেন প্যাটারসন, “রিপোর্টস সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানাটাই বেশি জরুরি।”

অসন্তুষ্ট হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকালেন রয়সন, “মিঃ কিরাবাঈ এর সাথে পরিচিত কিনা আমি জানি না।”

“ওয়েল, রিপোর্টগুলো দেখে আর গুগলে সময় কাটিয়ে আমি খানিকটা জেনে নিয়েছি” হেসে ফেললেন ইমরান, “কিন্তু আপনি এতটা ভেবেছেন তাই ধন্যবাদ।” ভাবলেন যাক, প্যাটারসনের তিক্ত ব্যবহারের খানিকটা ভরসাই করা গেল।

নাক সিটকালেন রয়সন, “তো তাহলে ব্যাপারটা হল কি যদিও বেশ জটিল। আমাদের কাছে অনুমানের ভিত্তিতে বলছি-পূর্ব থেকেই এক ধরনের আনআইডেন্টিফায়েড ব্যাকটেরিয়াম আর অজানা একটা রেট্রোভাইরাস আছে। প্রতিটা স্যাম্পলেই এ দুটোর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।” আবারো একদৃষ্টে ক্যামেরার দিকে তাকালেন, “আপনার পাঠানো স্যাম্পলগুলো নিয়ে সিডিসি আমাদের নিজস্ব কিছু পরীক্ষা করার পরেই এই ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে খুব বড় কোনো ভুল হয়নি।” চোখ নামিয়ে রিপোর্টগুলো চেক করে আবার ক্যামেরার দিকে তাকালেন,

“ব্যাপারটা সত্যিই বেশ অদ্ভুত। ব্যাকটেরিয়া স্বাস্থ্যবান সব বায়োফিল্ম তৈরি করেছে, যেখানে সেলগুলোর চারপাশে বিপুল পরিমাণে ম্যাট্রিক্স ম্যাটেরিয়াল থাকায় ইমিউন রেসপন্স থেকে সুরক্ষা পাচ্ছে। প্রাথমিক টক্সিকোলজী রিপোর্ট নির্দেশ করছে যে, ব্যাকটেরিয়া প্রচুর টক্সিন বমি করছে ফলে মৃত্যু অনিবার্য।” এবারে ইমরানকে বললেন, “মিঃ কিরবাঈ, আপনি এই স্যাম্পলগুলো কোথা থেকে পেয়েছেন?”

গত রাতের ঘটনা খুলে বললেন ইমরান, “ফ্যাসিলিটিতে পাওয়া কয়েকটা র‍্যানডমলি সিলেক্টেড মৃতদেহ থেকে। আর হার্ডডিস্ক থেকে যেটুকু ডাটা উদ্ধার করতে পেরেছি, আপনারা হয়ত দেখেছেন, সেই মেডিকেল হিস্ট্রিতেও রিপোর্টের মতই একই ইনফরমেশন লেখা আছে।”

মাথা নাড়লেন রয়সন, “হ্যাঁ। আপনার পাঠানো মেডিকেল হিস্ট্রি আর এ রিপোর্টগুলোর উপসংহার প্রায় একই। আর ইনফেকশনের কারণে মৃত্যুবরণ করা লোকগুলোও কয়েকটা ফাইলের মালিক। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, মেডিকেল ফাইল অনুযায়ী প্রাথমিক ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের চার থেকে পাঁচ বছর পরে তারা মারা গেছেন। তার মানে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হবার পরপরই এ রোগীদেরকে ডরমিটরিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমন কোনো সেল যেখানে ইনফেকশনটা আবদ্ধ ছিল কিন্তু পুরোপুরি খতম হয়নি। তাই এটা স্পষ্ট যে মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি প্রোটিনকে নতুন করে বানাবার ক্ষমতা আছে এই ব্যাকটেরিয়ার ক্রমানুযায়ী পুনঃপুন বেড়ে উঠলেও ক্লিনিক্যাল কিংবা লক্ষণাত্বক কোনো প্রভাব দেখা যায় না।”

“আচ্ছা আমাকে একটু বুঝতে দিন” ধীরে ধীরে বললেন ইমরান, “আপনি বলছেন যে, এই লোকগুলো চার থেকে পাঁচ বছর আগে ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। কোনো একভাবে মানব প্রোটিনের মাধ্যমেই এ ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘকাল ব্যাপী টিকে থাকতে পারে। আবার একই সময়ে এগুলো এমন কিছু বায়োফিল্ম তৈরি করে যার মাধ্যমে সেল মিডিয়েটেড ইমিউন রেসপন্স কিংবা সিএমআই থেকে সুরক্ষা পায়। তাই লক্ষ করার মত ইনফেকশনের কোনো চিহ্নই দেখা যায় না।”

“কারেক্ট।” প্রথমবারের মত হাসলেন রয়সন। দেখা গেল নিয়মিত ধূমপানের ফলে কালো হয়ে যাওয়া দাঁতের সারি। “আর কখনই হঠাৎ করে কিছু একটা, হয়ত সি এম আই’র দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো ট্রিগার ফ্যাক্টরের কারণে ব্যাকটেরিয়ার রস সক্রিয় হয়ে বিষ ছড়াতে থাকে। যার ফলে হাই ফিবার, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, প্রচণ্ড পেটের ব্যথা, চরম অবসন্নতা, চিত্তবৈকল্য, শারীরিক শিথিলতাজনিত প্যারালাইসিস দেখা দেয়। সাধারণত এসব চিহ্ন ফুটে উঠার কয়েকদিনের মাঝেই আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে।”

কথাগুলো হজম করার জন্য কয়েক সেকেন্ড নিলেন ইমরান।

কিন্তু প্যাটারসন এতটা সময় নিলেন না, “মনে হচ্ছে আপনার কথাই ঠিক কিরবাঈ। এই বেচারাদের উপর ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব আর কতদিনে তা প্রকাশ পায় তার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আর টেস্ট চালানো হচ্ছিল।”

“বায়োটেররিজম” বড় একটা নিশ্বাস ফেলে জানালেন ইমরান; বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে কেউ হিউম্যান সাবজেক্ট নিয়ে এরকম বীভৎস খেলা খেলতে পারে।

‘আ…ফট করে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসাটা বোধহয় ঠিক হবে না, তাই না?” এক আঙুল তুলে বাধা দিলেন রয়সন। “DNA-সিকোয়েন্সি আর হাতে থাকা প্যাথোজেনের জিন ব্যাংক চেক করার পরেই কেবল বলা যাবে যে এগুলো কি সত্যিকার অর্থেই কোনো নতুন ব্যাকটেরিয়া নাকি বর্তমান কোনো প্রজাতির সাথেও সম্পর্ক আছে। এছাড়াও ইনফেকশন ছড়ানোর জন্য দায়ী কারণটাকে চিহ্নিত করার জন্যও আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।”

খারিজ করে দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন প্যাটারসন, “শিউর, শিউর। কিন্তু টাস্ক ফোর্সের প্রায়োরিটি হিসেবে একে গ্রহণ করা যায়। এই কারণে এই দলটাকে একত্র করা হয়েছে।”

“আর ভাইরাস?” হঠাৎ করেই মনে পড়ল যে রয়সন একটা ভাইরাসের কথাও বলেছিলেন।

মাথা চুলকালেন রয়সন, “আসলে এটা আরেকটা অদ্ভুত জিনিস।” আরো একবার চোখ নামিয়ে পেপারসগুলো পড়ে দেখলেন, “রেট্রোভাইরাস সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। বিস্ময়কর হল যে, কোনো ধরনের তীব্র ভাইরাস ইনফেকশনও দেখা যায়নি। হার্ড ড্রাইভের মেডিকেল ফাইলেও এ সম্পর্কে কিছু লেখা নেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সবকটি টেস্টের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”

“ও.কে” নিজের কাগজপত্রগুলো একসাথে করে সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখলেন ইমরান। যতটুকু মনে হচ্ছে কনফারেন্স শেষ। তার আরো কিছু কাজ আছে। “গাইজ, যত দ্রুত সম্ভব সিডিসি’র উপসংহারমূলক মন্তব্য পেলে ভালো হয়। এরই মাঝে সিয়াটলের টাইটানের সাথেও কথা বলেছি। কিন্তু নতুন মলিকিউল সম্পর্কিত তাদের গবেষণার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সাহায্য করা ব্যতীত আর কিছু জানে না বলেই দাবি করছে। অন্যদিকে বিল্ডিংয়ের মালিকপক্ষ বলছে তারা শুধু টাইটানকে লিজ দিয়েছে। এর ভেতরকার অপারেশন সম্পর্কে তারা কিছু জানে না। তার মানে কেউ ব্যক্তিগতভাবে এ অপারেশন চালাচ্ছিল।”

প্যাটারসনকে চিন্তিত দেখাল। রয়সনও অবাক হয়ে গেলেন। “সিয়াটল নিয়ে কাজ করার ব্যবস্থা আমি করছি।” প্রমিজ করলেন প্যাটারসন, “যদি কোনো কানেকশন থাকে তাহলে তা অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে।”

নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন ইমরান। মনে মনে সাজিয়ে ফেললেন নিজের প্ল্যান। এর আগে এ ধরনের কঠিন কেস তেমন একটা পাননি। তবে

একটা ব্যাপার একেবারেই পরিষ্কার।

চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বায়োটেররিস্টের দল।

ভারতে।

তার নাকের ডগায়।

অথচ কোথায় খুঁজতে হবে সেটাই জানেন না।

.

জোনগড় কেল্লা

দশ মিনিট আগে খুঁজে পাওয়া ফাইলটাকে নিয়ে বসে আছে বিজয়। লেবেলটাই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কোনো লেখা নেই। কেবল “…”

তাই স্বভাবতই কার্টনের অন্য ফাইলগুলো থেকে এ ফাইলটাকে আলাদা করে নিয়ে পাতা ওল্টাতে বসেছে। বেশিরভাগ কাগজই বাবার হাতে লেখা নোট কিংবা নিউজপেপার আর্টিকেলের ক্লিপিংস। লেখা আছে সারা দেশ ব্যাপী খনন করা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটের নোটস আর ডায়াগ্রামস। রেকর্ডের কোনো লিপিবদ্ধ তথ্য। কেবল বিভিন্ন ডাটা। মনে হচ্ছে যেন বাবা এ সমস্ত খননকাজের ডাটা একসাথে করে এখানে রেখে দিয়েছেন; গুগল কিংবা উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রহ করেছেন। তবে যখন এই ফাইল তৈরি হয়েছে তখন তো উইকিপিডিয়ার জনুই হয়নি। পেজ আর ব্রিনও ক্যালিফোর্নিয়ার গ্যারাজেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তাহলে এই পাতাগুলোকে ফাইলবন্দী করার সময় বাবার মাথায় কোনো চিন্তা ঘুরছিল? এতগুলো তথ্য জড়ো করার জন্য যে অসম্ভব খাটতে হয়েছে সেটা তো বলাবাহুল্য।

বিজয় কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই পেপারসগুলো পড়তে শুরু করল। দেখা যাক বাবার চিন্তা-ভাবনার ধাচ বোঝা যায় কিনা। আর এতটা গুরুত্ব দিয়ে কেন এগুলোকে জড়ো করা হয়েছে সেটাও জানা যাবে।

তবে যত সময় কাটতে লাগল, বিজয়ের বিস্ময় ততই বাড়ছিল। এই প্রচন্ড প্রচেষ্টার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর কারণ আছে।

কিন্তু সেটা কী?

.

১২. তৃতীয় দিন

জোনগড় কেল্লা

নিবিষ্ট মনে কয়েক ঘণ্টা আগে খুঁজে পাওয়া ফাইলটা পড়ছে বিজয়। বিষয়গুলো বেশ চমকে উঠার মতন। ডকুমেন্টগুলোর মধ্যে কোনো কানেকশন আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে কেন এই ফাইলটা তৈরি হয়েছে জানা না থাকলে হয়ত কোন কানেকশন বোঝাও যাবে না।

হঠাৎ করেই মোবাইল ফোন বেজে উঠতে ঘোর ভাঙ্গল। ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে রাত তিনটা। এই সময়ে কলিনের কোন্ দরকার পড়ল আবার? তাছাড়া সে তো দুর্গেই আছে!

“তুমি তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ?” বন্ধুর কাছে অনুযোগ করল বিজয়।

“বাচালে দোস্ত। এই সময়ে আমার ফোনটা যদি তোমার কাঙ্ক্ষিত হত তাহলে তো চিন্তায় পড়ে যেতাম।” মজা করল কলিন।

হেসে ফেলল বিজয়, “এখন বলো এত রাতে কেন ফোন করেছ?”

খানিক থেমে কলিন জানাল, “আমার মনে হয় তুমি যদি নিচে এসে নিজের চোখে দেখো তাহলে বেশি ভাল হয়।”

“লিভিং রুম?”

“ইয়াপ। দেরি করো না।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটাকে বন্ধ করে রুমের দরজায় তালা লাগিয়ে দিল বিজয়। রুমটাকে খুঁজে পাবার পর থেকে চাবিটা সবসময় নিজের কাছেই রাখে। আরেকটা ডুপ্লিকেট বানালেও এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে যা ও ছাড়া আর কেউ জানে না। একটা লাইফলাইন, বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগের একটা উপায় খুঁজে পেয়েছে। এ সুযোগ সে কখনোই হারাবে না।

মাঝে মাঝে হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত বুঝতেই পারবে না যে তোমার কাছে কী ছিল।

আজ রাতটা মনে হচ্ছে সারপ্রাইজের রাত। লিভিং রুমে ঢুকতেই যেন জমে গেল। মনে হচ্ছে ভূত দেখছে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।

ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করে পা রাখল রুমে। কিন্তু কী বলবে কিংবা করবে কিছুই মাথায় আসছে না।

বন্ধুর অবস্থা বুঝতে পারছে কলিন। তাই কিছু বলল না।

“হাই, বিজয়” জড়োসডো ভঙ্গিতে সাদা সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল এলিস। এতক্ষণ কলিনের সাথে বসে থাকলেও এবারে সে নিজেও লজ্জা পাচ্ছে।

কোনো উত্তর দিল না বিজয়। শক্ত হয়ে গেছে চোয়াল। ভ্রু-কুঁচকে কী যেন ভাবছে। এমর কোনো সম্ভাবনা কখনো প্রত্যাশাই করে নি। বহুকষ্টে মনের গহীনে কবর দিয়েছে পুরনো স্মৃতি। ভেবেছে আর কখনো তাদের কথা স্মরণ করবে না। তারপরও আজ আবার সবকিছু মাথাচাড়া দিয়ে উঠল; ঠিক এগারো বছর আগেকার মতই তরতাজা হয়ে। আর সেই সাথে আসা বিভিন্ন অনুভূতিও যথেষ্ট জ্বালাচ্ছে। স্পর্শকাতর এ পথে সে কখনোই ফিরে আসতে চায়নি। কখনোই না। অথচ এখন ঠিক তাই করছে।

অবশেষে খুঁজে পেল কণ্ঠস্বর, “এখন রাত তিনটা বাজে।” যথাসাধ্য নির্লিপ্ত থাকতে চেষ্টা করল বিজয়, “তুমি এখানে কী করছ? বলেছিলে না, আমার সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাও না? বদলে গেলে কেন?”

“ও বিপদে পড়েছে।” বাধা দিয়ে বলে উঠল কলিন। এলিস উত্তর দেবার আগেই জানাল, “আমাদের সাহায্য দরকার।”

শীতল নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিজয়।

“বিজয়, ও সত্যিই ভয়ংকর বিপদে পড়েছে। আমাদের সাহায্য করা উচিত।” আবারো চেষ্টা করল কলিন।

বহুকষ্টে নিজের আবেগ দমন করল বিজয়। “এ জায়গাটা তো ইউএস থেকে অনেক দূর।” আস্তে আস্তে জানাল, “তারপরেও সাহায্যের জন্য এখানে এসেছ তার মানে বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছ।”

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এলিস। পুরনো ক্ষতটাতে আবার আঘাত পেয়েছে। বুঝতে পারল ভুলে যাবার চেষ্টা করলেও সার্থক হয়নি। “আমি জানি তোমার মনের অবস্থা আর সত্যিই বলছি অন্য কোনো উপায় থাকলে এখানে আর আসতাম না। কিন্তু আমার হাতে আর কোনো অপশন ছিল না।”

গলার স্বর সংযত করল বিজয়, “কী হয়েছে?”

গ্রিসে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো খুলে বলল এলিস। ড্যামনের মার্ডার, মারকোর মৃত্যু আর হাইওয়ে ধরে পালিয়ে আসার কথা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠল গলা। শেষ করল এই বলে যে, “আমার ইউএসে ফিরে যাবার সুযোগ নেই। যেখানেই যাই না কেন ওরা ঠিকই খুঁজে বের করবে। তাই অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু ইউএসের বাইরে এমন কাউকে চিনি না যাকে বিশ্বাস করা যায়। দিল্লিতে কার্ট ওয়ালেসের কজন পরিচিত আছেন। তারাই এয়ারপোর্ট থেকে এ পর্যন্ত আসার জন্য গাড়ি দিয়েছেন। আরো বলেছেন এতে করে নাকি গ্রিসের বাইরে কেউ আর আমার ট্রেস পাবে না। প্রাইভেট জেট। প্রাইভেট কার। কোনো ধরনের পেপার কিংবা ইলেকট্রনিক ট্রেইল থাকবে না।”

একদৃষ্টে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে ছেলেটার প্রতিক্রিয়া বুঝতে চাইছে। তবে মনে হচ্ছে এলিসের কাহিনি শুনে খানিকটা নরম হয়েছে।

“কাম অন বিজয়” নীরবতা ভাঙ্গল কলিন, “ওর তো থাকার জায়গা দরকার। সত্যিই বিপদ ওঁৎ পেতে আছে আর তোমার এই কেল্লায় অন্তত পঞ্চাশটা রুম আছে। কয়েকটা রাত কি থাকতে দেবে না?”

প্রথমে বন্ধু তারপর এলিসের দিকে ঘুরল বিজয়, “তোমাকে একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে” সিরিয়াস ভঙ্গিতে জানাল, “আসলে আমাদের দুজনকেই। আমার জীবন কিন্তু আগের জায়গায় থেমে নেই। এখন আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তুমি আর আমি-এসবই অতীত। তাই চাই না তুমি আমার আর রাধার মাঝে আসো।”

“রাধা ওর ফিয়ান্সে” এলিসকে সাহায্য করল কলিন।

মাথা নাড়ল এলিস। এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করেনি। তারপরও কেন যেন এখানে নিজেকে নিরাপদ মনে হচ্ছে। কখনো ভারতে না এলেও চারপাশে বন্ধুরা তো আছে!

“দুর্গের নিরাপত্তার জন্য আমাদের নিজস্ব সিকিউরিটি সিস্টেম আছে।” জানাল বিজয়, “বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত এখানে যতক্ষণ থাকবে কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবে না।” বললেও মনে পড়ে গেল গত বছর আঙ্কেলের ভাগ্যে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো। যাই হোক জোর করে তা মন থেকে তাড়িয়েও দিল। তারপর তো সিস্টেম আরো আপগ্রেড করা হয়েছে।

“থ্যাংক ইউ বিজয়” উত্তরে জানাল এলিস, “তুমি যে আমাকে সাহায্য, করতে রাজি হয়েছ সে কারণে অসংখ্য ধন্যবাদ।”

জোর করে হাসল বিজয়। নিজের আবেগ লুকোতে পুরোপুরি সচেতন। “শিওর। সাহায্য করতে পারলে সব সময় ভাল লাগে।

“কলিন, তুমি গিয়ে এলিসকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দাও। যেটা ইচ্ছে খুলে দিও। ওকে গাইজ, আমি এখন ঘুমাতে যাচ্ছি। রাধা কাল আসছে। তাই ওর সামনেও ঘুমন্ত থাকতে চাই না।” এরপর কলিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর কাল সকালে ইমরানের সাথে আমাদের মিটিং আছে।”

কলিন মাথা নাড়তেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল বিজয়।

এরপর এলিসের দিকে তাকাল, “ওয়েল, একেবারে খারাপ কিছু হয়নি, কী বলো?”

“আমাকে রাধা সম্পর্কে আরো কিছু বলো তো?” জিজ্ঞেস করল এলিস, “ও দেখতে কেমন?”

ভ্রু-কুঁচকে ফেলল কলিন। যতটা সহজ ভেবেছিল মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎ ততটা সহজ হবে না।

.

১৩. জোনগড় কেল্লা

“মর্নিং” ডাইনিং রুমে ঢুকতেই বিজয়ের মেজাজ খিঁচড়ে গেল। কলিন আর এলিসের ব্রেকফাস্ট এখনো শেষ হয়নি। ব্যাড টাইমিং। যে কোনো মুহূর্তে রাধা এসে পড়বে।

চেশায়ার বিড়ালের মত দাঁত বের করে হাসল কলিন। এতদিনে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে বিজয়। কিন্তু ব্রেকফাস্ট টেবিল থেকে এলিসের হাসি দেখেই নিজেকে শান্ত করতে বেগ পেতে হল।

“তোমার ঘুম ভালো হয়েছে? উদ্বেগ নয় বরঞ্চ ভদ্রতা রক্ষায় জানতে চাইল এলিসের কাছে। যদিও গতরাতের আলোচনার পর থেকে মাথার মাঝে কয়েকটা ব্যাপার ঘুরছে।

মাথা নাড়ল এলিস। “উমম হুমম। থ্যাংকস। তোমার?”

উত্তর দিল না বিজয়। গতরাতের কথাগুলো ভাবছে। “আচ্ছা তুমি বলেছিলে যে সমাধিতে একটা আইভরী কিউব পেয়েছ?” মুখ ভর্তি মাসালা ওমলেট আর পরোটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠল।

হা হয়ে মুখ তুলে তাকাল এলিস। গত রাতের আলোচনার পর তো মনে হয়েছিল যে গ্রিসে ওর অভিজ্ঞতা নিয়ে বিজয়ের কোনোই আগ্রহ নেই।

“ইয়েস” তারপরও উত্তর দিল। “খোদাইকৃত শিলালিপিও আছে।”

“আর মারকো ফিরে এসে বলেছিল যে ড্যামন সেটা হোটেলে নিয়ে যেতে বলেছে?”

“দ্যাটস রাইট।” বিজয় কেন এতটা চিন্তা করছে ভেবে অবাক হয়ে গেল এলিস।

“তারপর তুমি কিউবটাকে নিয়ে কী করেছ?”

“আমার ব্যাকপ্যাকে রেখে দিয়েছি।” কী বলেছে ভাবতেই শক্ত হয়ে গেল এলিস। আতঙ্ক আর অস্থির হয়ে ছোটাছুটির মধ্যে ভুলেই গিয়েছিল যে কিউবটা এখনো ওর সাথেই আছে। কন্টেইনারের ভেতর ভরে ব্যাকপ্যাকে করে ভারতেও নিয়ে এসেছে।

“তার মানে ওরা এটাই চায়।” বিড়বিড় করে উঠল বিজয়, “দ্য কিউব।”

মাথা ঝাঁকাল এলিস। তপ্ত গনগনে ইস্ত্রির ছ্যাকা খাওয়ার মত করে মনে পড়ে গেল দুই রাত আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। “ওরা আমার পিছনে লেগেছে কারণ আমি সমাধিটা দেখেছি। মারকোর অন্য কোনো দোষ ছিল না। কেবল আমাদের সাথে থাকা ছাড়া। তাই ওকেও মেরে ফেলল। সেই সন্ধ্যায় ওখানে যারাই ছিল তাদের সবাইকে খুন করে ফেলেছে।”

এবারে চিন্তিত ভঙ্গিতে বিজয় জিজ্ঞেস করল, “আর তোমার ল্যাপটপ আর ক্যামেরা?”

“হোটেলের রুমে ফেলে এসেছি।”

“তাহলে তো তারা সমস্ত আর্টিফ্যাক্টের ছবি পেয়ে যাবে।” দ্বিধায় পড়ে গেল বিজয়, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”

বড় বড় হয়ে গেল এলিসের চোখ। “না, পাবে না। ল্যাপটপে ছবিগুলো আপলোড করার টাইমও পাইনি। ভেবেছিলাম পরে করব তাই মেমোরি স্টিক বের করে কোমরের পাউচে রেখেছি। এখনো সাথেই আছে।”

ঊরুতে চাপড় মারল বিজয়, “এইতো পাওয়া গেছে। কিউবটাই হল যত নষ্টের গোড়া।” জোর দিয়ে বলল, “এখানে দুটো কারণ আছে। প্রথমত, পুরো কালেকশন থেকে একমাত্র কিউবটাই মিসিং। ওদের কাছে ছবিও নেই। তার মানে অরিজিন্যালটাই দরকার। ঠিক?”

“রাইট” বিড়বিড় করে উঠল এলিস। এখনো সন্দেহে দুলছে মন।

“দ্বিতীয়ত, তুমি বলেছ যে একেবারে সবার শেষে ট্যাবলেট আর মূর্তিগুলোর পেছনে কিউবটাকে পেয়েছ। ততক্ষণে ড্যামনও চলে গেছে।”

“দ্যাটস রাইট।” বিজয় কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে পারল এলিস। “তুমি অবাক হচ্ছ যে না দেখেও ড্যামন এটার কথা কিভাবে জানলেন? হতে পারে হয়ত গোপন চেম্বারে অন্যান্য আর্টিফ্যাক্ট গুলো পরীক্ষা করার সময় দেখেছেন।”

মাথা নাড়ল বিজয়। “না, তা না। আমি ভাবছি কো-ডিরেক্টরেরা সমস্ত কিছু সরিয়ে ডিগ হাটে নিয়ে যেতে বলেছিল। তাই তো?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে ড্যামন কেন শুধু কিউবটাকে নিয়ে হোটেলে যাবার কথা বলল? এটার বিশেষত্বই বা কী? আর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল মারকো বলেছিল যে ড্যামনের তোমাকে কিউবটা হোটেলে নিয়ে আসার কথায় বেজায় রেগে গিয়েছিল স্ট্যাভরস। তার কথানুযায়ী ড্যামনেরই নিয়ে আসা উচিত ছিল। তার মানে ড্যামনকে কিউবের গুরুতু জানিয়ে হোটেলে নিয়ে আসার আদেশ দেয়া হয়েছিল। এখান থেকে উদয় হচ্ছে আরো কয়েকটা প্রশ্ন না দেখেও কিভাবে পিটার, স্ট্যাভরস কিংবা অন্য কেউ জানল যে সমাধিতে কিউবটা আছে?”

এলিস নিজেও গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে। “হতে পারে” ধীরে ধীরে বলে উঠল, “ড্যামনই বলেছেন; তারপর তারা হোটলে আনার আদেশ দিয়েছেন।”

“আমার সেটা মনে হচ্ছে না” নিজের যুক্তি দিল বিজয়, “তোমার ব্যাখ্যা মানতে হলে বেশ কিছু কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে হবে। প্রথম, তোমার আগে ড্যামনকে এটা দেখতে হবে। তা কিন্তু ঘটেনি। ড্যামন স্ট্যাভারসকে জানাবার পর যদি কোনো বিশেষত্ব নাই থাকে তবে আর সবকটিকে বাদ দিয়ে কেন এটাকেই হোটেলে আনতে বলল? অন্যগুলো কেন নয়? আর সবশেষ হল, একমাত্র এটাই তাদের কাছে নেই। এমনকি ছবিও না। তার মানে কিউবটাই আসল কালপ্রিট।”

“কিছুই বুঝতে পারছি না।” উত্তরে জানাল এলিস, “হয়ত তোমার কথাই ঠিক। যুক্তিগুলোও ঠিক আছে। কিউবটাই বোধহয় খুঁজছে। কিন্তু কোনো বিশেষ কিছু তো নয়। তবে হ্যাঁ আইভরি দিয়ে তৈরি আর গায়ে দুর্বোধ্য কিছু লেখা।”

“সমাধিতে পাওয়া পুরনো একটা আইভরি কিউবের জন্য কেন এত মানুষকে মেরে ফেলতে হবে?” বিস্মিত হয়ে গেল কলিন। “কার সমাধি এটা?”

ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল এলিস। “তোমাদেরকে আসলে এই খনন কাজের ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানানো উচিত। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে যে আমরা কী খুঁজছি।”

“গাইজ” বাদ সাধল কলিন, “যদি আমরা কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসস্থান কিংবা সমাধি অথবা এ জাতীয় কিছু নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তাহলে আরেকটু আরামদায়ক কোথাও যাওয়া যায় না? এসব আলোচনা যে কেমন হয় তা আমার ভালই জানা আছে। প্লিজ ডাইনিং টেবিলে না।”

হেসে ফেলল বিজয়, “শিওর, স্টাডি?”

“গ্রেট আইডিয়া” খুশি হল কলিন। দুর্গে আঙ্কেলের স্টাড়িটা ওর সত্যিই বেশ পছন্দ। “আজ সূর্যের দেখা মিলেছে তাই আশা করছি দিনটাও ভালো কাটবে।”

সবাই মিলে স্টাডিতে গিয়ে কোণার দিকের কফি টেবিলের চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল। পাশের দেয়ালে এলসিডি টিভি।

“আঠারো মাস আগে শুরু করল এলিস, “ওয়ালেস অ্যার্কিওলজিক্যাল ট্রাস্টের হয়ে এই খনন কাজের লিডিং মেম্বার হিসেবে যোগ দিয়েছি।” বন্ধু দুজনের দিকেই তাকাল, “তোমরা মেসিড়নের তৃতীয় আলেকজান্ডার সম্পর্কে কতটা জানোনা?”

“কে?” আরাম করে সাদা চামড়ার কুশনে হেলান দিয়ে জানতে চাইল কলিন, “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের সাথে জড়িত কেউ?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল এলিস, “তৃতীয় আলেকজান্ডারই হচ্ছেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’।”।

লাজুক হাসল কলিন, “ওহ, সরি, ইতিহাস আসলে আমার জিনিস না।”

“যাই হোক” বলে চলল এলিস, “কয়েকটা কারণে কার্ট ওয়ালেস ব্যক্তিগতভাবে চেয়েছেন যেন আমি এই মিশনে থাকি। তাছাড়া হেলেনিস্টিক ইতিহাসে আগ্রহ থাকায় আমিও রাজি হয়েছি।”

“এই মিশনের বিশেষ কোনো কিছু নিশ্চয় তোমাকে আকর্ষণ করেছে।” বলে উঠল বিজয়। “আমি তোমাকে চিনি। মনে না ধরলে তুমি কিছুতে জড়াও না।”

হাসল এলিস। এই কারণেই বিজয়কে ভালবেসেছিল। কিভাবে যেন ছেলেটা ওর মনের সব কথা টের পায়। তাহলে সম্পর্কটা টিকলো না কেন?

কিন্তু কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতে যেতেই ঘরে ঢুকল বাটলার শিভজিৎ। “হুকুম, ডা. শুক্লাকে নিয়ে রাধা ম্যাডাম এসেছেন।”

বাবাকে নিয়ে রুমে ঢুকল হাস্যমুখী রাধা, “শিভজিৎ, আমাদের আসার কথা তোমাকে ঘোষণা করতে হবে না।” কিন্তু এলিসকে দেখেই মুছে গেল হাসি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এলো কলিন। তাড়াতাড়ি করে পরিচিতি দিতে লাগল। জানে বিজয়কে নিয়ে রাধা কতটা পজেসিভ। তাই ঘুণাক্ষরেও এলিসকে বিজয়ের এক্স-গার্লফ্রেন্ড হিসেবে বুঝতে দিল না। বিজয় নিজের সুবিধা মতন কোনো সময়ে পরে সব বুঝিয়ে বলবে।

অন্যদিকে বিজয় উঠে গিয়ে ডা. শুক্লাকে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরল। “আপনি এসেছেন দেখে আমি সত্যিই খুশি হয়েছি।”

“ভাবলাম যাই তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটিয়ে আসি, গত বছরের পর তো আর কলিনের সাথে দেখা হয়নি।” হেসে ফেললেন ভাষাবিদ।

এবার রাধার দিকে ফিরে চুমু দিল বিজয়, “আমার তো তর সইছিল না।”

পাল্টা হাসি দিল রাধা, “আমারও।”

দুজনে মিলে সোফায় বসল। কলিনের পাশে বসলেন ডা. শুক্লা, “গ্রিসে এলিসের কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে।” শুরু করল বিজয়, “ও আমাদেরকে সেসবই জানাচ্ছিল।”

রাধার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল এলিস। তারপর জানাল, “কার্ট ওয়ালেস আমাকে বললেন যে ওনার টিম এমন একটা সূত্র পেয়েছে যার মাধ্যমে প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে মূল্যবান এক রহস্যের সমাধান করা যাবে।”

“বিলিওনিয়ার কার্ট ওয়ালেসই ওর খনন কাজের ফান্ড দিয়েছেন।” রাধাকে জানাল কলিন। বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল মেয়েটা। “রহস্যটা কী?” আগ্রহী হয়ে উঠলেন ডা. শুক্লা।

“দ্বিতীয় ফিলিপের পত্নী এবং দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াসের সমাধি। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এই সমাধির অস্তিত্ব আর লোকেশন সম্পর্কে কোনো প্রমাণ না থাকায় বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ছিল। তবে এখন আমি জানি এর অবস্থান।”

নাড়া খেল বিজয়ের স্মৃতি। কি যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। এই নাম। অলিম্পিয়াস। আগেও কোথায় যেন শুনেছে? আর একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে। হয়ত গত মাসেই কিংবা তার কিছুদিন আগে। কিন্তু কোথায়? যাই হোক উত্তরটা শুনে কেবল বলল, “ওয়াও, অসাধারণ।”

ওর দিকে তাকিয়ে হাসল এলিস, “তোমরা গ্রিক ইতিহাস নিয়ে কতটা জানো আমি জানি না। কিন্তু রানি হিসেবে উনার রাজত্বকাল ছিল অত্যন্ত বিশৃংখল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র চতুর্থ আলেকজান্ডারের জন্য সিংহাসনকে সুরক্ষা করতেই ক্ষমতায় বসেছিলেন। প্রথমে পারডিকাস আর পরে পলিপারচনের সাথে হাত মিলিয়েছেন। মেসিডোনিয়ান জেনারেল হিসেবে তাদের দুজনেরই নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। অতঃপর ইফিরাস আর মেসিডোনিয়ার মধ্যে অবরুদ্ধ করার পর সবশেষে ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিড়নাতে ক্যাসান্ডারের হাতে বন্দী হন। আলেকজান্ডারের ভাইসরয় হিসেবে অ্যান্টিপ্যাটারপুত্র ক্যাসান্ডার এশিয়া অভিযানেও এসেছিলেন। যেসব মেসিডোনিয়ানকে রানি মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন তাদের আত্মীয়রাই পরবর্তীতে তার প্রাণ হরণ করে। তবে এই ষড়ন্ত্রের মূলে ছিল ক্যাসান্ডার। কারণ সে নিজ হাতে কাজটা করতে চায়নি। অলিম্পিয়াসকে ক্যাসাভার এতটা ঘৃণা করত যে তার মৃতদেহও সমাধিস্থ করতে দেয়নি। আদেশ জারি করে যেন তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। তবে, চুপিসারে ঠিকই তাকে কবর দেয়া ও সম্ভবত ইফিরাসের ফাইরাসের শাসনামলে সমাধিও নির্মিত হয়। যিনি কিনা অলিম্পিয়াদের মতই একজন ইয়াসিড ছিলেন।”

চারপাশের শ্রোতাদের দিকে তাকাল এলিস। “বলে যাও” উৎসাহ দিলেন ডা. শুক্লা, “সত্যিই বেশ ইন্টারেস্টিং।”

“আমরা সমাধিটাকে খুঁজে পেয়েছি।” এত সহজে মাত্র চারটা শব্দে ঐতিহাসিক আবিষ্কারটার কথা বলে ফেলল দেখে এলিস নিজেই বিস্মিত হয়ে গেল।

“এটাই যে রানি অলিম্পিয়াসের সমাধি সেটা জানলে কিভাবে?” জানতে চাইল রাধা। একটু আগেই মেয়েটা এমনভাবে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে হেসেছে যা ওর মোটেও ভালো লাগেনি। কে এই মেয়ে? বিজয় তো কখনো এ নাম বলেনি।

“ওয়েল এ ব্যাপারে শুরু করতে হলে অলিম্পিয়াস সম্পর্কে কিছু বলতে হবে। মারকিজিয়ালস গ্রামে বিংশ শতকের শুরুতে অলিম্পিয়াসের সমাধির কথা লেখা একটা শিলালিপি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় যে, এখানেই ছিল প্রাচীন পিড়না। কার্টের রিসার্চ টিম একটা নিউজ আইটেম খুঁজে পেয়েছে যেটার বেশিরভাগই আবার মুছে গেছে। তারা এটাকে খুঁজে পেয়ে কিনে নেয়। এখানে সমাধির ব্যাপারে সরাসরি উল্লেখ করে লেখা হয়েছে এটা মারকিজিয়ালসের চেয়ে করিনোসের বেশি কাছে। তাই আমরাও স্যাটেলাইট রিমোর্ট সেন্সরের মাধ্যমে মাটির নিচে সমাধি সদৃশ কাঠামোর প্রমাণ পেয়ে সেখানেই খনন শুরু করি। যদিও একেবারে ভেতরে না ঢোকা পর্যন্ত এর বাসিন্দা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম না।” স্বীকার করল এলিস। “কিন্তু দেয়ালের ভাস্কর্যগুলো দেখার সাথে সাথে… চেম্বারের সর্বত্র দেখা সাপগুলোর কথা মনে পড়তেই থেমে গেল। তারপর আবার জানাল, “আপনারা হয়ত জানেন যে লোককাহিনি অনুযায়ী আলেকজান্ডারের জনক ফিলিপ নন। আলেকজান্ডারের মা তাকে জানিয়েছেন যে তিনি জিউসের পুত্র যে কিনা সাপের বেশে এসে রানির সাথে মিলন করেছেন। লোককাহিনি অনুযায়ী সাপের প্রতি অলিম্পিয়াসের এক অন্যরকম মুগ্ধতা কাজ করত। তিনি এমনকি এগুলোর সাথে ঘুমাতেই অভ্যস্ত ছিলেন। এই কারণেও হয়ত আলেকজান্ডারের জন্ম নিয়ে সে লোকজ কাহিনি তৈরি হয়েছে।” অ্যান্টি চেম্বারের দেয়ালে দেখা সেই রানির পেইন্টিং, সমাধির চেম্বারের দেয়ালের সাপ আর তৃতীয় আরেকটা চেম্বারে খুঁজে পাওয়া গোপন মূর্তি আর ট্যাবলেটগুলোর কথা খুলে বলল এলিস।

“আর সেই কিউব?”

নিজের কৌতূহল আর দমাতে পারল না বিজয়। “আমরা দেখতে পারি?”

.

১৪. আইভরির এক ধাঁধা

কিউবটা আনতে নিজের রুমে গেল এলিস। এই ফাঁকে রাধা আর ডা. শুক্লাকে মেয়েটার গ্রিসের অভিজ্ঞতা খুলে বলল বিজয়।

“এই কারণে ইউএস ফিরে না গিয়ে এখানে এসেছে।” মন্তব্য করল রাধী।

“পালানোর চেষ্টা করার সময় আমাকে ফোন করেছিল।” রাধার কণ্ঠস্বরে সন্দেহের আভাস পেয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল কলিন, “হয়ত ভেবেছে যে এখানে আসলে কোনো সমস্যা হবে না।”

“আর তাই তো হয়েছে, না?” উত্তর দিল রাধা।

ঠিক তখনি আবার ফিরে এলো এলিস। কন্টেইনার খুলে কিউবটি কফি টেবিলের উপর রাখল যেন সবাই দেখতে পায়। চারটা মাথা একসাথে কিউবটার উপর উপুড় হয়ে পড়ল।

“এখানে কী লেখা আছে? তুমি পড়তে পেরেছ?” এলিসের দিকে তাকাল রাধা।

মাথা নাড়ল এলিস। “এই লেখা আমি কখনোই দেখিনি। তবে কেমন পদ্য টাইপের মনে হচ্ছে। আমার ভুলও হতে পারে।”

“এটা ব্রাহ্মী স্ক্রিপ্ট।” ঘোষণা করলেন ডা. শুক্লা, এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কিউবটা দেখছিলেন। “আরো অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এটা সংস্কৃতে লেখা। অথচ সংকৃত লেখার জন্য ব্রাহ্মীকে তেমন একটা ব্যবহার করা হত না। এই কিউবটা নির্ঘাৎ ভারত থেকে নেয়া হয়েছে।”

পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করল এলিস, কলিন আর বিজয়। “ভারতীয় একটা কিউব প্রাচীন গ্রিক সমাধির মধ্যে কী করছিল?” আশ্চর্য হয়ে গেল এলিস। “ভ্রমণ করার জন্য দূরতুটা কম নয়। সবার আগে ভাবতে হবে যে এটা গ্রিসে গেল কী করে?”

এলিসের দিকে তাকালেন ডা. শুক্লা, “কন্টেইনার থেকে বের করে যদি আমি এটা আরেকটু কাছ থেকে দেখি তুমি কিছু মনে করবে?”

“শিওর” সম্মত হল এলিস। কী লেখা আছে জানার জন্য অন্যদের মত সে নিজেও বেশ আগ্রহী।

উল্টে-পাল্টে কিউবটার ছয়টা পাশই পড়লেন ডা. শুক্লা। “ইন্টারেস্টিং” বোঝা গেল অবাক হয়েছেন।

“বলো না পাপা” চাপ দিল রাধা, “পদ্যগুলো পড়ে শোনাও।”

পিটপিট করে তাকালেন ডা. শুক্লা, “কিউবের একটা পাশ একেবারে খালি। অন্যগুলোতে সব মিলিয়ে পাঁচটা পদ্য আছে। একটা হল :

ঢালের উপরের নদী
যেখানে একসাথে মেশে দিন আর রাত্রি
আর শুক্র দেখায় শিবের ইঙ্গিত
পাঁচ মুকুটঅলা সেই মহাশক্তিধর সাপ
তোমাকে জীবন দান করবে যে প্রবেশদ্ধার
তার চির প্রতিপালক।

গুঙ্গিয়ে উঠল কলিন, “ওহ, খোদা! সাংকেতিক মেসেজঅলা আরেকটা ধাঁধা। এক বছরও হয়নি এগুলোর হাত থেকে বেঁচে এসেছি।”

“ইয়েস; কিন্তু মর্মোদ্ধার করে অবশেষে সিক্রেট লোকেশন খুঁজে পাওয়াটাও কম মজার ছিল না, তাই না?” বন্ধুর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল বিজয়।

“শুধু আমরা যে কিডন্যাপ হয়েছি সে অংশটা বাদে।” মনে করিয়ে দিল রাধা। ওই অভিজ্ঞতার নগ্ন আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি ভুলতে পারেনি।

“আর শেষ পদ্যটার মর্মোদ্ধার করে লোকেশনটা তুমিই পেয়েছিলে কলিন।”

“ইয়াহু, জানি, জানি।” ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে উঠল কলিন। “কিন্তু ওরকম আরেকটা শিকারে যাবার কোনো ইচ্ছে নেই। মনে হচ্ছে যতবার ভারতে আসব ততবারই এসব ধাঁধা আর কবিতা এসে চেপে ধরবে।”

ধাঁধার সমাধানের উত্তেজনায় এরই মাঝে জ্বলছে রাধার চোখ। “এই ধাঁধাগুলোরও মর্মোদ্ধার ঠিকই হয়ে যাবে। ভারতীয় স্বভাবই হল এরকম প্রহেলিকা সৃষ্টি করা। যেমন ধরো, শরীরের ইঙ্গিত হল তার ত্রিশূল।”

কাঁধ ঝাঁকাল এলিস, “আমার কোনো ধারণাই নেই এ ব্যাপারে। তোমরাই ভালো জানবে। কিন্তু যেটা খটকা লাগছে তা হল, ভারতীয় শিলালিপি খোদাই করা একটা আইভরি কিউব একটা গ্রিক সমাধিতে কিভাবে পৌঁছাল।”

“এটা অবশ্যই ভারতেরই তৈরি।” বলে উঠলেন ডা. শুক্লা। “শুক্রের উল্লেখও ভারতীয় পুরাণের অংশ। ঋষি ব্ৰিণ্ডর পুত্র হল শুক্র; অসুরের প্রধান ধর্মগুরু। নবজীবন সঞ্চারের বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছে। আর এই জ্ঞান ব্যবহার করেই দেবতারদের হাতে নিহত দানবদেরকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে শুক্র।”

“অন্য পাশগুলোতে কী লেখা আছে?” জানতে চাইল বিজয়।

কিউবটাকে উল্টে ফেললেন ডা. শুক্লা। “এটার ভারতীয় হবার আরেকটা প্রমাণ পাওয়া গেল। একপাশে লেখা আছে :

দ্রুত বহতা চোখের ওপাশে
লবণহীন গভীর সমুদ্রের ধারে
নিজেদের ছায়া ফেলল তিন ভ্রাতা
পথ দেখিয়ে দিল তীরের মাথা
যা চলে গেছে পাতালে
সর্পের চিহ্নের গভীর গোপনে
খুঁজে পাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত ভূমি।”

মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, “ভারতীয় পুরাণে পাতালের মানে হল পৃথিবীর নিম্নাংশ, নরক। টেকনিক্যালি সাতটা প্রেতলোকের একটা।”

“মানে সত্যিই নরক?” জিজ্ঞেস করল কলিন।

“ঠিক তা না।” শুধরে দিলেন ডা. শুক্লা, নরক তো আসলে পশ্চিমা ধারণা। ভয় দেখিয়ে মানুষকে সত্যের পথে ধরে রাখা। হিন্দু দর্শন কিংবা পুরাণে নরকের এরকম কোনো ধারণা নেই। সত্যিই একটা নিম্নস্থ দুনিয়া। যা আমাদের পৃথিবীর ভূমিতলের নিচে অবস্থিত।”

চারপাশে তাকাল এলিস, “আর কোনো আইডিয়া? আমার মাথায় কিছু আসছে না। কেবল মনে হচ্ছে যে কোথাও যাবার জন্য এক ধরনের নির্দেশনা।”

“আমার মনে হচ্ছে” বলে উঠল কলিন, “পাতালে যাবার জন্য তাড়া দিচ্ছে এই পদ্য। বাস্তবের সাথে তো কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছি না। পুরোটাই লোককাহিনি না?”

“সম্ভবত সবকটির অনুবাদ করা হলে ভালো একটা আইডিয়া পাওয়া যাবে।” মাঝখানে মন্তব্য করল রাধা। “গো অন পাপা” পিতাকে তাগাদা দিল, “অন্যগুলো কী বলে দেখা যাক।”

.

১৫. আরো কিছু ধাঁধা

“ও. কে, পরেরটা বলছি, আরো একবার কিউবটাকে ঘোরালেন ডা. শুক্লা,

“আর পাথরের চারপাশের ভূমি থেকে
তুলে নাও ফল, পাতা আর বাকল
প্রথমে পাবে অনেক শেকড় আর ফল
গাঢ় বেগুনি, সাদা আর ছাইরঙা খোসা।
কিংবা সবুজ আর বাদামি।
পরেরটার গাত্রবর্ণ বেশ মসৃণ
ভেতরে বেগুনি ফল
তবে সাবধানে থেকো
স্পর্শ করলেই জ্বলে উঠবে তুক।”

“একেবারে নিখুঁত এক নির্দেশনা” বিদ্রূপ করে উঠল কলিন, “যদি জানা থাকে যে কী খুঁজছে।” “কিন্তু এতে করে বোঝা গেল যে এলিস এইমাত্র যা বলল সেটাই ঠিক।” বাধা দিল রাধা, “কোনো একটা অভিযানের গোপন গাইড হচ্ছে এ কিউব। শুধু সমস্যা হচ্ছে এর উদ্দেশ্যটাই জানি না।”

পরের শিলালিপিটা পড়লেন ডা. শুক্লা,

“মনে রেখ, সাহসী অভিযাত্রিগণ
যদি তুচ্ছ করো এসব বাধা
একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে সব বিপত্তি
সাপের ভয়ংকর দৃষ্টি–
অন্যথায় খোয়াবে
সবচেয়ে মূল্যবান সেই উপহার।”

“ও, কে” আবার বাদ সাধল কলিন, “এই ধাঁধাটার অন্তত একটা লাইনের মর্মোদ্ধার আমিই করতে পারব” অন্যদের দিকে তাকিয়ে সবজান্তার মত হাসল, “এখানে বলা হচ্ছে যদি তুমি নির্দেশগুলোকে নামানো আর সতর্কবাণীকেও তুচ্ছ জ্ঞান করো-সেগুলো যাই হোক না কেন নিজের জীবন হারাবে। এটাই হল সবচেয়ে মূল্যবান উপহার অন্য আর কিছুই হতে পারে না।”

“তোমাদের কথাই বোধহয় ঠিক” চিন্তিত হয়ে পড়ল রাধা, “কিন্তু এখনো বোঝা যাচ্ছে না যে নির্দেশগুলো কোথায় নিয়ে যাবে। এছাড়া একগাদা কল্পনা তো আছেই-শিব, সাপ, ফল, দ্রুত বহতা চক্ষু-এগুলোইবা কিভাবে খুঁজে পাবো?”

“একেবারে শেষেরটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো” ছেলে-মেয়েরা যখন কথা বলছে ডা. শুক্লা তখন সর্বশেষ শিলালিপিটা পড়ছেন। এবারে জানালেন, “লেখা আছে :

পূর্ব আর পশ্চিমকে বিভক্ত করে
যে উপত্যকাদ্বয়
এবারে সে প্রবেশদ্বারে যাও
কাজে লাগাও নিজের বুদ্ধিমত্তা
মনে রাখবে তুমি সেথায় যাবে
যেথায় ঘুমায় সূর্য।”

“ওহ, গ্রেট” গুঙ্গিয়ে উঠল কলিন, “এবারে আরেকটা প্রবেশদ্বার আর সূর্যকেও পাওয়া গেল। এটা পাগলামো না তো কী? সূর্যটা আবার কে?”

“উঁহু তা না।”-ভ্রু-কুঁচকে গভীর চিন্তায় ডুবে গেছে রাধা। “সূর্য হচ্ছে ভারতীয় সূর্য দেবতা। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে। তার মানে এই ধাঁধায় দুটো উপত্যকার কথা বলা হয়েছে আর নির্দেশানুযায়ী পূর্বদিকেরটাই বেছে নিতে হবে।”

“এটা একটা গুড পয়েন্ট। কিন্তু কোন্ উপত্যকা? আর সূর্য তো পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায়। তার মানে পশ্চিম দিকও হতে পারে। দিনের সময়ের উপর নির্ভর করবে।” এতক্ষণে কথা বলল বিজয়।

নিভে গেল রাধার চোখের আলো। “এই ধাঁধাটাকে সমাধা করার জন্য কোনো রেফারেন্স পয়েন্ট তো নেই।” কাঁধ ঝাঁকাতেই কণ্ঠস্বরের অসন্তুষ্টিও বোঝা গেল। “একটা স্টার্টিং পয়েন্ট দরকার, তাহলে বোঝা যাবে যে কোন পাশটা আগে পড়তে হবে। কিংবা এই কিউবটা তৈরির উদ্দেশ্য জানতে হবে। এসব ছাড়া তো মর্মোদ্বার সম্ভব নয়।”

“ঠিক কথা।” সম্মত হল এলিস। “কিউবটা তৈরির পেছনে নিশ্চয় কোনো একটা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু কী উদ্দেশ্য সেটা জানারই কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। “ আবারো কন্টেইনারে ঢুকিয়ে রেখে দিল কিউবটা।

“ও.কে, তাহলে আজ এ পর্যন্তই থাক। এখন বাইরে গিয়ে কেল্লার চারপাশে একটু ঘুরে বেড়ালে হয় না? এত সুন্দর একটা দিন। তাছাড়া ধাঁধাগুলোর তো সমাধানও হচ্ছে না। ঈশ্বর জানেন যে এতে আমি কতটা খুশি হয়েছি। আর আমার জীবনটা হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। তাই কোনো ধরনের দুঃসাহসিক অভিযানে গিয়ে তা খোয়াতে চাই না। এগুলো গ্রিক হিরোদেরকেই মানায়; হারকিউলিস আর ওর জ্ঞাতিভাইরা। আমার মত বিংশ শতকের কাউকে না।” উঠে দাঁড়িয়ে এলিসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল কলিন। হাস্যমুখে সাড়া দিল মেয়েটা।

“ডোন্ট ওরি” হা হা করে অট্টহাসি দিল বিজয়। “এমনিতেও আমরা যে এগুলোর পিছনে ছুটব সেরকম মনে হচ্ছে না। গ্রিস এখান থেকে অনেক দূর। তাই উত্তরের আশায় অত দূর ছুটে যাবার কোনো মানে হয়না। আর তাছাড়া আমাদের তো কোনো গরজও নেই। অনর্থক এই বুদ্ধির খেলায় পা না বাড়ানোটাই সমীচিন।”।

“আমার মনে হয়, একটু তাজা বাতাসে ঘুরে আসলে ভালই লাগবে।” উঠে দাঁড়িয়ে এলিস আর কলিনকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ডা. শুক্লা। রয়ে গেল বিজয় আর রাধা।

কৌতূহল নিয়ে তাকাল বিজয়।

“তো” শুরু করল রাধা, “মেয়েটা কে? হট, সোনালি কেশধারী, বার্বির মত চেহারার মেয়েটা মাঝরাতে পৌঁছেই তোমাদের বন্ধু হয়ে গেল? কেন এসেছে? বলো?”

রাধার কণ্ঠে মজা করার ভাব থাকলেও বিজয় বুঝতে পারল ওকে খুলে বলা দরকার। তাই এলিসের সাথে ওর অতীত সম্পর্কের কথা স্বীকার করল। “কিন্তু চিন্তা করো না” আশ্বস্ত করল রাধাকে, “এসবই এখন অতীত। বহুকাল আগেই চুকেবুকে গেছে। যখন তোমার সাথে দেখা হল তখন আমার সঙ্গী ছিল কেবল কাজ আর কাজ।”

মাথা নেড়ে হেসে ফেলল রাধা। কিন্তু মনের মাঝে কী যেন খচখচ করছে। বিজয়কে নিয়ে কোনো চিন্তা নেই; ওকে মন প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে যে এলিস আর বিজয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মেয়েটাই বেশি শক্ত ছিল। এলিস কেমন করে বিজয়ের দিকে তাকাচ্ছিল সেটাও সে দেখেছে। তাই সন্দেহ হচ্ছে যে এখনো হয়ত মন থেকে বিজয়কে ভুলতে পারেনি। ব্রেক আপ আর এত বছরের দূরত্ব সত্ত্বেও এলিস এখনো বিজয়ের কথা ভাবে।

ঠিক করল এখন এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে সময়মতই সব সামলাবে। “ইমরান এখানে কখন আসবেন?” জানতে চাইল রাধা।

ঘড়ির দিকে তাকাল বিজয়, “বলেছিলেন যে দুপুর হবে। আমাদের হাতে এখনো অনেক সময় আছে।” হঠাৎ করেই আরেকটা কথা মনে এলো, “চলো, সময় যেহেতু পাওয়া গেছে তোমাকে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখাবো। উপরের তলার একটা রুমে যেতে হবে।”

“ইমরান কেন দেখা করতে চাইছেন?” সিঁড়ি বেয়ে পাঁচ তলায় উঠতে গিয়ে জানতে চাইল রাধা।

“ঠিক করে কিছু বলেননি। শুধু এটুকু জানিয়েছেন যে টাস্ক ফোর্সের প্রথম কেস পেয়েছেন আর সে ব্যাপারেই ব্রিফ করবেন। কিন্তু কেন যেন তেমন হাসি-খুশি শোনায়নি উনার গলা।”

.

১৬. জোনগড় কেল্লা

“এটা তো আসলেই বেশ অদ্ভুত!” বিজয়কে হতবুদ্ধি করে দেয়া ফাইলটার পাতা ওল্টাতে গিয়ে বলল, “সবকিছুকে একত্রে ফাইলবন্দী করে যাবার পেছনে নিশ্চয়ই তোমার বাবার শক্ত কোনো যুক্তি আছে।”

কাধ ঝাঁকাল বিজয়, “সেটাই তো ভেবে বের করতে চাইছি। কিন্তু কারণটা যে কী হতে পারে সে সম্পর্কে মাথায় কোনো আইডিয়াই আসছে না।”

“এটা কী?” বিভিন্ন চিহ্ন আঁকা একটা এ-ফোর সাইজের পৃষ্ঠার দিকে ইশারা করল রাধা। সিম্বলগুলোকে খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করে দেখল। “দেখে মনে হচ্ছে উত্তর-ইউরোপীয় প্রাচীন বর্ণমালা। আরে এগুলোতে হাতে লেখা হয়েছে। তোমার বাবার হ্যান্ডরাইটিং?”।

“জানিনা” স্বীকার করল বিজয়। “উনার হাতের লেখা কেমন ছিল তাও, খেয়াল নেই। আসলে বাবার সম্পর্কেও তেমন কিছু মনে পড়ে না।” মাথা নাড়িয়ে। জানাল, “একসাথে তো খুব বেশি সময় কাটানো হয়নি। এখন আফসোস হয়। আরেকটু যদি কাছে পেতাম। তখন মনে হত কোথায় আর যাবো। তাই বাড়ির পাশের পার্কে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট আর ফুটবল খেলা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতাম। অথচ দেখো এখন আর কিছু করার নেই।” নীরব হয়ে গেল বিজয়। আস্তে করে ওর হাত ধরল রাধা। মেয়েটা ওর কাছে আছে জেনে কৃতজ্ঞতায় ছেয়ে গেল মন।

“এখানে একটা লিস্টও আছে” আরেকটা কাগজ হাতে নিয়ে দেখছে রাধা, “মনে হচ্ছে কোনো সূচিপত্র।”

রাধার হাতের কাগজটা দেখল বিজয়, “একটা কাজ করলে কেমন হয়, চলো চেক করে দেখি, ফাইলের কাগজপত্র আর এই সূচিপত্রের মাঝে মিল আছে কিনা। হুম?”

একমত হল রাধা। মনে হচ্ছে সেটাই ভালো হবে। আর শেষমেশ কিছু পাওয়া না গেলেও সমস্যা নেই; বিজয় তো স্বস্তি পাবে! ইনডেক্স পাতাটা ফাইল থেকে বের করে নিল। তারপর একেকটা নাম ধরে ধরে আবার ফাইল গোছানো শুরু করল বিজয়।

এতটা সহজ হল না কাজটা। ঠিকঠাক নাম অনুযায়ী কেবল অল্প কয়েকটাই পাওয়া গেছে। তাই লিস্ট অনুসারে মেলাবার পর বাকিগুলোকে অনুমানে গোছাতে হল।

“তালিকার তিনটা আইটেম এই ফাইলে নেই।” সমস্ত কিছু জায়গামত রেখে দেবার পর ঘোষণা করল রাধা। হিসাব করে দেখাল, “কে এস-১, কে এস-২ আর তৃতীয়টা হল একটা মাত্র চিহ্নঅলা নামটা পড়তে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, “এটা কি একটা ডব্লিউ?”

বিজয়ও মনোযোগ দিয়ে দেখছে, “মনে তো হচ্ছে ডব্লিউ। কিন্তু একটু বেশিই ঢেউ খেলানো। দেখো কোনো সোজা লাইন নেই।” কিছু একটা মনে পড়তেই হঠাৎ করে শক্ত হয়ে গেল।

“কী হয়েছে?” রাধারও চোখে পড়েছে ছেলেটার পরিবর্তন। “মনে হচ্ছে মিসিং ডকুমেন্টসগুলোর একটা আগেও কোথায় যেন দেখেছি।” স্মরণ করতে গিয়ে সরু হয়ে গেল বিজয়ের চোখ, “কোথায় যে কে এস দেখলাম!” উঠে দাঁড়িয়ে রুমের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কার্টনগুলোর দিকে তাকাল। গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘেটে দেখলেও এখন মনে হল, “আবার সবকিছু গোড়া থেকে খুঁজে দেখতে হবে।”

“চলো আমিও হাত লাগাচ্ছি।” একটা কার্টন টেনে নিয়ে খুলে ফেলল রাধা।

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল বিজয়। তারপর নিজেও আরেকটা বাক্স টেনে আনল। এ কারণেই রাধাকে এত ভালোবাসে। বুঝতে পারছে নির্লিপ্ত থাকলেও এলিসের উপস্থিতি মেয়েটা এখনো মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু কিছুই বুঝতে না দিয়ে ঠিকই বিজয়ের কাজে সাহায্য করছে। রাধার এই মানসিক শক্তি আর আত্মবিশ্বাসকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে বিজয়। নিজস্ব প্রয়োজন আর অগ্রাধিকারকে এক পাশে ঠেলে সবসময় প্রাধান্য দেয় তার বন্ধু আর পরিবারকে। ইস, বিজয়ও যদি এমন হতে পারত! এর বদলে ব্যস্ত থাকে নিজের অন্তর্মুখী জগৎ নিয়ে। হঠাৎ করেই মনে পড়ল এলিসের কথা। জানে এমআইটিতে থাকার সময় কেন দুজনের ব্রেক আপ হয়েছে। তারপরও বিজয় বহুবার ভাবতে চেয়েছে কোথায় ওর ভুল হয়েছিল। অবশেষে বুঝতেও পেরেছে। কখনোই এলিসের কাছে মনের দুয়ার খুলে দিতে পারেনি। সিরিয়াস আর চাপা স্বভাবের বিজয় পিতা-মাতার মৃত্যুর পর আরো বেশি করে নিজের মাঝে গুটিয়ে যায়। ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডিকে প্রাণপণে ভুলে থাকতে চেষ্টা করেছে। আর তাই নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। আর স্বপ্নের প্রজেক্টটাকে গুরুত্ব দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। এলিসের সাথে দেখা হবার পর মনে হয়েছিল এবার বুঝি সবকিছু বদলে যাবে। কিন্তু দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালটা কেন যেন একটুও ভাঙ্গতে পারেনি।

অতঃপর বহুদিন পার হয়ে গেলেও ওকে এভাবে ছেড়ে যাবার জন্য এলিসকে ক্ষমা করতে পারেনি। কথা নেই, বার্তা নেই, এমনকি বিজয়কে বদলাবার কোনো সুযোগও দেয়নি। ফলে নিজের ভুল সত্ত্বেও তিক্ত হয়ে গেছে বিজয়ের মন। অনেক পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছে যে এলিস যদি ওর ভুলগুলো দেখিয়েও দিত তার পরেও কোনো লাভ হত না। বিজয় আসলে কোনো ধরনের সম্পর্কের জন্য তৈরিই ছিল না। ব্রেকআপের সেই কষ্ট ভুলতে পুরো দুই বছর লেগেছে। এরপর তো কোনো সম্পর্কের কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসত। একদিকে তাই নিজের কাজ নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর অন্যদিকে মনে হত যে নিজেকে উজাড় করে দেয়া বুঝি কোনোকালেই সম্ভব হবে না।

আর তারপর রাধার সাথে পরিচয়। বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে বছরখানেক আগে। তাও আবার আঙ্কেল খুন হবার পরে এক অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে। তবে যাই ঘটুক না কেন এখন সে প্রকৃতই খুশি। অসম্ভব তৃপ্ত। ওর জন্য রাধার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউই নেই।

“এই তো পাওয়া গেছে!” ভাবনার গভীর সমুদ্র থেকে যেন বিজয়কে টেনে তুলল রাধার কণ্ঠস্বর। মেয়েটা কী পেয়েছে দেখার জন্য চোখ তুলে তাকাল।

রাধার হাতে পাতলা কার্ড বোর্ডের ফাইলের ভেতর রিবন দিয়ে বাঁধা এক তোড়া কাগজ। বোঝা যাচ্ছে কাগজগুলো বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। একেবারে জীর্ণপ্রায়। “কে-এস-১” ঘোষণা করল রাধা।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা, “গ্রেট, চলো, ভেতরে কী আছে দেখি।”

“দেখে তো মনে হচ্ছে হাতে লেখা জার্নালের ফটোকপি।” ফাইল খুলে কাগজগুলোতে চোখ বোলাচ্ছে রাধা, “দিস ইজ ইন্টারেস্টিং; তোমার বাবা তো হিস্টোরিয়াল ছিলেন তাই না?”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিল বিজয়।

“এ ধরনের জিনিস সংগ্রহে রেখে গেছেন তার মানে নিজের কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন। এটা দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের সময়কার একটা জার্নালের অনুবাদ কপি।”

এমন সময় বেজে উঠল বিজয়ের মোবাইল ফোন। কলিন। ইমরান এসেছেন।

“দুপুর হয়ে গেছে নাকি?” ঘড়ি দেখেই দাঁত বের করে হেসে ফেলল রাধা, “মজা করার সময় আসলে সময়ের হুশ থাকে না।” জার্নালটাকে নেড়ে দেখাল, “প্রথম পাতায় লেখা আছে এটা অত্যন্ত পুরনো এক জার্নালের অনুবাদ, যেটা, কী যেন লোকটার নাম…” নামটাকে ভালোভাবে পড়ে দেখল, “হুম পেয়েছি, ইউমেনিস। অরিজিন্যাল জার্নালটা উনি লিখে গেছেন। তারপর লরেন্স ফুলার নামে আরেকজন সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে।”

রাধার হাত থেকে জার্নালটাকে নিয়ে কয়েকটা পাতা ওল্টালো বিজয়। এটাকে নিরাপদে রাখতে গিয়ে বাবা এতটা কষ্ট করেছেন। জানতে হবে, কেন? একটা নাম দেখে তো আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। রাধাকে দেখাতেই বিজয়ের হাত থেকে নিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ে দেখল মেয়েটা। সাথে সাথে উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর চোখ।

.

১৭. টাস্ক ফোর্স সভা

পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দুজনে। রাধার হাতে একটু আগে পাওয়া জার্নাল। প্ল্যান হল ইমরান চলে গেলেই বিজয়কে নিয়ে একসাথে বসে পড়বে।

দশ মিনিট পরেই গ্লাস লাগানো কফি-টেবিলের চারপাশে একসাথে হল বিজয়, রাধা আর কলিন। গবেষণা কক্ষের দরজায় ডাবল লকড় করে সিরিয়াস ভঙ্গি নিয়ে এসে বসলেন ইমরান। এমনকি অন্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময়েও শান্ত হয়ে রইলেন।

“রাইট” শুরু করলেন আইবি স্পেশাল ডিরেক্টর, “টাস্ক ফোর্স তার ফাস্ট কেস পেয়েছে। থিংক ট্যাংক হিসেবে তাই তোমাদেরকে ব্রিফ করতে এসেছি। প্যাটারসনের সাথেও যোগাযোগ হয়েছে। সে তার ইউ এস টিম মেম্বারদেরকে জানাবে।”

খানিক বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “সম্ভাব্য বায়োটেররিজমের কেস এসেছে হাতে। দুই রাত আগে, আমার শৈশবের বন্ধু আনোয়ার সাহায্যের অনুরোধ করে মেইল পাঠিয়েছিল। কিন্তু তখন আমি এটা জানতাম না; তবে এখন মনে হচ্ছে ও পাঁচ বছর আগে ইউ এস মাল্টিন্যাশনাল টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের ভারতীয় রির্সাচ সেন্টারে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ভলান্টিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছে। আর্য ল্যাবরেটরিতে পাওয়া মৃতদেহসহ সে রাতে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন ইমরান।

“আইটি ল্যাবে পাওয়া মৃতদেহই আনোয়ার। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় চেনার কোনো উপায় ছিল না। ডিএনএ অ্যানালাইসিস করে নিশ্চিত হয়েছি।” থেমে গেলেন ইমরান। বন্ধুর মৃত্যুর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। “পুরোটাই আমাদের অনুমান। তবে মনে হচ্ছে আনোয়ার কোনো এক ফাঁকে আইটি ল্যাবে ঢুকে মেইলটা পাঠিয়েছে। আর তারপর ওকে ধরে হত্যা করা হয়েছে। অটোপসি রিপোর্ট কনফার্ম করেছে যে মৃত্যুর কারণ হল মাথার ভেতর ঢুকে পড়া বুলেট।

একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ। আরো মনে হচ্ছে, ওরা যখন বুঝতে পেরেছে যে ইমেইলটা একজন আইবি অফিসারকে পাঠানো হয়েছে তখনই আর দেরি না করে সবাইকে খুন করে পুরো ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে; যেন কোনো প্রমাণই আর না থাকে।”

“তার মানে একটা নতুন বায়ো-উইপন তৈরির জন্যই এসব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছিল?” জানতে চাইল রাধা, “টাইটান কী বলছে?”

“আমরাও প্রথমে তাদেরকেই সন্দেহ করেছি। কিন্তু টাইটানের দাবি যে তাদের সমস্ত ট্রায়ালই বৈধ আর ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়াও স্বীকৃতি দিয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস রেজিস্ট্রিও চেক করে দেখেছি। টাইটান ওখানে অসংখ্য ট্রায়ালের রেজিস্ট্রেশন করেছে। প্যাটারসন আর তার দল ইউএসে টাইটানের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট আর বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মেজরিটি শেয়ারহোল্ডার কাট ওয়ালেসের সাথেও কথা বলেছে।”

নামটা শুনে সাথে সাথে নড়ে উঠল বাকিরা। “এই লোকটাই তো এলিসের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজে ফান্ড দিয়েছিল বিস্মিত হল বিজয়। “এলিস কে?” তৎক্ষণাৎ জানতে চাইলেন ইমরান, “এর সাথে ওর কিসের সম্পর্ক?”

“ও আমার ফ্রেন্ড। ইউএসে থাকে। হঠাৎ করেই আজ সকালে এখানে এসেছে।” খুব দ্রুত এলিসের কাহিনি বলে গেল বিজয়। ওয়ালেসের কথাও বাদ দিল না। :

শেষ হতেই ঠোঁট কামড়ে ধরলেন ইমরান। “তোমার বন্ধু তো আসলেই এক কঠিন সময় পার হয়ে এসেছে। শুনে ভাল লাগল যে অবশেষে সরে আসতে পেরেছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে দুটো কেসেই কার্ট ওয়ালেস’কমন ফ্যাক্টর। আর তার চেয়েও কাকতালীয় হল এমন একটা সময়ে তোমার বন্ধু ভারতে এসেছে যখন আমরা সম্ভাব্য বায়োটেররিজমের কেস হাতে পেয়েছি।”

ইমরান কী ভাবছেন বুঝতে পারল বিজয়, “আমি ওর হয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছি” অভয় দেয়ার চেষ্টা করে বলল, “আমি ওকে চিনি…” রাধাকে না ক্ষেপিয়ে কিভাবে ওর আর এলিসের সম্পর্ক বর্ণনা করা যায় তা নিয়ে খানিক ভেবে জানাল, “আসলে বলা যায় ওর সম্পর্কে ভালোভাবে জানি।” . চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন ইমরান, “হয়ত। কিন্তু এখানে আসার টাইমিং আর আমাদের কেসের কার্ট ওয়ালেসের সাথে ওর সম্পর্কটা আসলেই কৌতূহলোদ্দীপক। হতে পারে এটা কো-ইন্সিডেন্স ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাবে না।”

চুপ করে গেল বিজয়। নিজের অসন্তোষ চাপার চেষ্টা করছে।

আবারো শুরু করলেন ইমরান, “ওয়ালেস আর টাইটানের পুরো সিনিয়র ম্যানেজমেন্টই আর্যর মালিক সুমন পাওয়ার উপর আঙুল তুলেছে। আগুন লাগার পর থেকে তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খোঁজা হয়েছে। অথচ একেবারে যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তাই ফলাফল শূন্য। তবে আরো কিছু খবর আছে। আগুনে হার্ড-ড্রাইভের যথেষ্ট ক্ষতি হলেও আমাদের অত্যন্ত অত্যাধুনিক আইটি ল্যাবে বেশ কিছু ডাটা উদ্ধার করতে পেরেছি। যার মাঝে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাবজেক্টদের উপর ফাইলও আছে। এসব মেডিকেল হিস্ট্রি থেকে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত মৃতদেহগুলোর উপর অটোপসি রিপোর্ট আর স্যাম্পল নিউ দিল্লির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল আর পুনেতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতেও পাঠিয়েছি। এদের ফাইন্ডিংসের সাথে ওয়াশিংটনে অবস্থিত সি ডিসি-র রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা হয়েছে; যা মাত্র আজ সকালেই হাতে এসেছে।”

আগের দিন সন্ধ্যায় প্যাটারসন আর ডা. রয়সনের সাথে আলোচনার কথাও সবিস্তারে জানালেন। “তো এখন আমাদের অনুমান হল যে এই পাওয়াই চুপিচুপি সেন্টারে গোপন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছিল। ইউএসের কারো জড়িত থাকার আশঙ্কাও বাদ দেয়া যাচ্ছেনা। বিশেষ করে ওয়ালেস নিজে। যদিও শক্ত কোনো প্রমাণও নেই।”

ইমরানের কথা শেষ হবার সাথে সাথে নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো রুম।

“তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?” বরাবরের মতই সবার আগে মুখ খুলল কলিন।

“আর আমরাই বা কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” যোগ করল বিজয়।

“আপাতত হাতে তেমন কোনো কাজ নেই সিদ্ধান্ত জানালেন ইমরান, “তাই আমি চাইছি, তোমরা সব অ্যাংগেল থেকে সমস্যাটাকে ভেবে দেখো। যদি কোনো নতুন আইডিয়া পাওয়া যায়। এই ফাঁকে ফিল্ড এজেন্টরা পাওয়া আর অন্য কোনো লিড পাওয়া যায় কিনা খুঁজে দেখুক। তারা চার থেকে পাঁচ বছর আগেকার নিউজপেপার ঘেঁটে কিনিক্যাল ট্রায়ালের বিজ্ঞপ্তি দেখছে আর সেই সাথে এই ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের সাথেও কথা বলছে। আমি ভারতে টাইটানের সিইও ভা, স্বরূপ ভার্মার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আর টাইটানের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. বরুণ সাক্সেনার সাথেও মিটিং করব।”

“এ ব্যাপারে আমরাও সাহায্য করতে পারি” প্রস্তাব দিল রাধা। “সি এম ও-র সাথে দেখা করতে আমার কোনো সমস্যা নেই; যদি আপনি বলেন

“থ্যাংকস।” হেসে ফেললেন ইমরান। কিন্তু এটা একটা ফিল্ড জব। জার্নি টাস্ক ফোর্স সেট আপের পর তোমরা ট্রেনিং নিয়েছ; কিন্তু কোনো অভিজ্ঞতা তো নেই। ব্যাপারটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে যদি সত্যিই বায়োটেররিজমের সাথে দেখা হয়ে যায়।” না চাইলেও গত বছর মহাভারতের সিক্রেট খোঁজার সময়ে টেররিস্টদের সাথে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা মনে পড়ে গেল।

.

১৮. গুড়গাঁও

গুড়গাঁওয়ে অবস্থিত দ্য ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটের ফ্ল্যাট স্ক্রিন মনিটরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে পিটার কুপার। রুমের এক কোণায় যন্ত্রপাতি ভর্তি একটা তাক থেকে ঝুলছে একগাদা তার। আরেক সারি সার্ভারের সাথে গিয়ে মিশেছে।

কুপার এই কম্পিউটার জিনিসটাকে একটুও বোঝে না। বাহান্ন বছরের জীবনে টেকনোলজির সাথে কখনোই তেমন বন্ধুত্ব হয়নি। একুশ বছর বয়সে যখন অর্ডারে যোগ দিয়েছে, তখন সম্বল ছিল কেবল ভাড়া করা পিস্তলের টেলিস্কোপিক সাইট দিয়ে যে কোনো দূরত্বে দেখা চলন্ত টার্গেটে লাগাবার ক্ষমতা। এছাড়া সষ্টিকর্তা ওকে সত্যিই এক অত্যাশ্চর্য স্মৃতিশক্তি দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর এই দুই দক্ষতা মিলে তাকে বানিয়ে তুলেছে এক ভয়ংকর গুপ্তঘাতক। দিনে দিনে যা আরো শাণিত হয়ে উঠছে।

এ পর্যন্ত যে কতজনকে খুন করেছে তার কোনো হিসাবও নেই: নারী, পুরুষ, ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। আসলে কুপারের কাছে এরা কোনো সংখ্যা নয়। মানুষ হিসেবে ভাবা তো বহু দূরের কথা। কুপারের কাছে এরা কেবল সহজ-সাধারণ টার্গেট। যাদেরকে খতম করাটাই আনন্দের। নিজের কাজটা সে ভালোই বোঝে। নিয়মিত সাফল্য নিয়ে তাই যথেষ্ট গর্বিত। একটা টার্গেটও কখনো মিস হয়নি। এমনকি ট্রিগারের উপর হাত কপারও অভিজ্ঞতা হয়নি।

বছরের পর বছর ধরে অর্ডারে তাই প্রভাব প্রতিপত্তিও বেড়ে গেছে। এখন তার কাজগুলো কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্ব পায়। যার মানে হল আগের তুলনায় কম অ্যাসাইনমেন্ট। যদিও বয়সের ভারে চোখের দৃষ্টি এখনো একটুও মান হয়নি। অবশ্য তার সফলতার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটা বিরাট ভূমিকা রাখলেও সেটা কখনো তেমনভাবে স্বীকার করে না। তার মতে এক স্ট্যাটেজিস্টের মারণাস্ত্র হল মাথা। সেখানেই থাকে সব প্রযুক্তিবিদ্যা। বাকি সবকিছু অনর্থক।

“বর্তমান স্ট্যাটাস কী?” কনসোলে বসে থাকা টাক মাথা লোকটার কাছে জানতে চাইল কুপার। মোচঅলা লোকটার নাম কৃষাণ। স্থানীয় টেকনোলজি

“যদি শুরুই না করি তো অভিজ্ঞতাই বা কিভাবে হবে?” জোর দিল রাধা, “আপনার সাথে যদি সিইও-র কাছে যাইও তো কী হবে? আপনি তো সাথেই থাকবেন।”

“রাজি হয়ে যান, ইমরান” অট্টহাসি দিল বিজয়, “ও একটা বুলডগ। এখন আর পিছু হটবে না।”

নিজের পিঠে চাপড় দিয়ে ভাব দেখাল রাধা। “আমার মনে হয় ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং হবে। কাম অন ইমরান; চলুন ঝাঁপিয়ে পড়ি।”

“ওহ, ওকে” হাত বাড়িয়ে দিলেন ইমরান। “ফাইন। একটা ইন্টারভিউতে আর এমন কিইবা ঘটতে পারে? বিকাল সাড়ে চারটায় ইন্টারভিউর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। একই সময়ে সিএমও-র সাথে মিটিং করবে আমার লোকেরা।”

ফোনের জন্য হাত বাড়াতেই বাজতে শুরু করল রিংটোন। মনোযোগ দিয়ে ওপাশের কথা শুনতেই কালো হয়ে গেল ইমরানের চেহারা।

“কোনো খারাপ সংবাদ?” অনুমান করতে চাইল বিজয়। “এই মাত্র পাওয়ার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এক্সপ্রেস ওয়ের সাথে কার অ্যাক্সিডেন্ট। কেউ গাড়ির ব্রেক আগে থেকেই নষ্ট করে রেখেছিল। তাই কোনো সুযোগই পায়নি।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালেন, “শেষ জীবিত সূত্রটাও হারিয়ে গেল। তার মানে খেলার স্বার্থে তাকেও বলি দেয়া হয়েছে। টাইটানের কারো হাতেই আছে আসল নাটাই। সমস্যা হল, সে যে কে তা খুঁজে পাবারই কোনো উপায় নেই।”

.

১৮. গুড়গাঁও 

গুড়গাঁওয়ে অবস্থিত দ্য ওয়েস্টিন হােটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইটের ফ্ল্যাট স্ক্রিন মনিটরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে পিটার কুপার। রুমের এক কোণায় যন্ত্রপাতি ভর্তি একটা তাক থেকে ঝুলছে একগাদা তার। আরেক সারি সার্ভারের সাথে গিয়ে মিশেছে।

কুপার এই কম্পিউটার জিনিসটাকে একটুও বােঝে না। বাহান্ন বছরের জীবনে টেকনােলজির সাথে কখনােই তেমন বন্ধুত্ব হয় নি। একুশ বছর বয়সে যখন অর্ডারে যােগ দিয়েছে, তখন সম্বল ছিল কেবল ভাড়া করা পিস্তলের টেলিস্কোপিক সাইট দিয়ে যে কোনাে দূরত্বে দেখা চলন্ত টার্গেটে লাগাবার ক্ষমতা। এছাড়া সৃষ্টিকর্তা ওকে সত্যিই এক অত্যাশ্চর্য স্মৃতিশক্তি দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর এই দুই দক্ষতা মিলে তাকে বানিয়ে তুলেছে এক ভয়ংকর গুপ্তঘাতক। দিনে দিনে যা আরাে শাণিত হয়ে উঠছে।

এ পর্যন্ত যে কতজনকে খুন করেছে তার কোনাে হিসাবও নেই নারী, পুরুষ, ছােট ছােট ছেলে-মেয়ে। আসলে কুপারের কাছে এরা কোনাে সংখ্যা নয়। মানুষ হিসেবে ভাবা তাে বহু দূরের কথা। কুপারের কাছে এরা কেবল সহজ-সাধারণ টার্গেট। যাদেরকে খতম করাটাই আনন্দের। নিজের কাজটা সে ভালােই বােঝে । নিয়মিত সাফল্য নিয়ে তাই যথেষ্ট গর্বিত। একট! টার্গেট ও কখনাে মিস হয়নি। এমনকি ট্রিগারের উপর হাত কাঁপারও অভিজ্ঞতা হয় নি।

বছরের পর বছর ধরে অর্ডারে তাই প্রভাব প্রতিপত্তিও বেড়ে গেছে। এখন তার কাজগুলাে কৌশলগতভাবে বেশি গুরুত্ব পায় যার মানে হল আগের তুলনায় কম অ্যাসাইনমেন্ট। যদিও বয়সের ভারেন্সেখের দৃষ্টি এখনাে একটুও মান হয় নি। অবশ্য তার সফলতার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একটা বিরাট ভূমিকা রাখলেও সেটা কখনাে তেমনভাবে স্বীকার করে না। তার মতে এক স্ট্যাটেজিস্টের মারণাস্ত্র হল মাথা। সেখানেই থাকে, সব প্রযুক্তিবিদ্যা। বাকি সবকিছু অনর্থক।

“বর্তমান স্ট্যাটাস কী?” কনসােলে বসে থাকা টাক মাথা লােকটার কাছে জানতে চাইল কুপার। মোচঅলা লােকটার নাম কৃষাণ। স্থানীয় টেকনােলজি টিম চালায়। গাত্রবর্ণ কালো হলেও আইটিতে একটা জিনিয়াস। কুপারের তাই ধারণা।

থেসালোনিকিতে পুলিশ জড়িয়ে পড়ার পর এলিসের পিছু না নিয়ে ট্রাক করার সিদ্ধান্ত নেয় কুপার। গোপন এই মিশন লোকচক্ষুর অন্তরালেই সারতে চেয়েছিল। অন্যদিকে মিডিয়ার কাছে খনন সাইটের ঘটনাটা যাতে লিক না হয় সেদিকটা সামলেছে স্ট্যাভরস। সত্যি ব্যাপারটা তাই কেউ জানতেই পারবে না। আর মিশনটাও সিক্রেট থাকবে।

কেবল বিষফোঁড়া হল এলিস। মেয়েটা যে কেবল চাক্ষুষ প্রত্যক্ষদর্শী তা নয়, ওর কাছে মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদটাও রয়ে গেছে। যেমন করেই হোক তা এবার পেতেই হবে। তবে এতে করে তার কিংবা মিশনের প্রতি যেন কারো দৃষ্টি না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

থেসালোনিকিতে মেয়েটা উধাও হবার পর থেকেই বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেছে। তারপর টের পেয়েছে যে এলিস সে দেশ ছেড়েই চলেছে। কিন্তু কুপারও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। বিশেষ করে যখন জানত যে ওর পাসপোর্ট সাইট হোটেলেই রয়ে গেছে। নিজের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কুপার থেসালোনিকিতে আমেরিকান কনস্যুলেটেও যোগাযোগ করেছে। সেই গ্রিক সিংগেল মাদার প্রথমে সাহায্য করতে রাজি না হওয়ায় তার পাঁচ বছরের মেয়েটাকেও তুলে আনতে হয়। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে এরপরই কুপারকে গড়গড় করে সবকিছু বলে দিয়েছে শোকার্ত মা। ওয়াশিংটন থেকে স্পেশ্যাল অর্ডারসহ দ্রুত গতিতে এলিসের পাসপোর্ট ইস্যুর কথাও তার কাছ থেকেই জানতে পেরেছে। পরের দিন সকালবেলার নিউজপেপারে সবাই মাতা কন্যার গলা কাটা মৃতদেহের ছবি দেখেছে। এটা অবশ্য কুপারের স্টাইল নয়। এসব তার নতুন ডেপুটির কর্ম। ছোকরা আবার অস্ত্রের চেয়ে ছুরিতেই বেশি পটু।

পরের স্টপ হল গ্রিক ইমিগ্রেশন। যেখানে তার বেতনভুক্ত কন্ট্যাক্ট নেটওয়ার্ক আছে। তাদের কাছেই শুনেছে যে এলিস ভারতের নিউ দিল্লির উদ্দেশ্যে প্রাইভেট জেটে চড়ে বসেছে।

স্ট্যাভরসকে গ্রিসের দেখভালের জন্য রেখে অর্ডারের দেয়া প্রাইভেট জেটে করে কুপার নিজেও উড়ে এসেছে একই জায়গায়। ভারতে নেমে লোকাল মেলের সাথে যোগাযোগ করে গুড়গাঁওতে হেডকোয়ার্টার সাজিয়েছে। এখন শুধু জানার বাকি যে এলিস কোথায় আর কার কাছে উঠেছে। ব্যাপারটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। নিজের মিশন পুরো করার জন্য কেউ আর তাকে আটকাতে পারবে না। এলিস তো একটা উটকো ঝামেলা। একটা পিপড়া, যেটা কিনা পিকনিকের বারোটা বাজাতে এসেছে। এখন এটাকে পিষে মারার সময় হয়েছে।

নিজের চেয়ার ঘুরিয়ে কুপারের দিকে তাকাল কৃষাণ। “মেয়েটা জোনগড়ের একটা দুর্গে উঠেছে। নিউ দিল্লি থেকে দূরত্ব ১৩০ কি. মি. ওর সাথের লোকজনদেরকে আইডেন্টিফাই করেছি।” থেমে গেল কৃষাণ। “খবর বেশি ভালো না।”

ভ্রু তুলে তাকাল কুপার। “সাথে দুজন আমেরিকান নাগরিকও আছে। একজন আবার জন্মসূত্রে ভারতীয়। বিজয় সিং। অন্যজন হল কলিন বেকার। আরেকজন মেয়ে আছে যে কিনা ইন্ডিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাটোমিক এনাজিতে কাজ করে, নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট রাধা শুক্লা। আরো আছে ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর স্পেশাল ডিরেক্টর ইমরান কিরবাঈ।”

ভ্রুকুটি করল পিটার। মেয়েটা তত মনে হচ্ছে ভালই সেয়ানা। এরই মাঝে ইন্ডিয়ান ইনটেলিজেন্স এজেন্সিকেও জড়িয়ে ফেলেছে। কৃষাণ ঠিকই বলেছে। খবর মোটেও ভালো না। “আইবি’র লোকটা এখানে কী করছে? তাদের আলোচনা সম্পর্কে কিছু জানা যায় না?”

“আমাদের টিম জায়গামতই আছে। কিন্তু ওরা এমন একটা রুমে আছে যেখানে কোনো সারভেইল্যান্স কাজ করে না। অডিও কন্ট্রাক্টও নেই। আর এমন কোনো ফাঁক নেই যেখান দিয়ে ভিজুয়াল কন্ট্রাক্ট করা যাবে। ফলে কোনো উপায়ই দেখছি না।” স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কুপার। “আসলে আমাদের স্টিগ্রে থাকলে ভাল হত। তাহলে তাদের কলগুলোও ট্র্যাক করে সব বের করে ফেলা কোনো ব্যাপারই ছিল না।”

এবার ভ্রুকুটি করল কুপার, “এই মিশনকে এমনিতেই যতটা সম্ভব লো প্রোফাইল রাখতে চাইছি। একটা দেশে স্টিনগ্রে নিয়ে আসার মানে তুমি জানো? সম্ভাবনার পাশাপাশি আমাদের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেবে। তুমি না একটা জিনিয়াস? তো হাতের কাছে যা আছে তাই নিয়েই কাজ করো না।”

নিজের অপশনগুলোও খতিয়ে দেখল। যদি টার্গেট সত্যিই একটা দুর্গে গিয়ে লুকিয়ে থাকে তাহলে তো হেভি গোলাবারুদ ছাড়া কাজ হবে না। কিন্তু তাতে করে আবার মানুষের নজর কাড়ার ঝামেলাও আছে।

এর পরিবর্তে তাই নির্দেশে জানাল, “আমাদের সবকয়টা টিমকে সজাগ থাকতে বলল। ওই দুর্গের প্রতিটা মানুষের গতিবিধি আমাকে জানাবে। ওরা কোথায় যায়, কী করে কিছু বাদ দেবে না।”

হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে ফেলল কুপার। বছরের পর বছর ধরে ট্রিগার টেপার জন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা তাকে ধৈর্যশীল হতে শিখিয়েছে। তাই আজও এর ব্যত্যয় হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই সঠিক মুহূর্ত নিজে থেকে এসে ধরা দেয়।

আর এর যে বেশি দেরি নেই সেটাও ভালোভাবেই জানেন। সব সময় তাই হয়েছে।

.

১৯. কৌতূহলোদ্দীপক এক আবিষ্কার

কেল্লার দোতলায় গবেষণা কক্ষে বসে নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিন দেখছে বিজয়। ইমরান আর রাধা টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে মিটিংয়ের জন্য বের হয়ে যাবার পর থেকেই চোখ দুটো আঠার মত জার্নালের পাতায় সেটে আছে। মাঝে মাঝে আবার নোটপ্যাডে নোটও নিচ্ছে।

রাধার খুঁজে পাওয়া জার্নালটা পড়ার পর গত আধঘণ্টা ধরে নিজের নোট রেফার করে ইন্টারনেট সার্চ করছে। এই ফাঁকে মাত্র একবারই কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নিয়ে ঘুরে এসেছে পাঁচতলার সেই বিশেষ রম থেকে, যেখানে বাবা মায়ের জিনিস ভর্তি কার্টনগুলো পেয়েছিল। তবে কাঙ্ক্ষিত ফাইলটা খুঁজে পেতেই আবার দৌড়ে গবেষণা কক্ষে চলে এসেছে।

হঠাৎ করে দরজায় নক শুনে চোখ তুলে তাকাল বিজয়।

“ওই, তোমার কি শেকড় গজিয়ে গেল নাকি?” ভেতরে এলো কলিন।

বন্ধুকে দেখে দেঁতো হাসি দিল বিজয়। জানে কৌতূহলে কলিনের পেট ফেটে যাচ্ছে। এতক্ষণ যে অপেক্ষা করেছে সেটাই বেশি।

ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল কলিন, “ইমরানের সাথে ওর মিটিং কেমন হয়েছে তুমি জানতে না চাওয়ায় এলিস খানিকটা রুষ্ট হয়েছে। বাকিদেরকে ব্রিফ করার পর স্টাডিতে বসে এলিসের সাথেও আধাঘণ্টা কথা বলে গেছেন ইমরান। কিন্তু বিজয়ের মাথায় কেবল জার্নালের কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই রাধা আর ইমরান চলে যেতেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে গেছে।

“ওতো আর ছোট খুকী নয়” পাল্টা আবারো একবার হাসল বিজয়, “তাহলে জিজ্ঞেস করার কী আছে? আর ইমরানও বেশ সজ্জন মানুষ। যদিও বুদ্ধিমানও বটে। তাই জানি সব ভালোই হয়েছে।”

মাথা নাড়ল কলিন, “উনি এলিসকে একগাদা প্রশ্ন করে ওর খনন সাইট, ওয়ালেস আর তার স্ট্রাস্ট, ওই রাতে ওর সাথে কী কী ঘটেছে স জেনে নিয়েছে। এমনকি হোয়াটস অ্যাপে স্ট্যাভরস আর পিটারের ছবিও পাঠাতে বলেছেন উনার নাম্বারে। দেখতে চাইছেন ওই দুজন সম্পর্কে কিছু বের করা যায় কিনা।”

এরপর কৌতূহল নিয়ে বিজয়ের জার্নাল আর নোটপ্যাডের দিকে তাকাল, “আচ্ছা তুমি কী নিয়ে এত ব্যস্ত?”

“আমি একটু পরেই তোমাদেরকে জানাতাম। এত আকর্ষণীয় একটা জিনিস পেয়েছি না! আর এলিস দেখলে তো হা হয়ে যাবে। আমাদের হাত ধরেই সমাধা হবে এক প্রাচীন রহস্য।”

ঘোৎ ঘোৎ করে উঠল কলিন, “জানতাম যে এরকমই একটা কিছু ঘটবে। আসলে তোমাকে একা রেখে যাওয়াটাই ভুল হয়েছে।” কিন্তু বন্ধুর কথা শুনে আবার আগ্রহও হচ্ছে, “একটু থামো; এলিস আর ডা. শুক্লাকে নিয়ে আসি।”

অন্যেরা আসতে আসতে সেন্টার টেবিলের উপর সব গুছিয়ে রাখল বিজয়; জার্নাল, ল্যাপটপ আর পাঁচতলা থেকে নিয়ে আসা ফাইল।

কলিন আর ডা. শুক্লার সাথে রুমে ঢুকেই উৎসাহ নিয়ে ওর দিকে তাকাল মেয়েটা।

“এলিস” শুরু করল বিজয়, “এটা তোমার বিশ্বাস না হলেও আশা করছি ভালো লাগবে। আজ সকালে তুমি যখন অলিম্পিয়াসের কথা বললে তখনি কেন যেন মনে হয়েছিল যে এই নামটা আগেও কোথাও যেন শুনেছি। পড়ে মনে পড়ল যে কোথাও পড়েছি। এখানে, দেখো।” জার্নালটাকে তুলে নিল হাতে, “মেসিডোনিয়ার ইউমেনিসের একটা সিক্রেট জার্নাল।” আগ্রহ নিয়ে তাকাল বিজয়।

একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে এলিস। বুঝতে পারছে না বিজয় ওর সাথে তামাশা করছে কিনা। একটা সিক্রেট জার্নালং ইউমেনিসের?” কণ্ঠস্বরেই বোঝা গেল যে কতটা ধাঁধায় পড়ে গেছে। “সত্যি বলছ তো?”

হেসে ফেলল বিজয়। জার্নালটা পড়ার পর ইন্টারনেটের রেফারেন্স থেকে গ্রিক ইতিহাস সম্পর্কে এত কিছু জেনে গেছে যে এলিসের কাছ থেকে ঠিক এই প্রতিক্রিয়াই আশা করেছে।

“ফাইন” নিজের নোটগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। এখানে এমন কিছু তথ্য আছে যা বললে বুঝে যাবে যে আমি কতটা সিরিয়াস: আলেকজান্ডারের হয়ে সগডিয়ান পাথরের কাছাকাছি ব্যাকট্রিয়াতে ক্যালিসথিনস একটা সিক্রেট অভিযানে গিয়েছিলেন। এছাড়াও ভারত আক্রমণের সময়ও আলেকজান্ডার আর ইউমিনেস, দুজনে মিলে আরেকটা গোপন মিশনে অংশ নিয়েছিলেন।”

একেবারে হা হয়ে গেল এলিস। বিজয় যা যা বলছে সব সত্যি হলেও ইউমিনেসের যে একটা সিক্রেট জার্নাল আছে তা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। অথচ এখানে একেবারে তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে।

“আমাকে একটু দেখতে দেবে?” হাত বাড়াতেই ওকে জার্নালটা দিল বিজয়।

“দাঁড়াও দাঁড়াও” বন্ধুর হাত ধরে ফেলল কলিন, “ইউমিনেস কে? ক্যালিসথিনসই বা কে? ক্যালিসথেনিকস এর আবিষ্কারক?”

“ক্যালিসথিনস, দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের সময়কার গ্রিক ইতিহাসবিদ” খানিকক্ষণের জন্য জার্নাল থেকে মনোযোগ সরিয়ে

কলিনের প্রশ্নের উত্তর দিল এলিস। “ফোসিয়ান যুদ্ধ আর গ্রিসের বিস্তৃত ইতিহাসের লেখক। তবে সম্ভবত দ্য ডিডস অব আলেকজান্ডার লিখে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। সেখানে আলেকজান্ডারের সবকয়টা অভিযান সম্পর্কে লিখে তাকে দেবত্ব দান করে গেছেন। অনেকেরই মতে, জিউসের পুত্র সম্পর্কিত আলেকজান্ডারের জন্য নিয়ে সেই লোককাহিনির প্রতিষ্ঠাতাও তিনিই। গ্রিকবাসীর দুনিয়ায় সিওয়াতে আলেকজান্ডারের ভ্রমণ আর প্যাম্পিলিয়াতে সমুদ্রের দুভাগ হয়ে যাবার গল্পও তিনিই ছড়িয়েছেন। সেই সিওয়াতেই নাকি ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ওরাকল আলেকজান্ডারকে জিউস আমানের পুত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে নির্মম ব্যাপার হল, তিনিই আলেকজান্ডারকে দেবতা রূপে পরিচিত করেছেন আবার এ কারণে উপহাস করাতেই মৃত্যুবরণও করেছেন।”

“ওয়াও! তার মানে আলেকজান্ডার নিজেকে সত্যিই ঈশ্বর মনে করত নাকি?” কলিন এবারে সত্যিই বিস্মিত হন।

“ইয়েস” ওর অবস্থা দেখে হেসে ফেলল এলিস। “৩২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মধ্য এশিয়ায় বিজয় লাভের পর আলেকজান্ডার বাল্ক শহরে ক্যাম্প করে ঘোষণা করে দেন যে তাঁকে দেবতা হিসেবেই উপাসনা করতে হবে। পারস্য আর মধ্য এশিয়ায় জয়লাভ, সিওয়ার ওরাকলের স্বীকৃতি, অভিযান সম্পর্কে ক্যালিসথিনসের উচ্চ প্রশংসা সবকিছু মিলিয়ে তাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে তিনি বুঝি সত্যিই ঈশ্বর।”

“অথচ ক্যালিসথিনসই তাকে ঈশ্বর হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন।” বিড়বিড় করে গত আধঘণ্টা ধরে নিজের রিসার্চ স্মরণ করে নিল বিজয়।

মাথা নেড়ে সম্মত হল এলিস। “কারেক্ট। আর তিনি যে শুধু প্রত্যাখ্যান করেছেন তা না; ইলিয়াডের একটা লাইন উদ্ধৃত করে আলেকজান্ডারকে বলেছেন :

“প্যাট্রোক্লাস তোমার চেয়েও উত্তম ছিল; কিন্তু মৃত্যু তাকেও ছেড়ে দেয়নি।”

“এটা তো এক ধরনের বিপ” মন্তব্য করল কলিন, “মানে লোকটা আরেকটু নরম স্বরে বোঝাতে পারত। কাউকে ঈশ্বর না বলার ক্ষেত্রে আরো তো কত উপায় আছে। বিশেষ করে যখন তার কাছে তলোয়ার থাকে।”

“এই কারণেই আলেকজান্ডার তাকে হত্যার আদেশ দেন। সে সময়ে অবশ্য নিজের বিরুদ্ধ মতের কাউকেই আর সহ্য করতে পারতেন না। একই সময়ে আবার আলেকজান্ডারকে গুপ্ত ঘাতকের হাতে মারার ষড়যন্ত্র হয়। আর সেই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার মিথ্যে অভিযোগে ক্যালিসথিনসকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে মেরে ফেলা হয়। আলেকজান্ডার নিজে তাঁকে ক্রুশে দিয়েছেন।

থরথর করে কেঁপে উঠল কলিন, “কী ভয়ংকর। আর ক্যালিসথিনস তার জন্যে এত কিছু করার পরেও আলেকজান্ডার এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাহলে মেসিডোনিয়ার ইউমিনেস কোত্থেকে আসলো?”

বিজয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল এলিস, “বিজয় নিজে যেহেতু একা একা গোপন কিছু রিসার্চ করেছে, তাহলে এটাও সেই জানাক।”

.

২০. ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ

মেসিডোনিয়া, গ্রিস

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে একদৃষ্টে দেখছেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের স্ত্রী অলিম্পিয়াস। বাদামি দেহত্বক, কালো চোখ আর কৃষ্ণবর্ণের চুলঅলা লোকটার পরনে এমন এক ধরনের সাদা ঢোলা পোশাক যা তিনি আগে আর কখনো দেখেননি। একই সাথে এটাও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে তার কাছেই সেই বিশেষ সংবাদটা আছে। অর্ডারের একেবারে উপর মহল থেকে যদি নিশ্চয়তা না পেতেন তাহলে তো দেখার সাথে সাথে একে বিদায় করে দিতেন। দ্বিতীয়বার চিন্তা করার কোনো প্রয়োজনই হত না।

“আমি শুনেছি তুমি নাকি দেবতাদের সিক্রেট সম্পর্কে অনেক কিছু জানো?” স্থির দৃষ্টি দিয়ে লোকটাকে একেবারে বিদ্ধ করে দিয়ে অবশেষে বলে উঠলেন অলিম্পিয়াস।

মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল সাদা পোশাকধারী, “যা, কিন্তু তারা আপনার দেবতা নন। প্রাচ্যের দেবতা। আমার জনগণের দেবতা। লোকটার উচ্চারণ বেশ অদ্ভুত আর কথাও বলছে ধীরে ধীরে। এই ভাষা বোধহয় তেমন জানে না।

ভ্রুকুটি করলেন অলিম্পিয়াস। লোকটার নির্লিপ্ততা আর তার রাজকীয় পদমর্যাদার প্রতি ঔদাসীন্য দেখে বিরক্ত লাগছে। কিন্তু সেই তথ্যটাও জানা দরকার। অধীর হয়ে এরই জন্য এত অপেক্ষা। তাই নিজের রাগ কমিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। একবার যখন পেয়ে যাবেন সেই কাঙ্ক্ষিত বস্তু তখন আর এই উজবুকের ভাগ্য নির্ধারণে ভাবার কিছু থাকবে না।

“আমি তা জানি। সেটা কোনো সমস্যাই না। কার দেবতা তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই। ঠিক আছে?”

নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল বাদামি গাত্রবর্ণ, “এই লোকগাঁথা সম্পূর্ণ সত্য। আমি তার জামিন দিচ্ছি।”

“তুমি যে সত্যি কথা বলছ, সেটাই বা কিভাবে জানব?” জানতে চাইলেন অলিম্পিয়াস।

এবার স্থির দৃষ্টিতে তাকাল লোকটা, “হে রানি, আপনি কী আমাকে সন্দেহ করেন?” এতটা সোজা-সাপ্টা প্রশ্ন শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন অলিম্পিয়াস। হেসে ফেলল লোকটা। “এতটা ঔদ্ধত্য। এত উচ্চাকাভক্ষা আর আমার কথায় যদি ভরসা না থাকত তাহলে এতগুলো নদী আর সমুদ্র পেরিয়ে এখানে আনার ব্যবস্থা করতেন না, নিশ্চয়। তারপরেও আপনার সন্দেহের জন্য ক্ষমা করে দিচ্ছি। যারা জানে না তাদের কাছে এই পুরান বিশ্বাস করা সত্যিই কষ্টকর।”

অলিম্পয়াসের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য খানিক বিরতি দিয়ে আবার বলল, “ও রানি, আপনার কী মনে হয়? আমার বয়স কত?”

আবার ভ্রু-কুঁচকে ফেললেন অলিম্পিয়াস। এই লোকটার বয়স কত তা জেনে কী হবে? শুধু তো সেই তথ্যটাই দরকার। তাই হালকাভাবে কাঁধ আঁকিয়ে বললেন, “আমি কিভাবে জানব?”

“গত ছয়শ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে আমি এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াচ্ছি। বছর গোনা বাদ দিয়ে তাই এখন শুধু দশক হিসাব করি।”

পুরোপুরি সজাগ হয়ে গেলেন অলিম্পিয়াস। এবারে তো তাহলে লোকটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যাপারটা সত্যিই আলাদা। দেখে তো চল্লিশের বেশি মনে হচ্ছে না অথচ কিনা বলছে ছয়শ। যদি তার দাবি সত্য হয় তো…

মনে মনে ভেবে দেখলেন রানি। “দেবতাদের সিক্রেট কোথায় লুকানো আছে আমাকে বলো?” সাগ্রহে সামনে ঝুঁকতেই দেখা গেল জ্বলজ্বল করছে চোখ।

“এখান থেকে অনেক দূর, হে রানি” উত্তরে জানাল লোকটা। “ইন্দুস ভূমির এক গোপন স্থানে। এমনভাবে লুকানো আছে যেন অজানা কেউই হাত দিতে না পারে।”

“দুনিয়ার একেবারে শেষে ফিসফিস করে উঠলেন অলিম্পিয়াস। উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চেহারা।

“গ্রিকদের মত এত উন্নত একটা জাতি হয়েও পৃথিবী সম্পর্কে আপনি এত কম জানেন দেখে অবাক লাগছে।” বিদ্রূপ করে মন্তব্য করল দার্শনিক লোকটা।

তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন অলিম্পিয়াস। লোকটা তো মহাপাজি। এক আই ব্রো তুলে জানতে চাইলেন কী বলতে চায়।

“আপনার দার্শনিকেরা কি এটাই শেখায়? যে দুনিয়ার শেষ মাথা ইন্দুসের ওপারে? তাহলে আপনার পুত্রও পৃথিবীর শেষ অব্দি পৌঁছানোর জন্য তার বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে আর যখন ফিরে আসবে তখন সেই হবে মেসিডোনিয়ার সবচেয়ে জ্ঞানী।” এরপর গলার স্বর নিচু করে জানাল, “আপনাকে জানিয়ে রাখি হে রানি ইন্দুসের ওপারেও ভয়ংকর আর চওড়া সব নদীর ধারে ছড়িয়ে আছে পৃথিবী। আছে শক্তিশালী সব রাজা আর আপনার ধারণারও বাইরে সব অস্ত্র। এসকল ভূমি একদা দেবতাগণ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই প্রয়োজন মিটে গেলেই যেন ফিরে আসে আপনার পুত্র। নতুবা আপনার আর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিলে মেসিডোনিয়াকে ধ্বংস করে দেবে।”

লোকটার স্পর্ধা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন রানি অলিম্পিয়াস। কিন্তু তারপরও নিজেকে শান্ত করলেন। কেননা এখনো মোক্ষলাভ হয়নি। বদলে তাই জানতে চাইলেন, “তাহলে আমাকে কী দিতে চাও?”

নিজের ঢোলা পোশাকের পকেট থেকে লুকানো কী যেন বের করে রানির হাতে দিল লোকটা। “পূর্বপুরুষেরা আমাদের জন্য বানিয়ে গেছেন। তবে খোদাইকৃত লেখাগুলো আপনি বুঝতে পারবেন না। কেননা আপনি তো আর আমাদের দেবতাদেরকে চেনেন না!” এরপর একটা পার্চমেন্ট বের করে রানির হাতে দিয়ে জানাল, “এখানে আসার সময় এটা আমি আপনার জন্য বানিয়েছি। শিলালিপি গ্রিকে লেখা। আমি বুঝিয়ে বলব নচেৎ বুঝবেন না। আর এটা” একটু আগেই রানির হাতে দেয়া দুটো জিনিসের একটাকে ইশারা করে বলল, “আমাদের দেশে অবশ্যই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ইন্দুস পার হবার পরে আপনার পুত্র যেন একেবারে গহীনে লুকিয়ে রেখে দেয়। যেন আর কেউ খুঁজে না পায়।” আবার কিছু বলার আগে খানিকক্ষণ বিরতি নিল। চেহারা এবার বেশ সিরিয়াস দেখাচ্ছে, “কিন্তু খুব সাবধান। পুরো ব্যাপারটাই, অত্যন্ত বিপজ্জনক। নির্দেশগুলোকে ঠিকঠাকভাবে না মানলে সামনে কেবল মৃত্যুই আছে।”

জিনিস দুটো হাতে নিতেই উত্তেজনায় কেঁপে উঠল রানি অলিম্পিয়াসের হাত। প্রথমটা দেখে মনে হচ্ছে হাড়ের তৈরি কিউব। নিশ্চয় বেশ প্রাচীন। বয়সের ভারে হলুদ হয়ে গেছে। গায়ে খোদাই করা ভাষাটা সত্যিই অজানা। দ্বিতীয় জিনিসটা হল শিলালিপি খোদাই করা কালো একটা ধাতব পাত। পার্চমেন্টের শিলালিপি বুঝিয়ে দিয়ে কী কী করতে হবে রানিকে সেই নির্দেশনাও দিয়ে দিল লোকটা।

চামড়া সদৃশ্য কাগজের একটা জায়গা দেখিয়ে জানাল, “এখানে গিয়ে আপনার পুত্রকে থামতেই হবে। এর বেশি যেন কিছুতেই না এগোয়। সেখান থেকেই বাসায় ফিরতে হবে অথবা আর ফেরারই অবস্থা থাকবে না।” এদিকে অলিম্পিয়াসের তেমন আর মনোযোগ নেই। চামড়ার উপর চোখ বোলাতেই উত্তেজনা আরো বেড়ে গেল। পুত্র আলেকজান্ডারের জন্য তাঁর পরিকল্পনা এবার সফল হতে চলেছে। এরই মাঝে পুত্রের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির ক্ষুধাও টের পেয়েছেন। ফিলিপের রেখে যাওয়া সীমানা বৃদ্ধিই তাঁর কাম্য। আর এবার দেবতাদের সিক্রেট হাতের মুঠোয় চলে আসায় দুনিয়ার বুকে পুত্রের শাসনভার তিনি নিশ্চিত করেই ছাড়বেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়। ঈশ্বর হিসেবেই এ পৃথিবী শাসন করবে আলেকজান্ডার।

৩. বর্তমান সময়

তৃতীয় দিন
এক অদ্ভুত ইন্টারভিউ

সিএমওর সাথে মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভারতে টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের হেডকোয়ার্টারের চওড়া লবিটাকে খুঁটে খুঁটে দেখছে রাধা। ইচ্ছে করেই কয়েক ফুট দূরে আরেকটা চামড়ার সোফায় বসে থাকা ইমরানের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। দুজনে একই সময়ে পৌঁছালেও এসেছে ভিন্ন ভিন্ন গাড়িতে। আইবির এক ফিল্ড এজেন্ট রাধাকে এখানে দিয়ে গেছে; আবার ফিরিয়েও নিয়ে যাবে।

দালানটা গুড়গাঁওয়ের বেশির ভাগ কর্পোরেট অফিসের মতই সাদামাটা ছয়তলা একটা স্টিল আর গ্লাসের তৈরি কাঠামো। তবে অন্দর মহলে মার্বেলের মেঝে, রিসেপশনে গ্রানাইট কাউন্টার আর লবির একেবারে মাঝখানে একটা ঝরনা থাকায় ব্যবসার সমৃদ্ধি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।

বসার একটু পরেই এগিয়ে এলো মরচে রঙা চুল আর লম্বা, কৃশকায় এক লোক। পরনে ল্যাবরেটরি কোর্ট আর হাবভাবে কর্তৃত্ব দেখে বোঝা গেল যে ডা. বরুণ সাক্সেনা। মুগ্ধ হয়ে গেল রাধা। ভদ্রলোক নিজে এসে লবিতে ওর সাথে দেখা করে উপরে নিয়ে যাবেন এতটা আশাও করেনি। কিন্তু তারপরই তাকে জানানো হল যে রাধা একজন জার্নালিস্ট আর মেডিকেল ফ্যাসিলিটির অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে কাভার করতে এসেছে। বুঝতে পারল কোম্পানি প্রেসকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। শোনার সাথে সাথেই কেমন ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে কনফার্ম করে দিলেন।

“হ্যালো সিমা” রাধার ভুয়া নাম ধরে অভিবাদন জানাল রোগা লোকটা। তবে চেহারা দেখে বোঝা গেল যে জোর করে হাসছে। তার মানে এই মিটিং নিয়ে তেমন খুশি না; অথচ হাতে কোনো অপশনও নেই। “আমি ডা. বরুণ সাক্সেনা।”

পাল্টা সম্ভাষণ জানিয়ে রাধা বলল, “এত শর্ট নোটিসে আমার সাথে মিটিং করতে রাজি হয়েছেন তাই ধন্যবাদ। আগামীকালকেই এ সংবাদটা ছাপতে চাইছি। তাই যদি আরো কিছু জানা যায়।”

সুযোগটা লুফে নিল সাক্সেনা। “ওহ, আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এখানে আর বেশি কিছু বলার নেই। আপনি যা যা জানতে চান বলতে আমার আপত্তি নেই; তবে মনে হয় না তেমন কোনো চটকদার কিছু পাবেন।” পরিবেশকে হালকা করার জন্য হাসার চেষ্টা করে বলল, “চলুন উপরে গিয়ে কথা বলি?”

রাধা মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই দুজন চুপচাপ পাঁচতলায় উঠে এলো। মিটিং রুমে বসার পর সাক্সেনা কফির অর্ডার দিতেই সোজা পয়েন্টে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিল রাধা।

“পূর্ব-দিল্লিতে আপনার ফ্যাসিলিটিতে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে বেশ কিছু গুজব শোনা যাচ্ছে তাই ভাবলাম সত্য খবরটা আপনার কাছেই পাওয়া যাবে।”

“ওহ অবশ্যই, কেন নয়।” দাঁত দেখিয়ে হাসার চেষ্টা করল সাক্সেনা, সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে। এবার বলুন আপনি কী শুনেছেন?”

“ওয়েল” রাধা এমনভাবে থেমে গেল যেন নিজের কথাগুলো সাজিয়ে “ নিচ্ছে, “শুনেছি কয়েকটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নাকি ডিসিজি আই অ্যাপ্রুভ করেনি। ভয়ংকর মাইক্রোবস নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছিল।”

নার্ভাস ভঙ্গিতে হেসে ফেলল সাক্সেনা। মনে হচ্ছে এ প্রশ্নটারই আশঙ্কা করছিল। “আপনি যাই শুনে থাকুন না কেন তা পুরোপুরি মিথ্যা। ফ্যাসিলিটি টাইটান যে সমস্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করছিল তার সবটুকুই বোর্ড জানে। জিসিজি আইও অ্যাপ্রুভ করেছে। আপনি চাইলে আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে পেপারসও দেখাতে পারি। আর প্রাণঘাতী মাইক্রোবসের তো প্রশ্নই উঠে না। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এভাবে কাজ করে না। আর টাইটানের নীতিবোধ নিয়ে আমরা গর্বিত। একজন ভাইরোলজিস্ট হিসেবে এসব হাবিজাবি আমার অজানা থাকার কথা নয়। কিছু হলে আমি ঠিকই টের পেতাম।

“আর ফ্যাসিলিটিতে যে মৃতদেহগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো? এ ব্যাপারে আপনার মত কী?” রাধা জানে যে ইমরান মৃতদেহের কথা এখনো সর্বসাধারণকে জানাননি। কেননা তাহলে গণমাধ্যমের নজরে পড়বে আর তদন্ত বানচাল হবে। তাই সাক্সেনাও নিশ্চয় অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে।

সত্যিই তাই, লোকটা যেন আকাশ থেকে পড়ল। বোঝা গেল যে এ প্রশ্ন আসতে পারে ভাবতেই পারেনি। চোখ সরু করে জানাল, “এটা আপনি কোথা থেকে শুনলেন? এটা একেবারেই সত্য নয়। আগুনে কেউ নিহত হয়নি। প্রপার্টি আর ইকুপমেন্টের ক্ষতি হলেও হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাধা, “ডা, সাক্সেনা আপনি নিশ্চয় জানেন আমাদের মানে জার্নালিস্টদের সোর্সের কোনো অভাব নেই। এমনকি পুলিশেও লোক আছে। আমি যা শুনেছি তার সাথে আপনার কথা মিলছে না। সোর্স অনুযায়ী, দমকল কর্মীরা পৌঁছানোর পর বিল্ডিংয়ে কাউকেই দেখতে পায়নি। স্টাফ, ল্যাব টেকনিশিয়ান, রিসার্চার কেউ ছিল না। সবাই যেন হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কেবল গোপন বেজমেন্টের বাইরে থেকে তালা দেয়া হাইটেক সেলে মৃতদেহগুলো পড়ে ছিল। আমি এও শুনেছি যে বেচারা লোকগুলোকে গুলি করে মারা হয়েছে। তাদের মৃত্যুর কারণ অগ্নিকাণ্ড নয়। আমার মনে হয় আপনার এই কথাটা অন্ত ত সত্যি যে, আগুনে কেউ মারা যায়নি।

সাক্সেনার কাঁধ ঝুলে পড়ল। চেহারাতেও অসন্তুষ্টি। তবে ক্ষণিকের মাঝেই আবার নিজেকে সামলে নিল। তার মানে, হয় সে মিথ্যে বলায় ট্রেনিংপ্রাপ্ত নয়ত এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে পটু।

“ওকে ফাইন” রাধার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল ডা. সাক্সেনা, “আমি তো ভেবেছিলাম যে এই ব্যাপারে কেউ কিছু জানেনা। দুঃখিত যে আপনাকে মিথ্যে বলেছি। তবে আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা নাজুক।” মাথা নেড়ে আরো জানাল, “ওইসব মৃতদেহ সেখানে কিভাবে কিংবা কেন এলো সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। বিশ্বাস করুন টাইটানের মূল্যবোধ আর ন্যায়নীতি বেশ কড়া। আমাদের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান কার্ট ওয়ালেস শুধু ইউএসে নয় বরঞ্চ সারা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ব্যক্তি। এটা বলছি না যে আমরা সুবোধ। আমাদেরও ভুল হয়। তবে এ ঘটনাটা তো কোনো ভুল নয়। আমাদের ধারণা, ফ্যাসিলিটির মালিক সুমন পাওয়া কোনো এক ধরনের গোপন অপারেশন পরিচালনা করছিল। যদি জানতে চান কেন, তাহলে বলব উনার সাথে কথা বললেই ভালো হবে। তবে পুলিশ যদি খুঁজে পায়, তবে আপনার সোর্স নিশ্চয় এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে।” শেষ লাইনটা বেশ জোর দিয়ে বলল ডাক্তার।

তার মানে পাওয়ার মৃতদেহের কথা এখনো জানেনা। থাক, রাধাও কিছু বলবে না বলেই ঠিক করল।

“কিন্তু সেন্টারে তো একমাত্র টাইটানের ট্রায়ালই চলছিল।” রাধা এখনো হাল ছাড়েনি।

“ওহ, ইয়েস। অবশ্যই। সেটা তো আমি অস্বীকার করছি না।”

“ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে এরকম একটা ফ্যাসিলিটিতে আপনার সেলের কি দরকার ছিল?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাক্সেনা জানাল, “আপনি শুধু শুধু নোংরা খোঁজার চেষ্টা করছেন। যেমনটা আমি বলেছি এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোও অন্য সব ট্রায়ালের মতই। ল্যাবে আর্য তার রিসার্চ করছিল। তারা এই ফ্যাসিলিটির মালিক। যখন আমরা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই রিসার্চের স্পন্সর হবার জন্যে সম্মতি দিতে ফ্যাসিলিটি চেক করেছিলাম, তখন তো গোপন বেজমেন্ট সম্পর্কে জানতামই না। কেউ সাইট ইন্সপেকশনে গেলে নিশ্চয়ই গুপ্ত রুম খুঁজে বেড়ায় না। আপনি তাই ভুল লোকটাকে ভুল প্রশ্ন করছেন। আমি আবারো বলছি পাওয়াকে জিজ্ঞেস করুন। সেই এসব কাদা ঘাটছিল, টাইটান নয়। ফ্যাসিলিটিতে যা আবিষ্কার করেছেন তা দেখে আপনার মত আমরাও স্তম্ভিত।”

“আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হল” রাধা যেন সাক্সেনার কথা শুনতেই পায়নি, “ফ্যাসিলিটির কেবল তিনটা তুলাই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কাকতালীয়ভাবে এসব তলাতে কেবল ফ্যাসিলিটির সমস্ত মেডিকেল রেকর্ডস আর আইটি সেন্টার ছিল। শুধু এ ফ্লোরগুলোই পুড়ে গেল, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত না? নিশ্চিতভাবেই কেউ ইচ্ছে করে ফ্যাসিলিটির ট্রায়ালের সমস্ত রেকর্ড আর ডাটা নষ্ট করার চেষ্টা করেছে।”

“আমার উত্তর এবারও একই।” খানিকটা কাট কাট স্বরে জানাল সাক্সেনা, “এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কে কিংবা কী দায়ী সে সম্পর্কে আমাদের কোনো আইডিয়াই নেই। তদন্ত শুরু হয়েছে। তাই সন্দেহাতীতভাবেই শেষ হলে আরো অনেক কিছু জানা যাবে। যা করার আছে তা হল অপেক্ষা। আর আমাদের অপিনিওন হল এর জন্য মি. পাওয়াই দায়ী।”

মাথা নাড়ল রাধা। সময় হয়েছে কান ধরে টানার “আমি তো এও শুনেছি যে ফ্যাসিলিটিতে প্রাপ্ত মৃতদেহগুলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াম আর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। যদি এর জন্য মি. পাওয়াকেই দায়ী করা হয় তাহলে তিনি আপনার অজ্ঞাতে কিভাবে আপনারই মেডিকেল সেন্টারে একশরও বেশি লোকের উপর দুটো নতুন ধরনের মাইক্রোবস প্রয়োগ করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছিল?”

এবার সাক্সেনার চেহারা কঠোর হয়ে গেল, বোঝা গেল যে আঘাতটা জায়গামত, লেগেছে। আপনার সোর্স সম্পর্কে আমার সত্যিই জানতে ইচ্ছে করছে। এবারে আর কষ্ট করে হাসার কোনো চেষ্টাই করল না। আপনি অনেক কিছুই জানেন দেখছি। টাইটানের বিরুদ্ধে এতসব জটিল অভিযোগ করছেন যার কোনো প্রমাণই নেই। দুভার্গ্য হল এই বেদনাদায়ক ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণহীনতাকেই তুলে ধরেছে। সেন্টারের স্টাফেরা কেবল তাদের দায়িত্ব পালন করছিল। বিভিন্ন টেস্ট করা, স্যাম্পল নেয়া এসবের মাধ্যমে বিশ্বাস করেছিল যে তারা বৈধ। আমরা আমাদের ইন্টারনাল সিস্টেম চেক করব। আর এটাও চেষ্টা থাকবে যেন এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটে। এ ব্যাপারে আমি নিজে আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।”

খানিকটা ঝুঁকে সামনে আসতেই দেখা গেল পাথরের মত চেহারা ক্রোধে কালো হয়ে গেছে। “আর আমি এটাও জানি যে আপনি এই গল্প লিখবেন না সীমা। কেন জানেন?”

রাধা কিছুই বলল না। লোকটার গলার স্বরে কিছু একটা আছে। ও কী একটু বেশিই বলে ফেলেছে নাকি?

“কারণ” সাক্সেনা আবার শুরু করল, “আপনার হাতে কোনো প্রমাণই নেই। টাইটানকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যদি এসব যথেচ্ছাচার লিখেন তাহলে আপনার সংবাদপত্রের ভরাডুবির ব্যবস্থা আমরাই করব। আর আমি শিওর আপনার এডিটর এতটা রিস্ক নেবেন না।”

এবারে রাধা জানাল, “আর যদি আমরা প্রমাণ খুঁজে পাই তো?” ভয়ে বুক দুরু দুরু কাঁপতে থাকলেও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সি এম ওর দিকে।

মুখ বাঁকা করে হেসে ফেলল সাক্সেনা, “আপনি পাবেন না। আর আমি তো বলব যে সে চেষ্টাও করবেন না। কেননা তাতে সমূহ বিপদ হতে পারে।”

“মনে হচ্ছে আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন ডা. সাক্সেনা?” নিজেকে সামলাতে যুদ্ধ করছে রাধা। হালকাভাবে কেঁপে উঠল নিচের ঠোঁট।

সাথে সাথে বদলে গেল সাক্সেনার গলা। আবারো পরে নিল হাসি-খুশি থাকার মুখোশ। “ওহ, না, আরে কি বলেন।” জোর করে হেসে জানাল, “আমি তো শুধু বলতে চাইছি যে, আমাদের প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে যদি কেউ অবৈধ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালিয়ে থাকে আর এতদিন ধরে, সেটা লুকিয়ে রাখতেও সমর্থ হয় তাহলে নিশ্চয় নিজেদের প্ল্যান বাঁচাতে যে কোনো কিছু করতেও পিছপা হবে না। তাদের সিক্রেট খোঁজার জন্য আশপাশে ছোঁক ছোঁক করা রিপোর্টারকেও নিশ্চয়ই ছেড়ে কথা কইবে না।” উঠে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিল যে মিটিং খতম হয়ে গেছে। “আপনি একজন নাইস ইয়াং লেডি। তাই আপনার কিছু থোক তা চাইছি না। সো, প্লিজ সাবধানে থাকবেন।”

বোবার মত করে মাথা নাড়ল রাধা। যা শুনেছে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। তাড়াতাড়ি সাক্সেনার সাথে হাত মিলিয়ে বাইরে চলে এলো।

মেয়েটা চলে যাবার পর নিজের চেয়ারে বসে খানিক সিলিঙের লাইট পরীক্ষা করল সাক্সেনা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইল ফোনে একটা নাম্বার ডায়াল করে জানাল, “সাক্সেনা বলছি। কয়েকটা ব্যাপার জানানোর আছে।”

.

২২. দ্য সিক্রেট জার্নাল

“শিওর” গলা পরিষ্কার করে বলল বিজয়, “দেখা যাক কী হয়। বেশ রহস্যময় একটা ব্যাপার। ইউমিনেস সম্পর্কে একেকটা সোর্স একেকটা কথা বলছে। তবে সবকিছু মিলিয়ে আমি যেটা বুঝতে পারছি তা হল তিনি ছিলেন আলেকজান্ডারের একজন জেনারেল আর তার মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ শুরু হলে ইউমিনেসকেও বন্দী করা হয়। এছাড়া পৌত্রের জন্য মেসিডোনিয়ান সিংহাসন পুনরুদ্ধারের কাজে অলিম্পিয়াসকেও সাহায্য করেছিলেন; যদিও এই কারণেই জীবন হারিয়েছেন। আরেকটা ব্যাপার স্পষ্ট যে তিনি বেশ জ্ঞানী ছিলেন আর এশিয়া অভিযানের সময় আলেকজান্ডারের রয়্যাল ডায়েরিও লিখে গেছেন।”

“রিসার্চ করার তেমন একটা সময় না পেলেও ক্যালিসথিনস আর ইউমিনেস সম্পর্কে এতকিছু জেনেছ সেটাই তো কত?” খুশি হল এলিস। “আলেকজান্ডারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপের সেক্রেটারি হিসেবেও কাজ করেছেন ইউমিনেস। আর ফিলিপের মৃত্যুর পর হয়ে উঠেন আলেকজান্ডারের চিফ সেক্রেটারি। এছাড়া অন্যতম জেনারেল তো ছিলেনই। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তার জেনারেলরা। বেশির ভাগ সোর্স ইউমিনেসকে স্বীকৃতি দিলেও ভাগ্য তার সহায় হয়নি। কাহিনিটা বেশ বড় হলেও খুব দ্রুত যতটা পারি সংক্ষেপে বলছি। আলেকজান্ডারের পর নির্বাচিত উত্তরাধিকার পারডিকাসের বিরুদ্ধে যেসব জেনারেল বিদ্রোহ করেছিল তাদের সাথে মৃত্যুবরণ করার কথা থাকলেও একবার ফাঁকি দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন ইউমিনেস। কিন্তু মৃত্যু তাকে আলেকজান্ডারের আরেক জেনারেল অ্যান্টিগোনাসের কাছে তাড়া করে নিয়ে যায়। তবে অ্যান্টিগোনাসকে হারিয়ে দিলেও ইউমিনেসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তারই কিছু প্রাদেশিক কর্মকর্তা। এরপর অ্যান্টিগোনাসের হাতে খুন হন। সময় ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তবে কথিত আছে যে, অ্যান্টিগোনাসের সাথে যুদ্ধের আগেই নিজের সমস্ত ডকুমেন্টস আর জার্নালস নষ্ট করে গেছেন। তাই কোনো ঐতিহাসিক রেকর্ডেই এই সিক্রেট জার্নালের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।”

“তোমার ধারণা এটা নকল?” খানিকটা উন্মা নিয়ে জানতে চাইল বিজয়। বন্ধুর গলার স্বরে রাগের আভাস পেয়ে ভ্রু তুলে তাকাল কলিন।

জার্নালটা হাতে নিয়ে মন দিয়ে পড়ছে এলিস। মনে হয় বাকি দুজনের কাণ্ড খেয়ালই করেনি। “হুম, সে রকমত মনে হচ্ছে না। অনেকটা যেন নিজেকেই শোনাল। তারপর বলল, “অনুবাদকের সূচনা অনুযায়ী, লরেন্স ফুলার ১৯৫৪ সালে মিসরীয় এক অ্যান্টিক ডিলারের কাছে খুব ভালো অবস্থায় আছে এমন এক সেট প্যাপিরাস ডকুমেন্টস পেয়ে যান। সে সময়ে তার দল কায়রোর কাছাকাছি এক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের সাথে জড়িত ছিল। এর সাথে ফুলার আরো কিছু নোটস আর টীকা যোগ করে গেছেন। কিন্তু এই জার্নাল মিশরে কেন আর কিভাবে গেল সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ইউমিনেস তো আজকের দিনের ইরানে মারা গেছেন।” চোখ তুলে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “তুমি এটা কোথায় পেয়েছ?”।

বিজয় খুলে বলল কেমন করে মাত্র গতকালকেই সে আর রাধা মিলে জার্নালটাকে খুঁজে বের করেছে। আমার বাবা-মা দুজনেই ইতিহাসবিদ ছিলেন, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে কাজ করতেন।”

“চমৎকার” বিড়বিড় করে আবার জার্নালে মনোযোগ দিল এলিস, “মনে হচ্ছে প্যাপিরাস ডকুমেন্টসগুলো ঠিকঠাক থাকলেও কিছু কিছু অংশ মিসিং হয়েছে। ফুলার যেই হোক না কেন যথাসাধ্য চেষ্টা করে হারানো অর্থ বসিয়ে অনুবাদ করে গেলেও মিসিং শব্দগুলো ছাড়া পড়তে একটু কষ্টই হচ্ছে।”

“তোমার বাবা-মা কিভাবে এই জার্নাল পেলেন সেটাই তো আমার মাথায় আসছে না” উচ্চস্বরে জানাল কলিন, “উনারা নিশ্চয়ই এই ফুলার লোকটাকে চিনতেন।”

কাঁধ ঝাঁকাল বিজয়, “আমি আসলে অনেক ছোট ছিলাম” স্বীকার করে জানাল, “আর দুভার্গ্যক্রমে সে সময় তাদের কাজের প্রতি এতটা আগ্রহীও ছিলাম না। তাই ওদের বন্ধু কারা কিংবা তাদের মাঝে ফুলারও ছিলেন কিনা সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। ইস, কোনোভাবে যদি জানতাম। উনার সাথে তাহলে যোগাযোগ করে বাবা-মা সম্পর্কেও কথা বলা যেত।” ধরে এলো ছেলেটার গলা।

“ওকে, এক্ষুনি আমি পুরো জার্নালটা পড়ে দেখতে চাই” ঘোষণা করল এলিস। উত্তেজনা লুকিয়ে রাখতে পারছে না। আমাকে শুধু সারাংশটা বলো।”

“ফুলারের লেখানুযায়ী জার্নালটা দুভাগে বিভক্ত আর সাথে একটা চিঠিও আছে।” শুরু করল বিজয়। “ক্যালিসথিনসের অংশটা মনে হচ্ছে ক্যালিসথিনস নিজেই লিখে গেছেন। আর তারপর ইউমিনেস তার দ্য ডিডস অব আলেকজান্ডারের সাথে এটাকে জুড়ে দিয়েছেন। ক্যালিসথিনসের দাবি সগডিয়ান পাথর অভিযানের সময় আলেকজান্ডার তাকে একটা সিক্রেট মিশনে পাঠিয়েছিলেন। এর কাহিনির অনেকটুকুই হারিয়ে গেছে। কারণ জার্নালের ওই অংশটার বেশ ক্ষতি হয়েছিল। তাই মিশনের উদ্দেশ্যটা তেমন স্পষ্ট না। তবে অবাক ব্যাপার হচ্ছে তিনি ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গলে ঘুরে গাছ আর পাতা পরীক্ষা করতেন; যেটার কোনো ব্যাখ্যাই পাওয়া যায়নি।”

“তাই নাকি?” এলিসেরও খটকা লাগছে ব্যাপারটা নিয়ে।

“এই গল্পে এটুকুই আছে। এরপর মিশন সম্পন্ন করে ক্যালিসথিনস ফিরে এলে পর আলেকজান্ডার তাকে অত্যন্ত কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন।”

“আর তার কিছুদিন পরেই আবার খুন করে ফেলেছেন।” মিটিমিটি হাসছে কলিন। “মিডতে দেখি ক্ষণে ক্ষণে বদলাতো।”

“জার্নালে কি লেখা আছে যে ব্যাকট্রিয়াতে ক্যালিসথিনস আসলে কী খুঁজে পেয়েছিলেন?” মৃদু স্বরে জানতে চাইলেন ডা. শুক্লা। এতক্ষণ চুপচাপ বসে অন্যদের কথা শুনছিলেন আর আইভরি কিউবটা পরীক্ষা করেছেন।

নিজের নোটের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল বিজয়। “ফুলারের অনুবাদে এ সম্পর্কে কিছুই নেই। হয়ত অরিজিন্যাল প্যাপিরাস ডকুমেন্টে ছিল। তবে সে অংশটা তো ড্যামেজ হয়ে গেছে।”

“এটা সত্যি হলেও হতে পারে” মন্তব্য করল এলিস। “কারণ, আলেকজান্ডারের এশিয়া অভিযানের সময় ক্যালিসথিনস অনেক ধরনের সায়েন্টিফিক মিশনেও গিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে আর কিছু নেই কেন সেটাই বিস্ময়কর। কী মনে হয়, উনি ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গলে কী করছিলেন?”

“ইউমিনেসের গল্পটা আরো মজার। শোনার জন্য সবাই তৈরি তো?” চকচক করে উঠল বিজয়ের চোখ। “ইউমিনেসের দাবি, আলেকজান্ডার তাকে তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ছয়টা পদ্যের একটা পার্চমেন্ট দিয়েছিলেন। যেটা নাকি “দেবতাদের সিক্রেট” খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। ইউমিনেস সিক্রেটের কথা বলে না গেলেও এটা লিখেছেন যে পার্চমেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী নাকি সিক্রেট অবস্থানে যেতে আলেকজান্ডারকে সাহায্য করেছে। দুজনে এক রাতে ছোট একটা চামড়ার পাউচ নিয়ে সেনাবাহিনিকে রেখে বের হয়ে পড়েন। তবে ব্যাগের ভেতরকার জিনিস ইউমিনেসকে দেখতে দেয়া হয়নি। পাঁচ মাথাঅলা সাপের মত দেখতে একটা পাথরের অভ্যন্তরে সিক্রেট লোকেশনটা খুঁজেও পান। তারপর ইউমিনেসকে রেখে আলেকজান্ডার কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে যান। ফিরে আসার পর দেখা যায় তার দেহবর্ম আর ব্রেস্টপ্লেট ভেজা। যেন এতক্ষণ পুলে ভিজেছেন। সে রাতে কী ঘটেছে ইউমিনেস না জানলেও পরে বলতেন যে আলেকজান্ডার সত্যিই দেবতাদের সিক্রেট খুঁজে পেয়েছিলেন আর তারপর থেকে তিনি নিজেই এক দেবতা হয়ে যান।”

বিজয়ের কথা শেষ হবার সাথে সাথে নিশ্চুপ হয়ে গেল চারপাশ।

“এই কাহিনিটা” অবশেষে কথা বলল এলিস, “আলেকজান্ডার যে নিজেকে দেবতা দাবি করে উপাসনার ঘোষণা দিয়েছিলেন তার সাথে মিলে গেলেও কিছুটা আবার আলেকজান্ডার যে রোমান্স করেছেন সে গল্পের সাথেও খাপ খায়।”

“এগুলো সম্পর্কে আমিও শুনেছি।” বলে উঠল কলিন। “গ্রিক ইতিহাস যে একেবারে জানি না তা না। আলেকজান্ডারের গল্পগুলোর কালেকশনের একটা না?”

“ওয়েল, আমি এটাকে গ্রিক ইতিহাস বলব না, কলিন” হেসে ফেলল এলিস। “অজ্ঞাত একজন গ্রিক লেখক দ্য গ্রিক আলেকজান্ডার রোমান্স লিখে গেছেন। যাকে আজকাল ফুসিডো-ক্যালিসথিনস নামে ডাকা হয়। এর তিনটা ভার্সন আছে। প্রতিটাই অন্যদের চেয়ে আরো বেশি আকষর্ণীয় এবং একেবারে প্রথম পান্ডুলিপির তারিখ তৃতীয় শতকের। এখানে আলেকজান্ডার সম্পর্কে এত চমৎকার সব গল্প আছে যে কী বলব। তবে ইতিহাসের চেয়ে কল্পনাই বেশি।”

দাঁত বের করে হাসি দেখিয়ে দিল কলিন, “আরে বাবা আমিও তো তাই বলছি। সত্যিই।”

তবে বিজয়ের কথা শুনে চিন্তায় পড়ে গেছে এলিস। “আলেকজান্ডারের একটাই ইচ্ছে ছিল; দুনিয়া জয় করা। ইতিহাসে যে কথা বার বার লেখা হয়েছে। এখনো যেন মাথায় ঢুকছে না, “আর যদি এটা ধরেও নেই যে তিনি কোনো রহস্যময় এক ‘দেবতাদের সিক্রেট জানার অভিযানে গিয়েছিলেন কই ইউমিনেস তো মূল্যবান কিছু পাবার কথা লিখে যাননি। শুধু এটুকুই যে আলেকজান্ডার ফিরে আসার পর দেখা যায় তার দেহবর্ম ভেজা।”

“হয়ত দেবতাদের সুইমিং পুল পেয়ে গেছেন” কলিনের হাসি আর থামেই না, “সেটাও তো বেশ দামি তাই না?”

চোখ মুখ শক্ত করে তাকাল এলিস। “দ্যাটস ফানি, কলিন। কিন্তু সিরিয়াসলি এ কাহিনি তো আলেকজান্ডারের রোমান্সকেও ছাড়িয়ে গেছে। রোমান্সের সব ক্ষেত্রেই আলেকজান্ডারকে ঈশ্বর হিসেবে আঁকা হয়েছে। এ কারণেই হয়ত ইউমিনেস অফিসিয়াল রেকর্ডে এ জাতীয় কিছু লিখে যাননি সত্যের চেয়ে কল্পনাই বেশি শোনাবে।”

খুক খুক করে কাশি দিয়ে বিজয়ের দিকে তাকালেন ডা. শুক্লা, “ইউমিনেস ছয়টা পদ্য সম্পর্কে কিছু বলে গেছেন?” নরম স্বরে জানতে চাইলেন প্রাজ্ঞ ভাষাবিদ।

“আমি তো ভেবেছি এ ব্যাপারে কারো আগ্রহই নেই।” এমনভাবে বলল বিজয় যেন মহার্ঘ্য কিছু উন্মোচন করতে যাচ্ছে। “উনি জার্নালে সবকটি পদ্য রেকর্ড করে গেছেন আর ফুলারও দয়াপরবশ হয়ে প্রতিটা অনুবাদ করেছেন। কয়েকটা শব্দ মিসিঙ হলেও সারমর্ম বুঝতে অসুবিধা হবে না। আমি বলছি।”

নোটবুকের পাতা উল্টে পড়তে শুরু করল বিজয়।

.

২৩. আবছায়া এক হুমকি

এক দৃষ্টে ক্রিশ্চিয়ান ভ্যান কুকের দিকে তাকিয়ে প্রেসিডেন্সিয়াল সুইটের বেডরুমে পার্সোনাল ওয়ার্কস্টেশনে বসে আছে কুপার। এইমাত্র মিশনের প্রগ্রেস সম্পর্কে সব জানিয়ে শেষ করেছে। ভ্যান কুক কেবল মাঝে মাঝে মাথা নেড়েছে। বোঝা গেল যে শেষ করার জন্য তাড়া দিচ্ছে।

তবে এলিসের সাথে আর কারা আছে শোনার সাথে সাথে বদলে গেল অস্ট্রিয়ান বিজনেসম্যানের চেহারা। স্থান-কাল ভুলে ঈগলের মত তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া শ্যেন দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল কুপারের দিকে।

“আমি ওই নামগুলো চিনি।” ধারালো কণ্ঠে জানাল ভ্যান ক্লক। গত বছর অর্ডারের সমস্ত প্ল্যান বানচাল করে দেয়া নামগুলো এত সহজে ভোলার কথা নয়। আরেকটু হলেই হাতে এসে যেত দুই হাজার বছর ধরে গোপনে থাকা মহাভারতের সিক্রেট। “একেকটা একেবারে বিষ ফোঁড়া। ওদের কারণেই অর্ডারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকেও হারিয়েছি।” দ্রুত কুপারকে সবকিছু খুলে বলল।

“তাহলে সরিয়ে দিলেই তো হয়।” অর্ডার এদেরকে এত সহজে ছেড়ে দিয়েছে দেখে তো কুপার যারপরনাই বিস্মিত। ওদের জীবিত থাকাটা তো

অর্ডারের কাজের সাথে খাপ খায় না। “বেঁচে থাকবে না, মানে প্রত্যক্ষদর্শীও নেই।” এটাই তো অর্ডারের গাইডিং প্রিন্সিপ্যাল। অর্ডারের সাথে জড়িত সকলেই এই নীতি মেনে চলে। এর বাইরে যাবার সাধ্য কারো নেই। এই কেসের ক্ষেত্রে কেন উল্টোটা হল কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

ভ্যান কুক বুঝতে পারলো যে কুপার ব্যাপারটা ধরতে পারেনি। লোকটা অর্ডারের সত্যিকারের কোনো সদস্য ছিল না; ছিল এক কর্মচারী মাত্র। “অর্ডারের জন্ম কখন, বয়স কত সেটাও বোধহয় কারো মনে নেই। সেই ইতিহাসের শুরু থেকেই আছে। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা মেটাবার কোনো স্থান নয় অর্ডার। অর্ডারের অস্তিত্বের কারণও সবার অজানা। কেবল এর সদস্যরাই জানে। তবে আমরা যে কী করতে পারি তাও একেবারে অজানা নয়। আর এটা সম্ভব হয়েছে আড়ালে থেকে অপারেশন চালানো; রাজনীতিকে ব্যবহার করা; একইভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনীতি আর যুদ্ধকেও কাজে লাগানোর মাধ্যমে। যদি আমাদের গত বছরের মিশনটা সফল হত তাহলে দুনিয়াকে শাসন করার জন্য মারণাস্ত্র হাতে এসে যেত। কিন্তু তখনো বাইরের দুনিয়ায় আমাদের উদ্দেশ্য। সাধনের জন্য সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মেলাতে হয়েছে। অন্তরালে থেকে গোপনে রশি টেনে ঘটনা ঘটানোই আমাদের কাজ। তাই, যদি এই লোকগুলোর পিছু নিতাম তাহলে ইউ এস আর ইন্ডিয়ার সরকার কানেকশনটা টের পেয়ে যেত। অথচ মিশনে আমাদের সদস্যদের মৃত্যুর সাথে সবাই ধরে নিল যে কেস। সেখানেই সমাধা হয়ে গেছে। ফলে আমরাও স্বাধীন হয়ে গেলাম। অন্যান্য মিশন নিয়ে মাথা ঘামাতেও কোনো কষ্ট হল না। এখন যেমন তুমি একটার দায়িত্ব পেয়েছ।”

“তবে সমস্যাটা মনে হচ্ছে শেষ হয়নি।” চিন্তিত ভঙ্গিতে চিবুক ঘষলো কুপার। “ইন্ডিয়ান গোয়েন্দাবাহিনি জড়িয়ে পড়ায় কাজ আদায় করাটা কঠিন হবে।”

“গত বছর আর এ বছরের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে কুপার।” হালকাভাবে হাসল ভ্যান কুক, “এই বছর আমাদের মিশন সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। আর আমাদের সাথে এসবের কানেকশনও কেউ বের করতে পারবে না। বিশেষ করে তুমি যখন চার্জে আছো। আমি তোমাকে চিনি। নিজের ট্র্যাক তুমি কাভার করো। এদের কোনো গুরুত্বই নেই। আর কোপ দেয়ারও যথেষ্ট কারণ আছে। তাই তোমার পথে যেই আসুক না কেন তাকে নিয়ে কী করবে সেটা ভাবার অধিকারও তোমার। কেউ বেঁচে থাকবে না। মানে প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। নিয়মটা তো তুমিও জানো।”

কুপার মাথা নাড়তেই লাইন কেটে গেল।

বেডরুমের দরজায় নক শুনে তাকাতেই দেখা গেল কৃষাণ। বেশ অস্থির। দেখাচ্ছে।

“কোনো সমস্যা?” জানতে চাইল কুপার।

“আইবি অফিসার আর রাধা শুক্লা দুজনেই টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসে গেছে।”

এক দৌড়ে স্যুইটের লিভিং রুমে চলে এলো কুপার, “নাহ, এটা কিছুতেই হতে পারে না।”

দুটা লাল আলো জ্বলছে নিভছে এরকম একটা মনিটরের দিকে ইশারা করল কৃষাণ, “এটা টাইটান, আর ওই যে দুটো টার্গেট।”

নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না কুপার। ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স কী ওদের প্ল্যানটা ধরে ফেলল নাকি? সেটা কিভাবে সম্ভব? কেউইতো জানে না। এমনকি কুপার নিজেও পুরো ডিটেইলস জানে না। শুধু এটুকু জানে যে পঁচিশ বছর আগে শুরু হয়েছিল এ মিশন। তাকে ব্রিফ করা হয় স্ট্যাভরসকে নিয়ে অলিম্পিয়াসের সমাধি খোঁড়ার জন্য। এও জানানো হয় যে সমাধি থেকে কী আনতে হবে। একবার সেই নির্দিষ্ট বস্তুটা হাতে এলে কী করতে হবে তাও স্পষ্ট ছিল। এর বেশি আর কিছুই জানে না।

তাহলে আইবি এমন কী জানে যেটা সে জানেনা?

যাই হোক, ওকে ওর কাজ করতে হবে। সাথে সাথে তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। সবার আগে একটা ফোন করতে হবে। আর তারপর টার্গেটেরা খতম। এরা সত্যের বড় বেশি কাছে চলে গেছে।

এতটা তো সে হতে দিতে পারে না।

.

২৪. এ মিসিং লিঙ্ক

একে একে ছয়টা পদ্যই পড়ে ফেলল বিজয়। মাঝে মাঝে কেবল মিসিং শব্দগুলোর সময় একটু করে থামতে হল।

“নাম্বার ওয়ান” শুরু করল বিজয়’ “এটাই মনে হচ্ছে পুরোপুরি অক্ষত আছে।”

পদ্য-১

তারপর…ধোঁকাবাজির জন্মস্থান
প্রতিশোধের শপথ নিয়ে মৃত্যুর জন্ম
সর্বশক্তিমান এক রাজা
অভিযাত্রিগণ…গড়িয়ে দাও খুঁটি!
আর…ভাগ্য তোমায় পথ দেখবে!

“নাম্বার টু-তে অনেক শব্দই নেই” পড়ার আগে বলে নিল বিজয়।

পদ্য-২

“ওপারে…দ্রুতবহতা…চক্ষু
লবণহীন সমুদ্রের …পাশে
তিনজন ভ্রাতা…
তীরের ফলার ন্যায়…রাস্তা
পাতালের …প্রবেশপথ
সর্পের সিল…
আর পাবে…সন্ধান।

“নাম্বার-খ্রি:

আর…সেই…পাথর
তুলে ফেলো…আর…ছাল
প্রথমটি…আর ফল
গাঢ় রঙ্গা…সাদা…খোসা
আর…অথবা…মসৃণ পরবর্তী …
… সেই ফল
সাবধান…স্পর্শে…জ্বলবে।

“নাম্বার ফোর”:

তারপর প্রবেশ করো…সেই পথে…
উপত্যকায়…পূর্বে…
বেছে নাও…মনে রাখবে
তুমি…যেখানে ঘুমায় অ্যাপোলো।

“নাম্বার-ফাইভ”:

কিনারের…উপরে…
যেখানে…আর রাত্রি…মেশে
…পোসিডনের সম্পদ
…সর্পের কাছে…
পাঁচ…দেবদূত
সেই প্রবেশপথ…দেবে…জীবন।

“নাম্বার-সিক্স”:

মনে রাখবে…সাহস…আর
অবহেলায়…হবে ধ্বংস
একত্রে …সমস্ত কিছু
সুরক্ষা দেয়…স্থির দৃষ্টি
অবজ্ঞায়…
হারাবে…সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।

চোখ তুলে তাকাল বিজয়। নিস্তব্ধ হয়ে আছে সকলে।

“তার মানে আলেকজান্ডারের পার্চমেন্ট আর তার মায়ের সমাধিতে পাওয়া এলিসের আইভরি কিউবটার মধ্যে কানেকশন আছে।” সবার আগে নিজের মতামত দিল কলিন। “একেবারে প্রথমটা ছাড়া আর সবকটিই তো কিউবের সাথে মিলে যাচ্ছে। কয়েকটা শব্দ মিসিং থাকলেও বুঝতে কোনো কষ্টই হচ্ছে না।”

ডা. শুক্লাও মাথা নাড়লেন। “আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল যে এরকমই হবে”, স্বীকার করে জানালেন, “তুমি যখন ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গলে ক্যালিসথিনসের মিশনের কথা বললে তখনই আমার পাতা, গাছের ছালসহ বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া পদ্যটার কথাই মনে হয়েছে। আর যখন পাঁচ মাথাঅলা সাপের কাছে আলেকজান্ডারের অনুসন্ধান শেষ হবার কথা শুনলাম তখন তো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছি। একটা পদ্যে কিন্তু সেই প্রবেশদ্বারের রক্ষক হিসেবে পাঁচ মাথাঅলা সাপের কথা লেখা আছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না আমার ভাবনার আদৌ কোনো সত্যতা আছে কিনা।

“দিস ইজ ইন্টারেস্টিং” ধীরে ধীরে বলে উঠল এলিস। মনে হচ্ছে বেশ চিন্তা করে তারপর কথা বলছে, “কিউবটাতে প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় দেবতাদের কথাই লেখা হয়েছে। অন্যদিকে আলেকজান্ডারের কাছে যে পার্চমেন্ট ছিল সেখানে ভারতীয় দেবতা গ্রিক দেবতাতে পরিণত হয়েছে। অ্যাপোলো হল সূর্য। পোসিডন শিব। আর কেবল দেবতারাই নয়, পাতাল হল নরক। পার্চমেন্টটা সম্ভবত গ্রিকে লেখা। তার মানে কিউবটা আসলে ভারতে তৈরি হয়েছিল। তারপর কেউ এটাকে গ্রিকে অনুবাদ করেছে। ফলে অরিজিন্যাল সংস্কৃত পদ্যের চেয়ে আরো সহজতর হওয়ায় আলেকজান্ডারের বুঝতে কোনো অসুবিধাই হয়নি।”

“এতে করে আরো একগাদা প্রশ্নের উদয় হল” স্বীকার করল বিজয়। “যেমন ধরো কিউবটা এলো কোথা থেকে? আর সংস্কৃতকে ঘিকেই বা কে অনুবাদ করল? আরো আছে, পার্চমেন্ট অনুসরণ করে কিসের সন্ধানে গিয়েছিলেন তিনি? নিশ্চয় এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আলেকজান্ডার গ্রিস থেকে ভারতে চলে এসেছেন। ইউমিনেসের মতে দেবতাদের সিক্রেট অনুসন্ধানই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু তাতে কিছুই তো খোলাসা হল না।”

“আচ্ছা চিঠিটা কোথায়?” বিজয়ের কাছে জানতে চাইল এলিস। “তুমি না বলেছিলে জার্নালের সাথে একটা চিঠিও আছে?”

মাথা নেড়ে বিজয় জানাল, “ফুলারের মতে চিঠিটা অনেকটা জার্নালের কাভার লেটারের মত। অলিম্পিয়াসকে উদ্দেশ্য করে ইউমিনেস লিখে গেছেন। ফুলারের বিশ্বাস ইউমিনেস জার্নালসহ এই চিঠিটা অলিম্পিয়াসের কাছে পাঠিয়েছিলেন। হয়ত নিজের মৃত্যুর কয়েকদিন আগে?”

ভ্রু-কুঁচকে ফেলল এলিস, “ইউমিনেস ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেছেন। অলিম্পিয়াসও তাই। হয়ত চিঠিটা কখনোই পান নি। তাই সম্ভবত ফুলারের ধারণাই সত্যি। আর তারপর কোনো একভাবে সমস্ত ডকুমেন্টস মিশরে পৌঁছে গেছে।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল, “এসবই অনুমান। কোনো প্রমাণ নেই হাতে।”

হেসে ফেলল বিজয়। এলিসের অ্যার্কিওলজিস্ট সত্তাটা বেরিয়ে এসেছে। কোনো ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা প্রমাণ ব্যতীত কেবল ঐতিহাসিক রেকর্ড দেখেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ।

“যাই হোক” বিজয় বলল, “চিঠিটা অলিম্পিয়াসকে জানিয়েছে যে ইন্দুস ভূমিতে আলেকজান্ডারের মিশন সফল হয়েছে। আরও লেখা আছে যে রানির নির্দেশ মতন আলেকজান্ডারকে দেয়া ধাতব গোলাকার পাতটাকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। আলেকজান্ডারের স্বর্গীয় পিতা জিউসের বেদির নিচে। ব্যাবিলনে ফিরে যাবার আগে হাইফাঁসিস নদী তীরে আলেকজান্ডার যে বারোটা বেদি নির্মাণ করিয়েছিলেন এটা তাদেরই একটা। দেবতাদের সিক্রেট খুঁজে পাবার জন্য ধাতব পাতটা যে অন্যতম চাবিকাঠি ইউমিনেস সেটাও বারে বারে লিখে গেছেন।”

“তার মানে তোমার ধারণা ধাতব পাতটাকে দেখতে পেলে কিউবের পদ্যগুলোর মমার্থ বোঝা যেত?” বন্ধুর চিন্তার ধারা অনুমান করল কলিন।

“সেটার সম্ভাবনা কিন্তু আছে।” একমত হলেন ডা. শুক্লা। “রাধা যেমনটা বলেছিল কিউবের পদ্যগুলোর কোনো অর্থই বোঝা যাবে না; যদি না রেফারেন্স পয়েন্টটা জানা যায়। আর যদি সত্যিই কোনো মূল্যবান চাবি হয় তাহলে তো পুঁতে ফেলার জন্য অলিম্পিয়াসের কথায় যুক্তি আছে। নিজ পুত্রকে উপহার দেবার পর নিশ্চয় অন্যকারো হাতে পড়ক দেবতাদের এই সিক্রেস্ট, সেটা কাম্য নয়।”

“কিন্তু এখনো আমার মাথায় আসছে না যে অলিম্পিয়াস এই কিউব আর ধাতব পাতটা কোথায় পেয়েছেন?” এলিস কিছুতেই ধোঁয়াশা কাটাতে পারছে না। “উনাকে কে এসব দিয়েছিল? কেন? সমাধিতে একসাথে ধাতব পাওয়া গেলেই বেশি ভাল হত। তাহলে এখন চোখে দেখে পরীক্ষা করা যেত যে আদৌ কিউব আর এটার মাঝে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা।”

এলিসের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেসে ফেলল বিজয়। ও এখনো ওদের জন্য অনেক সারপ্রাইজ লুকিয়ে রেখেছে। জার্নালের রেফারেন্স পাওয়া ফাইলের বাক্সের গায়ে চাপড় মেরে বলে উঠল, “তোমাদেরকে একটা ফাইলের কথা জানিয়েছিলাম না যেখানে জার্নালের কথা পেয়েছি? এটাই সেটা। কোনো এক কারণে আমার বাবা সারা বিশ্বব্যাপী হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজগুলোর একগাদা ডকুমেন্টস আর নিউজ পেপার আর্টিকেল সংগ্রহ করে গেছেন। কেন করেছেন সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু যখন জানালটা পড়েছি, তখনই ফাইলের একটা নিউজ পেপারের কথা মনে পড়েছে।”

ফাইলের বেশ কয়েকটা পাতা উল্টে কাঙ্ক্ষিত আর্টিকেলটা বের করে আনল বিজয়। ১৯৮৫ সালের একটা নিউজ আইটেম। পড়ব? তোমরা শুনবে?”

অন্যেরা একযোগে মাথা নেড়ে অপেক্ষা করল বিজয়ের জন্য। “দ্য গ্রেট আলেকজান্ডার নির্মিত বেদির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে” আর্টিকেলের হেডলাইন পড়ে বাকিটা শোনাল, “ইস উপত্যকার ধ্বংসাবশেষের জন্য ভূমি খনন করতে গিয়ে হোশিয়ারপুর জেলার দাশুয়া শহরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা অসংখ্য বিশালাকার কাঠামোর কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি ইটের ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন। ফাউন্ডেশন অনুযায়ী প্রতিটা কাঠামো অন্তত ১৭ মিটার চওড়া। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা দেশে ফেরার দীর্ঘ ভ্রমণ শুরু করার আগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বীজ (Beas) নদী তীরে যে বারোটা বেদি নির্মাণ করেছিলেন এগুলো তারই ধ্বংসাবশেষ। দুহাজার বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এসব বেদিতে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর চারশ বছর পরেও ভারতীয় রাজারা উপাসনা করতেন।”

চোখ তুলে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবারে এটা শোন। বেদিগুলো পরীক্ষা করে দেখার সময় একটা ভিত্তিপ্রস্তরের নিচে অজ্ঞাত এক কৃষ্ণরঙা ধাতু দিয়ে তৈরি গোলাকার ছোট্ট একটা পাত পাওয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রিক না হওয়ায় প্লেটটির উৎস নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে। এ আবিষ্কার সম্পর্কে পুরো দল মুখ না খুললেও এটুকু জানিয়েছে যে অত্যন্ত প্রাচীন আমলের এই ধাতব পাত আলেকজান্ডারেরও বহু আগের কোনো এক সময়ের হতে পারে। এটির গায়ে খোদাই করা রহস্যময় চিহ্নগুলো হায়ারোগ্লিফিক কিংবা এ জাতীয় চিত্রসদৃশ লেখা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পরীক্ষা নিরীক্ষা আর সংরক্ষণের জন্য পাতটাকে নিউ দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।”

হেসে ফেললেন ডা. শুক্লা। বুঝতে পেরেছেন বিজয় এরপর কী বলতে পারে। তার মানে তোমার ধারণা ইউমিনেস উনার চিঠিতে এই পাতটার কথাই লিখে গেছেন?”

“রাইট” টেবিলের উপর ফাইলটাকে রেখে দিল বিজয়। “আমার মনে হয় না এতে তেমন কোনো ভুল আছে। প্রথমত, পাতটা আলেকজান্ডারের চেয়েও বয়সে প্রাচীন। দ্বিতীয়ত, সেটা তাহলে আলেকজান্ডারের নির্মিত বেদির নিচে কিভাবে গেল? যদি না আলেকজান্ডার নিজে সেখানে না রাখেন? ইউমিনেস নিজেই তো বলে গেছেন যে আলেকজান্ডার তা করেছিলেন।”

“তোমার যুক্তিতে এখনো অনেক ফাঁক-ফোকড় আছে বিজয়” কপালে ভাঁজ ফেলে জানাল এলিস, “সবচেয়ে জরুরি কথা হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিকের ধারণা যে

ধ্বংসাবশেষগুলো আলেকজান্ডারের নির্মিত বেদির হতে পারে। আরো একবার বলছি তাদের কাছেও জোরালো কোনো প্রমাণ নেই। যদি এগুলো এমনই কোনো ধ্বংসাবশেষ হয় যার সাথে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কোনো সম্পর্কই নেই?”

ভ্রু-কুটি করলেন ডা. শুক্লা, “১৯৮৫ সালে পাতটা আবিষ্কার হয়েছে? কই আমি তো কখনো ন্যাশনাল মিউজিয়ামে তা দেখিনি।”

“তাহলে একবার মিউজিয়ামে ফোন করে জিজ্ঞেস করলে হয় না?” পরামর্শ দিল কলিন। “হয়ত পাবলিক ডিসপ্লেতে রাখা হয়নি। অনেক জাদুঘরই তাদের বেজমেন্টে কার্টন আর ক্রেট ভর্তি জিনিসপত্র রেখে দেয়। কায়রো মিউজিয়ামও এরকম করে; আমি জানি। সাধারণত এ ধরনের নিদর্শন সাধারণ জনগণকে দেখতে দেয়া হয় না। তবে এলিস নিজে একজন অ্যার্কিওলজিস্ট। হয়ত ও বলতে পারে যে গবেষণার জন্য একবার দেখতে চায়।”

মাথা নেড়ে এলিস জানাল, “শিওর। এ পাতের সাথে কিউবের সম্পর্ক আছে কি নেই সেটা জানার জন্য আমার অসম্ভব কৌতূহল হচ্ছে। তাছাড়া জার্নালের কথাগুলো সত্যি, নাকি আলেকজান্ডারকে নিয়ে রচিত আরেকটা কল্পকাহিনি তাও জানা হয়ে যাবে।”

“তাহলে তো চেষ্টা করে দেখতেই হচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের উপর নিজের মোবাইল ফোন আনতে গেল বিজয়। “হয়ত এ ব্যাপারে আমি একটু সাহায্য করতে পারি” বললেন ডা. শুক্লা, “ন্যাশনাল মিউজিয়ামে আমার এক কিউরেটর বন্ধু ছিল। ও হয়ত আমাদের জন্য কিছু করতে পারবে।” বিজয়কে নাম্বার দিয়ে দিলেন।

তারপর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডা. শুক্লার বন্ধুর সাথে কথা বলে আর্কিওলজির কিউরেটরের নাম্বার নিয়ে মিউজিয়ামে গিয়ে পাতটাকে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করে ফেলল বিজয়।

কান থেকে ফোন নামাতেই চোখ ভরে উঠল খুশিতে, “দেখা যাক, আমাদের ধারণা কতটা মেলে। তাছাড়া কিউবের ধাঁধার সমাধান করারও কোনো উপায় নেই। আলেকজান্ডারের মাই বা কিভাবে পেলেন সেটাও জানি না। কিন্তু এলিস যেটা বলল যে প্রাচীন এক রহস্যের প্রতিটা অংশকে জোড়া লাগানোটা সত্যিই আনন্দের হবে। একই সাথে জার্নালের গল্পের নির্ভুলতাও প্রমাণিত হবে।”

“মনে রেখো, তুমি কিন্তু বলেছ যে আমরা কিউবের ধাঁধার মীমাংসা করব “ জোর দিল কলিন, “শেষবার কয়েকটা পদ্যের মর্মোদ্ধার করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের সাথে লড়েছি। আরেকটু হলেই স্বর্গবাসী হতে হতো। এবারের আলোচনাটাও মজার হলেও এখানেই এটাকে শেষ করো। মেটাল প্লেটটাকে দেখব। তখনই জানা যাবে ইউমিনেস জোচ্চুরি করেছে কিনা, তারপর ব্যস সব খতম।”

হেসে ফেলল বিজয়, “শিওর, তোমার সাথে আমিও একমত। এবার আমি আর কোনো জেদ করব না। এই কিউবটার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই। তাই এটার সিক্রেট যাই হোক না কেন, সারাজীবন লুকিয়ে থাকলেই ভালো।”

তখন বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে ওর কথা কতটা ভুল প্রমাণিত হবে।

.

২৫. শয়তানের নকশা

“ওরা বাইরে যাচ্ছে” রিপোর্ট করল কৃষাণ।

স্ক্রিনে ফুটে উঠা একগাদা বিন্দুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কুপার। “ওরা দুর্গের বাইরে যাচ্ছে, গুড।” এটার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। দুর্গের বাইরে গেলেই হতচ্ছাড়াগুলো নাজুক হয়ে পড়বে।

“নজর রাখো আর আমাকে জানাবে সবকিছু।”

এরপর পাশে দাঁড়ানো ছয় ফুট লম্বা, ঢেউ খেলানো সোনালি চুল আর অত্যুজ্জ্বল নীল চোখের পেশিবহুল তরুণের দিকে তাকাল। মাত্র এক বছর আগেই তার কিলার গ্রুপে যোগ দিয়েছে রাইলি; কিন্তু ছেলেটার খুন করার দক্ষতা দেখে কুপার মুগ্ধ, ঠাণ্ডা মাথায় একেবারে সূক্ষ্ম কাজ। কুপারের মত নয়; রাইলি তার ছুরি, দড়ি আর শূন্য হাতদুটোই বেশি পছন্দ করে। “মারার সময় আমার টার্গেটদেরকে ফিল করতে পছন্দ করি; মৃত্যুর সাথে সাথে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া শরীর, শেষ দীর্ঘশ্বাস-ওহ, আমার যে কেমন লাগে না।” অস্ত্রে কেন অভক্তি জিজ্ঞেস করায় একবার কুপারকে বলেছিল রাইলি।

এ কারণে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে শারীরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য কসরৎও অর্জন করতে হয়েছে। কেননা একেবারে কাছ থেকে খুন করার সময় ভিকটিমের চেয়ে তোমাকেই বেশি শক্তিশালী হতে হবে। নচেৎ তুমি সফল হবে না।

এই জিনিসটাই রাইলি অত্যন্ত ঘৃণা করে। অথচ মাত্র দু’রাত আগেই গ্রিসে তাকে একই রাতে দুবার অস্ত্র চালাতে হয়েছে। ওর উপর দায়িত্ব ছিল কুপার আর স্ট্যাভরসের খোঁড়া সমাধিটাকে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া। অথচ হঠাৎ করে যেন কোথা থেকে উদয় হয় সেই মেয়ে অ্যার্কিওলজিস্ট। তেমন বাধ্য হয়ে ওর পালানো ঠেকাতে গুলি ছুঁড়তে হয়। কিন্তু অস্ত্র হিসেবে বন্দুক তেমন পছন্দ না করাতে টার্গেট নিচ্ছিদ্র হয়নি। আবারো হাইওয়ের উপর সেই মেয়েটার সাথে এনকাউন্টারে যেতে হয়। আরো একবার জেদের বশে গুলি ছুঁড়তে হয়। কারণ মেয়েটা ওর ল্যান্ড করা হেলিকপ্টার সরিয়ে চলে গেছে, বেঁচে গেছে শয়তানিটা। আর, দেশ ছেড়ে এখানে এসে লুকিয়েছে। যাক এবারে হাতে পাওয়া গেছে।

“আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা হ্যাঁন্ডেল করতে চাই” রাইলিকে জানাল কুপার। খুঁজে বের করে যে তারা কী জানে। তারপর সবাইকে খতম করতে হবে। যদি ওরা দিল্লির দিকে যায়; তাহলে এক্ষুনি বেরিয়ে ওখানকার দলের সাথে যোগাযোগ করো।”

মাথা নাড়ল রাইলি, এবার সে রাতের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সুযোগ পাওয়া গেল। বহু হিসাব নিকাশ করা বাকি আছে। “শিওর। কোনো সমস্যাই হবে না। আপনি কি অন্য দুজনকে দেখবেন?” টেক্সাসে অনেক দিন কাটানোয় কণ্ঠস্বরে দক্ষিণি টান।

মাথা নেড়ে কুপার জানাল, “মেয়েটাকে জীবিত ধরে আনতে হবে। ওর ব্যবস্থা করার আকে কতটুকু কী জানে তাও দেখতে হবে।” আরেকটা স্ক্রিনের লাল ফুটকির দিকে ইশারা করে বলল, “তবে তার আগে অন্য টার্গেটকেও দেখতে হবে।” রাইলির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, “তোমাকেই পাঠাতাম তবে এক্ষেত্রে লং ডিসট্যান্স উইপন লাগবে।”

“চিয়ারস” খলবল করে উঠল রাইলি।

স্যুইট থেকে বেরিয়ে এলিভেটরে চড়ে বসল কুপার। সব প্ল্যান মত এগোলে মিশনের এই অংশ আজ রাতেই পূর্ণ হয়ে যাবে। আর যেমনটা সব সময়েই ঘটে কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও থাকবে না।

.

২৬. নিউ দিল্লি

সন্ধ্যার ব্যস্ত ট্রাফিকের জন্য রাধা বেশ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের অফিস থেকে বের হয়ে ইমরানকে কয়েকবার ফোন করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। উনি টাইটানের সিইওর সাথে মিটিংয়ে ব্যস্ত ভেবে এরপর বিজয়কে ফোন করেছে।

জার্নালের কথা জানিয়ে ন্যাশনাল মিউজিয়ামে যাচ্ছে বলে রাধাকে ইনফর্ম করল বিজয়; এও জানাল যে, “তোমার বাবাকে কাজ শেষ হলে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসব।” তাই সোজা বাসায় গিয়ে অন্যদের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল রাধা। সিক্রেট জার্নাল, ধাতব পাত আর আইভরি কিউবের সাথে এর সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা শুনে সে নিজেও বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে মিউজিয়ামে কী ঘটে জানার জন্য।

সাউথ দিল্লিতে সাদা দেয়াল ঘেরা একটা বাংলোর গেইটের বাইরে গাড়ি পার্ক করল। এখানেই থাকে পিতা-কন্যা। ঘরে ঢোকার সময় আরেকবার ইমরানকে চেষ্টা করতেই এবারে উনি ফোন ধরলেন।

“সরি” ইমরান জানালেন, “আমার মিটিং শুরুই হয়েছে দেরিতে আর তারপর বারে বারে সিইওর ফোন আসায় শেষ হতেও সময় লেগেছে। আমিও ভাবছিলাম যে এক্ষুনিই তোমাকে ফোন দেবো। মিটিং কেমন হল?”

সাক্সেনার সাথে কী কী কথা হল সব খুলে বলল রাধা।

“হুমমম। তুমি আরেকটু হলেই থলের বিড়াল বের করে দিচ্ছিলে। আমার মনে হয় তাহলে সাক্সেনাকে চোখে চোখে রাখতে হবে। আরো অনেক কিছুই জানা যাবে বোধহয়।” নিজের মিটিং সম্পর্কে এরপর জানিয়ে বললেন, “রিপোর্ট করার মতন বিশেষ কিছু না। সাক্সেনা যা বলেছে প্রায়ই সেই কথাগুলোই শুনেছি। শুধু এর গলাটা বেশ সংযত আর কম হুমকির মনে হয়েছে। আমাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে রেকর্ডও দেখতে দেবে বলে জানিয়েছে। এ ব্যাপারটা অবশ্য বেশ মজার লেগেছে। যদি গোপন করার কিছু থাকত, তাহলে নিশ্চয় এত সহজে অভ্যন্তরীণ রেকর্ড নিয়ে কথা বলত না। প্যাটারসনকে বলে ইউএসে ওদের বাকি কাগজপত্র চেক করাতে হবে।” কেটে দিলেন ইমরান।

রাধা ভেবে দেখল যে কেল্লায় ফেরার আগে অন্যদেরকে কিছু খাওয়াতে তো হবেই। জোনগড় এখান থেকে অনেক দূর। যেতে যেতে ক্ষিধের চোটেই মরে যাবে সকলে। কিন্তু তাড়াতাড়ি ডিনার বানাবার আগে চট করে একটু গোসল করে নিলে কেমন হয়?

যেই ভাবা সেই কাজ। শাওয়ার সেরে, কাপড় বদলে রান্না শুরু করল রাধা। শেষ করার পর ঘড়ির দিকে তাকাল; রাত সাড়ে আটটা। বাকিরা এখনো বাইরে কী করছে? জাদুঘরে কি সত্যিই আকষর্ণীয় কিছু পেয়ে গেল নাকি? মনে হল একবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে; তারপর আবার ভাবল না থাক; বিজয় যেহেতু ফোন করছে না তার মানে কোনো না কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে।

টিভির সুইচ অন করে তাই একের পর এক চ্যানেল পাল্টাতে লাগল। ওরা ফিরে এলে সবকিছু একসাথে শুনবে।

.

খতম

প্যাটারসনের ফোনটা কেটে দিয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইমরান। টাস্ক ফোর্স লিডারের সাথে তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ঝামেলা লেগে গেছে। সবসময় যুক্তি মেনে চলা, খুঁতখুঁতে স্বভাবের প্যাটারসনের সাথে কাজ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। অন্যদিকে তারকা খ্যাতি নিয়ে আইপিএস ছেড়ে আসা ইমরান। আইবি’তেও বেশির ভাগ সময়ে নিজের মত করেই কাজ করেন। আর তা না। হলে নিয়ম ভঙ্গ করে হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ঠিকই আদায় করে ছাড়েন। যে কোনো ব্যক্তি কিংবা পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার তার ক্ষমতা আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শক্তি এ পর্যন্ত উপরঅলার সমীহই জাগিয়েছে কেবল। তাই নিজের কাজ আর অনুমানশক্তি নিয়ে কখনো কোথাও কৈফিয়ত দিতে হয়নি।

কিন্তু প্যাটারসন একেবারে আলাদা। সবসময় ফ্যাক্টস চায়। আর টাইটান কড়কড়া প্রমাণ। টাইটান ফার্মার কেউই যে মেডিকেল ফ্যাসিলিটির ঘটনার সাথে জড়িত আছে, ইমরানের সেই ধারণাকেও এক কথায় খারিজ করে দিল।

“আপনার বক্তব্যে তো নজর দেবার মতন বিশেষ কিছুই পেলাম না।” টাইটান সিএমওর সাথে রাধা আর সিইওর সাথে তার নিজের মিটিংয়ের কথা জানাতেই তেতে উঠলো প্যাটারসন। “আমি কার্ট ওয়ালেসের সাথে কথা বলেছি। ভদ্রলোক শুধু যে পুরো সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিয়েছে তা নয় বরঞ্চ ভারত কিংবা ইউএসে তার ম্যানেজমেন্ট টিম থেকে কেউ যে এতে জড়িত নয় তার স্বপক্ষেও জোরালো যুক্তি দেখিয়েছে। এটা তো লোকাল অপারেশন হিসেবেই মনে হচ্ছে না। কোনো গ্লোবাল টেররিস্ট সংস্থার ফান্ডও থাকতে পারে। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে টাইটানকে ধাওয়া বাদ দিয়ে এসবের পেছনকার মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বের করুন।”

ইমরান একবার ভেবেছিলেন যে হঠাৎ করে এলিসের ভারতে আসা আর কার্ট ওয়ালেসের সাথে তার কানেকশনকে বায়ো-টেররিজমের অ্যাংগেলে দেখার কথা জানাবেন কিনা। তবে প্যাটারসনের অবজ্ঞা পেয়ে সেই ইচ্ছেটাই উঠে গেল। তাছাড়া এলিসের সাথে কথা বলার পর মনে হয়েছে যে নাহ মেয়েটা সত্য কথাই বলছে। গ্রিসে তার অভিজ্ঞতা আর এখানকার ঘটনার মাঝে আসলে কোনো মিল নেই; যদিও ওয়ালেস উভয় ক্ষেত্রেই কমন ফ্যাক্টর।

সেই সাথে মনে পড়ে গেল এলিস স্ট্যাভরস আর পিটারের ছবি দিয়েছে। ছবিগুলো নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডাটাবেইজ ঘাটাঘাটি করতেই বাজিমাৎ করে দিলেন।

তাড়াতাড়ি বিজয়ের নাম্বারে ফোন করে জানিয়ে দিলেন সবকিছু।

গাড়ি নিয়ে চলে এলেন নিজের বাসায়। চৌকষ গার্ড স্যালুট করতেই ইমরানও উত্তরে হাসলেন। একেবারেই সামান্য বেতন দেয়া এ কনস্টেবলদেরকে কেউ ধন্যবাদ না দিলেও তাদের কাজটা বেশ কঠিন। তিনি নিজে অনেক সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে দেখেছেন চলার পথে ওদের দিকে না তাকিয়ে অগ্রাহ্য করতে। তবে ইমরানের ধাঁচ তা নয়। মানুষ হিসেবে অন্তত আরেকজন মানুষের দিকে তাকিয়ে হাসা, কাজের জন্য ধন্যবাদ দেয়াই তো মনুষত্বের পরিচয়।

নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে পৌঁছে তাই ড্রাইভারকেও হাসিমুখে বিদায় দিলেন ইমরান। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে লিফটে চড়ে সিক্সথ ফ্লোরে উঠে এলেন ইমরান। লিফট থেকে নামার সাথে সাথে কেন যেন কাঁপতে লাগল ল্যান্ডিংয়ের সিলিং লাইট। মেইনটেন্যান্সের জন্য কমপ্লেইন করার কথা ভাবতে ভাবতে খুলে ফেললেন ঘরের দরজা।

গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছে লিভিং রুম। লাইট অন করেই জানালার কাছে। এগিয়ে গেলেন। বিরক্ত চোখে দেখলেন রাস্তার ওপারে নির্মাণাধীন টাওয়ারের কুৎসিত দৃশ্য। পাঁচটা ফ্লোর সম্পূর্ণ হয়ে গেল, তার অ্যাপার্টমেন্ট সোজাসুজি ছয় নম্বর ফ্লোরটায় এখনো কাজ চলছে। প্রথম দিকে তেমন আমল না দিলেও এখন প্রায় প্রতিদিনই শ্রমিকদেরকে দেখে।

ব্যাপারটা ডেইলি রুটিনের মত হয়ে গেছে। হাউজকিপার কাজ সেরে পর্দা মেলে দিয়ে চলে যায়। আর ইমরান বাসায় ফিরে টাওয়ারের দৃশ্য ঢাকতে আবার টেনে দেয়।

রুমে ঢোকার সাথে সাথে বিপ বিপ করে উঠল ব্ল্যাকবেরি। বেডরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ফোনের স্ক্রিন দেখে তো চোয়াল ঝুলে পড়ার জোগাড়।

এই মাত্র পাওয়া টেক্সট মেসেজটা দেখে রীতিমত চমকে উঠলেন। এমনকি পর্দা টানার কথাও ভুলে গেলেন। তাই সিক্সথ ফ্লোরে ছায়ার মধ্যে উঠে দাঁড়ানো লোকটাকেও দেখতে পেলেন না।

বেডরুম থেকে মাত্র দুকদম দূরে থাকতেই ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল জানালার কাঁচ। হুশহুশ শব্দ করে কিছু একটা উড়ে এলো রুমে।

সহজাত বোধ আর ট্রেনিংয়ের কল্যাণে সাথে সাথে বুঝে গেলেন কী হচ্ছে। অ্যাপার্টমেন্টের দরজা আর তার মাঝখানে পড়েছে খোলা একটা রকেট প্রপেলড বোমা।

বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেডরুমে ঢুকে গেলেন ইমরান। প্রচন্ড শব্দে লিভিং রুমের ফ্লোরে বিস্ফোরিত হল রকেট বোমা। থরথর করে কেঁপে উঠল পুরো অ্যাপার্টমেন্ট।

বেডরুমের দেয়াল বেশিরভাগ ধাক্কা সামলে নিলেও ব্লাস্টের সাথে সাথে মেঝেতে শুয়ে পড়ায় বুকে তীব্র ব্যথা পেলেন ইমরান। মেঝেতেও ছড়িয়ে পড়ল রক্ত।

রক্ত! তার মানে উনি আঘাত পেয়েছেন। কী দিয়ে কিছুই বুঝতে পারছেন না। এ্যাপনেল, ফ্লাইং গ্লাস? যাই হোক না কেন ক্ষতটা গুরুতর। মারাত্মকভাবেই জখম হয়েছে।

চোখের সামনে মুছে গেল সবকিছু।

প্রাণহীন অসাড় হাত থেকে মাত্র তিন ফুট দূরেই পড়ে আছে ব্ল্যাকবেরি ফোন। স্ক্রিনের মেসেজটা এখনো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে: “কুপার আজই ইমিগ্রেশন পার হয়ে এসেছে।”

.

২৭. জাদুঘরে কাটানো রাত

ফোন কেটে দিয়ে বাকিদের দিকে তাকাল বিজয়। “ইমরান ফোন করেছিলেন।” এলিসের পাঠানো ছবিগুলো চেক করে দেখেছেন। ম্যাচ পাওয়া গেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিন্যাল ডাটাবেজে পিটারও আছে। “দ্য রিপার” নামে ডাকে সবাই। আসল নাম পিটার কুপার আর গত ত্রিশ বছর ধরে অসংখ্য খুন করেছে। স্নাইপার আর টেলিস্কোপিক সাইট লাগানো বন্দুকে পারদর্শী পিটার এ পর্যন্ত একটাও টার্গেট মিস করেনি। একুশটা দেশ ওকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তোমার খনন কাজের সাথে তাহলে কিভাবে জড়ালো?”

“আমি জানি না” কেঁপে উঠল এলিসের গলা, “সে তো…শুধু…ওখানে। স্ট্যাভরসের সাথে ছিল। দুজনেই এ প্রোগ্রামের কো-ডিরেক্টর। ওয়ালেস ট্রাস্ট ওদেরকে নিয়োগ দিয়েছে। স্ট্যাভস অ্যার্কিওলজিস্ট। আর পিটার ফিনান্সিয়াল ও লিয়াজো কর্মকর্তা। আর্কিওলজিস্ট কিংবা খনন কাজ সম্পর্কে কিছুই জানত না। ওর সম্পর্কে কেবল এটুকুই শুনেছি। আর কোনো প্রশ্নও করিনি। অলিম্পিয়াসের সম্ভাব্য সমাধি নিয়ে এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে অন্য কোনো কিছু ভাবিও নি। আর স্ট্যাভরস সম্পর্কে কিছু বলেন নি?”

মাথা নাড়ল বিজয়। “না। কোনো ডাটাবেজ লিস্টেই নেই। তার মানে অবশ্য এই না যে সে সুবোধ। ইন্টারপোল কিংবা অন্য কোনো এজেন্সিতে নেই এই যা।”

“চিন্তা করোনা।” মেয়েটা ভয় পাচ্ছে বুঝতে পেরে সাহস দিতে চাইল কলিন, “তুমি তো কুপারকে গ্রিসেই ছেড়ে এসেছ। ভারত পর্যন্ত তোমাকে ট্রেস করার কোনো উপায় নেই। তুমি যে এখানে আসবে সেটা সে কিভাবে জানবে? আর যদি জানেও তাহলেও জোনগড় মানচিত্রে এতটা দূরে যে স্থানীয়রাই ঠিকমত চেনে না।”

“কিন্তু আমরা তো এখন জোনগড়ে নেই।” হঠাৎ করেই কেল্লার আরাম আয়েশ আর নিরাপত্তার কথা মনে করল এলিস। বিশেষ করে স্পেশাল সিকিউরিটি সিস্টেম আছে। এখানে ওর কাছে মরতে এসেছি।”

“কলিন যেভাবে বলল কুপার তোমাকে ইন্ডিয়া আর জোনগড়ে ট্রাক করলেও আজই যে দিল্লি এসেছ সেটাই বা কিভাবে জানবে?” হেসে ফেলল বিজয়। “জানি গ্রিসে তোমার সাথে কী কী হয়েছে। তবে সে সবই অতীত। আর ইমরান ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অথরিটিকেও অ্যালার্ট করে দিয়েছেন। কুপারের সত্যিকারের পরিচয় জানার পরপরই ব্যবস্থা নিয়েছেন। যদি কুপার ইন্ডিয়াতে আসেও আমরা ঠিকই জানতে পারব। যদি প্রয়োজন পড়ে ইমরান তোমাকে আইবির সেফ হাউজে নিয়ে যাবেন বলেছেন। সুতরাং তোমার কোনো ভয় নেই। ঠিক আছে? আর আমরা তো সাথে আছি।”

সকলে মিলে মিউজিয়ামে পৌঁছে গেল। ভিজিটরস আওয়ার শেষ হওয়াতে মেইন গেইট লকড। তাড়াতাড়ি কিউরেটরকে ফোন করে দিল বিজয়। ভদ্রলোক ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাই ফোনের সাথে সাথে গার্ড পাঠিয়ে দিলেন। গাড়ি ভেতরে ঢোকার পর আবার তালা লাগিয়ে দিল গার্ড।

“ওয়াও, দেখো দেখো!” চত্বরের বিশাল মূর্তিটা দেখে অবাক হয়ে গেল কলিন, “বেশ প্রাচীন, তাই না!”

বিজয় গাড়ি পার্ক করতেই সবাই নেমে এলো। গার্ড এসে জানাল যে সে ই তাদেরকে কিউরেটরের কাছে নিয়ে যাবে।

বিল্ডিংয়ের ভেতরের দিকের দেয়ালের সাথে হেলান দেয়া গার্নার থেকে আনা দ্য গ্রেট অশোকের ঈডিক্টের রেপ্লিকা পার হয়ে মূল দালানে ঢুকতে হয়। চারপাশে বেশ খোলামেলা আবহাওয়া।

ফার্স্ট ফ্লোরে কিউরেটরের অফিস। ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক।

“ডা. শুক্লা” এগিয়ে এসে শুক্লার সাথে করমর্দন করলেন। “আমি রাজিব সাহু, আর্কিওলজির কিউরেটর এবং কালেকশন কীপার। আপনি আসাতে সত্যিই বেশ ভাল লাগছে।” এরপর এলিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর আপনি নিশ্চয় মিস টার্নার?” হাত মিলিয়ে জানাল, “দেখা হয়ে ভাল লাগল। বলুন আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?”

বিজয়ের দিকে তাকিয়ে ঘোঁৎ করে উঠল কলিন, “তার মানে আমরা বডিগার্ডস?”

দাঁত বের করে অট্টহাসি দিল বিজয়। তারপর সাহুর কাছে দুজনের পরিচয়। দিল।

“ওহ্, হ্যাঁ, আমাদের তো কথা হয়েছে ফোনে।” বিজয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেও কলিনের সাথে কোনো কথা বললেন না।

দ্বিধায় পড়ে গেল এলিস। “মানে…আমি ১৯৮৫ সালে দোশুয়ার কাছে। আবিষ্কৃত পাতটা দেখতে চাই। যেটাকে মনে করা হয় গ্রিসে ফেরার আগে বীজ নদীর তীরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বেদি নির্মাণ করে সমাধিস্থ করে গেছেন।”

“অবশ্যই, অবশ্যই।” মুখে বললেও একটুও নড়ল না সাহু। “এটা সম্পর্কে আপনার এত আগ্রহ কেন তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। জানেন নিশ্চয়ই পাবলিকের জন্য এটা উন্মুক্ত নয়।”

“আমরা কিন্তু কথা বলেছিলাম মিঃ সাহু” বাধা দিল বিজয়। “ডা. দত্তই বলেছেন আপনাকে জানাতে। তখন তো আপনি রাজি হয়েছিলেন।”

“আমি কেবল ভিজিটরস আওয়ারের শেষে মিউজিয়ামে ঢুকতে দিতে রাজি হয়েছি।” এখনো নজর শুধু এলিসের উপর, “যেটা আসলে সরকারের নিয়ম বিরুদ্ধ। কিন্তু আমি মানা করিনি। আমি শুধু মিস টার্নারের আগ্রহটাই জানতে চাইছি। উনি পাবলিক ডিসপ্লের বাইরে থাকা একটা আর্টিফ্যাক্ট দেখতে চাইছেন। নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, যে কেউ এসে নিজেকে অ্যার্কিওলজিস্ট দাবি করার সাথে সাথে আমি অনুমতি দিতে পারি না। এমনকি ডা, দত্ত পাঠালেও আমার কিছু করার নেই।”

আগ্রহ নিয়ে আবারো এলিসের দিকে তাকালেন, কিউরেটর।

“আমি একজন অ্যার্কিওলজিস্ট।” খানিকটা উত্তপ্ত হয়েই জানালো এলিস, “এ ব্যাপারে আপনি সন্দেহ করছেন? ইন্টারনেটে আমাকে সার্চ দিন। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাস আমার পছন্দের বিষয়। বিশেষ করে হেলেনিস্টিক পিরিয়ড। শুনেছি যে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সাথে জড়িত একটা নিদর্শন আছে আপনার কাছে; তাই দেখতে এসেছি।”

“আপনার সাথে নিশ্চয় কোনো আইডেন্টিফিকেশন আছে?” এলিসের কথা যেন শুনতেই পাননি এমনভাবে বললেন কিউরেটর, “যেমন ধরুন আইডি কার্ড? আপনার স্বপক্ষে প্রমাণ দেয় এমন কিছু?”

রাগে লাল হয়ে গেল এলিসের গাল। তারপরেও ব্যাগ হাতড়ে গ্রিসে জয়েন্ট মিশনের আইডি কার্ড বের করে সাহুর হাতে দিল। খানিকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে আবার এলিসকে ফিরিয়ে দিলেন কিউরেটর।

“এবারে আপনি ধাতব প্লেটটা দেখতে পারেন।” পকেট থেকে সিংগল একটা চাবি বের করে জানালেন, “চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি। সেকেন্ড ফ্লোরে স্টোর করে রাখা হয়েছে।” অন্যদের দিকে তাকিয়ে খানিকটা অসন্তুষ্টের ভঙ্গিতে জানালেন, “সবাই কী আপনার সাথেই যাবে?”

“হ্যাঁ।” দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল এলিস, “থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”

“ফলো মি” আদেশ দিয়েই হাঁটতে শুরু করলেন কিউরেটর। সিঁড়ি বেয়ে পার হলেন আর্মস অ্যান্ড আর্মার গ্যালারি। এ কক্ষের সর্বত্র কাঁচের কেসে থরে থরে সাজানো

তলোয়ার, বর্শা আর সব ধরনের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় অস্ত্র। গ্যালারির শেষ মাথায় প্রাইভেট লেখা একটা দরজা। তালা খুললেন সাহু।

সবার মনের মাঝে একটাই চিন্তা; না জানি কী দেখতে পাবে!

.

২৮. এক নতুন রহস্য

রুমটা পুরোপুরি অন্ধকার। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট ব্যবহার করে লাইটের সুইচ অন করল বিজয়। সিলিংয়ের বা চিরে দিল আঁধার। বিস্ময়ে মুখে হাত চাপা দিল এলিস।

সারি সারি তাক ভর্তি বিভিন্ন ধরন আর গড়নের ট্যাবলেট। এমন সব ভাষায় লেখা যার একটাও চেনে না। বুঝতে পারল এ কক্ষ ইতিহাসের এক গুপ্ত ভান্ডার।

ডা. শুক্লারও প্রায় একই অবস্থা। এমনভাবে চারপাশে তাকাচ্ছে যেন তিনি একটা ছোট্ট বাচ্চা; যাকে খেলনার দোকানে ছেড়ে দেয়া হয়েছে আর কোন খেলনাটা নেবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেছে ছোট্ট মানুষটা।

“আমরা যে পাতটা খুঁজছি সেটা কোনটা?” উঁচু গলায় বলে উঠল বিজয়।

“এটা।” কালো রঙের ছোট গোলাকার একটা প্লেট নিয়ে বাকিদেরকে দেখালেন ডা. শুক্লা। ট্যাবলেটের একপাশে খোদাই করা ছয়টা চিহ্নও দেখা যাচ্ছে।

সবাই হা করে তাকিয়ে রইল ট্যাবলেটের দিকে। ছয়টা চিহ্নের কোন অর্থই বুঝতে পারছে না।

ঘড়ির দিকে তাকাবার ভান করলেন সাহু। “আমি আপনাদেরকে পনের মিনিটের বেশি দিতে পারব না। প্লিজ শেষ করে তালা লাগিয়ে যাবেন। আমি অফিসেই থাকব।” আর একটাও কথা না বলে গটগট করে হেঁটে সিঁড়ির কাছে চলে গেলেন কিউরেটর।

এখনো সবাই একদৃষ্টে সিলগুলোই দেখছে।

“তো?” স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করে এলিস জানতে চাইল, “কোনো ধারণা?”

মাথা নাড়লেন ডা. শুক্লা। “কিউবের সাথে কানেকশন আছে এমন কিছুই তো দেখছি না। বোধহয় আমার অনুমান ভুল হয়েছে।” বিব্রত ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন, “যাই হোক আশা করা খারাপ না। তবে সত্যি হলে ব্যাপারটা বেশি ভালো হত।”

“আমিও কিছু দেখতে পাচ্ছি না। এই ট্যাবলেটটার আসলে কোনো মানে নেই।” একমত হল বিজয়।

“ওকে, তাহলে চলো বেরিয়ে যাই। রাধার রান্না খেতে হবে তো।” সাগ্রহে হাত ঘষল কলিন।

“দাঁড়াও, কয়েকটা ছবি তুলে নেই।” মোবাইল ফোন বের করে দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে নিল বিজয়।

এরপর রুমে তালা দিয়ে গ্যালারি পার হয়ে এলো। আধো অন্ধকারেও সাজিয়ে রাখা অস্ত্রগুলো দেখতে বেশ ভয়ংকর লাগছে। যুদ্ধের সময় না জানি কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করত এগুলো।

করিড়োর ধরে সিঁড়ির দিকে যেতেই হঠাৎ করে কানে এল কারো আর্তচিৎকার। ঠিক কিউরেটরের অফিস থেকেই এসেছে শব্দটা। কেউ একজন প্রচন্ড ব্যথায় কাতড়াচ্ছে। তীব্র আক্রোশ নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আরেকজন।

.

সমস্যার পর সমস্যা

অফিসের দিকে হাঁটতে গিয়েও সাহুর মনটা কেন যেন খচখচ করে উঠল। আজ সময়মত চলে যাবার কথা থাকলেও দত্তের অপ্রত্যাশিত ফোনটা সব ভন্ডুল করে দিল। দত্তের অনুরোধ উপেক্ষাও করতে পারলেন না। বিশেষ করে বারবার জানিয়েছেন যে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু একজন আমেরিকান অ্যার্কিওলজিস্ট প্রায় তিন দশক আগে আবিষ্কত একটা অখ্যাত ধাতব পাত নিয়ে কেন এত আগ্রহ দেখাচ্ছে সেটাই তো মাথায় আসছে না। আলেকজান্ডারের বেদিগুলো আবিষ্কার হওয়ার পর সেসময়ে বেশ শোরগোল হলেও আদৌ এগুলো সেই বিখ্যাত স্থাপনা কিনা তা কেউ প্রমাণ করতে পারেনি। দ্রুত আবার ব্যাপারটা সবাই ভুলে গেছে। আর আলেকজান্ডারের বেদিগুলোও এখন পর্যন্ত বলতে গেলে অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। মিডিয়াও এ গল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় তখন থেকেই উপর তলায় নির্জীবের মতন পড়ে আছে বেচারা ধাতব প্লেট। মেয়েটা যে কিভাবে এটা জানল সেটা সম্পর্কেও উনার কোনো আইডিয়া নেই। শুধু দত্ত সাহেব ফোন করে জানালেন যে ওর পুরনো বন্ধু ডা. শুক্লা আসতে চায়।

নিজের অফিসে ঢুকেই আবার থেমে গেলেন সাহু। রুমে অজানা দুজন লোক। তবে যদি মেঝেতে গলা কাটা অবস্থায় রক্তের মধ্যে ডুবে থাকা মৃত গার্ডকে হিসাবে ধরেন তাহলে থ্রি।

সাহুর চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে সোনালি চুলের লম্বা এক তরুণ সাহুরই টিবক্স থেকে টিস্যু নিয়ে মুছছে বিশাল আর কুৎসিত দর্শন বোয়ি ছোরা। অন্যজন পিস্তল হাতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সাহু খেয়াল করে দেখলেন যে গানম্যানের চোখ, মাথা, নাক, হাত মুখোশে ঢাকা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে যে সে ককেশীয়।

সাথে সাথে দৌড়ানোর জন্য ঘুরলেও পালাতে পারলেন না সাহু। সাৎ করে দরজার সামনে চলে এলো গানম্যান। ফাঁদে আটকা পড়ে গেছেন।

কোমরে বাঁধা খাপের ভেতর ছুরি ঢুকিয়ে মোবাইল ফোনের দিকে তাকাল রাইলি, “রাজিব সাহু, কিউরেটর অব অ্যার্কিওলজিস্ট” ফোন দেখে লাইনগুলো পড়ে আবার রেখে দিয়ে জানাল, “তোমার ভিজিটররা কোথায়?”

একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সাহু। এতটাই অবাক হয়ে গেছেন যে কথা বলাও ভুলে গেলেন। কে এই লোক? মিউজিয়ামে ঢুকে গার্ডকে খুন করে এখন। আবার ট্যাবলেট রুমে রেখে আসা লোকগুলোর কথা জানতে চাইছে।

অবশেষে গলায় স্বর ফুটিয়ে কোনো মতে বললেন, “উপর তলাতে তোতলাতে তোতলাতে বুড়ো আঙুল দিয়ে দেখালেন সেকেন্ড ফ্লোর।

মাথা নাড়ল রাইলি, “একটু বসা যাক, ঠিক আছে?” তোমার ভিজিটরদের খবর নেয়ার আগে তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।”

কৃষাণ চারজন টার্গেটের গুড়গাঁও হয়ে দিল্লি আসার রিপোর্ট করার পরে হোটেল থেকে বেরিয়ে দিল্লির দলের সাথে দেখা করেছে রাইলি। এরপর ন্যাশনাল মিউজিয়ামের কথা শুনে বুঝতে পারল টার্গেট দল এমনি এমনিই এখানে বেড়াতে আসেনি। নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে। কুপারকে ফোন করতেই, টার্গেটদের পিছু নিয়ে খুন করার আগে সম্ভব হলে মিউজিয়ামে আসার উদ্দেশ্যও জেনে নিতে বললো।

আর এ কাজের জন্য কিউরেটরের চেয়ে যোগ্যতর আর কেউ নেই।

“তো” সাহু নিজের ডেস্কে বসতেই রাইলি বলল, “তোমার ভিজিটররা কী দেখতে চেয়েছে বলো।”

চোখ বড় বড় করে রাইলিকে দেখছেন সাহু; শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে আতঙ্ক। কিউরেটরের অবস্থা দেখে হেসে ফেলল রাইলি। ভয়ে লোকটার দিশেহারা অবস্থা। আর খতম করার আগে টার্গেটের এরকম গন্ধটাই রাইলির পছন্দ। অন্য কোনো আবেগীয় সম্পর্কই তাকে এতটা আনন্দ দিতে পারে না।

“তাদের একজন আর্কিওলজিস্ট” বিড়বিড় করে জানালেন সাহু।

“আমেরিকান মেয়েটা। এটা আমি আগে থেকেই জানি।” কঠোর হয়ে উঠল রাইলির গলা। ক্রমেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। “যা জানি না এরকম কিছু বলল। ওরা কেন এসেছে?”

গানম্যানকে ইশারা করতেই সাহুর পাশে চলে এলো। কব্জি ধরে ডেস্কের উপর হাত নিয়ে তালু চেপে ধরতেই আঙুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল। খাপ থেকে ছুরি বের করে কিউরেটরের হাতের উপর ঘোরাতে লাগল রাইলি। অবশেষে একটা জায়গা পছন্দ করে এক ফালি মাংস কেটে দিতেই ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত।

সাহুর আর্তচিৎকার পৌঁছে গেল খালি করিডোর বেয়ে মিউজিয়ামের গ্যালারি অব্দি। সহ্যের অতীত সেই যন্ত্রণা। আরেকটা জায়গা বেছে নিয়ে আরেকটু মাংস কেটে ফেলল রাইলি।

কিউরেটরের গলা ভেঙে গেল চিৎকারের চোটে। “এবার, আরেকবার বলছি” নিচু কিন্তু ভয়ংকর স্বরে জানতে চাইল রাইলি, “অ্যার্কিওলজিস্ট তোমার কাছে কী চেয়েছে? সে কেন এসেছে এই মিউজিয়োমে?”

.

২৯. কী ঘটেছে বুঝে ফেলা

“এটা তো সাহুর গলা!” বলে উঠল বিজয়। “তোমরা তালা লাগাও ততক্ষণে আমি দেখে আসি কী হয়েছে।”

লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি পার হয়ে করিডোর ধরে সাহুর অফিসের দিকে দৌড় দিল বিজয়। কিন্তু অফিসের কাছাকাছি যেতেই কিউরেটরের আর্তনাদ ছাপিয়ে শোনা গেল নিচু স্বরের ভয়ংকর সব শব্দ, “এবার, আরেকবার বলছি, অ্যার্কিওলজিস্ট তোমার কাছে কী চেয়েছে? সে কেন এসেছে এই মিউজিয়ামে?”

মাঝ পথেই থেমে গেল বিজয়। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হবার জোগাড়। কেউ নিশ্চয় এলিসের কথা জানতে চাইছে। তার মানে এলিস যে এই মিউজিয়ামে এসেছে তাও জানে লোকটা। কুপার নাকি? সেটাই বা কিভাবে সম্ভব? ইমরানকে

জানিয়ে কুপারের তো ইমিগ্রেশনের চৌহদ্দি পেরোবারই কথা না।

মনের মাঝে টিকটিক করে উঠল দুঃশ্চিন্তার কাঁটা। অন্যদেরকে সাবধান করতে হবে।

.

সত্য উদঘাটন

বাইরের করিডোরে কারো দৌড়ানোর শব্দ শুনেই গানম্যানকে ইশারা করল রাইলি। ছুটে বের হয়ে গেল লোকটা। আবার কিউরেটরের দিকে মনোযোগ দিল রাইলি।

“আয়্যাম ওয়েটিং।” খালি হাত দিয়ে ধরে রেখেছে কিউরেটরের অক্ষত হাত। যেকোনো মুহূর্তেই ছুরি চালানোর জন্য প্রস্তুত। রক্তে ভেসে গেছে পুরো ডেস্ক।

“দ্য মেটাল প্লেট” কান্না মেশানো কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠলেন সাহু; প্রাণপণে চেষ্টা করছেন লোকটার হাত থেকে ভালো হাতটাকে ছাড়াতে। “আলেকজান্ডারের বেদির ফাউন্ডেশনের নিচে যেটা পাওয়া গিয়েছিল!”

খবরটা যেন রাইলির কানের মধ্যে হুল ফোঁটালো। অপছন্দের বলে ইতিহাস আর আর্কিওলজিস্ট সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলেও, এটা জানে যে এই মিশন গ্রিক ইতিহাসের সাথে জড়িত। আর গ্রিসে তো সমাধিটা নিজের চোখেই দেখেছে। উড়িয়ে দেয়ার সময় ডিগিং হাটের ক্যাম্পে আর্টিফ্যাক্টগুলোও দেখেছে। তার মানে হচ্ছে যে এই ধাতব পাতটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

“গার্ড নয়। করিডোরে তেমন আলো না থাকায় চেহারাও ভালো করে দেখিনি।” কিউরেটর অফিস থেকে বাইরে গিয়ে রিপোর্ট করল গানম্যান। “উপরের দিকে উঠে গেছে। তাহলে টার্গেট গ্রুপই হবে। আমি অন্যদেরকে ডেকে পিছু নিচ্ছি।” রাইলির ইয়ারপিসে জানিয়ে দিল লোকটা।

“ঠিক আছে।” আবার কিউরেটরের দিকে তাকাল রাইলি, “ওরা এখন কোথায়? মেটাল প্লেটটা কোথায়?”

এতক্ষণে সাহুর সমস্ত শক্তি শেষ। রাইলিকে তাই গড়গড় করে সবকিছুই বলে দিলেন।

“সেকেন্ড ফ্লোর। আর্মস অ্যান্ড আর্মার রুম” নিজের লোকদেরকে আদেশ দিল রাইলি। “খেদিয়ে সোজা একজায়গায় জড়ো করবে। আমি মিনিটখানেকের ভেতরে উপরে আসছি। দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার আগে কথা বলতে চাই।”

.

ডিফেন্স

একেকবারে দুটো করে সিঁড়ি পার হয়ে উপরে উঠে এলো বিজয়। অন্যরা ততক্ষণে অর্ধেক নেমে এসেছে। “ব্যাক-আপ!” হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো মতে জানাল, “আমাদেরকে আবার উপরে যেতে হবে। এরপর এলিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওরা জেনে গেছে যে তুমি এখানে।”

অন্য কোনো প্রশ্ন করারও সময় নেই। বিজয়েরর কণ্ঠস্বরের মরিয়াভাবেই সবাই যা বোঝার বুঝে নিয়ে আবার উপরে উঠে গেল।

এই ফাঁকে প্ল্যান করে ফেলল বিজয়। সেকেন্ড ফ্লোরের গ্যালারিতে ঢুকতেই সবাইকে দ্রুত বুঝিয়ে বলে দিল যে কী করতে হবে। “জানি না ওরা কতজন এসেছে।” ফিসফিসিয়ে জানাল, “এটাও জানি না যে নিচে নামার আর অন্য কোনো পথ আছে কিনা। মেইন সিঁড়ি দিয়ে তো নামাই যাবে না, ওরা পিছু নেবে। আর লোকগুলো যে সশস্ত্র তা তো বলাই বাহুল্য। তাই আমাদেরকে এটাই করতে হবে। ডিসপ্লে থেকে যার যেটা খুশি অস্ত্র তুলে নাও। নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য কিছু তো করতে হবে।”

“বেটা, ওদের সাথে কি আমরা পারব?” মোলায়েম স্বরে জানালেন ডা. শুক্লা, “ওদের হাতে পিস্তল আছে। এর বিরুদ্ধে তরবারি আর বর্শা কোনো কাজেই আসবে না।”

হাতে অস্ত্র নিয়ে গ্যালারিতে ঢুকে মাথা নাড়ল বিজয়। “বলছি না যে আমরা লড়ব। অস্ত্রগুলো কেবল সতর্কতাস্বরূপ এনেছি। জানি ওদের সাথে লড়তে যাওয়া কেবল বোকামিই হবে। তবে কিছু একটা অন্তত সাথে রাখা ভালো। এখন কী করতে হবে বলছি। এটাই একমাত্র সুযোগ।” প্ল্যানটা খুলে বলতেই অন্যরা সম্মতি দিয়ে মাথা নাড়ল।

করিডোরে লাইন করে রাখা মূর্তিগুলো থেকে ছোট্ট একটা পাথরের ভাস্কর্য তুলে নিল বিজয় আর কলিন। এটা দিয়েই বাড়ি মেরে কাঁচ ভেঙে ডিসপ্লে করা অস্ত্রগুলো থেকে যার যার পছন্দ মত তুলে নিল।

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি নাদির শাহের ব্যবহৃত খোদাইকৃত যুদ্ধ কুঠার তুলে নিলেন ডা. শুক্লা। চওড়া মাত্র ৫২ সেন্টিমিটার। তাছাড়া ওজনও খুব বেশি নয়। তাই ওনার পক্ষে হাতে নিতে কোনো সমস্যাই হল না।

কলিন পছন্দ করল টিপু সুলতানের তরবারি। আর বিজয় তুলে নিল আঠারো’শ শতকে কাশ্মির থেকে আসা গদা।

“নিজের মতই সবচেয়ে বড় আর ভারী অস্ত্রটা নিয়ে নিলে”, বন্ধুর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসি দিল কলিন। এরকম কঠিন পরিস্থিতিতেও ওর ঠাট্টার কারণে হালকা হয়ে গেল পরিবেশ, “কিন্তু যখন প্রয়োজন হবে মাথার উপর নিয়ে ঘোরাতে পারবে তো?”

“আশা করো যেন তার দরকারই না হয়”, ধীর স্থিরভাবে উত্তর দিল বিজয়, “এলিস তুমি কী নেবে?”।

ভীত চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে মেয়েটা; জানে হাতে সময় বেশি নেই। কোনটা যে হাতে নেবে সেটাও বুঝতে পারছে না। গ্রিসের কথা মনে পড়তেই আতঙ্কে হাত-পা অবশ হবার যোগাড়। ওর অবস্থা দেখে এগিয়ে এল বিজয়। তুলে নিল ষোড়শ শতকে রাজপুত কাঠ আর আইভরি দিয়ে তৈরি একটা বর্শা। ৩৮.৫ সেন্টিমিটার হওয়াতে বহন করতেও সুবিধা হবে। এলিসও মনে মনে আশা করল যেন ব্যবহার করতে না হয় এ বর্শা।

বিজয়ের প্ল্যান মোতাবেক সবাই যার যার অস্ত্র হাতে পজিশন নিয়ে নিল। এ অবস্থাতে হাতে খুব বেশি অপশন না থাকলেও এটুকুই আশা যে প্ল্যানটা কাজ করবে।

.

৩০. সব ঠিকঠাক মত হবে তো?

সেকেন্ড ফ্লোরে যাবার সিঁড়ির নিচে এসে একসাথে জড়ো হল তিনজন গানম্যান। গ্রাউন্ড ফ্লোরে মিউজিয়ামের মেইন লবির দুটো করিডোরে গার্ড দিচ্ছে দুজন; যেন কেউই ভেতরে কিংবা বাইরে যেতে না পারে।

কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ হতেই ঝট করে সবাই উপরের দিকে তাকাল।

প্রথম গানম্যান সিঁড়ির দিকে ইশারা করতেই নিঃশব্দে উঠে গেল তিনজন।

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার নিশ্চুপ হয়ে গেল সেকেন্ড ফ্লোর। চারপাশে ঝাপসা আলো। করিডোরে বাতি নেভানো থাকলেও গ্যালারি থেকে খানিকটা আলো আসছে।

আশেপাশে তাকিয়ে মিউজিয়ামের সাইন খুঁজলো; যেন আর্মস আর আমার গ্যালারিটা চেনা সহজ হয়। এরপরই সিঁড়ির কাছে দেয়ালের গায়ে লাগানো ফ্লোর প্ল্যান দেখে ইশারা করল তিনজনের একজন। মাথা নেড়ে ফ্ল্যাশলাইট তুলে নিল প্রথম গানম্যান। আর কোনো উপায় নেই। তাই বাধ্য হয়েই টার্গেটদের চোখে পড়ার রিস্কটা নিতে হল। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে, যাদের সাথে লড়তে এসেছে তারা বেশ স্মার্ট। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।

ম্যাপে দেখা গ্যালারি খুঁজে বের করে বাকি দুজনকে ইশারা দিল। হঠাৎ করেই কী মনে হতে সশস্ত্র হবারও সিগন্যাল দিল। কিছুই বলা যায় না; যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। যদিও রাইলি বলেছে এরা নাকি সব সাধারণ মানুষ। অথচ এমন অনেকের কথা শুনেছে যারা শত্রুকে তুচ্ছ জ্ঞান করায় প্রাণ পর্যন্ত হারিয়েছে। নিজেও সেই দলে ভেড়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার।

যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে গ্যালারির প্রবেশ দ্বার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। খোলা দরজার ওপাশে নিকষ কালো রাত।

করিডোরের সুইচ খোঁজার জন্য ইশারা দিল প্রথম গানম্যান। তিনজন মিলে ছড়িয়ে দেয়াল ধরে খোঁজা শুরু করল।

“পেয়ে গেছি”, গলার সাথে লাগানো মাইক্রোফোন সামান্য কম্পন থেকেই বুঝতে পারে; তাই নিশ্চুপ মিউজিয়ামে তার ফিসফিসানি একটুও শোনা গেল না।

সুইচ টিপতেই আলোয় ভেসে গেল পুরো করিডোের। খানিকক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে গেল তিনজন।

স্কি-মাস্কের নিচে কঠোর হয়ে গেল লিড গানম্যানের চেহারা। করিডোরের আলো অন্ধকার গ্যালারিতে পৌঁছালেও এরকম উজ্জ্বল আলো থেকে নিকষ কালো গ্যালারিতে ঢোকাটা তাদের জন্য সুখকর হবে না। কিন্তু তারা নিরুপায়।

তাই আস্তে আস্তে আগে বাড়লো তিনজন।

.

কুকুর-বিড়াল খেলা

বাইরের বাতি জ্বলতে দেখেই শক্ত হয়ে গেল বিজয়। ভেবেছিল বুঝি ভেতরে এত অন্ধকার দেখে গানম্যানেরা ঢুকবে না। তার মানে যতক্ষণ সুইচ খুঁজবে সে সময়ের ভেতরেই যা করার করতে হবে।

নিঃশব্দে দরজার কাছে এসে পড়ল একটা ছায়া। একেবারে ট্রেইনড় কিলারস, মনে মনে ভাবল বিজয়। এদের দক্ষতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

একের পর এক এসে পড়ল তিনটা ছায়া। পরস্পরের সাথে একেবারে মিশে গেল; তবে তাদের মালিকদেরকে এখনো চোখে পড়ছে না।

এবার কী তাহলে? অন্যদের কী অবস্থা তা চেক করার কোনো উপায় নেই। কেবল সেকেন্ড গোনা ছাড়া! আশা করছে যেভাবে প্ল্যান করেছে সব সেভাবেই এগোবে।

.

প্রায় কাছে…

ইয়ারপিসে গানম্যানের কণ্ঠস্বর শুনে মাথা নাড়ল রাইলি। সাহুর পায়ে জোর একটা লাথি দিয়ে বলল, “আমার সাথে চললা; উপরে কাজ আছে।”

রক্তাক্ত কিউরেটরকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে তুলে চেষ্টা করল গ্যালারিতে যেতে। যেন পালানোর আগেই টার্গেটদের ঘাড় চেপে ধরা যায়।

.

ভণ্ডুল হয়ে গেল সবকিছু!

দেয়ালের গায়ে পড়া ছায়াদের দেখে তিক্ত হয়ে গেল বিজয়ের চেহারা। এতক্ষণে প্ল্যান মোতাবেক তার দলের সবাই বাইরে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু গানম্যানদেরকেও যে বাইরে বেরোতে দেখা যাবে সেটা তার মাথায় ছিল না। বাইরে কিংবা সিঁড়িতে আরো কেউ আছে কিনা সেটাও জানে না। কিন্তু এটাই একমাত্র সুযোগ।

১২৮

অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু দরজায় তো আর কোনো ছায়া পড়ছে না। আরেকটা ব্যাপার হল তার দলের দুজন বের হয়ে গেলেও গানম্যান কিন্তু পিছু নেয়নি। কোথাও কোনো গন্ডগোল হচ্ছে। আর তখনই জ্বলে উঠল গ্যালারির লাইট। উজ্জ্বল আলোতে চোখ পিটপিট করল বিজয়। না জানি কী হচ্ছে বাইরে।

৪. ফাঁদ

পরিকল্পনামাফিক চোরের মত গ্যালারিতে সটকে পড়ল এলিস। রুমের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ডিসপ্লের পেছনে যার যার পজিশন নিয়ে নিল। লম্বা লম্বা ডিসপ্লেগুলোতে রাজ-রাজড়াদের বর্ম পরিহিত ম্যানিকুইন এখন অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

করিডোরের লাইট অন হবার সাথে সাথে গুণে দেখল কজন এসেছে। প্ল্যান হল একেবারে শেষ জন ঢোকার পর আরো বিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হবে যেন আরো কেউ থাকলে বোঝা যায়। আর তারপর দশ সেকেন্ডের ব্যবধানে একের পর এক তারাও বের হয়ে যাবে।

কয়েক মুহূর্ত পর বেরিয়ে এলো কলিন। তারপর সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল ডা. শুক্লার জন্য। সবার শেষে আসবে বিজয়। একটু আগেই সিরিয়াস ভঙ্গিতে এর কারণও জানিয়েছে, কারণ আমার কাছেই তো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।” সময় তেমন না থাকায় কেউ আর কোনো তর্ক করেনি।

কিন্তু এতক্ষণ পার হয়ে গেলেও ডা. শুক্লার দেখা নেই। চিন্তিত ভঙ্গিতে এলিসের দিকে তাকাল কলিন। ডা. শুক্লা কিংবা বিজয় কাউকেই রেখে যাবার কোনো ইচ্ছেই তাদের নেই। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। ভেতরে ঢোকাটাও ঠিক হবে না। গানম্যানেরা যখন পিছু নেয়নি তখন নিশ্চয়ই ভেতরে ওঁৎ পেতে থাকবে।

হঠাৎ মাথায় এলো কথাটা: যদি ডা. শুক্লাকে ইতোমধ্যে বন্দী করে ফেলে?

কিন্তু অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগেই সেকেন্ড ফ্লোরের ল্যান্ডিংয়ে রক্তাক্ত সাহুকে নিয়ে উদয় হল রাইলি। “গ্যালারির লাইট জ্বালাও”, অন্ধকারেও এলিস আর কলিনকে ঠিকই দেখেছে। গা জ্বলানো হাসি দিয়ে সাহুকে আদেশ করতেই পালন করলেন কিউরেটর।

নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে বরফের মত জমে গেল এলিস আর কলিন। এই লোকটা কে তা না জানলেও সাহুর ডান হাতের রক্ত আর রাইলির হাতের বোয়ি ছুরি দেখে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যে অবস্থা সুবিধের না। তারা ফাঁদে পড়ে গেছে।

.

কিউরেটরের দুর্ভাগ্য

আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে বিজয়। রক্তে ভেজা সাহুর সাথে এলিস আর কলিনকেও বাইরে নিয়ে গেল সোনালি চুলের লম্বা আর পেশিবহুল এক তরুণ। হাতে আবার বিশাল বোয়ি ছোরা। গ্যালারির বাইরে যে অ্যামবুশ পাতা ছিল সেটা টেরই পায়নি এলিস আর কলিন। কিন্তু সাহুর সাথে এ কী করেছে? এবার বোঝা গেল সাহু কেন আর্তচিৎকার করছিলেন। কিউরেটরের অবসন্ন চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে ব্যথার চোটে বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে।

রুমের ওপাশে কালো স্কি-মাস্ক পরিহিত গানম্যানেরা তিন বন্দীকে ধরে দাঁড়াল।

ফোনে সব শুনে নিল রাইলি, “এলিস টার্নার। চেক। কলিন বেকার।” কলিনের দিকে তাকাল, “তুমিই সেই। রুমে তো আর কোনো শ্বেতাঙ্গ দেখছি না। তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল, “দুর্গে তো তোমরা তিনজন ছিলে। সব কাজে নাক গলানো বাকি দুজনকে ধরা হয়েছে। তার মানে আরো একজন আছে।” গলা তুলে ডাকল, “বিজয় সিং! আমি ভালোভাবেই জানি যে তুমি এখানে। আর লুকাতে পারবে না। যদি চাও যে ওদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করি তাহলে এখনি বেরিয়ে এসো।”

সাথে সাথে বুঝে গেল বিজয়। প্রথমত, কোনো না কোনোভাবে এরা দুর্গে নজরদারি করেছে। কিভাবে সেটা ধরতে পারলেও ওদের নাম-ধাম এমনকি কজন আছে সেটাও তারা জানে। আর আরেকটা ব্যাপার হল ইমরান আর রাধাকেও ধরে ফেলেছে। তবে এই লোকটার ইনফরমেশন কারেক্ট না। ডা. শুক্লার কথা জানে না। প্রাজ্ঞ নোকটা কেন লুকিয়ে আছেন বুঝতে না পারলেও এটুকু আশা যে উনি সবকিছু দেখছেন।

দাটাকে টানতে টানতে কেসের পেছন থেকে বেরিয়ে এলো বিজয়; সহজ স্বরে জানালো, “এই যে আমি।”

খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল রাইলির চেহারা। যাক সব তার ইচ্ছে মতই এগোচ্ছে। এরপর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে সাহুর দিকে ফিরে এক পোচ দিয়েই গলাটা কেটে ফেলল। ধপ করে মেঝের উপর আছড়ে পড়ল কিউরেটরের দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। “ওকে আসলে আর কোনো দরকার নেই।” ব্যাখ্যা দিল রাইলি।

ভীতি বিহ্বল অন্যদের সামনে এবারে এলিসকে ধরে রক্তমাখা ছুরির ফলা চেপে ধরল মেয়েটার গলায়, “এবার বলো মেটাল প্লেটটা কোথায়?” ফিসফিস করে উঠল রাইলি।

পিস্তল তাক করে বিজয় আর কলিনের দিকে এগোল দুজন গানম্যান। একটু নড়াচড়া করলেই পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে হাত কিংবা পায়ের দিকে উড়ে যাবে বুলেট।

চামড়ার উপর গেঁথে বসায় গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা রক্ত। কথা বলতে চেষ্টা করল এলিস; কিন্তু গলায় কোনো স্বর ফুটল না।

মিটিমিটি হাসছে রাইলি, “দেখা যাক কতক্ষণ সহ্য করতে পারো।”

“ওয়েট” নিজেকে সামলাতে না পেরে এক পা আগে বাড়ল বিজয়। চোখের সামনে দেখছে এলিসের আতঙ্কিত চেহারা, “ওর কাছে মেটাল প্লেটটা নেই। ওটা ওই দরজার পেছনের আরেকটা রুমে রাখা হয়েছে। কয়েক মিনিট আগে তালা মারা রুমটাকে ইশারায় দেখিয়ে বলল, “চাবি আমার কাছে।” উদ্যত অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গানম্যানের দিকে তাকাতেই লোকটাও মাথা নাড়ল।

“খুব সাবধান” বিজয়কে সতর্ক করে দিল গানম্যান। স্কি মাস্কের আড়ালে খসখস করে উঠল গলা, “এই রেঞ্জ থেকে কোনো চালাকি করেই কিন্তু বাঁচতে পারবে না।”

আস্তে আস্তে চাবির রিং তুলে রাইলির দিকে ছুঁড়ে মারল বিজয়। খানিকটা ঝুঁকে এলিসকে টানতে টানতে দরজার কাছে নিয়ে তালা খুলে ফেলল রাইলি। কিন্তু ভেতরের সারি সারি ট্যাবলেট আর সিলমোহর দেখেই অসহিষ্ণু হয়ে জানতে চাইল, “এর মাঝে কোনটা?”

ধাতব পাতটা দেখিয়ে দিন এলিস। মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে তৃতীয় গানম্যানের কাছে সরিয়ে ছুরিটাকে খাপে ভরে নিল রাইলি। তারপর সিলটাকে হাতে নিয়ে দেখল।

আর ঠিক তখনি এমন এক ঘটনা ঘটল যে বিস্মিত হয়ে গেল বিজয় আর কলিন।

.

৩২. ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ

মেসিডোনিয়া

প্রাসাদের কক্ষে বসে আছেন আলেকজান্ডার। ভাবনায় বিভোর হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন জানালার দিকে। এমন সময় কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই ভেতরে এলেন রানি মাতা।

“পুত্র” বলে উঠলেন অলিম্পিয়াস, “দেখো তোমার জন্য আমি কোন উপহার এনেছি।”

ভ্রু-কুঁচকে এদিকে ফিরলেন আলেকজান্ডার। শৈশব থেকেই মায়ের এমন আচরণ দেখলেও এখনো কেন যেন অভ্যস্ত হতে পারেননি। যখন তখন গান গাওয়া, ইচ্ছে হলেই নাচ, সাপের প্রতি দুর্বোধ্য এক ভালোবাসা আর না

জানিয়ে রুমে ডোকা মাঝে মাঝে সত্যিই খুব বিরক্ত লাগে। কিন্তু মাকে এত ভালোবাসেন যে এসব বলার কোনো মানেই হয় না।

গাঢ় আর গভীর চোখ জোড়া দিয়ে নিজের গিফট খুঁজলেন আলেকজান্ডার কিন্তু মায়ের হাত দু’খানা তো খালি।

“উফ, মা” অভিযোগ করলেন তরুণ রাজা, “এরকম করোনা তো। বলল কী এনেছ। জানো আমি উপহার কত পছন্দ করি।”

“তার আগে আমার কাছে একটা প্রমিজ করো” ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন অলিম্পিয়াস। একমাত্র পুত্রের সাথেই তিনি কোনো ছলা-কলা করেন

কিংবা কোনো সুবিধাও আদায় করতে চান না। কেবল এটুকুই অভিপ্রায় যে একদিন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে পুত্রের মহিমা। আর এর জন্য যা যা দরকার তিনি তাই করবেন।

কপালে ভাঁজ ফেলে আলেকজান্ডার জানালেন, “নির্ভর করছে এটা কী তার উপর।”

“ওহ্, আমার মনে হয় এই প্রমিজটাকে পূর্ণ করতে পারলে তুমি খুশিই হবে” ছেলের কৌতূহল বাড়িয়ে তুললেন অলিম্পিয়াস, “আর সেটা পারস্যের বিরুদ্ধে তোমার অভিযান নিয়ে।”

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার, “মা, তুমি জানো এ ব্যাপারে আমি কতটা আগ্রহী। পারসীয়রা আমাদেরকে যে অবমাননা করেছে, আমাদেরই ভূমিতে আমাদেরকেই যতটা নিগ্রহ করেছে, সেটার প্রতিশোধ নেয়াই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য। পারস্য সাম্রাজ্যকে মেসিডোনিয়ান শাসনাধীনে না আনা পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না।”

“আমি জানি” পুত্রের দিকে তাকিয়ে শেহের হাসি হাসলেন অলিম্পিয়াস। “কিন্তু এতটুকুতেই থামবে কেন? পারস্যের ওপারে পূর্বে আরো বিস্তৃত ভূমি পড়ে আছে।” এবার প্রায় ফিসফিস করে জানালেন, “পূর্বদেশীয় দেবতাদের ভূমি, যেখানে ইন্দাসসহ আরো বিশাল সব নদী বয়ে যায়।”

“পৃথিবীর শেষ মাথা! সমৃদ্ধিশালী সেসব স্থান সম্পর্কে অবশ্য আমিও শুনেছি।” গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার। ইন্দাস উপত্যকার সোনা আর মূল্যবান সব পাথরসহ স্থানীয়রা পারসীয়দেরকে স্বর্ণধূলির আকারে যে কর দেয় তার বহু গল্পও শুনেছেন। কিন্তু তার মানে তো নিজ দেশ থেকে বহু বছর বাইরে কাটাতে হবে। সেটার যথাযথ মূল্য পাবো তো? তাহলে তো পারস্য সাম্রাজ্য আমাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হবে।”

“সেসব ভূমিতে তুমি যা পাবে তা কোনো পার্থিব সম্পদ নয়।” চিকচিক করে জ্বলে উঠল অলিম্পিয়াসের চোখ। “দেবতা হিসেবে তোমার জন্ম। তুমি জিউসের পুত্র। তোমাকে আগেও বলেছি একথা। কিন্তু এখনো তুমি মরণশীল।” খানিক থেমে পুত্রের চোখের দিকে তাকালেন, “ইন্দাসের স্থানে স্থানে প্রচলিত আছে এ গাঁথা। মহান এক রহস্য সম্পর্কে প্রাচীন সেই পৌরাণিক সত্য তোমাকে দেবতায় রূপান্তরিত করবে। আর আমি চাই তুমি এই রহস্যেরই অন্বেষণ করো।”

পূর্বদেশ থেকে আসা দার্শনিকের সাথে আলোচনার কথা জানালেন অলিম্পিয়াস। পার্চমেন্ট আর ধাতব পাতটা আলেকজান্ডারকে দিয়ে খোদাইকৃত শব্দগুলোও ব্যাখ্যা করলেন। ঠিক যেমনটা জানিয়েছেন সেই পণ্ডিত।

“তবে এটা হবে একটা সিক্রেট মিশন। অনুসন্ধানের কথা তোমার সেনাবাহিনি জানতে পারলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেবে। আর বিশ্বাস না করায় তারা হয়ত তোমার সাথে যেতেও অস্বীকার করবে।”

অলিম্পিয়াসের কথা শেষ হবার পর পার্চমেন্টটা পরীক্ষা করে দেখলেন আলেকজান্ডার। অবশেষে জানালেন, “এটাই আমার নিয়তি; আমিই হয়ে উঠব দেবতা।”

.

৩৩. বর্তমান সময়

তৃতীয় দিন

জরুরি তলব

ডোরবেল শুনে তাড়াহুড়া করে দরজা খুলতে গেল রাধা। বিজয় এসেছে নাকি?

কিন্তু দোরগোড়াতে শোকার্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাফারি স্যুট পরিহিত এক লোক, নির্ঘাৎ কোনো দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। ঘাবড়ে গেল রাধা।

“মিস রাধা শুক্লা?” জানতে চাইল লোকটা।

মাথা নাড়ল রাধা। ধুকপুক করছে বুক।

“আমি হোশিয়ার সিং। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে এসেছি।” আইডি কার্ড বের করেও দেখাল। কিন্তু রাধার শূন্য চোখে কিছুই ধরা পড়ল না। কেবল জানতে চাইছে যে এত রাতে লোকটা এখানে কী করতে এসেছে।

“মিঃ ইমরান কিরবাঈকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।” জানাল হোশিয়ার সিং। “কেউ একজন আজ সন্ধ্যায় তার অ্যাপার্টমেন্টে রকেট প্রপেলড বোমা ছুঁড়ে খুন করতে চেয়েছিল। অবস্থা বেশ সংকটজনক। আমাকে বলা হয়েছে। আপনাকে জানানোর জন্য, যদি হাসপাতালে আসতে চান তো।”

হতভম্ব হয়ে গেল রাধা। ইমরান হাসপাতালে? বোমা? যা শুনছে কেন যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। খানিকক্ষণ আগেই তো ইমরানের সাথে কথা হয়েছে।

“আমাকে একটু সময় দিন” ভেতর থেকে ফোন আনতে ছুটল রাধা। দ্রুত হাতে ইমরানের অবস্থা জানিয়ে বিজয়কে মেসেজ পাঠিয়ে হাসপাতালে দেখা করার কথা জানাল। “চলুন।” দরজায় তালা লাগিয়ে এস্তপায়ে বাগান ধরে অপেক্ষারত গাড়ির কাছে চলে এলো রাধা।

.

এক অদ্ভুত ত্রাণকর্তা

মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দেহবর্মের ডিসপ্লের পেছনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সবকিছু দেখেছেন ডা. শুক্লা। এলিসকে টানতে টানতে ট্যাবলেটের রুমে নিয়ে গেল রাইলি। বিজয়ের মত তিনিও বুঝতে পারলেন যে সন্ত্রাসীরা তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানে না। জানেন না ঠিক হবে কিনা, তবে সিদ্ধান্ত নিলেন যে লুকিয়েই থাকবেন। অন্য কোনো কাজে না লাগলেও বাকিদেরকে বন্দী করার পর তিনি অন্তত ইমরানকে ফোন করে সাহায্য চাইতে পারবেন। এই ফাঁকে মনে মনে নিজেকে গালও দিলেন। জীবনে প্রথমবারের মত সাথে মোবাইল ফোন না রাখার জন্য অনুশোচনা করলেন। এত বছর ধরে রাধা অনেকবার চেষ্টা করলেও তিনি একথা কানেই তোলেন নি। “যখন মোবাইল ফোন ছিল না তখনো তো আমি দিব্যি ঘুরে ফিরে চলেছি”। মেয়েকে শান্ত করেছেন, “যদি কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করতে চায় তাহলে ঠিকই খুঁজে পাবে।”

আজ উপলব্ধি করেছেন যে এরকম পরিস্থিতিতে একটা মোবাইল ফোন কতটা দরকার। একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েও সাহায্য চাওয়া যেত।

এরই ফাঁকে এলিসকে ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিল রাইলি। টলতে টলতে আরেকটু হলেই পড়েই যাচ্ছিল মেয়েটা। তৃতীয় গানম্যান এগিয়ে এসে ধরে ফেলল। লোকটা ঠিক ডা. শুক্লার ফুট খানেক দূরে।

লোকটা এলিসকে ধরলেও নিজের ভারসাম্য বাঁচাতেই হাবুডুবু খাচ্ছে।

হঠাৎ করেই ডা. শুক্লার মাথায় এলো একটা আইডিয়া।

লোকটা যেই না নিজেকে ধাতস্থ করতে যাবে সেই মুহূর্তে কুড়ালের মাথা দিয়ে গানম্যানের মাথায় ডা. শুক্লা দিলেন একটা বাড়ি একই সাথে এলিসকেও ধরে ফেললেন। বর্মের আড়াল থেকে বেরিয়ে মুহূর্তের মাঝে ঘটিয়ে ফেললেন সব কাণ্ড।

কুড়ালের আঘাতে মেঝেতে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে গেল গানম্যান। চুরমাড় হয়ে গেল ডিসপ্লের কাঁচ আর সাথে সাথে যেন চারপাশে নরক ভেঙে পড়ল।

ডা. শুক্লাকে কুড়াল ঘোরাতে দেখেছে বিজয় আর কলিন। প্রথমে অবাক হয়ে গেলেও সাথে সাথে যার যার পাশের গানম্যানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

বন্দীদের দিকে নজর থাকায় সহকর্মীর পতন দেখে বিস্মিত হয়ে গেল বাকি দুই গানম্যান। ফলে মুহূর্তের জন্য তারাও দিশেহারা হয়ে পড়ল।

সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করল বিজয় আর কলিন। নিচু হয়ে বসে এক হাঁটুর উপর ভর দিয়ে ঘুরে আরেক পা দিয়ে এক গানম্যানকে আঘাত করল কলিন। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল লোকটা। হাত থেকে পড়ে গেল পিস্তল। ডাইভ দিয়ে অস্ত্রটা হাতে নিয়েই হাতল দিয়ে লোকটার মাথায় বাড়ি দিতেই জ্ঞান হারাল গানম্যান।

এলিসকে তুলে দরজার দিকে দৌড় দিলেন ডা. শুক্লা। অন্যদিকে মেঝেতে গড়িয়ে গিয়েই হাতের গদা ঘুরিয়ে পেছনের গানম্যানকে মারল বিজয়। যদি আবার নিজের গায়েই লাগে তাই গড়িয়ে সরে এলো একপাশে। গোলাকার রডের মাথায় লাগানো আটটা ফলা বিজয়কে নিরাশ করল না। গানম্যানের উরুতে লেগে কেটে দিল পেশি; অথর্ব হয়ে পড়ে গেল গানম্যান।

মাত্র সেকেন্ড খানেকের মধ্যেই এত কিছু ঘটে গেল যে রাইলি নড়াচড়ারও সুযোগ পেল না। খাপ থেকে ছুরি বের করার আগেই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দিল চার বন্দী।

প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠতেই লাফ দিয়ে পিছু নিল রাইলি। কিন্তু হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে গেছে পুরো গ্যালারি। নিশ্চয় চারজনের কেউ একজন মাথা খাঁটিয়ে যাবার আগে করিডোরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে গেছে।

এটা সেটার সাথে ধাক্কা খেতে খেতে অতি সন্তর্পণে দরজার কাছে এলো রাইলি। কিন্তু খোলার পর দেখা গেল করিডোরেও নিকষ কালো আঁধার। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে কানে এল মিউজিয়ামের বাইরে গাড়ি স্টার্ট দেবার আওয়াজ।

রাগে জ্বলে উঠল সর্বাঙ্গ। খেপে গিয়ে সিঁড়ির কাঠের হাতলের গায়ে ছুরির কোপ মারলেও শান্তি হচ্ছে না। কুপারকে সবকিছু জানাতে হবে। কিন্তু কুপারের প্রতিক্রিয়া চিন্তা করে যে রাগ হচ্ছে তা না; আজ রাতের এ ঘটনা তার রেকর্ডে দাগ ফেলে দিল। নিজের লোকেরাই হল এ ভরাডুবির কারণ।

তবে ভবিষ্যতে আর কখনোই এমনটা হবে না।

.

৩৪. নিউ দিল্লি

তাড়াহুড়ো করে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েই সেন্ট্রাল দিল্লির রাস্তা ধরে গাড়ি ছোটাল বিজয়। ব্যস্ত ট্রাফিকের মাঝেও এঁকেবেঁকে ছুটতে ছুটতে মিউজিয়াম আর তাদের মাঝে যতটা সম্ভব দূরত্ব কমাতে চাইছে। সবার চোখের সামনেই ভাসছে ঠাণ্ডা মাথায় কিউরেটরকে হত্যার দৃশ্য।

একটু পরে অবশ্য খানিকটা টেনশন কমলেও হুইলে ধরা হাত একটুও নরম হল না। “লোকটা কী কুপার নাকি?” এলিসকে জিজ্ঞেস করল বিজয়।

কোনোমতে মাথা নাড়ল এলিস। এখনো নিজেকে সামলাতে পারছে না। সোনালি চুলের তরুণটাকে না চিনলেও এটা বেশ বুঝতে পারছে, তাকে এত সহজে ছাড়বে না ওরা। সেই গ্রিস থেকে এতদূর পিছু ধাওয়া করে দিল্লি পর্যন্ত চলে এসেছে। এমনকি বিজয়ের দুর্গের কথাও জানে!

“ইমরানকে জানাতে হবে। কুপার হোক বা না হোক আজ রাতের ঘটনাটা এমনি এমনিই ঘটেনি। কেউ একজন সারাক্ষণ তোমার উপর চোখ রাখছে এলিস।” ঠিক যেন মেয়েটার মনের কথাই টের পেয়েছে বিজয়। কলিনকে নিজের ফোন দিয়ে জানাল, “ইমরানকে ফোন করো। স্পিড ডায়ালে নাম্বার আছে।”

মাথা নেড়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিনসেভার সরাতে বিজয়ের পাসওয়ার্ড টাইপ করল কলিন, “আরে, রাধা তোমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে।”

“পড়ো তো!” অবাক হয়ে গেল বিজয়।

পড়ার সাথে সাথে কলিনের চোয়াল ঝুলে পড়ার দশা।

“কী হয়েছে?” ভেতরের সীট থেকে জানতে চাইলেন ডা. শুক্লা। পাশেই এলিস।

“ইমরান” কেঁপে উঠল কলিনের গলা। যা পড়েছে তা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। “আজ সন্ধ্যায় উনার অ্যাপার্টমেন্টে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। এখন হাসপাতালে আছেন? কে একজন আইবি’র লোকের সাথে রাধাও ওখানে গেছে। বলল আমরাও যেন যাই।” হাসপাতালের ঠিকানা জানাতেই তৎক্ষণাৎ গাড়ি ঘোরাল বিজয়। আর হয়ত পনের মিনিটের মাঝেই পৌঁছে যাবে।

.

আইবি? নাকি না?

গাড়িতে বসে একদৃষ্টে চারপাশের দৃশ্য দেখছে বিষণ্ণ রাধা। মাথায় যদিও একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইমরানকে কেন টার্গেট করল? উনাকে কেন কেউ খুন করতে চাইবে? এর সাথে কী আগের দিন টাইটানে ভিজিটের কোনো সম্পর্ক আছে? যদি তাই হয় তাহলে তো ওর নিজের জীবনও সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেছে।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে চিন্তাটা দূর করে দিল রাধা। ভেবে ভাল লাগছে যে সে অন্তত তিনজন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তার সাথে এই গাড়িতে নিরাপদেই আছে।

“ডাক্তারেরা ইমরানের সম্পর্কে কী বলেছেন?” পাশেই বসে থাকা এজেন্টের দিকে তাকাল রাধা। গোঁফঅলা লোকটার চেহারা বেশ রুক্ষ।

কিন্তু উত্তর না দিয়ে লোকটা কেবল কাধ ঝাঁকাল। সামনের প্যাসেঞ্জার সিট থেকে এদিকে ঘুরে উত্তর দিল হোশিয়ার সিং, “আমরা শুধু জানি যে উনার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। বাকিটা পৌঁছানোর পর জানা যাবে।”

বহুকষ্টে চোখের জল আটকাল রাধা। গত বছর থেকেই ইমরানের সাথে তার একটা বিশেষ সম্পর্ক হয়ে গেছে। কিডন্যাপড হবার পরে আরেকটু হলে মারাই যাচ্ছিল। ইমরান এসে বাঁচিয়েছে; এখন পর্যন্ত নিশ্বাস নিতে পারছে।

গোলচত্বরের কাছে এসে বামদিকে ঘুরে গেল গাড়ি। এখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আত্মমগ্ন থাকলেও খানিকটা চমকে উঠল রাধা। কোন পথ ধরে এগোচ্ছে এতক্ষণ কেন যেন খেয়াল করেনি। সাউথ দিল্লি থেকে হাসপাতালের দিকেই এসেছিল। কিন্তু ইমরানকে হারাবার চিন্তায় অস্থির থাকায় বুঝতেই পারেনি কখন দূরে সরে এসেছে। এইমাত্র উপলব্ধি করল যে চানক্যপুরীর মধ্য দিয়ে ধোলা কুয়ানের দিকে ছুটছে গাড়ি; আর এই রাস্তায় ওদেরকে গুড়গাঁও নিয়ে যাবে।

ঝট করে একবার পাশের কর্কশ চেহারার এজেন্টের দিকে তাকিয়ে সামনের দুজনেকেও দেখে নিল রাধা। কেউই বুঝতে পারছে না যে তারা ভুল রাস্তায় যাচ্ছে বা বুঝতে পারলেও কোনো প্রক্ষেপ নেই। গাড়ির রেডিও অন করা আর লেটেস্ট বলিউড গানের সাথে গুনগুন করছে হোশিয়ার সিং।

কোথায় কোনো একটা গন্ডগোল হচ্ছে। অস্বস্তি বোধ হল। এরা সত্যিই আইবি এজেন্ট তো? নাকি এসব কিছুই আচমকা টাইটানে উদয় হবার পরিণতি? এজেন্টের আইডি কার্ড স্মরণ করার চেষ্টা করলেও বুঝতে পারল একটুও মনে নেই। হয়ত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখেছে। এতটা অসাবধান হবার জন্য মনে মনে নিজেকে গালও দিল।

কিন্তু যদি এরা আইবি এজেন্টের ভান ধরে এসে থাকে তাহলে এতক্ষণও ওকে খুন করেনি কেন? কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় বাড়িতেই তো কাজটা সারতে পারত। কেন তাহলে ইমরানকে দেখানোর বাহানা করে হাসপাতালে নেবার কথা বলেছে? তার মানে ইমরানের কথাটা আসলে অজুহাত। এ চিন্তা মাথায় আসতেই খানিকটা আশাও জাগল। হয়ত ইমরান সুস্থই আছেন; উনার কিছুই হয়নি। কিন্তু নিজের কথা মনে হতেই আবার খুশি উবে গেল।

নিজের সিটে প্রায় ডুবে গেল রাধা। হতে পারে ও একটু বেশিই ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ওর ধারণাটা যদি সত্যি হয় তাহলেও সন্দেহের কথাটা এদেরকে বুঝতে দেয়া যাবে না। দুপাশের দরজার উপর চোখ বোলাল সেন্ট্রাল লকিং মেকানিজম দিয়ে তালা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না যে খোলা যাবে না। তবে চলন্ত গাড়ি থেকে ঝাঁপ দেবার কোনো মানে নেই। আহত হলে আবার ওকে বয়ে নিয়ে যাবে লোকগুলো।

বুঝতে পারল পালানোর জন্য হয়ত কেবল একটাই সুযোগ পাবে। তাতে যদি ব্যর্থ হয় তাহলে লোকগুলোও সতর্ক হয়ে যাবে আর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না।

চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল রাধা। এত সহজে হাল ছাড়া যাবে না। ধৈর্য ধরে কোনো একটা ট্রাফিক ইন্টারসেকশনে গাড়ি না থামা

পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেটাই হবে একমাত্র সুযোগ।

একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অজানা গন্তব্যের কথা ভাবল রাধা; কী ঘটতে যাচ্ছে ওর সাথে?

.

৩৫. হাসপাতাল

হাসপাতালের পার্কিং লটে ঢুকেই ঘঁাচ করে ব্রেক কষল বিজয়। চারজন আরোহীর সবাই একসাথে বেরিয়েই ছুটল ইমারজেন্সি রুমের দিকে। বিজয় আর কলিন রিসেপশনে হুমড়ি খেতেই পিছনে চলে এলো এলিস। তরুণদের মত এত জোরে না পারলেও আস্তে আস্তে এলেন ডা. শুক্লা।

“ইমরান কিরবা?” রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল বিজয়, “আমরা উনার বন্ধু।”

“জাস্ট আ মোমেন্ট প্লিজ” মাপা কণ্ঠে জবাব দিল রিসেপশনিস্ট। কিছু কাগজপত্র চেক করে কি-বোর্ডে কী যেন টাইপ করল। তারপর কম্পিউটার মনিটর দেখে অবশেষে মাথা নেড়ে জানাল, “নাহ, এই নামে এখানে কেউ নেই।”

পরস্পরের দিকে তাকাল দুই বন্ধু, “আপনি নিশ্চিত?” বিশ্বাসই করতে পারছে না বিজয়। “আমরা তো শুনেছি যে উনি নাকি কিছুক্ষণ আগেই এখানে ভর্তি হয়েছেন। বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে কাজ করেন।”

দৃঢ় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল রিসেপশনিস্ট, “আমি সমস্ত রেকর্ড চেক করে দেখেছি। কোনো বোমা বিস্ফোরণে আহত রুগী নেই। আর ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে তো নয়ই। আয়্যাম সরি। হয়ত আপনারা ভুল হাসপাতালে এসেছেন।”

এতক্ষণে সবার কাছে পৌঁছে সবকিছু শুনলেন ডা. শুক্লা। সাথে সাথে উদ্বেগে ভরে গেল চেহারা। কাউকে বলতে হল না। বাকিরাও বুঝতে পারছে। সবার মাথায় ঘুরছে একই চিন্তা। যদি ইমরান হাসপাতালে না থাকে তো রাধার সাথে কাদের দেখা হয়েছে আর ওকে কোথায়ই বা নিয়ে গেছে?

.

উদয় হল সুযোগ

ধোলা কুয়ানে পৌঁছে গেল গাড়ি। এইমাত্র ফ্লাইওভার পার হয়েছে। পাশেই এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস মেট্রো লাইন। এবার সোজা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের দিকে ছুটছে।

মেট্রো স্টেশনের পরের সিগন্যালেই প্রচুর গাড়ি দেখা যাচ্ছে। রিং রোডের চারপাশ থেকে আসছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। কার, বাস, টু-হুঁইলার মিলে যত্রতত্র মোড় ঘোরার কারণে সৃষ্টি হয়েছে প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যাম।

বুঝতে পেরেই শক্ত হয়ে গেল রাধা। এই-ই সুযোগ। এই সিগন্যালটা পার হলেই দিল্লি থেকে গুড়গাঁওগামী এক্সপ্রেসওয়ে। তারপর গাড়ি এত জোরে ছুটবে যে আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

চট করে একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধা। পাশের গাড়িটা এতটাই কাছে যে দুটোর মধ্যে খুব বেশি হলে ফুট খানেকের ব্যবধান। তাই দরজা খুলে বের হওয়াটা বোকামি হবে।

ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গাড়ি। শত চেষ্টা করেও এলোমেলো ট্রাফিকের মধ্য দিয়ে চালাতে পারছে না ড্রাইভার। দুটো গাড়ির মাঝখানের গ্যাপ খানিকটা বাড়লেও টেনশনে আছে রাধা! সবুজ বাতি জ্বলে উঠল। দ্রুত কেটে যাচ্ছে জ্যাম।

এখন নয়ত কখনোই নয় ভাবতে ভাবতে অবচেতনেই ডোরনবে হাত দিল রাধা।

আর ঠিক সেসময়েই বেজে উঠল ফোন। গাড়ির বাকি তিনজনই সাথে সাথে ওর দিকে তাকাল। অথচ শেষ ভরসা এটাই।

.

কোনটা সত্যি?

“ও তত ফোন ধরছে না” চিন্তিত স্বরে জানাল বিজয়। ডা. শুক্লাও বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। নিঃশব্দে পরস্পরের যাতনা আর অনুভূতি ভাগ করে নিলেন একজন পিতা আর এক ফিয়ান্সে।

“ইমরানকে দেখো তো” বলে উঠল কলিন, “উনাকে তো এমনিতেও পিটার সম্পর্কে জানাতে হবে। হয়ত রাধা কোথায় আছে উনি জানেন।” এ বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও মানসিক স্পৃহাকে হারাতে চায় না। তাহলে বিজয় আর ডা. শুক্লা আরো ভেঙে পড়বে।

মাথা নেড়ে ইমরানের নাম্বার ডায়াল করল বিজয়। অদ্ভুত আর অপরিচিত একটা স্বর বলে উঠল, “ইয়েস?”

“আ…আমি আসলে ইমরান কিরবাঈয়ের সাথে কথা বলতে চাই” খানিকটা দ্বিধা নিয়ে উত্তর দিল বিজয়।

“তুমি কে?” বেশ কর্তৃত্বের স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করল আগন্তুক।

এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল বিজয়। মনে হচ্ছে লোকটা ইমরানকে চেনে। তারপরেও এটা নিশ্চিত যে ইমরান নন। তাহলে কে?

“আমি…ওমম…উনার বন্ধু” অবশেষে বলল বিজয়, “বিজয় সিং।”

“হোল্ড অন।” আদেশ দিয়েই কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল অজানা কণ্ঠস্বরের মালিক। খানিক বাদেই অবশ্য জানাল, “ওকে, ইউ চেক আউট। ইউএস-ইন্ডিয়া টাস্ক ফোর্সে তুমিও আছো। সরি, বিজয়। নিশ্চিত হওয়া দরকার ছিল যে সত্যিই তুমি ফোন করেছ কিনা। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।”

ক্রমেই বাড়ছে বিজয়ের বিস্ময়। আবার খানিকটা উদ্বেগও আছে। এরকম পরিস্থিতি মানে কী? ইমরান কোথায়?

তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল লোকটা।

“তোমাকে জানানো হয়নি?” মনে হল উনিও অবাক হয়েছেন। “আজ তো ইমরানকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। একেবারে ক্লোজ রেঞ্জে ওর অ্যাপার্টমেন্টে ছোঁড়া হয়েছে একটা রকেট প্রপেলড বোমা। ধুলায় মিশে গেছে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট। ইমরানের অবস্থাও বেশ সংকটপূর্ণ। সার্জারি চলছে। জানি

কতটুকু কী হবে।” বিজয়ের মনে হল মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। তার মানে ইমরানের উপর অ্যাটাকের খবরটা সত্য! খুব দ্রুত সবকটা ইনফরমেশনকে একসুতোয় জোড়া লাগাল। এখন ইমরানের সার্জারি চলছে আর তারাও ভুল হাসপাতালে এসেছে যার মানে রাধাকে অপহরণ করা হয়েছে। আর যারা ওকে গায়েব করেছে তারা আইবি এজেন্টের বেশ ধরে এসেছে মানে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। লোকগুলো মেয়েটার জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। বাজি ধরে বলতে পারে যে এই নকল আইবি এজেন্টেরাই ইমরানকেও মারতে চেয়েছিল।

“বিজয়” জানতে চাইল ওপাশের কণ্ঠ, “তুমি এখনো লাইনে আছো?”

কী বলবে কিছুই মাথায় আসছে না। কোনোমতে জানতে চাইল, “আপনি কে?”

কঠোর স্বরে জানাল সে কণ্ঠ, “আমি অর্জুন বৈদ্য, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর, আগেও দেখা হয়েছে তোমার সাথে।”

নিজের উপরই ক্ষেপে গেল বিজয়। সে তো বৈদ্যকে চেনে। ইমরানের বস। গত বছর পুরো অ্যাডভেঞ্চার শেষ হবার পর দেখাও হয়েছে। কিন্তু উনিই যে ফোন ধরবেন সেটাই বা বিজয় কিভাবে জানবে।

“আয়্যাম সরি, মিঃ বৈদ্য, তোতলাতে লাগল বিজয়, “আসলে আপনার কণ্ঠস্বর চিনতে পারিনি। কিন্তু এটাও আশা করিনি যে…”

“দ্যাটস ফাইন”, জানালেন বৈদ্য, “তুমি এখন কোথায়? রাধাও কি তোমার সাথে আছে? আজ যে ওরা টাইটান ফার্মাতে গিয়ে ছিল সেটার সাথে এই ঘটনার যোগসাজস থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।”

ভয়ে বিজয়ের হাত-পা হিম হয়ে গেল। আগেও বহুবার সে আর রাধা এসবের মাঝে দিয়ে গিয়েছে। প্রথম যখন ইমরান ট্রাস্ক ফোর্সে জয়েনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, তখন বিজয় মানা করেছিল। গত বছরের স্মৃতি এখনো মন থেকে মুছেনি, তাছাড়া একটা সিক্রেট রক্ষার গুরুভারও আছে কাঁধে। শেষমেশ রাধার পীড়াপীড়িতে রাজি হতে হল।

“তোমার চেয়ে টাস্ক ফোর্সের জন্য বেশি উপযুক্ত আর কে আছে”, বলেছিল মেয়েটা; বিজয়ের সিক্রেট সম্পর্কে কলিন আর রাধাও জানে। নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুজন ব্যক্তির কাছে একথা লুকাতে মন সায় দেয়নি। আর তাই রাধা বুঝিয়েছিল, “তোমার দেশ শুধু নয় বরঞ্চ গোটা পৃথিবীর জন্য কাজ করার সুযোগ পাবে। এ ধরনের সুযোগ জীবনে কেবল একবারই আসে।”

অগত্যা মানতেই হল। এরপর রাধা জয়েন করার সময়েও আপত্তি করেছিল; কিন্তু মেয়েটা ওর কথা কানেই তোলেনি।

“ব্যাপারটা কিন্তু বেশ বিপজ্জনক” অনেক বোঝাতে চেয়েছে বিজয়। “ওহ, আমার জন্য বিপজ্জনক আর তোমার জন্য নয়, তাই না?” স্বভাবসুলভ জ্বলজ্বলে চোখে উত্তর দিয়েছিল কঠোর রাধা, কারণ তুমি পুরুষ আর আমি নারী বলে?”

“না, সেটা না” আমতা আমতা করে উত্তর দিয়েছিল বিজয়। মনে মনে অবশ্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। রাধাই তো ওকে রাজি করিয়েছে আর ও কিনা ওর সাথে! কিন্তু নিজের কথা খুলে বলার সাধ্য ছিল না।

এখন আবার নাড়া দিল সে স্মৃতি। বিজয়ের ভয়ই অবশেষে সত্যে পরিণত হল। জীবনে প্রথমবারের মত, তাও ইমরানের অসন্তুষ্টি নিয়েই ফিল্ড মিশনে গিয়েছিল রাধা। আর এখন এমনকি বৈদ্য পর্যন্ত জানে না যে ও কোথায়।

যা যা ঘটেছে সব খুলে বলল বিজয়। ইমরানের অ্যাপার্টমেন্টে যারা বোমা ফাটিয়েছে তারা যে নকল আইবি এজেন্টদের সাথেও জড়িত সে ব্যাপারে অর্জুন বৈদ্যও একমত হলেন।

“ডোন্ট ওরি” বিজয়কে আশ্বস্ত করে বললেন, “আমি এক্ষুনি রাধার ফোন ট্রেস করার ব্যবস্থা করছি। যদি জিপিএস অন থাকে তাহলে তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে। আর ইমরানের সম্পর্কে তোমাকে জানাব। ঈশ্বর জানেন যে আমরা সকলেই ওর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। এখন যেখানে আছে সেখানেই থাকো। আমি কয়েকজন এজেন্টকে পাঠাচ্ছি। মনে হচ্ছে তোমরা কেউই নিরাপদ নও।”

“থ্যাংকস” ফোন কেটে দিয়ে অন্যদেরকে সবকিছু জানাল বিজয়। তবে কথা বলার সময় কেন যেন আরেকটা চিন্তা খেলে গেল মাথায়। বৈদ্যর একটা মন্তব্যে কেন যেন খটকা লেগেছে। হঠাৎ করেই বুঝতে পারল যে সোনালি চুলের তরুণ কিভাবে দুর্গে তাদের একত্রে থাকার কথা জানতে পেরেছে। ডা.

শুক্লার কথা কেন টের পায়নি সেটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

.

৩৬. ৩২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, সেপ্টেম্বর

সমরকন্দ, বর্তমান সময়ের উজবেকিস্তান

ল্যাম্প আর মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে পুরো সগডিয়ান রাজপ্রাসাদ, কর্মব্যস্ত চারপাশে সকলেই আনন্দ-উল্লাসে মত্ত। ভোজনের আয়োজন করেছেন সম্রাট স্বয়ং। অপ্রত্যাশিত এক পরাজয়ের পর বাল্ক পর্যন্ত পশ্চাদপসরণ করে নতুন করে শৃঙ্খলিত করেছেন তার সেনাবাহিনি। এরপর চারটা মোবাইল ইউনিটকে নদী উপত্যকা পেরিয়ে বর্তমানকালের তাজিকিস্তান আর আরেকটা ইউনিট উজবেকিস্তানে পাঠিয়েছেন সমরকন্দে একত্রিত হবার জন্য। পরিবার পরিজনসহ বিদ্রোহী গোত্র প্রধানেরা পিছিয়ে চলে এসেছে আলেকজান্ডারের পরবর্তী স্টপেজ সগডিয়ান রক পর্যন্ত। এর পেছনে অবশ্য অনেক কারণও আছে।

তবে এতে বর্তমানের আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। আলেকজান্ডার এখন পারস্য সম্রাট। আগামীতে রকও জয় করে নেবেন। কোনো কিছুই তার পথে বাধা হতে পারে না।

প্রাসাদের ভেতরে উপচে পড়ছে ভোজনশালা। পানির মত বইছে ওয়াইন, আর টেবিলগুলোও উপাদেয় সব সগডিয়ান খাবারে পূর্ণ।

বিশাল কক্ষে একসাথে মিশে গেছে সাধারণ সৈন্য আর জেনারেল, মেসিডোনীয় আর অ-মেসিডোনীয় সকলেই। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছে সমস্ত শক্রতা আর রাজনীতি। যুদ্ধের কথা বিস্মৃত হয়ে সবাই বেশ আন্তরিক আচরণ করছে।

তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না এ পরিবেশ।

হলের একপাশে হেফাসন আর নিজের অন্তরঙ্গ কজন পুরুষকে নিয়ে আসর জমিয়েছেন আলেকজান্ডার। চিৎকার-চেঁচামেচি আর হাসির হল্লায় বোঝ গেল সুরার মাত্রা।

কিন্তু ওয়াইনে মত্ত হবার আগেই এগিয়ে এলেন হেফাসন।

“এবার চুপ হও সবাই!” গুটিকয়েক সৈন্য আর জেনারেল এদিকে মনোযোগ দিলেও বেশিরভাগই কোনো পাত্তা দিল না। কেউ একজন আবার এমন এক মন্তব্য করল যে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন আলেকজান্ডার।

এবার নিজের কর্তৃত্ব জাহির করার সিদ্ধান্ত নিলেন হেফাসন। খাবার ভর্তি একটা টেবিলের উপর লাফ দিয়ে উঠে ব্রোঞ্জের দুটি সার্ভিং ডিশের সমস্ত কিছু ফেলে বেশ কয়েকবার জোরে জোরে করাঘাত করলেন।

অবশেষে নিশ্চুপ হল পুরো কক্ষ। কিছু একটা ঘটছে আঁচ করে সবাই এদিকে মনোযোগ দিল। আলেকজান্ডারের প্রিয়ভাজন যখন এভাবে টেবিলের উপর উঠে বাসন বাজাচ্ছে আর সম্রাট নিজেও শান্ত হয়ে আছেন তখন ব্যাপার নিশ্চয় গুরুতর।

সন্তুষ্ট হেফাসন এবার আলেকজান্ডারের পাশে বসা একজনকে ইশারা দিলেন।

“আমাদের স্থানীয় কবি প্রাণিকাসের লেখা কবিতা শোন”, মিটিমিটি হেসে লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নেমে এলেন হেফাসন।

সবাই হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিল। টেবিলের উপর উঠে আবৃত্তি শুরু করলেন প্রাণিকাস।

সাথে সাথে পাল্টে গেল সমস্ত চিত্র। প্রাণিকাসের আবৃত্তির সাথে সাথে হলের বেশির ভাগ লোক হেসে কুটি কুটি হল। আবার বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যে ভারী হয়ে উঠল বাতাস। অন্যদিকে কবিতা শুনে কয়েকজনের চেহারা হয়ে উঠল কালো আর কঠোর।

এরা সকলেই বেশ প্রাচীন পন্থী। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপের আমলের রাজনীতিবিদ। তবে তরুণ রাজাকেও কম সহায়তা করেন নি। একসাথে লড়েছেন বিভিন্ন লড়াই। বিশেষ করে বলা যায় মেসিডোনিয়ানদের ভাগ্যের পাল্লা ভারী করা গগাঁমেলার যুদ্ধ। তাই যা শুনছেন তা কিছুতেই মনঃপুত হচ্ছে না।

সমরকন্দে আলেকজান্ডারের জেনারেলদের পরাজয়ের উপর রচিত এ কবিতায় বলা হয়েছে গত শীতে বাধ্য হয়ে বাল্কে পিছিয়ে আসার কথা। ব্যাকট্রিয়ান গোত্রের হাতে এরকম অবমাননার জন্য উপহাসের পাত্র হয়েছেন। জেনারেলগণ।

এ কথা কানে আসতেই নিজেদের মাঝে মৃদু গুঞ্জন শুরু করলেন প্রাচীনপন্থী রাজনীতিকেরা। এদের মাঝে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন মাত্র কিছুদিন আগেই ব্যাকট্রিয়া ও সগডিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তা ক্লিটাস।

“বর্বর আর শত্রুদের সামনে মেসিডোনিয়াদেরকে অপমান করা হচ্ছে।” দাঁতে দাঁত ঘষে বুঝিয়ে দিলেন রাগের মাত্রা। “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি এসব সহ্য করব নাকি? আমাদের মাঝে কী কোনো সত্যিকারের পুরুষ নেই? আমাদেরকে ব্যঙ্গ করছে তাই কী দেখতে হবে?”

“সফলতা এলে আলেকজান্ডার হয় এর দাবিদার আর যখন পরাজিত হই তখন জেনারেলরা হয় দায়ী।” অসন্তোষে অভিযোগ করলেন আরেকজন। “ফিলিপের সময়তো এমনটা কখনো হত না।”

ওনার দিকে তাকালেন ক্লিটাস, “তাহলে কিছু বলছেন না কেন? বন্ধ করুন এসব বাজে কথা! ফিলিপ আর এমনকি আলেকজান্ডারের সামনেও আমাদের কথা বলার যথেষ্ট স্বাধীনতা আছে। আমাদের যুক্তি নিশ্চয় আগ্রাহ্য করবে না।

“লোকগুলো সব মাতাল হয়ে গেছে।” ভর্ৎসনা করে উঠলেন আরেকজন প্রাজ্ঞ। “মাত্রাতিরিক্ত ওয়াইনের প্রভাবে ওদের মাথা কাজ করছে না। তাই এ সময়ে কিছু বলাটা ঠিক হবে না। পারসেপোলিসে কী হয়েছে মনে নেই?” পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী পারসেপোলিসে প্রবেশ করে এরকমই এক ভোজনের আয়োজন করেছিলেন আলেকজান্ডার। আর সেই অনুষ্ঠানেই মদ্যপ আলেকজান্ডার সিদ্ধান্ত নেন পুরো পারসেপোলিসে আগুন ধরিয়ে দেবেন। ফলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অনিন্দ্য সুন্দর সে শহর।

“আর মাতাল হয়ে ফিলিপ যে আলেকজান্ডারকেও খুন করতে চেয়েছিল সে কথাও মনে রেখো।” অভিজাত বংশ থেকে আসা এক রমণী, ক্লিওপেট্রা আর ফিলিপের বিবাহ অনুষ্ঠানের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন আরেক প্রৌঢ়। আলেকজান্ডারকে অবৈধ ইশারা করে ক্লিওপেট্রার চাচা অ্যাটালাস মন্তব্য করেছিলেন যে এবার ফিলিপ এক বৈধ উত্তরাধিকারী জন্ম দিতে পারবে। অলিম্পিয়াস নিজে ফিলিপ নয় বরঞ্চ জিউসকেই আলেকজান্ডারের পিতা দাবি করলেও ক্ষেপে উঠেন আলেকজান্ডার। অ্যাটালাসের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারেন নিজের কাপ আর মাঝখানে ফিলিপ পড়ে যাওয়ায় সাথে সাথে তরবারি বের করে আলেকজান্ডারকে খুন করতে উদ্যত হন মৃত সম্রাট। কিন্তু নেশাগ্রস্ত থাকায় মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়াটাই সার হয়।

তবে এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যায় সুরামত্ত রাতে ঘটনা কতদূর এগোতে পারে। আজ রাতটাও ঠিক তেমন। তাই তুচ্ছ কিছু নিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠাকে সায় দিলেন না প্রাচীন রাজনীতিকেরা।

কিন্তু ক্লিটাস দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। “এসব থামাতেই হবে। আর যদি আপনাদের কারো সাহস না হয় আমিই করব। গ্রাণিকাসে আমিই বাঁচিয়েছি আলেকজান্ডারকে। আর ভুলে যাবেন না যে পিলোটাসকে হত্যা করার পর সেনাবাহিনির অর্ধেক আমাকে আর বাকি অর্ধেক হেফাসনকে সমর্পণ করেছে। তাই আমার কথা না মেনে পারবে না।”

ধাক্কা দিয়ে ভিড়ের মাঝে পথ করে একেবারে প্রাণিকাসের টেবিলে পৌঁছে গেলেন ক্লিটাস।

“যথেষ্ট হয়েছে!” প্রাণিকাসকে আদেশ দিয়ে বললেন, “আর না!” আবৃত্তির মাঝপথে থেমে গিয়ে হেফাসন আর আলেকজান্ডারের দিকে তাকাল প্রাণিকাস।

টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন অ্যালকোহলের নেশায় আচ্ছন্ন তরুণ রাজা।

“কেন থামবে?” ক্লিটাসকে জিজ্ঞেস করলেন আলেকজান্ডার, “সে তো সত্যি কথাই বলছে।”

পুরো হল রুমে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। ব্যাপারটা এখন আর প্রাণিকাস আর ক্লিটাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আলেকজান্ডারও জড়িয়ে পড়েছেন।

আস্তে করে টেবিল থেকে নেমে পিছু হটল প্রাণিকাস। পরস্পরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্লিটাস আর আলেকজান্ডার।

“তোমার পিতার আমল থেকেই এ ঐহিত্য চলে আসছে যে বিজয়ের দাবিদার আর পরাজয়ের জন্য দায়ী,..” ক্লিটাস শুরু করলেও শেষ করতে পারলেন না, মাঝপথে বাধা দিলেন আলেকজান্ডার।

“আমার পিতা!” থু করে থুথু ফেলে বললেন, “এমনভাবে বলছেন যেন তার মত নীতিবান আর কেউ নেই। তার বিজয়ে আমিও যে কত ভূমিকা পালন করেছি তার জন্য আমাকে কখনো প্রশংসা করেছেন? পিতার ঐতিহ্যের কথা বলছেন? আমি তো শুধু জানি আমার প্রতি তার অন্যায় অভিপ্রায়ের কথা। আমার প্রতি উনার প্রতিহিংসার কথা। সেসব কি তাহলে? সেগুলো কি একজন ন্যায়বানের চিহ্ন?” ক্লিটাসের দিকে তাকিয়ে ওয়াইনের কাপে চুমুক দিলেন আলেকজান্ডার। ‘

“তুমি তোমার পিতার স্মৃতিকে অবজ্ঞা করছ। পারস্যের উপর আক্রমণ তিনিই শুরু করেছিলেন আর আজ তুমি যা করেছ তা বহু বছর আগে উনিই করতেন যদি না এক আততায়ীর ছোরা তার জীবন কেড়ে নিত।” থেমে গেলেন ক্লিটাস। আবেগের তোড়ে হারিয়ে যাচ্ছে যুক্তিবোধ। “ভুলে যাচ্ছো যে আজ তুমি যা তা কেবল পিতার কল্যাণেই পেয়েছ। আজ তোমার যা কিছু অর্জন তিনিই সবকিছুর ভিত্তি করে গেছেন। তোমার চেয়েও তার অর্জন কয়েক গুণ বেশি। আর আজ তুমি পিতা ফিলিপকে অমান্য করে আমনের সন্তান হিসেবে ভান করে নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবছ?”

শেষ শব্দটার সাথে সাথে সবাই যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।

“বদমায়েশ!” ক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিলেন ওয়াইনের নেশামত্ত আলেকজান্ডার। “আমাকে তিরস্কার করে মেসিডোনিয়ানদের মাঝে অসন্তুষ্টি জাগানোর ইচ্ছে তাই না?”

কিন্তু নিজের জায়গায় অনড় রইলেন ক্লিটাস, “যদি তুমি কারো যুক্তি শুনতে চাও তাহলে কেন তাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছ? দাস আর দুবৃত্তদেরকে সঙ্গে রাখলেই পারতে। তারা নতমুখে তোমার চাটুকারিতা করত!”

ক্রোধে ফেটে পড়লেন আলেকজান্ডার। ক্লিটাসের দিকে ছুঁড়ে মারলেন হাতের কাপ। দুজনের গায়েই ছিটিয়ে পড়ল ওয়াইন। হন্তদন্ত হয়ে সকলেই ছোটাছুটি করছে। এরই মাঝে পরিবেশন টেবিল থেকে একের পর এক ফল তুলে ক্লিটাসের দিকে ছুঁড়তে লাগলেন তরুণ রাজা। আশেপাশে অস্ত্রের খোঁজে হাত বাড়ালেও একটাও পাওয়া গেল না।

“প্রহরীদেরকে ডাকো!” চিৎকার করে উঠলেন আলেকজান্ডার, “আমার’ গার্ডেরা কোথায়? ডাকো ওদেরকে!”

এদিকে ক্লিটাসের কয়েক জন বন্ধু এসে টানতে টানতে জেনারেলকে প্রাসাদের বাইরে নিয়ে গেল। একেবারে পরিখার ওপারে; যেন আলেকজান্ডারের রোষানল থেকে তিনি নিরাপদে থাকতে পারেন। তারপর আলেকজান্ডারের ক্রোধ প্রশমিত হলে তিনি আবার এসে নৈশ দাওয়াতে যোগ দিতে পারবেন। যদি তা ততক্ষণ পর্যন্ত টিকে তো।

পৌঁছে গেল আলেকজান্ডারের দেহরক্ষী দল। গোল করে দাঁড়িয়ে তরুণ রাজাকে ঘিরে ফেলল।

একটু পরেই ক্লিটাসের বন্ধুরা ফিরে এসে আনন্দ উৎসব পুনরায় শুরু করার ইশারা দিল। আগামীকাল হ্যাংওভার কেটে গেলেই সবাই আবার সবকিছু ভুলে যাবে।

কিন্তু অদৃষ্ট আজ রাতের ভাগ্যে লিখে রেখেছে এক ভিন্ন পরিণতি।

হঠাৎ করেই দরজার কাছে শোনা গেল হৈ চৈ। তারপরই ভেতরে এলেন ক্লিটাস। যুদ্ধ ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়াটা তার স্বভাব নয়। সবসময় এ নীতিতেই অটল থেকেছেন। তাই আজও তার ব্যতিক্রম হবে না।

“আহ, আমি! গ্রিসে রাজত্ব করছে এক দুষ্ট প্রবৃত্তি!” পুরো হলরুম জুড়ে গমগম করে উঠল ক্লিটাসের কণ্ঠ। তরুণ রাজার দিকে এগোতে গিয়ে আবৃত্তি করলেন ইউরিপিডেসের লেখা আন্দ্রোমাচের এক পংক্তি। গলার স্বরে স্পষ্ট ঔদ্ধত্য।

বন্ধুদের কাছে ফিরে আসতে গিয়েও ঘুরে তাকালেন আলেকজান্ডার। ক্লিটাসকে দেখার সাথে সাথেই মাথায় চড়ে উঠল রাগ। তাই প্রতিক্রিয়াও হল একেবারে তৎক্ষণাৎ। এক গার্ডের কাছ থেকে বর্শা নিয়েই সোজা জেনারেলের দিকে দৌড় দিলেন।

“বিসাসের চেয়ে তো ভিন্ন কিছু নও!” বর্শা বিদ্ধ ক্লিটাস মাটিতে পড়ে যেতেই ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত। হলের মাখখানে তৈরি হল রক্তের খাড়ি। সবাই সভয়ে এমনভাবে পিছিয়ে গেল যেন এ রক্ত অভিশপ্ত। এর আগে আলেকজান্ডারের এ রূপ আর দেখা যায়নি। যেন তার উপর অন্য কেউ ভর করেছে।

রক্তের সাথে বেরিয়ে গেল ক্লিটাসের প্রাণশক্তি। হাটু ভেঙে বসে পড়লেন আলেকজান্ডার। মাতাল হলেও ঠিকই বুঝতে পেরেছেন যে কী করেছেন। ক্লিটাসের প্রাণহীন দেহের উপর নুইয়ে পড়ে তাই কান্না আটকাতে পারলেন না। জেনারেলের রক্তে ভেসে গেল তার পোশাক আর জুতা; কিন্তু এবার কোনো ভ্রূক্ষেপ করলেন না।

জীবনে প্রথমবারের মত ভিন্নমত পোষণকারী কাউকে হত্যা করলেন আলেকজান্ডার। আর একই সাথে ভঙ্গ হল দুটো মেসিডোনীয় প্রথা। প্রথমটা হল, সেনাবাহিনির উপস্থিতিতে বিচার ছাড়াই কাউকে হত্যা করা। আর দ্বিতীয়টি হল জিউসের আতিথ্য নীতি, নিমন্ত্রিত অতিথিকে হত্যা করা। যে

অতিথি কিনা সারাজীবন বিশ্বস্ততার সঙ্গে রাজপরিবারের সেবা করে গেছে।

অশ্রুজলে পূর্ণ হয়ে উঠল সে রাত। প্রথমবারের মত নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাশ টানতে ব্যর্থ হলেন আলেকজান্ডার।

তবে এটাই কিন্তু শেষ নয়।

.

৩৭. বর্তমান সময়

তৃতীয় দিন

পলায়ন...

খেয়ালের বশেই কাজটা করে ফেলল রাধা। গাড়ির বাকি তিন আরোহী ওর দিকে তাকাবার সাথে সাথেই মোবাইলের রিং আগ্রহ করে ভোর নবে হাত দিয়ে খুলে ফেলল গাড়ির দরজা। পাশের গাড়ির ফেন্ডারে ঠাস করে লাগায় কতটা ক্ষতি হয়েছে দেখতে নেমে এল ড্রাইভার।

উত্তেজিত ড্রাইভার, পেছনের একগাদা গাড়ির হর্ন সবকিছুকে উপেক্ষা করে ট্রাফিক জ্যামের মধ্য দিয়ে ছুটল রাধা। উদ্দেশ্য যত দ্রুত সম্ভব কয়েক মিটার দূরের মেট্রো স্টেশনে পৌঁছানো।

গ্লকের (পিস্তল) মাজল ঝলসে উঠায় তাড়াহুড়া করে আবার নিজের জায়গায় চলে গেল ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ড্রাইভার। প্রচন্ড ভয় আর আত্মরক্ষার চিন্তায় ভুলে গেছে অন্য সবকিছু।

এদিকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনজনই রাধার পিছু নিল। ফুটপাত ধরে এগিয়ে ত্রস্তপায়ে লাফ দিয়ে মেট্রো স্টেশনের এসকেলেটর লিফটে চড়ে বসল রাধা। ড্রাইভারদের দল সামনে এতক্ষণ হর্ন বাজালেও নকল আইবি এজেন্টদের

উদ্যত পিস্তল দেখে সবাই আবার চুপ করে গেল।

“ট্রেন আসছে!” স্টেশনের গায়ে হলুদ আলো পড়তেই চিৎকার করে উঠল তিনজনের একজন। নিজেদের হাঁটার গতি বাড়িয়ে আশপাশের গাড়িগুলোকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে রাধার পিছু পিছু এসকেলেটর লিফটে উঠে গেল।

চট করে দেখবার জন্য পিছনে তাকানোর ঝুঁকি নিল রাধা। দেখল এত ট্রাফিক সত্ত্বেও থামল না পিছু ধাওয়াকারীরা। হাতের পিস্তল স্পষ্ট দেখা গেলেও কেন যেন এখনো গুলি করেনি। খানিকটা অবাকই লাগল ঘটনাটা।

কিন্তু এত শত ভাবার মত সময় নেই হাতে। প্লটফর্মে পৌঁছেই ঘঁাৎ করে থেমে গেল ট্রেন। একই সময়ে এসকেলেটর থেকে নামল রাধা। সৎ নাগরিকের মত টিকিটের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াবার সময় নেই। অন্যদের চিৎকার অগ্রাহ্য করে সবাইকে টপকে সামনে চলে এল রাধা। তারপর প্লাটফর্মের একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত দৌড়ে উঠে পড়ল একেবারে শেষ কোচে। মনে মনে শুধু আশা করছে যেন নকল তিন এজেন্ট প্লাটফর্মে আসার আগেই ট্রেনটা ছেড়ে দেয়।

ট্রেনের দরজা বন্ধ হতেই ভয়ার্ত চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধা। লোকগুলো এখনো প্রাটফর্মেই আছে। হঠাৎ করেই একজন ওর দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালেও গতি বাড়িয়ে স্টেশন থেকে বের হয়ে গেলো ট্রেন।

হঠাৎ করেই শুরু হয়ে গেল জোর হট্টগোল। তিনজনের যে লোকটা একটু আগে ওকে দেখে ফেলেছিল সে এবারে তার সাথীদেরকে নিয়ে লাফাতে লাফাতে এক্সিটের দিকে চলে গেল। ট্রেনের গতি বাড়লেও কী ঘটেছে বুঝতে পারল রাধা। এসকেলেটর থেকে গেটের কাছে ছুটে এলো সাধারণ পোশাকধারী পাঁচজন আগন্তুক। সবার হাতেই হ্যান্ডগান। এই পাঁচজন এবার নকল তিন আইবি এজেন্টের পিছু নিল। এরা কারা না জানলেও লোকগুলোর পিছু নেয়াতে বোঝ গেল সাধারণ পোশক হলেও তারা আইনের লোক।

ধপ করে খালি একটা সিটে বসে কপাল মুছল রাধা। এতক্ষণ মনে পড়ল মোবাইল ফোনের কথা। রিং বাজছিল, উত্তর দেয়া হয়নি। ফোনটা বের করেই চেক করে দেখল বিজয়ের নাম্বার। দেখো একেবারে সময় মত এসেছিল ফোনটা! তাড়াতাড়ি করে নাম্বার ডায়াল করল রাধা।

“আয়্যাম ফাইন”, ঘটে যাওয়া সবকিছু জানিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে উদয় হওয়া পাঁচজন সশস্ত্র লোকের কথাও খুলে বলল।

কিডন্যাপারদের অবস্থা শুনে মিটিমিটি হাসল বিজয়, “ওরা আসলে বৈদ্যের পাঠানো আইবি এজেন্ট। তোমার জিপিএস ট্রেস করে সাহায্য করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। মনে হচ্ছে উনার পরিকল্পনা কাজ করেছে।”

রাধাও হেসে ফেলল; কিন্তু আবার একটা কথা মনে হতেই মুছে গেল হাসি। “তার মানে ইমরানের হাসপাতালে ভর্তি হবার ঘটনাটা মিথ্যাকাহিনি।”

“না, তা না।” এবারে বিজয়ের খবর পরিবেশনের পালা। “আর খুব বেশি হলে দশ মিনিটের মধ্যেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাবে। আমি এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। তুমি শুধু চুপচাপ ভালো একটা জায়গা দেখে অপেক্ষা করো।”

বিজয়ের আমেরিকান সুলভ হাবভাব দেখে অট্টহাসি দিল রাধা। মনে পড়ে গেল লুইস লামারের উপন্যাসের কথা। ওর সাথে এত কিছু ঘটে যাবার পরেও হাসি আসছে দেখে ভালোই লাগল আর একই সাথে বিজয় যে ওকে এয়ারপোর্টে আনতে যাচ্ছে তাতেও স্বস্তি পেল।

জিন্সের পকেটে ফোনটাকে রেখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল। সন্ধ্যার টেনশন নাকি জোনগড় থেকে গুড়গাঁও আবার দিল্লি আসার ধকল বুঝতে পারছে না।

বহুক্ষণ পর মনে হল ট্রেনটা থেমে গেল। ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠল রাধা। কিন্তু পুরোপুরি ধাতস্ত হবার আগেই দেখল চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একগাদা লোক।

আস্তে আস্তে ঝাপসা দৃষ্টি স্পষ্ট হতেই বুঝতে পারল পেছনে ছয় জন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ককেশীয় পুরুষ। সবাই সশস্ত্র। আর শ্বেতাঙ্গ লোকটা ঠিক ধর উপর ধরে আছে একটা হ্যান্ডগান। পুরো কোচ খালি। একটাও। প্যাসেঞ্জার নেই। পালিয়ে গেছে নাকি!

লোকটার সেঁতো হাসি দেখেই সব বুঝে গেল রাধা। “আমরা এয়ারপোর্টে চলে এসেছি মাই ডিয়ার।” ব্যঙ্গের স্বরে বলে উঠল লোক। “ওয়েলকাম টু ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।” একেবারে নিখুঁতভাবে নকল করল ঘোষণাটা। আর লোকটার গলার স্বরও হুবহু মিলে গেল ইংরেজি সেই ঘোষণার সাথে। “সিটবেল্ট বেঁধে নাও সোনামণি। তোমাকে এখন দীর্ঘ একটা ভ্রমণে যেতে হবে।”

.

আইজিআই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, মেট্রো স্টেশন

হতভম্ব হয়ে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছে বিজয়। দশ মিনিট আগে পৌঁছে দেখে যে আবার সেন্ট্রাল দিল্লির উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে ট্রেন। এদিকে প্লাটফর্মে রাধার কোনো চিহ্নও নেই। চারপাশে শুধু পরবর্তী ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত প্যাসেঞ্জার যারা এই মাত্র ফ্লাইট থেকে নেমেছে। গেল কোথায় মেয়েটা!!

স্টেশনের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত আরো একবার চক্কর দিয়ে এলো বিজয়; যদি রাধাকে মিস করে থাকে এই আশায়। এর সম্ভাবনা যথেষ্ট কম হলেও ঝুঁকি নিতে চায়নি।

বৈদ্যের এজেন্টের আশায় বাকিদেরকে রেখে এয়ারপোর্টে ছুটে এসেছিল বিজয়। ট্রাফিক জ্যাম বিরক্তিকর হলেও জানে ও কথা দেয়াতে রাধা ঠিক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু এখন কী করবে কিছুই মাথায় আসছে না। ফোনে কল করেও লাভ হচ্ছে না। সুইচড অফ। এ ব্যাপারটাও বেশ ভাবাচ্ছে। ফোন কেন বন্ধ রেখেছে?

কোথাও একটা গড়বড় হয়েছে মনে হচ্ছে। যদি এমন হয় যে কথা বলার সময়েও আসলে রাধা বন্দিই ছিল! হয়ত জোর করেই বলিয়েছে যে কিডন্যাপাররা চলে গেছে। ধারণাটা অস্বস্তিকর হলেও ইমরানের সাথে যা ঘটে গেছে তারপর আর স্বাভাবিকভাবে কিছুই ভাবতে পারছে না।

কলিনকে ফোন করে এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে দিল বিজয়। সাথে সাথে এলিস, ডা. শুক্লা আর তিনজন আইবি এজেন্টকে নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল কলিন। বিজয় আসার একটু পরেই চলে এসেছে এজেন্টের দল আর তাদের আইডেন্টিটি বৈদ্য নিজে ভেরিফাই করেছেন।

আইবি এজেন্টরা ওদেরকে জোনগড়ে পৌঁছে দেবার কথা। কোথায় ফিরবে সেটা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আর কোনো স্থানকে সুরক্ষিত মনে হয়নি। তাই সবাই মেনে নিয়েছে বিজয়ের যুক্তি; তা হল এলিস যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যদের সাথে দুর্গে ছিল লোকগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ হাত গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিল।

“আমার মনে হয় কেল্লাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে নিরাপদ।” সবাই বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল বিজয়ের রায়।

রাধাকে আর কিভাবে খুঁজবে বুঝতে না পেরে ইমরানের নাম্বার ডায়াল করল বিজয়। বৈদ্য নিজের নাম্বার বিজয়কে না দিয়ে বলেছেন কিছু সময়ের জন্য এই নাম্বারেই যোগাযোগ রাখতে।

“সবকিছু ঠিক আছে তো? ফোন কানে দিয়েই জানতে চাইলেন বৈদ্য।

“না, নেই।” সবকিছু খুলে বলল বিজয়। সাথে আরো জানাল, “আমার আরেকটা অনুরোধ আছে, রাধার ফোনের জিপিএস ধরে আরো একবার ট্রেস করার চেষ্টা করা যায় না?”

“আমি এক্ষুনি কাউকে পাঠিয়ে দিচ্ছি” উত্তরে জানালেন বৈদ্য, “কিন্তু ফোন খোলা না থাকলে কোনো লাভ নেই। যেমনটা তুমি বললে সেরকমই যদি সুইচ অফ থাকে তাহলে বেশি কিছু করা যাবে না।

মুষড়ে পড়ল বিজয়। ভয় পাচ্ছে যদি রাধাকে আবারো অপহরণ করা হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় আততায়ীরা ওর ফোন ভোলা রাখবে না। আর যদি খোলেও তাহলেও জিপিএস নিষ্ক্রিয় করে রাখবে যেন ওর কোনো হদিসই না পাওয়া যায়।

বেশ বুঝতে পারছে যে তাদেরকে মিউজিয়ামে যে দলটা আক্রমণ করেছে তাদের কাছে বিজয়দের সবার স্মার্টফোনের জিপিএস ট্র্যাক করার আধুনিক টেকনোলজি আছে। সবার পরিচয় আর অবস্থান জানতে পাবার এটাই হল রহস্য। কিন্তু ডা. শুক্লার কাছে কোনো ফোন না থাকায় আক্রমণকারীরা উনার কথা জানত না। ব্যাপারটা উপলব্ধি করার সাথে সাথেই সবাই যার যার জিপিএস বন্ধ করে দিয়েছে।

তবে এখন বেশ ভয় হচ্ছে। এই লোকগুলো মোটেই আনাড়ি নয়। আর আইবি যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারাও যদি সে ধরনেরই হয় তাহলে তো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তারা কতটা শক্তিশালী। তার মানে বিজয়ের দুঃস্বপ্নই সত্য হল। এবার হয়ত রাধাকে হারাতেই হবে।

.

৩৮. বন্দী…

তিরতির করে কেঁপে উঠে খুলে গেল চোখের পাতা। চারপাশে তাকিয়েই গুঙ্গিয়ে উঠল রাধা। সবার আগে চোখে পড়ল আশেপাশের রঙ।

সাদা। একেবারে শ্বেতশুভ্রই বলা চলে। একটা সাদা সিলিং। সাদা দেয়াল আর সম্ভবত সাদা মেঝে। বুঝতে পারল ওকে একটা বিছানার সাথে বাধা হয়েছে। কব্জি আর গোড়ালি এমনভাবে আটকানো যে একটুও নড়াচড়ার সাধ্য নেই। বাম হাতে আবার স্যালাইন চলছে।

খানিকক্ষণ মুক্তি পাবার জন্য বহু কসরত করেও অবশেষে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। কোনো লাভ নেই।

মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে। দেহও যেন সীসা। কোথায় শুয়ে আছে ও? এখানে এসেছেই বা কিভাবে? অস্পষ্টভাবে শুধু মনে পড়ছে যে ট্রেনের কোচে ওর দিকে পিস্তল ধরেছিল একটা লোক। তারপর ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে নামার পর আর কিছু মনে নেই।

জোর করে একটা কেমিকেলের গন্ধ নিঃশ্বাসের সাথে ভেতরে নিতে বাধ্য করেছিল লোকগুলো। সেই কটু ধোয়ার গন্ধে এখনো জ্বালা করছে না। বজ্রমুষ্টি একটা হাত রাধার ঘাড়ের নিচে ধরে জোর করে ভেজা এক টুকরো কাপড়ে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিল। ঘাড়ের কাছে সে জায়গাটায়ও ব্যথা হচ্ছে।

এতক্ষণে বুঝতে পারল যে গায়ে একটা হসপিটাল গাউন জড়িয়ে শুয়ে আছে। তাহলে তার নিজের জিন্স আর টপ কোথায় গেল? কে তার পোশাক বদলে দিয়েছে? অজানা একজন এরকমটা করেছে ভাবতেই অপমানবোধের পাশাপাশি হঠাৎ এক ক্রোধে দিশেহারা বোধ করল রাধা।

আস্তে আস্তে রাগ বাড়তেই ভেসে গেল সমস্ত যুক্তিবোধ। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতে করতে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই শুরু করল এ বন্দীদশা

থেকে মুক্তি লাভের জন্য।

.

… নাকি গিনিপিগ?

সেন্টারের কন্ট্রোল রুমের একটা ব্যাঙ্কে বসে কৌতূহল নিয়ে একদৃষ্টে ক্যামেরার ভিডিও মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন ডা, বরুন সাক্সেনা। এরপর সঙ্গীর দিকে ঘুরে মাথা নেড়ে জানালেন, “তুমি ঠিকই বলেছ গ্যারি। আমি জানতামই না যে এই ড্রাগের এতটা শক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।”

দাত বের করে হেসে ফেলল গ্যারি ফ্রিম্যান। “হেই, আপনাকে বলেছিলাম বলতে ভাল লাগছে না; কিন্তু সত্যিই তা বলেছিলাম। হঠাৎ করে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠা রাধাকে যে ভিডিও মনিটরে দেখা যাচ্ছে তার উপর বুড়ো আঙুল নাচিয়ে জানাল, “আমার মনে হয় এখনই ওকে অ্যান্টিভোট দেয়া উচিত। যদি ওকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখতে চান। নয়ত আগামী দু’ঘণ্টায়ও কাটবে না এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর ততক্ষণে মেয়েটা একটা কিংবা দুটো হাতই হারিয়ে ফেলবে।”

অন্যদিকে পর্দায় দেখা যাচ্ছে এখনো বাধন নিয়ে লড়াই করছে রাধা। হাতের ইনজেকশন সূচের কথা যেন ভুলেই গেছে। অসম্ভব জোরে ঝাঁকি খাচ্ছে টিউবে লাগানো স্যালাইনের প্যাকেট।

শেষ বারের মত ভিডিও মনিটরের দিকে তাকিয়ে ইন্টারকমে কয়েকটা নির্দেশ দিলেন সাক্সেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে ঢুকে স্যালাইনের মধ্যে কিছু একটা মিশিয়ে দিল নার্স। অ্যান্টিডোট দ্রুত কাজ করায় প্রায় সাথে সাথে শান্ত হয়ে গেল রাধা।

“রেগুলার নমুনার ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃশ্য হয়ত দেখার সুযোগ পাবেন না।” মিটিমিটি হাসছে ফ্রিম্যান। “ওদের শরীরে আমরা এতকিছু ইনজেকশনের মাধ্যমে ভরেছি যে ড্রাগের সাথে মিশে কোনটা যে কোন প্রতিক্রিয়া করে তা বলা মুশকিল। তবে এটাকে সময় মত পাওয়াতে ভালই হয়েছে। একেবারে সঠিক সময়ে।”

“ওকে পাইনি” রুম থেকে বেরোবার সময় জানালেন সাক্সেনা, “এখানে কুপার নিয়ে এসেছে। আজ নয়ত কাল ওকে ঝেরে ফেলতেই হবে। তার আগে জানতে হবে যে মেয়েটা অপারেশন মহাভারত সম্পর্কে কী কী জানে।”

“সত্যি?” উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল ফ্রিম্যানের চেহারা। “দেখুন আপনারা আমাকে এখানে বন্দী করে রেখেছেন আর তাই বাইরের দুনিয়ায় যে কী ঘটেছে আমি কিছু জানি না।”

“আর কিছু তো করারও নেই।” পাল্টা জবাব দিলেন সাক্সেনা, “আমরা এখানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে এসেছি। এমনকি আমিও তো খুব একটা বাইরে যেতে পারি না। এই ফ্যাসিলিটিকে কোনোভাবেই টাইটানের সাথে জুড়তে দেয়া যাবে না। আর তোমরা এখানে যে বিষয়ে পড়াশোনা করো তা যেকোনো মূল্যেই গোপন রাখতে হবে। এ কথা তুমিও জানেনা। যদি একটা শব্দও বাইরে যায় ধুন্ধুমার লেগে যাবে। বিশেষ করে যদি প্রকাশ পায় যে টাইটানের জেনেটেকিস হেড এই গবেষণা চালাচ্ছে।”

“ইয়াহ, আমি জানি, জানি। কিন্তু তার মানে তো এই না যে এতে খুশি হতে হবে।” ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠল ফ্রিম্যান, “কোনো ঝুঁকি কি দেখা দিয়েছে?”

কাঁধ ঝাঁকালেন সাক্সেনা, “জানি না। এই কারণেই তো মেয়েটাকে ধরে এনেছি। খুঁজে বের করা প্রয়োজন। আমার কাছে তো সাংবাদিক সেজে এসেছিল। সে সময়ে জানতাম না। টের পেলাম যখন কুপার এসে মেয়েটা আর স্বরূপের কাছে আসা আইবি এজেন্টের মধ্যেকার যোগাযোগের কথা জানাল। তখন শুনলাম যে মেয়েটা আন্ডারকাভার হিসেবে কাজ করছে।”

শিস দিয়ে উঠল ফ্রিম্যান। তার মানে সেও আইবি লোকটার সাথে কাজ করছে? ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনিতে?”

“এখনো জানি না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আইবির লোকটা মারা গেছে…কিংবা যাচ্ছে। কুপার সেটা সামলেছে। আর মেয়েটা কী জানে, জানার পর তারও একই পরিণতি হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত কুপার ওকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তার মানে যতক্ষণ এখানে আছে, আমাদেরও ব্যবহার করতে দ্বিধা নেই। এতটা ভালো আর একেবারে তাজা নমুনা পাওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়।” কদর্যভাবে হেসে ফেললেন সাক্সেনা; ফ্রিম্যানও মিটিমিটি হাসছে।

.

৩৯. পাওয়া গেল সম্পর্ক

কেল্লার স্টাডিতে একসাথে বসে আছে বিজয়, কলিন, এলিস আর ডা. শুক্লা। কিছুক্ষণ আগে সবাইকে এসকর্ট দিয়ে পৌঁছে দিয়ে গেছে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এজেন্টরা। তারপর আবার ফিরে গেছে। যদি আরো কেউ তাদের পিছু নিয়ে থাকে কিংবা নজরদারি করে সেজন্য খুব সাবধান থাকতে হয়েছে।

দুর্গে ফেরার পর থেকেই বেশ স্বস্তি আর নিরাপদ বোধ করছে বিজয়। এখানে অন্তত কোনো ভয় নেই। কিন্তু জোনগড়ে ফেরা আর তারপরেও এখন পর্যন্ত রাধার কোনো সংবাদ না পাওয়ায় সবাই বেশ উদ্বিগ্নও বটে। মনে হচ্ছে যেন একেবারে বাতাসে মিলিয়ে গেছে মেয়েটা।

কন্যার শোকে মনমরা হয়ে বসে আছেন ডা. শুক্লা, “বৈদ্য টাইটানে গিয়ে তদন্ত করছেন না কেন? নির্দিষ্ট কাউকে না হলেও এতক্ষণে প্রায় দশবারের উপর করে ফেলেছেন এ প্রশ্ন। যদিও বিজয় এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে বৈদ্য নিজে টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের সিইও স্বরূপ ভার্মার সাথে কথা বলেছেন। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর খোদ ডিরেক্টরকে নিজ অফিসে দেখে লোকটা রীতিমত ঘাবড়ে গেলেও ইমরান আর রাধার ব্যাপারে অকৃত্রিম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তদন্ত কাজ আর রাধাকে খোঁজার ব্যাপারেও পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি ভারতে টাইটানের প্রতিটি অফিস আর আউটসোর্সড ফ্যাসিলিটিতে আইবি এজেন্টদের পরিদর্শনের প্রস্তাবও দিয়েছেন।

“সমস্ত সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছে আইবি”, ধৈর্য বজায় রেখেই জানাল বিজয়। ডা. শুক্লার খাতিরে চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। “আমাদেরকে আসলে ওদের উপর ভরসা রাখতে হবে। আশা করি শীঘ্রিই কোনো না কোনো খবর পাওয়া যাবে।”

এবার কথা বলল এলিস, “যাদুঘরে সোনালি চুলের লোকটা একটা কথা বলেছিল।” বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে আছে যখন আমাদেরকে শুনেছিল? তখন ইমরান আর রাধা সম্পর্কে কী যেন একটা বলেছিল।”

“বলেছিল যে ওদের ব্যবস্থা করা হয়েছে।” গোমড়ামুখে উত্তর দিল বিজয়। রাধা আর ইমরান দুজনেই যে টার্গেট হবে সেটা যে কেন ওর মাথায় এল না। তবে জানে যে এর জন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। তখন তো সুতোর উপর ঝুলছিল তাদের নিজেদের ভাগ্য! কপালের জোর বলতে হবে বেঁচে ফিরতে পেরেছে। লোকগুলো তো পেশাদার খুনিই ছিল।

“হ্যাঁ, কিন্তু মনে নেই এটাও তো বলেছিল যে ওরা দুজন চারপাশে নাক গলাচ্ছিল।” সতর্ক চোখে তাকাল এলিস। জানে এসময় এটা বলাটা হয়ত ঠিক হবে না। কিন্তু একই সাথে এর মাধ্যমে নতুন একটা দিকও পাওয়া যাবে।

“ইয়াহ্, মনে আছে।” কলিন ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই বিজয় আর ডা. শুক্লাও মাথা নাড়লেন। তবে এবারে উরুতে চাপড় মেরে উঠল কলিন। বুঝতে পারল না এলিস কী বলতে চাইছে, “ও ঈশ্বর! দুটো ঘটনা আসলে একসাথে জড়িত।”

এখনো দ্বিধায় ভুগছে বিজয় আর ভা, শুক্লা। এলিস বুঝতে পারল দুজনেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ায় চিন্তাশক্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই ব্যাখ্যা করে বলল, “এতদিন ধরে আমরা ভেবে এসেছি যে গ্রিসের খনন কাজ আর আমার সাথে যা ঘটেছে তার সাথে পিটারের জড়িত থাকা আর এখানে, ভারতে ইমরানের বায়ো-টেররিজমের সম্ভাব্য উদয় খুঁজে পাবার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটা কি হতে পারে যে এই দুই ঘটনা আসলে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত?”

বিজয়ের দিকে তাকালেন ডা. শুক্লা। বুঝতে পারছেন না খবরটা ভালো না মন্দ। কিন্তু সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না বিজয়। এতক্ষণ সে নিজেও জাদুঘরে ঘটে যাওয়া সমস্ত আলাপচারিতা আর ঘটনা নিয়ে মনে মনে বিশ্লেষণ করছিল আর এলিস ঠিক তার চিন্তার সূত্রগুলোকেই শব্দ হিসেবে উচ্চারণ করেছে। দুজনের সম্পর্কের শুরু থেকেই মেয়েটা বিজয়কে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারত। বিজয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করার চমৎকার দক্ষতা আছে, একই সাথে নিজের সহজাত বোধের উপরও নির্ভর করে, কিলার কম্বিনেশন বলা যায়। এলিস বুঝতে পারল যে বিজয় মনে মনে তার দক্ষতা আর বোধশক্তি ব্যবহার করে ওর কথার সত্যতা যাচাই করছে।

“তোমার কথাই হয়ত ঠিক” অবশেষে জানাল বিজয়, “ওরা আমাদের সবার সম্পর্কেই জানে কেবল ডা. শুক্লা ছাড়া। তাদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যাতে আমাদের সমস্ত গতিবিধি ধরা পড়ে। সেভাবেই দুর্গে এলিসের উপস্থিতির কথা জেনে জাদুঘর পর্যন্ত আমাদেরকে অনুসরণ করেছে। রাধা আর ইমরানকে অনুসরণ করেছিল। তাই জানত যে ওরা টাইটান ফার্মাতে যাবে। জাদুঘরের সোনালি চুলের লোকটার কথা থেকে এটুকু স্পষ্ট বোঝা গেছে। আর তারপর থেকে ইমরান আর রাধাকে টার্গেট করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: গ্রিসের খনন কাজ আর বায়োটেররিজমের মধ্যে সম্পর্কটা কোথায়? জানি যে তারা কিউবটার পেছনে লেগেছে। এখন জানি যে আলেকজান্ডারও কিছু একটার খোঁজে ভারতে এসেছিলেন। এমন কিছু যাকে ইউমেনিস ‘দেবতাদের সিক্রেট নামে অভিহিত করে গেছেন।” সমস্বরে নিজের চিন্তা সকলের কাছে খুলে বলল বিজয়।

অন্যেরা চুপ করে বসে শুনছে। বিজয়কে এলিস আর কলিন ভালভাবেই চেনে; তাই মাঝখানে কোনো কথা বলে ওকে বাধা দিল না। রাধার জন্য দুশ্চিন্তায় অস্থির ডা. শুক্লা ঠিকভাবে শুনতেই পেল না যে বিজয় কী বলছে।

“তো” আবারো বলে উঠল বিজয়, “উপসংহারে বলা যায় আলেকজান্ডার যেটা খুঁজছিল সেটাই আসলে বায়োটেররিজমের সম্ভাব্য উৎস। আমার মাথায় শুধু একটাই ধারণা আছে আর তা হল এটা এমন এক ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া যা মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এমন কিছু যা সন্ত্রাসীরা নিজেদের কাজে লাগাবে। আর কিই বা হতে পারে? এর মাধ্যমে টাইটানের ক্লিনিক্লাল ট্রায়ালে যেসব ঘোট ঘোট সেলগুলো ছিল সেগুলোর উপস্থিতির কারণও স্পষ্ট হয়ে গেছে। টেস্ট রিপোর্টেও অজানা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের কথা পাওয়া গেছে। কিন্তু তাতে তো আরো বহু প্রশ্নর উদয় হয়েছে। একটা ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসকে কেন “দেবতাদের রহস্য” বলা হবে? আলেকজান্ডারই বা কেন এই রহস্য খুঁজছিলেন? যদি পেতেন তাহলে কী করতেন? নাকি অন্য কিছু যা আমাদের চোখে পড়ছে না?”

পুরো ব্যাপারটা হজম করতে গিয়ে বাকিরা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। বিজয়ের উপসংহার পুরোপুরি যৌক্তিক মনে হচ্ছে। ও যে প্রশ্নগুলো তুলেছে সেগুলোও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই। বিশেষ করে আলেকজান্ডারের অভিযানে যদি কোনো ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসই মুখ্য উদ্দেশ্য হয় তাহলে বায়োটেররিজমের সাথে এর সম্পর্ক কী?

উঠে দাঁড়ালেন ডা. শুক্লা, “রাত হয়ে গেছে। আমি আসি।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে অন্যদেরকে জানালেন, আসলে এ মুহূর্তে একটু একা থাকতে চাইছেন। তাই আলেকজান্ডার আর বায়োটেররিজমের মাঝে সম্পর্ক নিয়ে কোনো আগ্রহই পাচ্ছে না। তার অপহৃত কন্যা সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাও না। আর যদি এতে সন্ত্রাসীরা জড়িত থাকে তার মানে মেয়েটা কতটা বিপদের মধ্যে আছে। একজন সিনিয়র আইবি অফিসারের অ্যাপার্টমেন্টে যদি বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে তাহলে তাদের হাতে বন্দী রাধার সাথে কী কী ঘটতে পারে?

বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল বিজয়। ও নিজেও বেশ দুশ্চিন্তায় আছে; কিন্তু একটু আগেই যা আবিষ্কার করল, তাতে মনে হচ্ছে লড়াই করার মত অন্তত হাতে কিছু আছে। কী কিংবা কিভাবে করবে। কতটুকু লাভ হবে না জানলেও নিজের অনুভব শক্তির উপর তার পূর্ণ আস্থা আছে। “আচ্ছা তোমরাও গিয়ে একটু রেস্ট নাও না?” কলিন আর এলিসকে জানাল বিজয়। “আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু ভাবতে চাই। দেখা যাক নতুন কোনো আইডিয়া পাই কিনা।”

বন্ধুকে ভালোই চেনে কলিন। তাই কোনো দ্বিমত না করে এলিসের কাঁধে টোকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল, “ঠিকই বলেছ। এখন তাহলে উঠি; সকালে দেখা হবে।”

অন্যেরা স্টাডি থেকে বেরিয়ে যেতেই বিশালাকৃতির জানালার কাছে। দাঁড়িয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকাল বিজয়।

দুর্গের চারপাশের অন্ধকারের মতই আঁধারে চেয়ে আছে ওর অন্তর। কিন্তু গভীর গহীন থেকে আস্তে আস্তে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এক বিদ্রোহী মনোভাব। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে সাহায্য করেছে এ প্রবৃত্তি। হার না মানা এ জেদই তাকে টিকে থাকতে শিখিয়েছে। তবে হ্যাঁ, কখনো কখনো দুঃখ বয়ে আনলেও বেশিরভাগ সময়েই লক্ষ্য অর্জনে অটুট থাকতে পেরেছে।

আশা করছে এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। রাধাই এখন ওর একমাত্র সম্পদ। বলতে দ্বিধা নেই যে কলিনের মত মহৎ হৃদয় বন্ধুও আছে; যে কিনা প্রায় ভাই বলা যায়। কিন্তু বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর থেকে যা পায়নি, রাধা তাকে সে ভালোবাসা দিয়েছে। এমনকি এখন বুঝতে পারে যে এলিসের কাছ থেকেও তা পায়নি। রাধার কাছ থেকে নিঃস্বার্থ আর শর্তহীন ভালোবাসা পেয়েছে বিজয়। সম্ভব বলে যা কখনো ভাবতেই পারেনি।

অথচ এখন তাকে হারাতে বসেছে।

.

৪০. বিনিময়ের প্রস্তাব

বসে বসে পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দেখল কুপার। পরিকল্পনা মত সবকিছু এগোলেও জাদুঘরে কেবল খানিকটা গড়বড় হয়ে গেছে। একটু আগেই সবকিছু জানিয়েছে রাইলি। শিকার হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে স্বর্ণকেশি ছেলেটা।

“এটা নিয়ে এত ভেবো না”, প্রবোধ দিয়েছে কুপার। “এসব টুকটাক ঝামেলা তো হয়ই। যাই হোক, মেয়েটা এখনো আমাদের হাতে আছে। ওরা বাধ্য হবে ধরা দিতে। সাথে আরেকটা বোনাসও আছে। মেটাল প্লেটটা তত আমাদের কাছে। এটা ছাড়া কিউবটা কোনো কাজেই দেবে না।” ফোন তুলে। নিল কুপার। সময় হয়েছে আগে বাড়ার। একটা ফোন করতে হবে।

বিজয়ের নাম্বারে ডায়াল করল। আর প্রায় সাথে সাথেই উত্তর এলো।

“ইয়েস। কে বলছেন?”

“আমার নাম পিটার কুপার। বোধ হয় তোমার বন্ধু এলিসের কাছে আমার কথা শুনেছ।”

নীরবতা নেমে এলো অপর প্রান্তে। কল্পনার চোখে কুপার স্পষ্ট দেখছে যে এত রাতে ওর ফোন পেয়ে বিজয় কতটা চমকে উঠেছে। এটাও বুঝতে পারছে যে রাধার সংবাদের আশায় জেগে উঠেছে বিজয়ের সাহস। কুপারও ঠিক এটাই চায়। পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করছে তার দাবি মেনে নেয়ার জন্য বিজয় কতটা মরিয়া হয়ে আছে সেটার উপর।

তাই চুপচাপ অপেক্ষা করছে কুপার। ভারী হয়ে উঠেছে ওপাশের নীরবতা।

“রাধা কোথায়?” নিজেকে আর সামলাতে না পেরে অবশেষে জানতে চাইল বিজয়, “যদি ওর এতটুকু ক্ষতি করে থাকো…” যুৎসই কোনো শব্দ খুঁজে

পেয়ে বাক্যটাকে অসমাপ্তই রেখে দিল। অজানা অচেনা এক শত্রুর বিরুদ্ধে কী করতে পারবে যখন তারা কোথায় লুকিয়ে আছে সে সেটাও জানে না?

“এমন কোনো বোকামি করো না যার জন্যে তোমাকে পস্তাতে হবে।” উপদেশ দিল কুপার। “তোমার বাগদত্তা আমাদের কাছে। নিরাপদেই আছে। তবে আপাতত। তুমি আমাদের সাথে কতটা সহযোগিতা করবে তার উপর নির্ভর করছে ওর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।”

আবার নীরব হয়ে গেল বিজয়। এবারে আর অপেক্ষা করল না কুপার। বরঞ্চ জোর দিয়ে বলল, “আমার একটা প্রস্তাব শোন, এক ধরনের বিনিময় বলতে পারো, তোমার কাছে এমন একটা জিনিস আছে যা আমরা চাই। আর আমাদের কাছে আছে তোমার জিনিস তাহলে কেন পরস্পরের সাথে বদলে নেই না? সবাই খুশি হবে আর শেষ ভালো তো সব ভালো।”

“কিউবটা চাও?”

“ইয়েস। আর এলিস টার্নার। আমাকে দুটোই দিতে হবে; তাহলে তুমি তোমার বাগদত্তাকে ফিরে পাবে।”

আবার নিশ্চুপ ওপ্রান্ত। কুপার বেশ বুঝতে পারছে যে বিজয় কতটা কষ্টে নিজের আবেগ সংযত করছে। এটা সত্যিই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। বাগদত্তার বিনিময়ে প্রাক্তন বান্ধবী। দুজনের ভাগ্যই এখন বিজয়ের হাতে।

“আমি একেবারে নির্বোধ নই।” বলে চলল কুপার, “তোমাকে আগামী কাল দুপুর বারোটা পর্যন্ত সময় দিচ্ছি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার জন্য। তারপর আমাকে জানিয়ে দিও। ততক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চয়তা দিচ্ছি তোমার বাগদত্তার মাথার একটা চুলও কেউ স্পর্শ করবে না। কিন্তু এর মাঝে একটা সিদ্ধান্তও আশা করছি।”

ফোন কেটে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙল কুপার। সময় হয়েছে বিছানাতে গড়িয়ে পড়ার। দিনটা বেশ দীর্ঘ ছিল। তাছাড়া বয়সও হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন মাঠপর্যায়ের কাজই বেশি উপভোগ করত। টার্গেটের পিছু ধাওয়া

করা, কখনো কখনো হারিয়ে ফেলা আবার নাগালে পাওয়া এক শক্তিশালী নেশার মত লাগত। কিন্তু এখন শারীরিক পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তবে হাতের কাজটা তো করতেই হবে। আর তার অভ্যাসই হল খুঁটিনাটি ব্যাপারে নজর দেয়া। কাল আবার বিজয় সিংকে কল করবে। তখনই নির্ধারিত হয়ে যাবে দুই নারীর ভাগ্য।

৫. চতুর্থ দিন

খানিকটা আশা

কলিন স্টাডিতে ঢুকে দেখে ডেস্কে হাতের উপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে বিজয়। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্রিন্ট আউটের কাগজ। বিজয়ের নোটবুকও খোলা। তার উপরে কলম। সারা রাত যে বিজয় কত ব্যস্ত ছিল তা পরিষ্কার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে। শুধু চিন্তা এটাই যে ওর বন্ধু কী করছিল আর এমন কিছু কি খুঁজে পেয়েছে যাতে উপকার হবে?

বিজয়ের কাছে হেঁটে গিয়ে আস্তে করে নাড়া দিল কলিন, “হেই, দোস্ত, উঠো।”

ডেস্ক থেকে মাথা তুলে ঝাপসা চোখে কলিনের দিকে তাকাল বিজয়, “ঘুমিয়ে পড়েছিলাম” বিড়বিড় করে বলে উঠল।

“কোনো সমস্যা নেই। দেখো নিজে কী হাল করেছ। যাও নিচে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো।”

বিজয় মাথা নাড়লেও এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। আর তারপরই কী যেন একটা মনে পড়তেই একেবারে সিধে হয়ে বসল।

“একটা জিনিস পেয়েছি” কলিনকে জানাল, “চলো নাশতা করার সময়ে তোমাদেরকে জানাব।”

রাতে কী খুঁজে পেয়েছে না জানিয়ে বিস্মিত কলিনকে রেখে তাড়াহুড়া করে স্টাডি থেকে বেরিয়ে গেল বিজয়।

এক ঘণ্টা পরেই আবার স্টাডিতে এসে মিলিত হল সবাই। ডেস্কে বসে কাগজপত্র গুছিয়ে তূপ করে রাখল বিজয়।

এদিকে কৌতূহল আর এক রাশ প্রত্যাশা নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে তিন জোড়া চোখ।

“দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের উপর আমি বেশ খানিকটা গবেষণা করেছি” শুরু করল বিজয়, “মাইকেল উডের বিবিসি ডকুমেন্টারি ডাউনলোড করে সেটাও দেখেছি, পুরো চার ঘণ্টা। উনার সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন বইয়ের অংশ পড়েছি। তোমরা বিশ্বাসই করতে পারবে না যে কতজন উনার সম্পর্কে লিখে গেছেন। মেসিডোনিয়া থেকে ভারতে আসার জন্য যে রাস্তা অনুসরণ করেছিলেন। তাও পড়েছি। পথিমধ্যে কাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, বিভিন্ন শহরে কী কী করেছেন সেসব গল্প পড়েছি। তাই অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। যেমন উনি ছিলেন ভয়ানক জেদি। একগুয়েমির জন্য কোনো কিছুই তাঁকে রুখতে পারত না। আর ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

“শুনে মনে হচ্ছে অনেকটা তোমার মত”, দাঁত বের করে হেসে ফেলল কলিন, “নিজেকে বর্ণনা করতে হলেও এসবই বলতে হবে তোমাকে।”

বিজয় কুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেও কোনো উত্তর দিল না।

এলিস কিছু না বললেও মনে মনে সেও একই কথাই ভাবছে। বিজয়ের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব, অধ্যবসায় আর সবকিছুকে একবাক্যে বিশ্বাস না করার প্রবণতা ওকে অনেক ক্ষেত্রেই সফল হতে সাহায্য করেছে। এলিস নিজেও এ কারণেই ছেলেটার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এমন এক পুরুষ যে নিজের সম্পর্কে জানে। আর তাকে অনুসরণ করতে ভয় পায় না। কিন্তু একই সাথে ওদের ব্রেক আপের কারণও এটাই।

“যেটা মনে হয়েছে তা হল প্রতি পদক্ষেপে আলেকজান্ডাকে কিছু একটা প্রেরণা জুগিয়ে ছিল যখন মেসিডোনিয়া ছেড়েছেন এটা ছিল পোথোস আকাঙ্ক্ষা, বহুদিনের অপেক্ষা-পারসীয়দের হাতে গ্রিকদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। তাই তিনি পারস্যের অগ্রযাত্রা আর তারপর দারিয়ুসকে পরাজিত করলেন। শুধু তাই না, দারিয়ুস যখন তার নিজের সভাসদদের হাতে প্রাণ হারায় তখন আলেকজান্ডার তাদের পিছু ধাওয়া করে পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত চলে যান। তারপর সবাইকে ধরে হত্যা করেন। এবার তিনি হন পারস্যের শাসনকর্তা; কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন নি। আরেক আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে পূর্বদিকে গমন করেছেন। আমি যতগুলো লেখা পড়েছি সে সমস্ত লেখকেরা এ মনোবাসনাকে সারা দুনিয়া জয় করে একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবেই বর্ণনা করেছেন। এরই মাঝে এরিস্টোটলের কাছ থেকে আলেকজান্ডার জেনে গেছেন যে ইন্দুসেই আছে এক বিশাল মহাসমুদ্র আর পৃথিবীর শেষ প্রান্ত।”

কিছুক্ষণ থেমে এলিসের দিকে তাকাতেই মাথা নেড়ে সায় দিল মেয়েটা, “বলে যাও, চমৎকার হচ্ছে।”

“তারপর এখানে এসেই সবকিছু রহস্যময় হয়ে উঠেছে।” সমর্থন পেয়ে আবার শুরু করল বিজয়, “প্রথমত, গ্রিস ত্যাগ করার সময় আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনিকে কখনোই বলেন নি যে তারা পথিবীর শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে। শুধু পারস্য জয়ের পরেই জানান যে এবার পূর্বদিকে যাবেন। তবে হ্যাঁ এর যৌক্তিক ব্যাখ্যাও আছে। সৈন্যদেরকে জানালে হয়ত নিজ দেশ থেকে এতদূরে যেতে তারা রাজি হত না। কিন্তু কেন যেন আমার একটু খটকা লাগছে। নেতা হিসেবেই আলেকজান্ডার ছিলেন অসাধারণ। নিজ বাহিনিকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মেসিডোনিয়া থেকে গ্রিস এসেছেন তারপর আবার ব্যাবিলনে ফিরে গেছেন। সকলে মিলে হাঁড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় পার্বত্য অঞ্চল, উত্তপ্ত মরুভূমি পার হয়েছেন। কখনো কখনো খাবার আর পানিও ছিল না। বিনা বাক্য ব্যয়ে সৈন্যরা সর্বত্র আলেকজান্ডারকে অনুসরণ করেছে। কেবল মাত্র পাঞ্জাবের বীজ (Beas) নদী পর্যন্ত গিয়ে আলেকজান্ডারকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে আর না এগোনোর বায়না ধরে। তার মানে আলেকজান্ডার যদি চাইতেন তাহলে এ সৈন্যরা হয়ত পৃথিবীর একেবারে গভীর পর্যন্ত চলে যেত।”

চারপাশে তাকিয়ে বাকিদের অবস্থা দেখে নিল বিজয়। তারাও তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে আবার শুরু করল, “তবে লেখকদের কাছ থেকে এ সম্পর্কে ভিন্ন মত পাওয়া গেছে। কারণ তাদের কাছে সিক্রেট জার্নাল কিংবা কিউবটা ছিল না। তারা এটাও জানত না যে আলেকজান্ডার এক গোপন অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছিলেন; যে সম্পর্কে কেবল তিনি আর তার মা জানতেন। কিন্তু আমাদের ধারণা যা ঘটেছে তার পিছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে।”

“বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছ” বলে উঠল এলিস, “অলিম্পিয়াস আলেকজান্ডারকে কিউব আর পার্চমেন্ট দিয়েছেন। তার মানে হয়ত এ অভিযান গোপন রাখার কথাও বলেছেন। সারা দুনিয়া জয় করে পৃথিবীর শেষ মাথা অব্দি যাওয়ার পেছনে এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মেসিডোনিয়া ত্যাগ করার সময়ে সেনাবাহিনিকে কেবল পারস্যে আক্রমণের কথাই বলেছেন। ইন্দুস উপত্যকার কথা নয়। এমন না যে সৈন্যদের অপারগতার কথা ভেবে ভয় পেয়েছেন; চেয়েছেন যেন তারা “দেবতাদের রহস্য সম্পর্কে না জানে। আর যদি আমার ধারণা সঠিক হয় তাহলে তুমিও ভাবছ যে বীজ নদী তীরে বিদ্রোহের মাধ্যমে আলেকজান্ডারের মিশন সফল হবার ঘটনা আর দেশে ফেরার বাসনাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে।”

“ঠিক তাই।” উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা। “যা খুঁজছিলেন তা পেয়ে যাওয়ায় বীজের কাছাকাছি নির্মিত বেদির নিচে ধাতব পাতটাকে সমাধিস্থ করে গেছেন। মনে নেই, ইউমিনেস লিখেছেন যে পাঁচ মাথাঅলা সাপের গুহায় ঢোকার পর থেকে আলেকজান্ডার দেবতা হয়ে গেছেন? আর এটাও জানি যে ব্যাকট্রিয়ার উপজাতিদেরকে হারানোর পর থেকেই আলেকজান্ডার নিজেকে দেবতা হিসেবে দাবি করা শুরু করেছেন-এই কারণে ক্যালিসথিনসকে জীবনও দিতে হল।”

“তুমি তাহলে বলতে চাচ্ছো যে”, ধীরে ধীরে বলে উঠল কলিন, ‘অলিম্পয়াস যে পার্চমেন্টটা দিয়েছিলেন তার সাথে আলেকজান্ডার পারস্য থেকে ভারতে আসার জন্য যে পথ অনুসরণ করেছেন সেটাও জড়িত। তাই তুমি এই রাস্তাটাই খুঁজছিলে।”

‘বিঙ্গো!” উত্তেজনায় চকচক করছে বিজয়ের চেহারা। এটা ওর নিজের যুক্তি। দেখে ভাল লাগছে যে বাকিরাও তাকে অনুসরণ করছে। নিজের অনুমানের বৈধতাও প্রতিষ্ঠিত হল। এর মধ্যেই পরবর্তী পদক্ষেপও ঠিক করে ফেলেছে। নির্ভর করছে কেবল এই আলোচনার শেষাংশের উপর।

“তো, তুমি কী খুঁজে পেলে?” জানতে চাইল কলিন।

.

৪২. বন্দী

ঘুম ভাঙ্গতেই চমকে গেল রাধা। কয়েক মুহূর্ত লাগল ধাতস্থ হতে। চারপাশের একেবারে শ্বেতশুভ্র এই পরিবেশ ওর কাছে পুরোপুরি অপরিচিত।

তারপরেই মনে পড়ল সবকিছু। এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেস। পিস্তল হাতে একটা লোক। চেতনা হারালো। হাসপাতাল গাউন। হাতের বাঁধন। অস্বস্তিকর এক ধরনের উপলব্ধির সাথে সাথে ক্রোধে ফেটে পড়া। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তারপরে আর কিছু মনে করতে পারছে না। কী হয়েছিল? এবার বুঝতে পারল যে আগেরবার যেখানে ঘুম ভেঙেছিল তার চেয়ে ওকে ছোট আরেকটা রুমে নিয়ে আসা হয়েছে।

নিচে তাকাল। পরনে এখনো গাউন। কিন্তু বাঁধনগুলো আর নেই। কতক্ষণ ধরে এভাবে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে?

অত্যন্ত সতর্কভাবে বিছানার উপর উঠে বসে পাশ দিয়ে পা ঝুলিয়ে দিল। বেশ দুর্বল লাগছে। অবসন্ন; যেন কঠিন কোনো শারীরিক পরিশ্রমে সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

হঠাৎ করেই বুঝতে পারল যে কব্জি আর গোড়ালিতে অসম্ভব ব্যথা করছে। একে একে পরীক্ষা করতে গিয়ে মাংস কেটে বসে যাওয়া নাইলনের দড়ির ক্ষতচিহ্ন দেখে অবাক হয়ে গেল।

বিছানা থেকে নামতেই খালি পায়ে সাদা মার্বেলের মেঝে বেশ ঠাণ্ডা মনে হল। রুমে কোনো স্লিপারও নেই। দেয়ালগুলো একেবারে ইস্পাত কঠিন শক্ত। কাঁচের দরজা থাকলেও তালা লাগানো। হ্যাঁন্ডেল ধরে কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হল না। দরজাটা কেবল বাইরে থেকেই খোলা যায়। মানুষ চাইলে ভেতরে আসতে পারবে; কিন্তু ও বাইরে যেতে পারবে না। দরজার পাশের সেন্সরকে সক্রিয় করে তোলার অ্যাকসেস কার্ড ছাড়া তো নয়ই। তার মানে ও এখন সত্যিকারের বন্দী।

হাতল থেকে হাত সরাতেই হঠাৎ করে একপাশে সরে গেল দরজা। বাইরের দিকে খুলে গেল। সভয়ে পিছিয়ে এলো রাধা। রুমে ঢুকলেন সাক্সেনা আর ফ্রিম্যান।

“আজ আমাদের রোগিণী কেমন আছে?” আমুদে কন্ঠে জানতে চাইলেন সাক্সেনা।

“আমি রোগী নই!” রাগে জ্বলে উঠল রাধার চোখ,”এখানে কেন আনা হয়েছে আমাকে?”।

“আজ প্রশ্ন কেবল আমিই করব।” বিছানার দিকে ইশারা করলেন সাক্সেনা, “বসো।”

বমি বমি ভাবসহ হঠাৎ করেই দুর্বল বোধ করল রাধা। তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে বিছানায় উঠে বসল। দাঁড়িয়ে থাকতে না হওয়াতে ভালই লাগছে। জানে না কেন পা দুটোতে কোনো শক্তি পাচ্ছে না।

“মানসিক যাতনা বেড়ে যাবার পরবর্তী অবস্থা” রাধার অস্বস্তি দেখে সাক্সেনাকে মন্তব্য করল ফ্রিম্যান; কারণটাও একেবারে সঠিকভাবে অনুমান করেছে, “বমি ভাব আর দুর্বলতা।”

“উনি কে?” কঠিন স্বরে জানতে চাইল রাধা।

“আহ তোমার সাথে পরিচয়ই করানো হয়নি” ফিম্যানের দিকে তাকালেন সাক্সেনা, “ডা, গ্যারি ফ্রিম্যান। জেনেটিক বিশেষজ্ঞ এবং টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের জেনেটিকস্ হেড। বহু বছর ধরেই আমাদের হয়ে একটা অতি গোপনীয় প্রজেক্টে কাজ করছেন। আর যুগান্তকারী এক আবিষ্কারের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। এবার, কয়েকটা উত্তর দাও তো। প্রথম প্রশ্ন : ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো আমাদের মিশন সম্পর্কে কী কী জানে?”

শূন্য চোখে তাকাল রাধা। লোকটা কোন মিশনের কথা বলছে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কেবল এটুকু বুঝতে পারছে যে ইমরানের সন্দেহই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া মেডিকেল সেন্টারের গোপন বেজমেন্টের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সাথে কোনো না কোনো ভাবে টাইটান ফার্মাও জড়িত। কিন্তু একজন জেনেটিকস হেড ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সাথে কিভাবে জড়িয়ে গেলেন?

সাক্সেনার চেহারায় বিরক্তি ফুটে উঠল, “আমি একটা উত্তর জানতে চাইছি”, দৃঢ় স্বরে জানালেন, “নীরবতা কোনো পথ নয়। চাইলে তোমাকে কথা বলাবার জন্য কষ্টদায়ক রাস্তাও বেছে নিতে পারি। তবে এখন বেশ ভদ্র আচরণ করছি। তাই আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না।”

“আমি জানি না আপনি কী সম্পর্কে কথা বলছেন।” ওর কাছ থেকে কথা বের করার জন্যে সাক্সেনা কী করতে পারে খুঁজে দেখার কোনো মনোবাসনাই নেই রাধার।

“কিন্তু এটা তো বিশ্বাস করা শক্ত। তুমি আমার অফিসে এসেছ, চারপাশে নাক গলিয়ে সাংবাদিকের ভান করেছ। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথেও জড়িত। যদিও কোন দক্ষতা বলে সেটা এখনো জানি না। পূর্ব দিল্লির মেডিকেল ফ্যাসিলিটির অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কেও তুমি সবকিছু জানো। এমনকি পেশেন্টদের জন্য তৈরি সেলগুলোর কথাও। তাই এটা পরিষ্কার যে তুমি আমাদের সম্পর্কে অনেকটাই জানো।”

বিস্মিত হয়ে গেল রাধা। আইবি’র সাথে ওর সম্পর্কের কথা এরা কিভাবে জানল? “আপনি যে কী বলছেন সে সম্পর্কে আমার সত্যিই কোনো ধারণা নেই।” ক্ষীণকণ্ঠে আপত্তি জানাল রাধা; যদিও ওদের জ্ঞানের বহর দেখে যারপরনাই অবাক হয়ে গেছে।

“ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।”

মুখ ভেংচি কাটলেন সাক্সেনা। সাবধান করে দিয়ে বললেন, “আমাদেরকে এত হেলা করোনা। আমাদের দ্বিতীয় দল তোমাদের উপর সারাক্ষণ চোখ রেখেছে। তাই জানি যে আইবি এজেন্টসহ তোমরা সকলেই জোনগড় দুর্গে একসাথে ছিলে। যেটা কিনা বলা বাহুল্য তোমার বাগদত্তার সম্পত্তি।”

“ওকে। মানছি যে আমি ইমরান কিরবাঈকে চিনি। কিন্তু বাকিটা কিন্তু সত্যি বলছি”, জোর দিল রাধা। “সন্দেহ করেছিলাম। ভেবেছিলাম যে ছাই হয়ে যাওয়া সেন্টারে যা ঘটছিল তার সাথে হয়ত টাইটনও জড়িত। কিন্তু আসল কারণটা জানি না।”

প্রথমে ফ্রিম্যানের দিকে একবার ফিরে তারপর রাধার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন সাক্সেনা, “তোমাকে বিশ্বাস করব নাকি করব না কিছুই বুঝতে পারছি না।” যদি নাই জানো যে আমরা কী করছি তাহলে তদন্ত করতে এসেছিল কেন?

দ্বিধায় পড়ে গেল রাধা। এই লোকটাকে যে সব বলে দিচ্ছে তা মোটেই ভাল লাগছে না। আবার খানিকটা ভয়ও পাচ্ছে। ব্যথা আর তার হাত পায়ের কাটা দাগ দেখে ভীত হয়ে পড়েছে। একটু আগেও তো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। জানে এদের পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব। আর যা চায় তার জন্য যে কোনো কিছু করতেও এরা দু’বার ভাববে না।

“আমরা ভেবেছিলাম যে টাইটান বায়োটেররিজমের সাথে জড়িত। মানে এখানে এমন কোনো নতুন ধরনের জীবাণু তৈরি হচ্ছে যা সন্ত্রাসীরা আর একনায়কতান্ত্রিক দেশসমূহ ব্যবহার করতে পারবে?” মনের কথা উগরে দিল রাধা।

এক মুহূর্তের জন্য যেন হয়ে গেল সাক্সেনা। আর তার পরপরই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, “বায়োটেররিজম!” কনুই দিয়ে আলতো করে ফ্রিম্যানকে তো দিতেই সেও মিটিমিটি হেসে উঠল। “নতুন ধরনের জীবাণু!” মাথা নেড়ে বললেন, “আমাদের প্রজেক্ট সম্পর্কে তুমি সত্যিই জানো না, তাই না?” ফ্রিম্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার মনে হয় ওকে আর আমাদের কোনো দরকার নেই। তাই ঝেরে ফেলার আগেই আরো কয়েকটা পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করে নেয়া যাক।”

দ্বিধান্বিত আর আতঙ্কগ্রস্ত রাধাকে একা রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল দুই ডাক্তার। নিজের ভাগ্য সম্পর্কে এখন আর কোনো সন্দেহই নেই। গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত না হলে এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেত।

.

৪৩. ধাঁধার একটা অংশ

“দেখো” ডেস্ক থেকে এক তাড়া কাগজ তুলে কফি টেবিলের চারধারে বসে থাকা অন্যদের কাছে নিয়ে এলো বিজয়, “এই ভ্রমণে আলেকজান্ডার যে রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন সেটাকে ঘিরে দুটো রহস্য আছে।”

আধুনিক কালের আফগানিস্তান, পাকিস্তান আর ভারতের উপর দিয়ে আলেকজান্ডারের গমন পথ চিহ্নিত করা একটা মানচিত্র বিছিয়ে দিল বিজয়। উজ্জ্বল লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে সব রাস্তা।

“প্রথমটা এখানে” উপকূলের কাছাকাছি দক্ষিণ পাকিস্তানের একটা অঞ্চল ইশারা করে বলল, “ইন্দাস থেকে নেমে ব্যবিলনে ফেরার পথে আলেকজান্ডার সেনাবাহিনিকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেন। একাংশকে সমুদ্র পথে পারস্য উপসাগরের পথে পাঠিয়ে দেন। উপকূল থেকে তারবাত পর্যন্ত বাকি অংশকে তিনি নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন।”

মানচিত্রে শহর দেখিয়ে বলল, আর তারপর কোনো এক ব্যাখ্যাতীত কারণে পাসনির মধ্য দিয়ে দক্ষিণের সমুদ্রমুখে চলে যান; বিপদ সংকুল পথের মধ্য দিয়ে পার হয়েছেন একশত মাইল মাকরান মরুভূমি। মাকরান পার হতে পুরো ষাট দিন লেগে যায়, আর সেনাবাহিনির বেশ বড় একটা অংশও খুইয়ে বসেন।”

“অদ্ভুত তো।” মন্তব্য করলেন ডা. শুক্লা, “ফেরার পথে কেন সমুদ্র পথে না গিয়ে সেনাবাহিনিকে বিভক্ত করে দিলেন?”

“আর শুধু তাই নয়” এই গল্পটা জানা থাকায় এবারে আলোচনায় অংশ নিল এলিস, “তারাবাত থেকে পারসেপোলিস একেবারে সোজা একটা লাইন।” মানচিত্রের দিকে ইশারা করে বলল, “আলেকজান্ডার মাকরান থেকে পাসনি গিয়ে সোজা পারসেপোলিসের পথ ধরেছিলেন। যদি সেনাবাহিনিকে দু’ভাগে ভাগ করার কোনো যুক্তিও থাকে কিংবা স্থলপথে পারসোপোলিস গেলেও মরুভূমি পার হবার কিন্তু আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না। আধুনিক কালের লেখকদের ধারণা, আলেকজান্ডার এ মরুভূমিও জয় করতে চেয়েছিলেন। কারণ রানি সেমিরামিস আর দ্য গ্রেট সাইরাসও পার হয়েছিল এ মরুভূমি।”

“হয়ত নিজের বাহিনিকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে তিনি সত্যিই এক দেবতা।” অনুমান করল কলিন।

“কেন, সেটা কোন ব্যাপার না” উত্তর দিল বিজয়, “আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি যে গোপন এক অভিযানের প্রমাণ করার জন্য আমাদের হাতে দুটো উপায় আছে। মাকরান মরুভূমি হল একটা। যদি আলেকজান্ডার কোনো কিছুর অনুসন্ধানে এসে থাকেন তাহলে মাকরান মরুভূমিতে সেটাই খুঁজছিলেন। এর জন্যই এত ঘুরপথে গিয়েছিলেন।”

“কিন্তু তা তো না” শুরু করল কলিন, “কেননা ততদিনে বীজ নদীতীরে নির্মিত বেদির নিচে তো ধাতব পাতটাকে সমাধিস্থ করে গেছেন। তার মানে নিজের অভিযানের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে ফেলেছেন। তাহলে দ্বিতীয় রহস্যটা কী? আমার মনে হয় তুমি আরো কিছু পেয়েছ?”

বন্ধুর দিকে তাকিয়ে সেঁতো হাসি দিল বিজয়, “মাকরান অভিযানেই যে আলেকজান্ডার কোনো কারণ ছাড়া নিজ সেনাবাহিনিকে ভাগ করে ফেলেছেন তা না; বরঞ্চ এটা ছিল দ্বিতীয় বার। প্রথমবার করেছেন এখানে।” মানচিত্রে একটা শহর দেখিয়ে দিল বিজয়, “এই হল জালালাবাদ। এখান থেকেই সেনাবাহিনির একাংশসহ হেফাসনকে খাইবার পাস পাঠিয়ে দিয়েছেন যেটা বর্তমান দিনের পাকিস্তান। বাকি অংশ নিয়ে তিনি নিজে প্রথমে এই নদী উপত্যকা আর তারপর নাওয়া পাস হয়ে পাকিস্তান চলে যান; যেটি খাইবার পাস থেকে একেবারে উত্তরে।” আরেকটা ম্যাপ টেনে নিল; আফগানিস্তানের মানচিত্র। “আর খেয়াল রেখো-আলেকজান্ডার কেন উত্তরে আর তারপর পূর্বে গেছেন তা নিয়ে কেউ কোনো সন্তুষ্টজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কয়েকজন লেখক আর কয়েকটা ওয়েবসাইটে সামরিক কিছু ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে–আর তা হল তিনি নিজ বাহিনিকে পাহাড়ি গোত্রদের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ি গোষ্ঠীদের জয় করার জন্য যে লড়াই করেছেন তা কিন্তু কুনার উপত্যকাতে নয়। এর সবকটিই এখানে হয়েছে-বর্তমান সময়ে পাকিস্তান আর আফগানিস্তান বর্ডারে। তিনি চাইলে খাইবার পাস পার হয়ে তারপর পাহাড়ি গোষ্ঠীদেরকে এড়ানোর জন্য সেনাবাহিনি ভাগ করে এক অংশ পূর্ব আর আরেক অংশ উত্তরে পাঠিয়ে দিতে পারতেন।”

“পারসারে পাহাড়ি গোত্রদের সাথে সর্বশেষ যে যুদ্ধটা হয়েছিল তাকে গ্রিকরা ডাকে আর্নস। আর সেটা অবশ্যই পাকিস্তানে, কুনার উপত্যকায় নয়। যদিও আলেকজান্ডারের গতিবিধির এরকম সামরিক ব্যাখ্যা আমার ঠিক মনঃপুত হয়নি।

‘দ্য কুনার রিভার ভ্যালি” মানচিত্র দেখে নামটা পড়ল কলিন, “তোমার ধারণা এখানেই লুকায়িত ছিল সেই গুপ্ত রহস্য?”

“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।” এলিস এখনো দ্বিধায় ভুগছে, “এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে নির্দিষ্ট কোনো কারণেই আলেকজান্ডার এই কুনার উপত্যকাতে গিয়েছিলেন আর বিশেষ অনুসন্ধানই হচ্ছে সেই কারণ। কিন্তু এটা তো কেবলই একটা অনুমান। তাহলে অন্যদের চেয়ে তোমার ব্যাখ্যা আমাদের অনুমান কেন আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করতে হবে?”

“এই জন্য।” ইউমেনিসের অনুবাদিত জার্নাল মেলে ধরল বিজয়, “আর কিউবের সেই কবিতাগুলো।” ডা. শুক্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরো একবার কিউবের পদ্যগুলোকে অনুবাদ করে শোনাবেন প্লিজ?”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন ডা. শুক্লা। বিজয়ের মনে কী আছে না জানলেও একটা ব্যাপার স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারছেন এটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বিজয়। নিজের বাগদত্তার যখন জীবন সংশয় তখন ছেলেটা নিশ্চয় কোনো উপকারে না লাগলে অহেতুক এরকম কোনো রহস্য সমাধানে নেমে পড়ত না।

তাই ডা. শুক্লা কিউবটাকে হাতে নিয়ে পদ্যগুলো পড়তে শুরু করলেন। প্রতিটা কবিতার শেষে মাথা নেড়ে অনাগ্রহ দেখাল বিজয়। একে একে তিনটা পদ্য শেষ হবার পর চতুর্থ পদ্যের সময় বলল, “এটাই। এটাই সেটা।” সবার দিকে তাকাল বিজয়, “এবারে বুঝতে পেরেছ?”

.

৪৪. প্রথম সূত্র

শূন্য চোখে বিজয়ের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। ডা. শুক্লা এইমাত্র যে পদ্যটা পড়লেন তা হল :

“তারপর প্রবেশ করো সেই পাতালে
পূর্ব আর পশ্চিমে যাকে বিভক্ত
করেছে উপত্যকাদ্বয়
সাবধানে বেছে নিও, মনে রাখবে
কোথায় যাচ্ছে, যেথায় সূর্য ঘুমায়।

“ওকে, হাত তুলল বিজয়, “মেনে নিলাম যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। যাওয়ার কথাও নয়। পুরো অভিযানটাই তো গোপন, তাই না? সাংকেতিক সব পদ্য দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কী খুঁজছে না জানলে পদ্যগুলোর অর্থই বুঝতে পারবে না। ধাঁধাগুলো তো এভাবেই কাজ করে।”

গত বছর মহাভারতের রহস্য সমাধান করা ধাঁধাগুলোর কথা স্মরণ করল কলিন আর ডা. শুক্লা। যখনই বুঝতে পেরেছে যে কী খুঁজছে তখনই কেবল সংকেত ভেঙে পদ্যগুলোর মর্মোদ্ধার করতে পেরেছিল।

“তার মানে আমরা এমন কিছু খুঁজছি যেটা সম্পর্কে আলেকজান্ডার জানতেন” মওকা বুঝে পাণ্ডিত্য জাহির করল কলিন, “পার্চমেন্টে লেখা এই ছয়টা পদ্যই আলেকজান্ডারকে গাইড করে সিক্রেটের কাছে নিয়ে গেছে; তার মানে প্রতিটা পদ্যই কোনো না কোনো ল্যান্ডমার্ক কিংবা লোকেশনকে ইশারা করছে।”

“রাইট” খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজয়ের চেহারা। “সারা রাত ধরে আমিও এ কথাটাই ভেবেছি। তাই গবেষণা করতে গিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে ভোর হয়ে গেছে। তখনই খুঁজে পেয়েছি সমাধান।”

ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে উঠল কলিন, “সমাধান! ভোর। আমি তো সকালে এসে দেখি তুমি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছো।”

অন্যদিকে এতক্ষণ মন দিয়ে মানচিত্র দেখেছে এলিস। যদি বিজয়ের কথা সত্যি হয় তাহলে পদ্যের সাথে মিল আছে এমন কিছু নিশ্চয় পাওয়া যাবে। এমন কিছু যেখানে দুটা উপত্যকায় যাবার প্রবেশপথ আছে।

বুঝতে পারার সাথে সাথে মনে হল যেন মাথার উপর হাজার টনের ইট। পড়েছে। “জালালাবাদ!” মুখ তুলে বিজয়ের দিকে তাকাল।

“গুডওয়ার্ক” বুড়ো আঙুল উঁচু করে প্রশংসা করল বিজয়। “মানচিত্রে নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছো যে জালালাবাদ দুটা নদী উপত্যকার প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। একটা গেছে পূর্বে, সেটাই কুনার উপত্যকা। আরেকটা গেছে পশ্চিমে, এটা লাহম্যান উপত্যকা। মনে আছে প্রথম যখন পদ্যগুলো শুনেছিলাম ভেবেছিলাম হয়ত কোনো দিকনির্দেশনা হবে কিন্তু জানতাম না যে কোথায় নিয়ে যাবে? এবারে কিন্তু উত্তরটা পেয়ে গেছি। কবিতার প্রবেশদ্বার”, হল জালালাবাদ। পাঠককে বলা হয়েছে পূর্ব দিকের উপত্যকা বেছে নিতে, যেখানে সূর্য ঘুমায়। রাধা ঠিক কথাই বলেছিল।” মেয়েটার নাম উচ্চারণের সাথে সাথে চুপ করে গেল বিজয়।

“আর পূর্বদিকে আছে কুনার উপত্যকা” মাথা নেড়ে সম্মতি দিল কলিন। “এখন একেবারে খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে।”

“কিন্তু তাহলে অন্য পদ্যগুলোর মানে কী? সেগুলোও নিশ্চয়ই আলেকজান্ডারের ভ্রমণপথের ইশারা করেছে। কিন্তু এরকম আর কোনো লোকেশনের কথা তো মনে আসছে না।” বলে উঠল এলিস।

“আচ্ছা, এমন হতে পারে যে একটা পদ্যে যে পাথরের কথা বলা হয়েছে সেটা হয়ত সগডিয়ান রক?” মনে করিয়ে দিল বিজয়। “যদি আমরা সবাই মিলে ভাবতে আরম্ভ করি তার সাথে খানিকটা গবেষণা তাহলে নির্ঘাৎ অন্য লোকেশনগুলোও পেয়ে যাবো। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সিক্রেটটা মনে হচ্ছে কুনার উপত্যকার নিচেই আছে।”

“অস্পষ্ট কোনো কিছুই আমার ভাল লাগে না। পুরোটাই আমাদের ধারণা।” এলিসকে তেমন খুশি মনে হল না, “হয়ত আমরা ঠিক; কিন্তু আলেকজান্ডার রহস্যময় কোনো এক কারণে কুনার উপত্যকাতে গিয়েছিলেন এর মানে এই না যে সিক্রেটটাও ওখানেই লুকিয়ে আছে। হতে পারে পথিমধ্যে এমনিতেই থেমেছিলেন। সেটাই আসলে শেষ গন্তব্য ছিল না। ধাতব পাতটা ছাড়া বলার কোনো উপায় নেই যে পদ্যগুলোকে কেমনভাবে পড়তে হবে। আর তা না জানা পর্যন্ত সিক্রেট লোকেশন সম্পর্কেও এত নিশ্চিত হওয়া যাবে না।”

“এই ক্ষেত্রে আমার মনে হয় তোমরাও আমাকে সাহায্য করতে পারো” উত্তরে জানাল বিজয়। “আমার গবেষণার উপর ভিত্তি করে একগাদা তথ্যের প্রিন্ট আউট বের করেছি। ম্যাপ, বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা, গুগল আর্থ ভিউ- এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যুক্তিগুলোকে যদি সঠিক বলে ধরে নাও তাহলে সবাইকে একসাথে মাথা খাটাতে হবে। অবশ্যই কিছু না কিছু পাওয়া যাবে।”

“এতে রাধার কী উপকার হবে?” আর অপেক্ষা করতে পারছেন না ডা. শুক্লা। বিজয় আর তার বিচার বিবেচনার উপর পূর্ণ আস্থা থাকলেও হাত গুটিয়ে বসে থাকা তো যায় না। তার কন্যার জীবন সংশয় চলছে আর সবাই কিনা প্রাচীন এক ধাঁধার সমাধানে বসেছে। তাই কোনটা বেশি জরুরি সেটা আগে ঠিক করতে হবে।

দ্বিধায় পড়ে গেল বিজয়। বলাটা ঠিক হবে কিনা তাও বুঝতে পারছে। ফোনের সম্পর্কে আসলে অন্যদেরকে জানাতে চায়নি। কিভাবেই বা জানাবে? তবে বুঝতে পারল আর কোনো উপায় নেই। এবার ব্যাখ্যা করতেই হবে।

“ভেবেছি যে এটাকে একটা দরকষাকষির উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারব।” অবশেষে জানাতেই হল। “গত রাতে কুপার ফোন করেছিল। কিউবটা চায়। কারণ তাহলে সিক্রেটের কাছে পৌঁছাতে পারবে। আর আমরা যদি পদ্যগুলোর ধাঁধা সমাধান করতে পারি তাহলে রাধার নিরাপত্তার বিনিময়ে তথ্যের লেনদেন করতে পারব। স্বীকার করতে ঘেন্না হচ্ছে; কিন্তু রাধাকে বাঁচাবার এটাই শেষ আশা। যদি আইবি’ই এতক্ষণ পর্যন্ত ওকে খুঁজে বের করতে না পারে তাহলে আমরা কিভাবে পারব জানি না। তাই একটাই উপায় আছে যেন ওরাই রাধাকে ছেড়ে দেয়। আর এর জন্য সমাধানের তথ্য ছাড়া ভালো আর কোনো রাস্তা নেই।”

খানিকক্ষণ ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবলেন ডা. শুক্লা, “মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক। দেখা যাক কোনো অগ্রগতি হয় কিনা।”

সারা রাত ধরে জড়ো করা বিজয়ের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই। কুপার যা চাইছে সেই তথ্য আবিষ্কারে সহায়তা করবে এমন কোনো সূত্র কি তারা খুঁজে পাবে?

.

৪৫. পাল্টা আরেকটা প্রস্তাব

নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল কুপার। দুপুর বারোটা। বিজয় সিংকে ফোন করার সময় হয়েছে। বিজয়ের নাম্বার ডায়াল করে শুনল যে ওপাশে রিং বেজেই চলেছে; কিন্তু ছেলেটার কোনো পাত্তা নেই। ভ্রু কুঁচকে ফেলল কুপার। ব্যাপারটা কী বোঝা যাচ্ছে না। ছেলেটার বাগদত্তা তার কাছে বন্দী। তাই প্রথম রিং বাজার সাথে সাথেই উত্তর আশা করেছিল।

কেটে দিয়ে আবার চেষ্টা করল কুপার। এইবার আকুল হয়ে ফোন তুলল ছেলেটা।

“কুপার?” বিজয়ের কণ্ঠের টানটান ভাবটা কুপারকে খুশি করে তুলল।

“তো?” সোজা আসল কথায় এলো কুপার, “কি সিদ্ধান্ত নিয়েছ? বাগদত্তা না প্রাক্তন প্রেমিকা? কে হবে?”

“আমার কাছে পাল্টা আরেকটা প্রস্তাব আছে।” এবার শক্ত হয়ে গেল ছেলেটার কণ্ঠস্বর; যদিও টেনশনের ভাবটা এখনো বজায় আছে।

কপালের ভ্রু তুলে ফেলল কুপার। বেশ কৌতূহল হচ্ছে। এরকম কিছু তো আশা করেনি। তাই ঠিক করল বাজিয়ে দেখবে ছেলেটাকে। দেখা যাক কী হয়।

“বলো” আদেশ দিল কুপার। “তোমার প্রাথমিক আগ্রহ কিন্তু এলিস কিংবা রাধা নয়” শুরু করল বিজয়, “ইন্দাস ভূমিতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যে সিক্রেটের খোঁজে এসেছিলেন সেটার অবস্থানটাই জানতে চাও, তাই তো?” থেমে গেল বিজয়। খানিক বিরতি দিয়ে জানাল, “আর এক্ষেত্রে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি।”

বিস্মিত হয়ে গেল কুপার। মনে পড়ল এই ছেলেটা আর তার বন্ধুদের সম্পর্কে ভ্যান কুক কী বলেছিল। এখন তো বিজয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল। একই সাথে আরেকটা কথাও জেনে গেল-বাগদত্তাকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠলেও প্রাক্তন প্রেমিকাকেও রক্ষা করতে চাইছে। এতটা সময় ব্যয় করে বহু প্রচেষ্টার পর হাতে থাকা সূত্রগুলোকে মিলিয়ে একেবারে সঠিক উত্তরটা খুঁজে বের করেছে; তার মানে বিজয় সিং সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে বেশ যত্নবান।

তাছাড়া, কুপারের মনে হল, সাক্সেনাকে খুঁজে বের করতে হবে যে রাধা আর তার আইবি সহকর্মীরা মিশনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু জানে কিনা। মেয়েটা কিডন্যাপ হবার পরে কি বিজয় সিং এতকিছু বের করেছে? নাকি আগে থেকেই জানত? কুপার যতটুকু জানে তারা যে সিক্রেট খুঁজে বের করতে চাইছে সেটার সত্যিকারের প্রকৃতি সম্পর্কে কেউ ভাবতেই পারবে না। কেবল অর্ডার এই ব্যাপারে জানে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে গোপন রয়েছে এই প্রজেক্ট। তাই এর চেয়ে বেশি আর লোকসমক্ষে আনতে চায়না। বিশেষ করে এখন যখন সফলতার একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে।

কুপার উপলব্ধি করল যে উত্তর দিতে একটু বেশিই সময় নিয়ে ফেলেছে। বিজয় যথেষ্ট বুদ্ধিমান। তাই বুঝে যাবে যে ও সঠিক জায়গাতেই হাত দিয়েছে। কিন্তু এটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেবার উপায়ও জানে কুপার। তুরুপের তাস এখনো তার হাতেই আছে।

“আর কিভাবে তুমি এ কাজে সাহায্য করবে?” বিজয় যা বলেছে তা অবজ্ঞা করার কিংবা বুঝতে না পারার কোনো ভানই করল না কুপার।

উত্তর শুনেই বোঝা গেল নিজের জয় সম্পর্কে খুশি হয়ে উঠেছে ছেলেটা, “আমরা কিউবের একটা পদ্যের মর্মোদ্ধার করেছি; যেটা তুমি নিজে নিজে পারতে না। তাই পাঁচটা পদ্যের সবকটির মর্মোদ্ধার করে জানিয়ে দিতে পারি যে সিক্রেটটা ঠিক কোথায় অবস্থিত।”

“এখানেই তোমার ভুল হয়েছে।” পাল্টা আঘাত হানল কুপার, “বীজ নদীর তীরে আলেকজান্ডার যে ধাতব পাত রেখে গিয়েছেন সেটা এখন আমাদের কাছে। কিউব আর পাত একসাথে পেলে পদ্যগুলোর মর্মোদ্ধার করাটা বাচ্চাদের খেলা হয়ে যাবে। বুঝেছে? তাহলে তোমাকে কী দরকার?”

“ভেবে দেখো। আমরা কিন্তু আলেকজান্ডারের ধাতব পাতটা ছাড়াই পদ্যের মর্মোদ্ধার করেছি। আমাদের কাছে এমন সব রিসোর্স আছে যা তোমার নেই- এলিস আর ডা. শুক্লা। তুমি যতটা তাড়াতাড়ি পারবে আমরা তার চেয়েও দ্রুত হস্তে তোমাকে উত্তর বের করে দেব।”

পুরো ব্যাপারটাকে ভেবে দেখল কুপার। বিজয়ের দাবি একেবারে মিথ্যে নয়। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে অর্ডারের বিশাল জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ওর দলও ঠিক সংকেতগুলোকে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু বিজয়ের দল যদি আরো দ্রুত তা করে দেয় তাহলে তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আর যদি কোনো তথ্য ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোকে পাচার করতে চায় তাহলে তো কোনো কথাই নেই, সাথে সাথে সব কটাকে খতম করে দেবে। এই কাজের জন্য আগে থেকেই একটা খালি চেক দিয়ে রেখেছে ভ্যান কুক।

“তোমরা যে ধোকা দিচ্ছ না সেটাই বা কিভাবে বুঝব?”

এরপর মনোযোগ দিয়ে পদ্যটার অর্থ আর কিভাবে তা পেয়েছে সে সম্পর্কে বিজয়ের ব্যাখ্যা শুনল।

ফলে সিদ্ধান্ত নিতেও সুবিধা হল। “তোমার শর্ত?” জানে সেগুলো কী হতে পারে কিন্তু এত সহজে ধরা দেবার কোনো ইচ্ছেই নেই।

“তুমি এলিসের পিছু ধাওয়া করা বন্ধ করে রাধাকে ছেড়ে দেবে।”

হেসে ফেলল কুপার। বিজয় সম্পর্কে যা ভেবেছে তাই ঠিক। এর জন্য ছেলেটার তারিফ করতেই হবে। অধ্যবসায় আর মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়েছে এমন পরিস্থিতিতেও দৃঢ় মনোবলের জন্য ফুল মার্কস। “মেনে নিচ্ছি, কিন্তু দুটো শর্ত আছে। তুমি আর তোমার দল আজ বিকেল চারটায় আমার সাথে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে দেখা করবে। তারপর সবাই মিলে আজ রাতেই জালালাবাদ যাবো। আর কাল কুনার উপত্যকা। দ্বিতীয়ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার দাবি সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে, রাধা আমার জিম্মায় থাকবে। যদি তুমি কোনো গড়বড় করো তাহলে মেডিকেল ফ্যাসিলিটির রোগীদের রক্তে যে ককটেল পাওয়া গিয়েছিল সেটাই ওর শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেয়া হবে।”

স্থূল আর উচ্চকণ্ঠে এই হুমকি শুনে রাগ সংবরণ করতে গিয়ে খানিক চুপ করে রইল বিজয়, “আমার আর কিছু বলার নেই। তবে শুধু আমি আসব বাকিরা এখানেই থাকবে। আর আমিই বা কিভাবে জানব যে তুমি কথা রাখবে?”

ভেবে দেখল কুপার। যদি অবস্থানটা সম্পর্কে সত্যি কথা বলে; তাহলে তো সিক্রেটটা সবাইকে দেখানোর কোনো মানে হয় না। তাই কুনার উপত্যকা পর্যন্ত সবাইকে বয়ে নিয়ে যাবারও কোনো মানে নেই। শুধু এই ভেবে বলেছিল যেন এ সুযোগে দেশের বাইরে এক লহমাতেই সবকটিকে শেষ করে দেয়া যায়। অন্যেরা না গিয়ে বিজয় একা গেলেও কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। আফগানিস্তানে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখাটাও কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া কেন যেন মনে হচ্ছে যে বিজয় আর তার বন্ধুদের নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা নেই। রাধা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথে জড়িত। বাকিরা নয়। তাই ওদের উপর নজরদারি করার জন্য কুপারের বাকি দল তো আছেই। একটু পরেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

এবার তাই কাট কাট স্বরে জানাল, “একটু আগে যেমনটা বললে তোমার আর কোনো উপায় নেই, ধরে নাও তাই। ঠিক বিকেল চারটায় দেখা হবে। ভোন্ট বি লেট।”

.

৪৬. জুয়াখেলার মত ঝুঁকি

ফোন কেটে দিয়ে আস্তে আস্তে স্টাডির কাছে ফিরে এলো বিজয়। একটু আগে কুপারের ফোন ধরার জন্যেই নিচের সিটিং রুমে চলে গিয়েছিল। চেয়েছে অন্যেরা, বিশেষ করে এলিস যেন এ আলোচনা শুনতে না পায়। বাকিদেরকে কিভাবে সংবাদটা দেবে সেটা নিয়ে অবশ্য চিন্তায় পড়ে গেল। আবার একই সাথে এটাও মনে হচ্ছে যে রাধাকে বাঁচাতে গিয়ে না জানি সবাই মিলে আরো বেশি করে কুপারের থাবার মধ্যে পড়ে গেল। স্বস্তির কথা হচ্ছে বাকিরা এখানে জোনগড়ে নিরাপদেই থাকবে। একা বিজয় শুধু কুপারের সাথে যাবে।

স্টাডিতে ঢুকতেই সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকাল। জানে সবাই ভাবছে যে কেন এত তাড়াহুড়া করে একটা ফোন ধরার জন্য চলে গিয়েছিল।

“কুপার ফোন করেছিল” প্রতিটা শব্দ বলার সময়েও ভাবছে, “কুপার বলেছিল যে বারোটার সময় ফোন করবে। আমাদের মধ্যে একটা ডীল হয়েছে।” কুপারকে কী প্রস্তাব দিয়েছে তা খুলে বললেও এলিস আর রাধাকে নিয়ে বিজয়ের সিদ্ধান্ত শুনে কুপার ফিরতি কী বলেছে সেটা আর জানাল না।

বিজয়ের কথা শেষ হতেই বাকিরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। আর বরাবরের মতই সবার আগে কথা বলল কলিন, “তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? একটা ওই…ওই…ওদের মাঝে? জানি না ওরা কারা তবে অত্যন্ত খতরনাক! এতদিনেও ওদের রূপ বোঝনি?”

এলিসও মাথা নাড়ল। “তুমি কী ভেবে এমন করলে জানি না বিজয়। গ্রিসে ওরা যা করল আর তারপর এখানে জাদুঘরেও আক্রমণের পর তুমি কিভাবে এমনটা করলে?”

বিজয় একেবারে চুপ। অন্যদেরকে কিভাবে বোঝাবে যে দোটানা থেকে বাঁচার এটাই ছিল একমাত্র পথ? কিভাবে বোঝাবে যে এলিস আর রাধার ভাগ্যের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় সিদ্ধান্ত নেয়াটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল? “রাধাকে বাঁচাবার জন্য এটাই ছিল একমাত্র পথ।” সোজা-সাপটা জবাব দিয়ে দিল। “তোমরা এখন থেকে এসবের বাইরে থাকবে। বিশেষ করে এলিস তুমি। তাই আমি যতক্ষণ ওদের সাথে থাকব তোমরা পদ্যগুলো নিয়ে কাজ করবে। কোনো কিছু পেলেই সাথে সাথে আমাকে জানাবে। যত দ্রুত এই প্রহেলিকার সমাধা হবে তত দ্রুত রাধাকে ফিরে পাবো।”

“তুমি একা যাচ্ছে না” উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধুর কাছে হেঁটে এলো কলিন; চোখে চোখ রেখে বলল, “আমরা না দোস্ত, একসাথে সবকিছু করি? গত বছরের কথা মনে নেই? আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে।”

তর্ক করে কোনো লাভ নেই তা বিজয় ভালোই জানে। আর যদি সত্যি কথা বলতে হয় তো বলবে যে ও নিজেও কলিনের সঙ্গের জন্যে উন্মুখ। কিন্তু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। গত বছরের পুনরাবৃত্তি চায় না। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সরি দোস্ত। এবার নয়। গত বছরের কথা এখনো ভুলি নি। এই কারণে এবার বাকিদের সাথেই থাকবে। আর কোনো আলোচনা চাই না আমি।” কলিন কিছু বলার জন্য মুখ খুললেও বিজয়ের ফোন বেজে উঠল। এবার বৈদ্য।

“আমি দুঃখিত যে রাধার ব্যাপারে আর কিছু জানতে পারিনি।” সবিস্তারে জানালেন বৈদ্য। “আমরা এখনো খুঁজছি। এ লোকগুলো মনে হচ্ছে বেশ পেশাদার। এতদিন পর্যন্ত আমাদের রাডারের নিচে কাজ করলেও নিজেদের ট্র্যাক অতি দক্ষতার সাথে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু আজ নয়ত কাল ঠিকই ধরে ফেলব।”

“সেরকমই আশা করছি” উত্তরে জানাল বিজয়, “তবে আপনাদের জন্যও কয়েকটা খবর আছে।” কুপারের কথা খুলে বলল।

উত্তর দেবার আগে খুব সাবধানে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন বৈদ্য, “তুমি অনেক বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছ। খুব খুব বড়। জানো তারা এত সহজে রাধাকে ছাড়বে না। তাছাড়া তোমরা সবাই ঝুঁকিতে আছো। ওরা জানে যে তোমরা সবাই, রাধাসহ ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাথে জড়িত। আর আমরা যেমনটা সন্দেহ করছি এক্ষেত্রে যদি বায়োটেররিজমও জড়িত থাকে তাহলে তোমরা তো তাদের জন্য রীতিমত হুমকি।”

“আমার কিন্তু তা মনে হয় না।” উত্তর দিল বিজয়। “আমার ধারণা ওরা ভাবছে যে শুধু রাধাই আইবি’র সাথে জড়িত। সম্ভবত কেল্লায় ইমরানের উপস্থিতিকে রাধার জন্য এসেছেন বলে ধরে নিয়েছে। তবে এটা জানে যে রাধা আমার বাগদত্তা। নয়ত এতদিন আমাদেরকেও টার্গেট করত। এমনকি জাদুঘরেও এলিসই ছিল তাদের সত্যিকারের নিশানা। যদি ওর সাথে আমরা না থাকতাম তাহলে আমাদের কোনো ক্ষতিই করত না।”

“আমার মনে হয় তুমি একটু অফিসে এলে ভালো হয়।” জানালেন ডিরেক্টর অর্জুন বৈদ্য, “প্যাটারসনকেও জানানো উচিত। সেই তো টাস্ক ফোর্সের হেড। তাই কী ঘটছে তার জানা প্রয়োজন আছে। আর মনে হয় না তাঁর সাথে যোগাযোগ ছাড়াই এ ধরনের একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ বলে খুব খুশি হবে।”

“আমি এক্ষুনি আসছি” প্রতিজ্ঞা করল বিজয়, “ওখান থেকে এয়ারপোর্ট চলে যাবো।”

“তার আগে হয়ত হাসপাতালে আসতে চাইবে।” উৎফুল্ল হয়ে উঠল বৈদ্যের কণ্ঠস্বর, “ইমরানের বিপদ কেটে গেছে। জ্ঞানও ফিরে এসেছে। তোমার সাথে দেখা করতে চাইছে।”

ফোন রেখে কলিনের দিকে তাকাল বিজয়; বন্ধুর চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি, “আরে তোমার তো খুশি হবার কথা বাছা” বলে উঠল, “এখানেই তোমাকে বেশি দরকার।” অট্টহাসি দিয়ে পরিবেশটাকে হালকা করতে চাইল, “তুমি না বলো আমার চেয়ে তোমার মাথায় বেশি বুদ্ধি। তো এবারে প্রমাণ দেখাও। ধাঁধার সমাধানে এলিস আর ডা. শুক্লাকে সাহায্য করো। আমাকে সহায়তার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো রাস্তা নেই, বুঝলে।”

তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না কলিন। এখনো মেনে নিতে পারছে না বিজয়ের সিদ্ধান্ত। বন্ধুকে ভালোভাবেই চেনে। একবার যখন মনস্থির করে ফেলেছে তখন দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাকে টলাতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়ে বিজয়কে একা ছাড়তেই হবে। অবশেষে মাথা নেড়ে জানাল, “বলছি না

যে খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু তুমি যদি এটাই চাও তো…” থেমে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল, “নিজের দিকে খেয়াল রেখো দোস্ত; আমি কিন্তু সেখানে থাকব

অন্যদের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে স্টাডি থেকে বেরিয়ে গেল বিজয়। জানে ও একটা জুয়া খেলা খেলতে যাচ্ছে। বাজিটা জিততে পারবে তো?

.

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো হেডকোয়ার্টার্স, নিউ দিল্পি

কনফারেন্স রুমের মনিটরে প্যাটারসনের ইমেজের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিজয় আর বৈদ্য। মাঝরাতে ডেকে তোেলায় আফ্রিকান-আমেরিকানের কঠোর আর অপ্রসন্ন মুখভাবে আজ আরো যোগ হয়েছে একরাশ বিরক্তি।

“ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ হলেই ভালো” কনফারেন্স রুমে অপেক্ষারত দুজনকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, কাল প্রেডিডেন্টের সাথে মিটিং আছে অথচ ঘুমানোর জন্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা আছে হাতে। তোমরা ফোন করার মাত্র একটু আগেই বিছানায় গিয়েছিলাম।”

বিজয় যেভাবে জানিয়েছে সেভাবেই সারা দিনের ঘটনাগুলো খুলে বললেন বৈদ্য। শুনতে শুনতে প্যাটারসনের চেহারা আরো কালো হয়ে চোখদুটো রাগে জুলতে আরম্ভ করল। তিনি নিজে নিয়ম-কানুনের প্রতি কড়া বলে যারা নিয়ম ভঙ্গ করে তাদেরকে তেমন দেখতে পারেন না। নেভীসিল হওয়াতেই পেয়েছেন এ অভ্যাস।

বৈদ্যের রিপোর্ট শেষ হবার সাথে সাথে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিজয়ের দিকে তাকালেও সাথে সাথে কিছু বললেন না প্যাটারসন। মনে হল এই মাত্র পাওয়া তথ্যগুলো নিয়ে গভীরভাবে ধ্যান করছেন।

“আগের কাজ আগে” খানিক পড়ে জানালেন প্যাটারসন, “কিরবাঈয়ের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ উনার কথাই ঠিক। গ্রিসে ঘটে যাওয়া ঘটনা আর টাইটান ফার্মাসিউটিক্যালসের মাঝে কোনো না কোনো সম্পর্ক অবশ্যই আছে। আমাদেরকে আরো গভীরে যেতে হবে আর সকাল হলে আমিও দেখব কী করা যায়। কিন্তু আমাদেরকেও সতর্ক আর কৌশলী হতে হবে। ওয়ালেস জড়িত হোক বা না থোক কার সাথে কথা বলছি আর কতটুকু কী বলছি সে ব্যাপারে বিচক্ষণ হতে হবে। পুরো ব্যাপারটাই বেশ নাজুক। বিভিন্ন কংগ্রেসম্যান, সিনেটর আর এমনকি প্রেসিডেন্টের সাথেও ওয়ালেসের বেশ দহরম-মহরম আছে। তাই বেস কিছু করা যাবে না।”

বিজয় আর বৈদ্য দুজনেই মাথা নাড়ল। অপেক্ষা করছে প্যাটারসনের কথা শেষ হবার জন্য।

“নেক্সট”, তীব্র দৃষ্টিতে বিজয়ের দিকে তাকালেন প্যাটারসন, “বিভিন্ন ধাঁধা আর প্রহেলিকার সমাধান করার জন্য তোমার দক্ষতা প্রশংসাজনক হলেও সন্ত্রাসীদের সাথে আলোচনা করার অধিকার তোমার নেই। এমনকি অভিজ্ঞতাও নেই। মনে হচ্ছে ভুলে গেছ যে তুমি টাস্কফোর্সের সদস্য। আর এখানে কে কী করবে সেটার সিদ্ধান্ত আমি নেব। তুমি নয়। তাই মন চাইলেই যা খুশি তা করতে পারো না।”

তারপর এমনভাবে থেমে গেলেন যেন নিজের কথা ওজন করে দেখছেন, “কিন্তু তুমি তাই করেছ। এইক্ষেত্রে আমাদের আর বেশি কিছু করার নেই। তবে একটা কথা বুঝতে চেষ্টা করো, যদি এসব মেয়েটার জন্য করে থাকো তাহলে তুমি একজন মহা বেকুব! একেবারে অথর্ব গাধা। ও এতক্ষণ মারা গেছে। আর যদি ভাবো যে তাদেরকে রূপার থালে করে সিক্রেটটা সাজিয়ে দিলেই মেয়েটাকে ছেড়ে দেবে তাহলে বলব দ্বিতীয়বার আগাগোড়া চিন্তা করে নাও। তুমি এবং মেয়েটা দুজনেই খরচের খাতায় চলে গেছ। তার মানে যা করছ তা মেয়েটার জন্য নয়; করছ টাস্ক ফোর্সের জন্য। তাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে যে আফগানিস্তান কিংবা অন্য যেখানকার গুহাতেই যা পড়ে আছে তা যেন দুনিয়ার জন্য কোনোরকম হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে। এই কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এ টাস্ক ফোর্স। আর এখন তা তোমার দায়িত্ব। বুঝতে পেরেছ?”

ঢোক গিলল বিজয়। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে প্যাটারসনের কথার সত্যতা। প্যাটারসনের যুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে ওর সমস্ত সত্তা। কিন্তু আপন হৃদয়ের গভীরে ঠিকই বুঝতে পারছে যে টাস্ক ফোর্সের লিডারের কথায় কোনো ভুল নেই।

চোখের জল আটকাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে বলল, “বুঝেছি। একেবারে পরিষ্কার।”

“এবার আবার শুরু করলেন প্যাটারসন, “শোন, যদি এই মহান রহস্যের সঙ্গে বায়োটেররিজমের হুমকি জড়িয়ে থাকে তাহলে তো হাতে হাত রেখে বসে ওদেরকে পালিয়ে যেতে দেয়া যায় না। যীশুর দিব্যি, ওরা যে কে সেটাও জানি না!”

“কী করতে বলছেন?” বিজয় বুঝতে পারল প্যাটারসন কী বলতে চাইছেন।

“তুমি তোমার সিদ্ধান্ত মত কাজ করো” বিজয়কে নির্দেশ দিলেন প্যাটারসন, “আমরা এখান থেকে তোমাকে কাভার দিব।”

হতবুদ্ধি হয়ে গেল বিজয়, “কিভাবে? রাধাকে কোথায় রাখা রয়েছে আপনি তো সেটাও জানেন না?”

“মনোযোগ দিয়ে শোন” কণ্ঠস্বর নিচু করে বিজয়কে সব জানিয়ে দিলেন প্যাটারসন; শেষ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “খুব সাবধানে থাকবে, মাই বয়। আমাদের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই। গত সপ্তাহে আরেকটু হলে টাস্ক ফোর্সের এক সদস্যকে হারাতেই বসেছিলাম। আরো দুজনকে হারাবার কোনো ইচ্ছেই নেই।”

.

৪৭. জালালাবাদ, আফগানিস্তান

জালালাবাদের রাস্তায় ঝাঁকি খেতে খেতে এগোচ্ছে ল্যান্ড রোভার। কুপারের পাশেই বসে আছে বিজয়। এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর সাথে সাথেই তড়িঘড়ি ওকে একটা অপেক্ষারত গাস্ট্রিম জিফাইভ ফাইভ জিরো জেটে তুলে নেয়া হয়েছে।

তারপর নব্বই মিনিটের ফ্লাইটে চড়ে উড়ে এসেছে দিল্লি থেকে কাবুল। সাথে কুপারের দলের আরো পাঁচজন এসেছে, স্থূলকায়, পেশিবহুল লোকগুলোর ক্ষতচিহ্ন দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা তেজী, সকলেই সশস্ত্র।

কাবুল এয়ারক্রাফট ল্যান্ড করার সাথে সাথেই টারম্যাকে পার্ক করা আরেকটা প্রাইভেট জেট দেখল বিজয়। গাস্ট্রিম সিক্স ফাইভ জিরো ই আর, দূরপাল্লার জেট। এগুলো যে কার সেটা ভেবেই বেশি অবাক লাগছে। কুপার ওকে আগেই জানিয়েছে যে তারা সরাসরি জালালাবাদ যেতে পারবে না। কারণ বিমানবন্দরগুলো এখন সামরিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয় আর এ মুহূর্তে কেবল জাতিসংঘের বিমান ওঠা-নামা করে। আশেপাশে আরো দুটো মোটাসোটা কর্মাশিয়াল এয়ারলাইন্স থাকলেও ছোট খাটো কোনো প্লেন নজরে পড়ল না।

ইমিগ্রেশনের ঝামেলা চুকিয়ে নকুই মিনিটের জন্য ল্যান্ড রোভারে চড়ে বসল জালালাবাদের উদ্দেশ্যে। সচরাচর বাহন নিয়ে কোনো কথা বলে না বিজয়। রাস্তাটা বেশ ভালো আর মসৃণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য পুষ্ট একটা প্রজেক্ট ২০০৬ সালে নতুন করে গড়ে তুলেছে এ অংশ। কিন্তু মনে হচ্ছে দু’ধারের গ্রাম্য-দৃশ্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য আফগান ড্রাইভারদেকে আরো উৎসাহ দিয়েছে রাস্তার এই বৈশিষ্ট্য।

কাবুল নদীর প্রায় ২০০ ফুটেরও বেশি উপর দিয়ে বয়ে চলা রাস্তার আশেপাশের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। যদিও সারাক্ষণ যেন বিপদ আর মৃত্যু ওঁৎ পেতে ছিল মাথার উপর। হাইওয়েতে মাত্র দুটো লেন আর পাশাপাশি খুব বেশি হলে দুটো গাড়ি চলতে পারবে এতটুকু মাত্র চওড়া।

ভেতরের লেনে, রাস্তার উপর টাওয়ারের মত উঁচু হয়ে আছে খাড়া একটা চূড়া। প্রায় নব্বই ডিগ্রি কোনে বাঁকানো। আর বাইরের লেনকে সুরক্ষা দিচ্ছে মাত্র এক ফুট উঁচু তাক। যার ওপারে খোলা আকাশ আর নিচে উপত্যকার মেঝে।

প্রাচীন লাডাস-সেই সোভিয়েত যুগ থেকেই টিকে আছে। দুর্বল, ভাঙ্গা-ভাঙ্গা বাস আর ক্ষয়ে যাওয়া টয়েটো ট্যাক্সিগুলো একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে এলোপাথারি গাড়ি চালাচ্ছে। একটু পরেই অবশ্য আবার সোভিয়েত আক্রমণের সাক্ষী খানা-খন্দে পড়ে এদিক সেদিক ছিটকে পড়তে হয়। ল্যান্ড রোভারের পাশ দিয়ে হুশ হাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় গাড়ি। একে অন্যের কাছ থেকে মিলিমিটার মাত্র দূরত্বে হাই স্পিডে পার হচ্ছে চুলের মত চিকন আর তীক্ষ্ণ বাক। এসব কিছুর মাঝে অসামঞ্জস্য হচ্ছে বোঝা বহনকারী ধীরগতির ট্রাকটার ট্রেইলার। কর্কশ শব্দ করে এমনভাবে গড়িয়ে চলেছে যেন সময় নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা বাকি যানবাহন থেকে একেবারেই আলাদা।

পথিমধ্যে দু’বার প্রতিদিন হাইওয়েতে ঘটে চলা দুর্ঘটনার নজির দেখতে পেল বিজয়। প্রথমটা হচ্ছে গিরিখাতের তলায় দোমড়ানো মোচড়ানো একটা গাড়ির অবশিষ্টাংশ। দ্বিতীয়টা একটা কন্টেইনার ট্রাক আর সেডানের মুখোমুখি সংঘর্ষ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে দুর্ভাগা ড্রাইভার সময় মত নিজ লেনে ফিরতে

পেরে পূর্ণ গতিতে গিয়ে ট্রাকের গায়ে আছড়ে পড়েছে। ফলে রাস্তার সংকীর্ণ অংশে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে যানবাহনের অবাধ গতি। বিশাল ট্রাক আর গাড়ির নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হচ্ছে বাকি গাড়ি।

যাক, অবশেষে জালালাবাদ পৌঁছাতে পেরেছে। এখন স্থানীয় এসকর্টের সাথে যাচ্ছে বাকিদের সাথে মোলাকাৎ করার জন্য। এই লোকটাই কাল সকালে তাদেরকে কুনার ভ্যালিতে নিয়ে যাবে।

জীর্ণদশা এক দালানের সামনে এসে থামল ল্যান্ড রোভার। প্লাস্টার উঠে যাচ্ছে, জানালাগুলো ভাঙ্গা। কোনো সন্দেহ নেই যে খুব শিঘ্রই মেরামত প্রয়োজন। তবে মনে হচ্ছে বিলাসিতা এদের কাছে তেমন জরুরি কিছু না। কুপার যে কাদের জন্য কাজ করছে তা ভেবে যারপরনাই বিস্মিত বিজয়।

অবশ্য দোতলা দালানের প্রায় পুরো গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে থাকা হলে ঢুকতে গিয়ে খানিকটা উত্তর পেয়েও গেল। কোনো এক কালে হয়ত হালকা হলুদ ছিল এমন এক পোকায় কাটা গদিঅলা সোফায় বসে আছে স্বতন্ত্র চেহারাবিশিষ্ট লম্বা এক লোক। ভদ্রলোকের উন্নত কপাল, ঈগলের মত বাকা নাক আর মাথায় রুপালি ধূসর চুল। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে বিজয়কে মেপে দেখল রীমলেস চশমার ওপারে থাকা ধূসর চোখজোড়া।

সামনেই টেবিলের উপর পড়ে আছে জাতীয় জাদুঘরে দেখা ধাতব পাত, বীজ নদীর কাছাকাছি জিউসের বেদির নিচে যেটি সমাধিস্থ করে গেছেন আলেকজান্ডার।

“শুভ সন্ধ্যা, ক্রিশ্চিয়ান”, লোকটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কুপার। একটুও না হেসে পাল্টা মাথা ঝাঁকাল লোকটা।

কোনো কথা না বললেও ঠিক বোঝা যাচ্ছে তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির বহর। বিজয় জানে না সে কে তবে সন্দেহ নেই যে কুপারের বস। এই পুরো প্রজেক্টের পুরোধা।

এখানেই এই সময়ে আগন্তুকের উপস্থিতি ভালো না মন্দ সেটাও বুঝতে পারছে না। তবে আশা করছে অন্তত এতদিন ধরে তাদের মনের মাঝে জমে উঠা একগাদা প্রশ্নের কয়েকটা উত্তর পাওয়া যাবে।

“অবশেষে বিজয়ের উপর স্থির দৃষ্টি মেলে ধরল লোকটা, ধূসর চোখ জোড়া এখনো ওকে মূল্যায়ন করে চলেছে। কাছেই পড়ে থাকা শতছিন আরেকটা সোফা দেখিয়ে বসতে ইশারা করল। বিজয়ও বসে পড়ল।

“আমার নাম ক্রিশ্চিয়ান ভ্যান ক্লক” নিজের পরিচয় জানাল আগন্তুক, “আমার কথা কখনো শোন নি, না?”

মাথা নেড়ে সম্মতি দিল বিজয়। সত্যিই শোনে নি।

“যাই হোক সেটা কোনো সমস্যা না; তুমি কে সেটা আমি জানি। বলে চলল ভ্যান কুক; কুপারের দিকেও একবার তাকাল, “বেশ ভালো কাজ দেখিয়েছে কুপার। কাল আমাদের অভিযানের জন্য বিশ্বস্ত লোকজনকে তৈরি করো ততক্ষণে আমি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে খানিক কথা বলি?”

সম্মত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল কুপার। এরপর ভ্যান ক্লক ওর দিকে তাকাতেই বিজয় বুঝতে পারল যে কাবুল এয়ারপোর্টের গাস্ট্রিম জেট এ লোকটার হবে নিশ্চয়। কে সে? কণ্ঠস্বরে পুরোপুরি ইউরোপীয় টান। সম্ভবত জার্মানি কিংবা অস্ট্রিয়া থেকে এসেছে। অসম্ভব ধনী, সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজয়কে কিভাবে চেনে?

“তুমি হচ্ছ আমাদের জন্যে একটা কাটা।” বিজয়কে জানাল ভ্যান কুক। তবে এরকম মন্তব্য সত্ত্বেও তাকে বিরক্ত কিংবা দুঃখী মনে হচ্ছে না, “তোমার জন্য গত বছর আমি একজন ভালো বন্ধুকে হারিয়েছি। আর অর্ডার হারিয়েছে এক কর্মোদ্যমী সদস্য।” মাথা নেড়ে জানাল, “আগামী হাজার বছরেও তোমার কথা ভুলব না।” এবারেও অভিব্যক্তি কিংবা গলার স্বরে কোনো তিক্ততা প্রকাশ পেল না।

কিন্তু শব্দগুলো শোনার সাথে সাথেই বিজয়ের মেরুদন্ড বেয়ে নেমে গেল ভয়ের শীতল স্রোত। ভ্যান কুক কি গত বছর মহাভারতের রহস্য অনুসন্ধানের কথা বলছে? অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে না যে কাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছে।

“অবশ্য এখন আর এসবের কোনো মানে হয় না” আবার শুরু করলো ভ্যান, “এসবই অতীত আর আমি অতীতে বসবাস করায় বিশ্বাস করিনা। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভবিষ্যৎ। তাই সামনের দিনগুলোর উপরেই মনোসংযোগ করতে হবে। এখনো অনেক কিছু পাবার বাকি আছে। কিন্তু অতীতও গুরুত্বপূর্ণ, তাই না?” বিজয়কে চিরে দিল মর্মভেদী দৃষ্টি, “অতীত থেকেই শিক্ষা নিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।”

লোকটা যে কী বলছে সে সম্পর্কে বিজয়ের কোনো ধারণাই নেই। মনে হচ্ছে সব অর্থহীন কথাবার্তা। কিন্তু সামনে বসে থাকা লোকটাকে দেখে তো অসংলগ্ন বলেও মনে হচ্ছে না। তাকে তো বরঞ্চ পুরোপুরি নির্ভুল, পরিকল্পনা মত হিসেব কষে পা ফেলাদের দলেই ফেলা যায়। মোটেই আবেগতাড়িত নয়।

“কুপার আমাকে বলেছে তুমি না-কি পদ্যগুলোর একটার মর্মোদ্ধার করেছ” বিজয়ের বিস্ময়কে পাত্তা না দিয়ে ভ্যান ক্লক জানাল, “তো কুনার উপত্যকায় কী আছে?” সামনে ঝুঁকে বিজয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বলো।”

পুরো আলোচনার মধ্যে এই প্রথমবারের মত বিজয়ের পরিচিত একটা কিছু নিয়ে কথা বলল ইউরোপীয়ান লোকটা। কিন্তু এবারেও ওর কাছে কোনো উত্তর প্রস্তুত নেই।

“আমি জানি না” উত্তরের পরিবর্তে তাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল বিজয়, “পদ্যটাতে কেবল জালালাবাদের অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে। এই অঞ্চলে আসার জন্য আলেকজান্ডার যে রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন তা থেকে কুনার উপত্যকা একটা অনুমান মাত্র।” এরপর ব্যাখ্যা করে জানাল যে কেমন করে কনার উপত্যকাতেই রহস্যটা লুকিয়ে থাকার জোরালো সম্ভাবনা খুঁজে বের করেছে।

বিজয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল ভ্যান কুক, “তার মানে তুমি সঠিক। অবস্থানটা জানো না। কিন্তু ভাবছ যে এখানেই হয়ত আমাদের অনুসন্ধান শেষ হবে।”

উত্তর দেবার আগে খানিক দ্বিধা করল বিজয়। এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল, “তোমরা আসলে কী খুঁজছ জানতে পারলে আমি সাহায্য করতে পারব। এখন তো কেবল কিছু না জেনেই পদ্যগুলোকে মমোদ্ধার করেছি। আলেকজান্ডার সেটা জানতেন। আমরাও যদি জানতে পারি। তাহলে সম্ভবত কাজটা আরো দ্রুত হবে।” এমন এক মানুষের মত একগুয়ে দৃষ্টিতে তাকাল যার কিছুই হারাবার নেই। প্যাটারসন তো জানিয়েছেন যে তার আর রাধার দিন শেষ। আর যদি মৃত্যু এত কাছেই থাকে তবে তার আগে উত্তরটাও ঠিকই জেনে যাবে।

চিন্তায় পড়ে গেল ভ্যান কুক। বিজয়ের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো তেজ প্রত্যাশা করেনি। যাই হোক অবশেষে মাথা নেড়ে হাসল; বরফ শীতল এক হাসি যা চোখে ফুটে উঠেনি। “হয়ত তুমিই ঠিক। যদি আরো কিছু জানতে পারো তাহলে হতে পারে আরেকটু বেশি কাজে লাগবে।”

বিজয় অপেক্ষা করছে; আর ইউরোপীয়টা মনে মনে ভাবছে যে কতটা বলবে আর কতটা গোপন রাখবে।

.

৪৮. আলেকজান্ডার সম্বন্ধে সত্য উদঘাটন

“দ্য গ্রেট আলেকজান্ডার সম্পর্কে খানিকটা সত্য বোধ হয় তুমি ইতিমধ্যে বের করে ফেলেছ।” অবশেষে জানাল ভ্যান কুক। “বাস্তব ক্ষেত্রে তার জীবন সম্পর্কে আমরা যতটা জানি-সেটার ভিত্তি হল অসংলগ্ন কিছু তথ্য কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যিনি রেকর্ড করে গেছে সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য, দর্শন অথবা ধ্যান-ধারণা। ফলে কোনটা যে আসল মানুষটা সম্পর্কে লেখা ঐতিহাসিক সত্য আর কোনটা যে মহিমান্বিত হিসেবে ফুটিয়ে তোেলা গল্প তা বের করা আসলেই কঠিন।”

বিজয় যেন এ মন্তব্যে সায় দেয় তাই খানিক অপেক্ষা করল ভ্যান কুক। বিজয় তাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই আবার শুরু করল, “আর এ কারণেই কিউবের মত আর্টিফ্যাক্ট গুলো দরকারি। এদের সাহায্যে আলেকজন্ডারের তাবেদারি আর উচ্চকিত প্রশংসা করে লেখা অতি কল্পনার অংশগুলোকে বাদ দেয়া যাবে।”

আবারো মাথা নাড়ল বিজয়। মনে পড়ল তাদের বিশ্লেষণের সময় এলিসের প্রত্যাখ্যানের কথা। বিভিন্ন রেকর্ডে আলেকজান্ডার সম্পর্কে প্রচুর পরিমাণে লোকজ গল্প মেলে ধরা হয়েছে যার সবকটিকে বিশ্বাস করা শক্ত।

হাত বাড়িয়ে দিল ভ্যান ক্লক, “কিউবটা প্লিজ।”

বিজয় কিউবটা ক্লকের হাতে তুলে দিতেই ধাতব পাতের গায়ে লাগিয়ে দিল ভ্যান কুক। সাথে সাথে চমৎকারভাবে বসে গেল, কিউব।

“তো তোমরা কিভাবে জানো যে আলেকজান্ডারের গল্পের কতটুকু সত্য আর কতটুকু অতি কল্পনা?” কৌতূহলী হয়ে উঠল বিজয়। এই লোকটার ক্ষমতার আর জ্ঞানের উৎস কী?

“জেনে কী তোমার ভালো লাগবে?” ব্যঙ্গ করল ভ্যান ক্লক। “কিন্তু একটা কথা বলতে পারি, অলিম্পিয়াস আমাদের অর্ডারের একজন সদস্য ছিলেন। আর তিনি এই কিউবের কথা জানতেন কারণ অর্ডারের একেবারে প্রথম দিককার এক সদস্যই এর সৃষ্টিকর্তা। সে হাজার হাজার বছর আগেকার কথা।”

হতভম্ব হয়ে গেল বিজয়। গত বছর টাক্স ফোর্সে যোগ দেবার পর ইমরান কিরবাঈয়ের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পেরেছে তাতে ভেবেছিল যে তাদের অদৃশ্য প্রতিপক্ষ নিশ্চয় অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে তারা যে এতটা প্রাচীন সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ভ্যান কুকের কথা যদি সত্য হয় তো এই অর্ডার গত বছর আবিষ্কৃত মহান অশোকের ব্রাদারহুডের চেয়েও আরো পুরনো।

বিজয়ের চমকে যাওয়া দেখে উল্লসিত হয়ে উঠল ভ্যান কুক, “তাই আমরা জানি যে ইন্দাস-ভূমিতে আলেকজান্ডারের অভিযান কোনো মস্তিস্কপ্রসূত কল্পনা নয়। যা চেয়েছিলেন তা খুঁজে পাবার রাস্তাও আমরাই সরবরাহ করেছিলাম।”

তবে এবার একটা ফোকর বের করল বিজয়, “এখানে একটা খটকা আছে।” পাল্টা মন্তব্য করে বলল, “আজ তার সেই রহস্য খুঁজছে। কিন্তু যেমনটা দাবি করলে যদি দুই হাজার চারশ কিংবা তার চেয়েও বেশি বছর আগে থেকেই উপায়গুলো জানো তাহলে তখনই কেন খোজোনি? কেন থালায় সাজিয়ে আলেকজান্ডারের হাতে তুলে দিলে, ধাতব পাতটাকেও লুকিয়ে রাখতে দিলে আর তারপর দুই হাজার বছর পর এসেছ খুঁজতে?”

ভ্যান ক্লকের চেহারাতে আঁধার ঘনাল, “কারণ অলিম্পিয়াস আমাদের সাথে ছল করেছিল। আলেকজান্ডারেরও হাজার বছর আগে থেকেই সুরক্ষিত ছিল এ রহস্য। মনে রাখবে এটা দেবতাদের রহস্য। ইন্দাস-ভূমির দেবতাদের। কিউব আর ধাতব পাতটাকেও এই কারণেই তৈরি করা হয়েছে যেন সিক্রেটটা আজীবন সুরক্ষিত থাকে। আর পাহারা দেবার জন্য সৃষ্টি হয়েছে বেদের পুরোহিতদের এক ছোট্ট ব্রাদারহুড। কেবল তারাই এটা জানত। অর্ডারেরও উৎপত্তি সম্পর্কে জানার অযুহাতে নিজ দরবারে পুরোহিতদের একজনকে আমন্ত্রণ করেছিলেন অলিম্পিয়াস। আর কোনো একভাবে পুরোহিতের কাছ থেকে সিক্রেট লোকেশনটাও জেনে নিয়েছেন। এরকম সীমালঙ্ঘনের জন্যই আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর অর্ডার তার উপর থেকে সব ধরনের প্রতিরক্ষাবহ সরিয়ে ফেলে। যদি অর্ডার নিরাপত্তা দিত তাহলে এতটা অবমাননাকর মৃত্যু সইতে হত না।”

“এটা কোন ধরনের অর্ডার?” আবারো নিজের প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসল বিজয়।

কিন্তু মাথা নাড়ল ভ্যান কুক। “তোমাকে ইতোমধ্যেই আমি অনেকটুকু বলে ফেলেছি। শুধু জেনে রাখো যে আমরা মানবজাতির মতই পুরনো। এমন একটা সময় ছিল যখন সারা দুনিয়া আমাদের কথা জানত আর ভয়ও পেত। তারপর আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলেই প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানোটা আরো সহজ হবে।”

আবারো শুরু করার আগে একটু বিরতি দিয়ে জানাল, “যাই হোক, আলেকজান্ডার সিক্রেটটা খুঁজে পেলেও তারপরের ঘটনাসমূহ জট পাকিয়ে যায় আর উনি মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাস নিশ্চয় জানো। তাঁর শেষকৃত্যের শবাধার টলেমি হাইজ্যাক করে আর মমি আলেকজান্দ্রিয়ায় সমাধিস্থ করে যা সেখানেই ছিল চতুর্থ শতক পর্যন্ত।”

“মানে, যখন রহস্যময়ভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল।” বিড়বিড় করে নিজের গবেষণা স্মরণ করল বিজয়।

“গায়েব হয়ে যায়নি” জানাল আত্মতৃপ্ত ভ্যান কুক, “সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল খ্রিস্টানবাদ। চিহ্নগুলো আমরা পরিষ্কারভাবেই দেখেছি। পৌত্তলিক দেবতাদের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছিল। আর আলেকজান্ডারকে দেবতা হিসেবেই পূজা করা হত। বহু আগেই তার সমাধিস্থান ভেঙে মমি নষ্ট করে ফেলার কথা ছিল। তাই লাগাম টেনে নিলাম আমাদের হাতে। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে মমি তুলে আরেকটা গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। সেই সমাধিস্থান সম্পর্কে কাউকেই জানানো হয়নি। কিন্তু অর্ডারের অজ্ঞাতে একটা মানচিত্র তৈরি হল। এত শতক ধরে যা লুকানোই ছিল। মাত্র কয়েক দশক আগে দুর্ঘটনাবশতই তা আবার পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে।

আমরা খনন করে মমিটাকে তুলেছি। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অনুগ্রহ বয়ে এনেছে বলতে পারো। তিনি যে সিক্রেটটা আবিষ্কার করেছিলেন শত শত বছর ধরে সে গল্প এক রূপকথায় পরিণত হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করিনি যে এমন কিছু সম্ভব। আর মমিটাকে পরীক্ষা করে দেখেছি। তখনই বুঝতে পারলাম যে রূপকথা আসলে সত্যি। দেবতাদের রহস্য আদৌ কোনো বানোয়াট নয়। আর আলেকজান্ডার প্রকৃত অর্থেই তা আবিষ্কার করেছিলেন। আর তখনই ঠিক করি যে এবার সিক্রেটটাকে খুঁজতে হবে। কিন্তু আমাদের হাতে কিউব আর ধাতব পাতটা ছিল না। তবে জানতাম, অলিম্পিয়াসের সাথে যে পুরোহিত দেখা করেছিলেন তার কাছেই এগুলো শেষবারের মত দেখা গিয়েছিল। কিন্তু মিটিংয়ের পরপরই উধাও হয়ে যান সেই পুরোহিত। আর, কেউ জানে না যে তার সাথে কী হয়েছিল। এরপর যখন অলিম্পিয়াসের সমাধি আবিষ্কৃত হবার সম্ভাবনার কথা শুনলাম, বুঝতে পারলাম যে কিউব আর ধাতব পাতটাও সেখানে পাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।”

“তো এরপর কুপারকে খনন কাজে জড়িত করে স্ট্যাভরসকেও নিজেদের দল টেনে নিলেন?”

“ঠিক তাই। এখন তাহলে তুমি পুরো ব্যাপারটাই বুঝতে পেরেছ।”

ভ্রু-কুঁচকে ফেলল বিজয়, “আমাদের কাছে যেসব তথ্য ছিল তার ফাঁক ফোকরগুলো এবার ভরে গেল। আমি তো খনন কাজ আর ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ভেতরেও কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে অনুমান করেছিলাম। আলেকজান্ডারের মমির উপর তোমরা যে পরীক্ষা চালিয়েছ…তার ফলাফলকে বৈধতা দেবার জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়াল জরুরি ছিল তাই না?”

হেসে ফেললেন ভ্যান কুক, “কাছাকাছি হয়েছে। তবে অংশত। আলেকজান্ডারের মমি পরীক্ষা করায় এমন কিছু জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে যার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো জরুরি হয়ে পড়ে। দেখো, তোমাদের মহাকাব্য মহাভারত থেকে নেয়া এক পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করেই কিউবটার সৃষ্টি। আলেকজান্ডার যা পেয়েছেন আর তার উপর পরীক্ষা করে আমরা যা পেয়েছি এ সবকিছুই মহাকাব্যের একটা গল্পে হুবহু বর্ণনা করা আছে। তাই পরীক্ষার ফলাফল বোঝার জন্য জীবিত মানুষের উপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল করাটা প্রয়োজন ছিল।

বিজয় নিজের মাথা খাঁটিয়ে মহাভারতের এমন কোনো কাহিনির কথা স্মরণ করার চেষ্টা করল যার সাথে কিনা ক্লিনিকাল ট্রায়াল আর দুহাজার বছর আগে মৃত্যুবরণ করা এক মৃতদেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের মিল পাওয়া যায়। কিন্তু মাথায় কিছুই এলো না।

“জানি না তুমি কিসের কথা বলছ। অবশেষে জানাতে বাধ্য হল বিজয়।

“ইংরেজিতে এর নাম মহাসাগর মন্থন অথবা আরো সঠিকভাবে বললে হয় সমুদ্রমন্থন।” ভ্যান ক্লক সংস্কৃত শব্দটা একেবারে নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করলেও খেয়াল করল না বিজয়। মহাকাব্যের সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনিগুলোর একটি শোনার সাথে সাথেই পুরো মনোযোগ চলে গেছে সেদিকে।

“কিন্তু…কিভাবে?” দ্বিধায় পড়ে গেল বিজয়। “এ কাহিনি তো পুরোপুরি একটা ফ্যান্টাসি, অতি কল্পনা। অমৃত পাবার জন্য দড়ির মত ভাসুকি আর একটা পর্বতকে ব্যবহার করে মহাসমুদ্র মন্থন। এর পেছনে কোনো বিজ্ঞান নেই।”

অনুকম্পা দেখিয়ে হাসল ভ্যান কুক, “সবাই আসলে মহাভারতকে এক মহাকাব্যিক কবিতা কিংবা কাল্পনিক কাহিনি হিসেবেই ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই বিশ্বাসই করতে পারবে না যে এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞান।”

সম্মত না হয়ে পারল না বিজয়। কারণ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিই যে মহাভারতের অন্তঃস্থল গত বছরের আবিষ্কারই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। আর এখন এও বেশ বুঝতে পারছে যে দু’হাজার বছর ধরে মহাভারতের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরেকটা রহস্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

“চলো, তোমাকে ব্যাখ্যা করে শোনাই”, সামনে ঝুঁকে শুরু করল ভ্যান

.

৪৯. পঞ্চম দিন

রহস্যের এক ঝলক

সাক্সেনাকে হাসতে দেখে চোখ পিটপিট করল বিস্মিত রাধা। কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই ডাক্তার ওর সেলে এসে জানিয়েছেন যে মেডিকেল সেন্টারের চারপাশে হাঁটতে নিয়ে যাবেন।

“আমাকে বলা হয়েছে যেন তোমার দিকে খেয়াল রাখি।” খোশমেজাজে জানালেন সাক্সেনা, “কুপার তোমাকে এখানে নিয়ে আসায় হাতে আরো বেশি সময় পাওয়া গেল। মনে হচ্ছে তার প্রজেক্টের ডেডলাইন আরো কয়েকদিন বাড়ানো যাবে। মানে আমার অংশও বেড়ে গেল।”

সেল থেকে বেরিয়ে আগে কখনোই দেখেনি এমন সব করিডোরের গোলকধাঁধা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তারের কথা ভেবে দেখল রাধা। কিন্তু আয়তাকার একটা অ্যাট্রিয়ামের চারপাশের লম্বা ব্যালকনিতে পৌঁছে মাথা থেকে দূর হয়ে গেল সমস্ত চিন্তা। বিশাল স্থানটাকে আলোকিত করে তুলেছে ছাদের শক্তিশালী লাইট আর ব্যালকনির বাতি। অ্যাট্রিয়ামের চারপাশেই আছে এ ব্যালকনি। গুণে দেখল পুরো দালানে আটটা সিঁড়িপথ আছে।

সবিস্ময়ে ভেবে দেখল যে পুরো স্থাপনাটা তাহলে কত বড়। অথচ সেল থেকে টয়লেট ব্লক পর্যন্ত করিডোরের মাঝেই সীমাবদ্ধ ওর গতিবিধি। এজমালি টয়লেট আর বাথরুম এ কারাগারের অন্যান্য বন্দী নিবাসীদেরকে দেখলেও ধারণা করতে পারেনি যে দালানটা এত বড়।

“আড়াইশো সেল আছে।” রাধার দম বন্ধ ভাব দেখে জানালেন সাক্সেনা। “এই ফ্যাসিলিটির আটটা তলাই ভূগর্ভে তৈরি যা এখন চোখের সামনে দেখছ। মাটির উপর কেবল দুই তলা। তাই বাইরে থেকে পুরো ভবনটাকেই নিচু আর বৈশিষ্ট্যহীন দেখায়। কেউ জানেই না যে এখানে কী আছে।”

“কুপার কে?” প্রাথমিক বিস্ময় সামলে উঠে জানতে চাইল রাধা।

“তুমি জানো না? আমি তো ভেবেছিলাম যে আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক হয়ত তোমাকে জানিয়েছে। তার খনন কাজের কো-ডিরেক্টরই ছিল কুপার। পুরো নাম পিটার কুপার। আমরাই তাকে ওখানে নিয়োগ দিয়েছি।”

আরো একবার চমকে উঠল রাধা। তার মানে গ্রিসে এলিসের অভিজ্ঞতা আর এই লোকগুলোর মাঝে সম্পর্ক আছে। কিন্তু কী সেই সম্পর্ক? আর “আমরা” মানেই বা কী?

হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় এলো। অন্যরা যখন মিউজিয়ামের দিকে যাচ্ছে তখন বিজয়ের সাথে যে আলোচনা হয়েছে তা মনে পড়ে গেল। বিজয় ওকে ইউমেনিসের জার্নাল আর আলেকজান্ডারের দেবতাদের রহস্য অভিযানের কথা বলেছিল। এটাই কি সাক্সেনার অপারেশন আর গ্রিসের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের মাঝে সম্পর্ক?

“তার মানে আপনারা কিউবের ধাঁধার মাঝে লুকায়িত সিক্রেট খুঁজে পাবার চেষ্টা করছেন?” জার্নালের কথা উল্লেখ না করেই জানতে চাইল রাধা। যদি জার্নালটা গোপনীয় হয় তাহলে সাক্সেনাকে জানানো উচিত হবে না।

রাধার দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে মেপে দেখলেন সাক্সেনা। “যতটা ভাব করছ তার চেয়ে তুমি আসলে বেশিই জানো। হ্যাঁ, ঠিক কথা বলেছ। এ পর্যন্ত পৃথিবী যা দেখেনি সেই মহারহস্য নিয়েই আমার কাজ। এর মাধ্যমে, কেউ ঘুণাক্ষরে ভাবতেও পারবে না এমনভাবে দুনিয়া শাসন করবে অর্ডার। লাগাম থাকবে আমাদের হাতে আর মানুষ সেই ইশারাতেই পুতুলের মত নাচবে।”

কৌতূহলী হয়ে উঠল রাধা। ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাই তাকে আরো জানতে হবে। সাক্সেনা গালভরা এসব কী বলছে। খানিকটা ফাঁকিবাজি করেই দেখা যাক না, “তো আপনি বলছেন যে অবজ্ঞাভরে বলে উঠল রাধা, “আমি এখানে যে ক্লিনিকাল ট্রায়াল দেখছি তার সমাপ্তি হল মানুষের মৃত্যু। সবাই মারা যাবে। এতে আর কী রহস্য আছে? অর্ডার কী তাহলে মৃতদের দুনিয়া শাসন করবে? আপনারা কি এমন কোনো নতুন জীবাণু আবিষ্কার করেছেন যা পৃথিবীর সব মানুষকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে? কেবল টিকে থাকবে অর্ডার? কেউ যদি না-ই থাকে তবে কার উপর আধিপত্য খাটাবেন?”

ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন সাক্সেনা, “আমরা মানুষকে খুন করব না” সহানুভূতির স্বরে জানালেন, “বরঞ্চ জীবন ফিরিয়ে দেব।”

স্পষ্ট অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে তাকাল রাধা, “আপনারা ভাবছেন যে, অর্ডারের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করছেন। কিন্তু যেসব ক্লিনিকাল ট্রায়াল করছেন তার সবকটির ফলাফল হল শূন্য। ব্যর্থতা ছাড়া কিছু না।”

মেয়েটার কথা শোনামাত্র ক্রোধে জ্বলে উঠল সাক্সেনার চেহারা। নিজের কাজ নিয়ে তিনি অত্যন্ত গর্বিত। এমন কি সফলতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন বলা চলে। বহুদিন ধরে সেই স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করছেন যার জন্য তিনিই যোগ্য। কিন্তু মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্ডার কোনো ধরনের স্বীকৃতিই দেবে না। কিন্তু তার অর্জন কিন্তু কম নয়! আর এই মেয়ে, যে কিনা তার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না অথচ তার সফলতাকে অবমূল্যায়ন করছে। কোনোভাবেই আর সহ্য হচ্ছে না এই আস্পর্ধা।

“আমি যা বলছি তা বিশ্বাস হচ্ছে না, না?” রাধাকে চ্যালেঞ্জ জানালেন সাক্সেনা, “তোমার ধারণা এসব কেবল ভবিষ্যহীন একটা ভাইরাস আর ক্লিনিকাল ট্রায়াল? তুমি…”

কথার মাঝখানে বাধা দিল রাধা, “আমার মনে হয় আপনি আপনার ছোট্ট একটা মিশনকেই ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করছেন। কিন্তু আসলে তা না আপনার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না।”

“ফাইন, তাহলে”, ক্ষেপে উঠলেন সাক্সেনা; প্রশংসা আর স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষায় পেয়ে বসল। তাছাড়া মেয়েটা তো আর কোথাও যাচ্ছে না। কেউ কখনো ওকে খুঁজেই পাবে না। “এসো আমার সাথে। চলো তোমাকে প্রমাণ দেখাই।”

এক সারি লিফটের দিকে এগিয়ে কার্ড রিডারে নিজের অ্যাকসেস কার্ড ঢুকিয়ে দালানের একেবারে নিচের তলার বোম চেপে ধরলেন। দ্রুত গতিতে নিচে নেমে গেল হাই স্পিড লিফট। একটু পরেই পৌঁছে গেল গন্তব্যে।

অর্ডার আর অলিম্পিয়াস কিভাবে কিউবটা পেলেন ও পারস্য সাম্রাজ্যে বিজয় লাভ ছাড়াও আরো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে আলেকজান্ডারকে ধাবিত করলেন তার সবকিছু সংক্ষেপে খুলে বললেন সাক্সেনা। এরই মাঝে লিফটের ডোর খুলে যেতেই দেখা গেল দুপাশে সারি সারি দরজা সমেত সাদা, লম্বা, একটা করিডোর। বেশির ভাগই বন্ধ। তবে কয়েকটা খোলা থাকায় ভেতরে দেখা যাচ্ছে সব ধরনের যন্ত্রপাতি, ডিভাইস, সার্ভার আর মনিটরে বোঝাই ল্যাবরেটরি। আর সাদা ল্যাবরেটরি কোর্ট গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একগাদা টেকনিশিয়ান।

“আমার মিশনে আমাদের অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে এই জায়গা।” ব্যাখ্যা করলেন সাক্সেনা, “আর আমাদের নিচের দুটো ফ্লোরে চলছে ফ্রিম্যানের প্রজেক্ট।” এরপর রাধাকে নিয়ে করিডোরের একেবারে শেষ মাথায় একটা অফিসে চলে এলেন। রুমটাতে ফার্নিচার বলতে বিশাল বড় একটা ডেস্ক আর এক কোণায় চামড়ার চেয়ার। বিপরীত দিকের দেয়ালের সাথে লাগানো হয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি ওয়ার্ক স্টেশন। ডেস্কের এক পাশে লম্বা একটা বুককেস। মেডিকেলের ভারী সব বইয়ের ভারে বাঁকা হয়ে পড়েছে তাক। ডেস্কের উপর আরো আছে একটা এলসিডি মনিটর, কী-বোর্ড আর মাউস।

“বসো।” নিজে চামড়ার চেয়ারে বসে ডেস্কের ওপাশে থাকা দুটো চেয়ারের একটার দিকে ইশারা করলেন সাক্সেনা।

বসে পড়ল রাধা। ওদিকে কম্পিউটার, কী বোর্ড আর মাউস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাক্সেনা।

কিছুক্ষণ বাদে মনিটরটা রাধার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন ভাইরাসবিদ। হাবভাব এমন যেন বিমূঢ় দর্শকের সামনে কোনো কিছু উপস্থাপন করছেন এক দক্ষ বিজ্ঞানী।

“তুমি ভাবছ যে আমরা জীবাণুর অপব্যবহার করে বায়োটেররিজম ঘটাতে যাচ্ছি।” তিরস্কার করে উঠলেন সাক্সেনা, “যা কিনা সত্যের চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ দূরে। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না কতটা দূরে। সত্যটা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। আমরা কাউকে খুন করতে চাই না। বরঞ্চ রোগ ভোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে চাই।”

“আর আপনি আশা করছেন যে আমি এটা বিশ্বাস করব?” ব্যঙ্গ করে উঠল রাধা, “আপনি আর আপনার লোকজন মিলে যে গুরুতর অপরাধ করেছেন এখন সেটাকে একটা মহৎ উদ্দেশ্য হিসেবে মেনে নিতে হবে?”

“চুপ, একদম চুপ” কঠোরভাবে তিরস্কার করলেন সাক্সেনা, “প্রতিটা মুদ্রার দুটো পিঠ থাকে। তুমি তো কেবল একপাশ দেখেছ। শুধু গত কয়েকদিনের নয়, গত দশকে যা করেছি তার সবটুকুই আমাদের সফলতার জন্য প্রয়োজন ছিল। আমরা এক যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি; এমনকি আধুনিক প্রযুক্তিও যা আজ পর্যন্ত করে দেখাতে পারেনি। অথচ চিকিৎসা শাস্ত্রের এই বিপ্লবের পেছনকার মহারহস্য দুই হাজার বছর আগে থেকেই কয়েকটা ধাঁধা আর পৌরাণিক কাহিনির আড়ালে লুকায়িত ছিল। যেটির অস্তিত্বের কথা বেশির ভাগ লোক জানেই না; প্রহেলিকার জাল ছিন্ন করাতো বহু দূরের কথা।”

“আপনি যে কী বলছেন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই।” স্বীকার করল রাধা।

“নিউজ পেপার তো পড়ো, নাকি না?”

রাধা মুখ কালো করে তাকালেও বুঝতে পারলো যে ভাইরাসবিদ সত্যিকারের আগ্রহ নিয়েই জানতে চাইছেন। তাই উত্তরে জানাল, “অবশ্যই পড়ি।”

“খুব ভালো। তাহলে নিশ্চয় আজকের দিনের চিকিৎসা শাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ইস্যুটির কথাও জানো। বছরের পর বছর ধরে এ উদ্বেগের জন্ম হলেও গণমাধ্যমে মাত্র অতি সম্প্রতি চাউর হয়েছে। বহু বছর ধরেই মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক অতি ব্যবহার আর অপব্যহার করছে।

ফলাফলে কী হচ্ছে? ব্যাকটেরিয়া জন্ম নিয়ে মানুষ জানে এমন কিছু ভয়ংকর রোগের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে। এসব প্রজাতির কিছু কিছু আবার অসংখ্য ড্রাগের বিরুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই একটা সত্যিকারের হুমকি হল পেনিসিলিনের আবিষ্কারের পর থেকে যে অ্যান্টিবায়োটিকস জীবন ধ্বংসকারী রোগ-বালাইয়ের বিরুদ্ধে বর্ম হিসেবে কাজ করে মানব শরীরকে সুরক্ষা দিয়েছে তা অতি সত্বর বিলীন হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রাণঘাতী যক্ষ্মারোগের হাত থেকে যে বর্ম এতদিন বাঁচিয়েছে তা দুর্বল হতে হতে সামনে নাই হয়ে যাবে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় বলতে গেলে আমরা আবার ইতিহাস-পূর্ব যুগে ফিরে যাবো; এমন এক অন্ধকার যুগ যখন ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশনের কোনো দাওয়াই ছিল না।”

মাথা নাড়ল রাধা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই বিষয়ের উপর অনেক প্রতিবেদন দেখেছে। অতি ভয়াবহ এই ভবিষ্যতের সাথে লড়াই করার জন্য আধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তির গবেষণার পাশাপাশি নতুন নতুন পথ আবিষ্কারের চেষ্টাও চলছে। একই সাথে রাধা এই দলটা যারাই হোক না কেন তাদের উদ্দেশ্যও বুঝতে শুরু করেছে। তার মানে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের উদ্দেশ্য হল অ্যান্টিবায়োটিকসের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য নতুন কিছু আবিষ্কার?” তবে এখনো বুঝতে পারছে না যে যে হুমকির কথা বললেন তার সাথে সাক্সেনা কেমন করে লড়াই করবেন।

পাশের কী-বোর্ডের একটা বোতামে চাপ দিলেন সাক্সেনা আর পর্দায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল একটা ত্রিমাত্রিক ইমেজ। বিশ মাথাঅলা একটা বহুভুজক্ষেত্র। আরেকটা বোতামে চাপ দিতেই ভাগ হয়ে গেল পুরো পর্দা। প্রথম ইমেজের ডান পাশে আরেকটা ত্রিমাত্রিক ইমেজ ফুটে উঠল। তবে এটার গড়ন গোলাকার আর এলোমলো।

“বামপাশে যা দেখছ তা হল একটা রেট্রোভাইরাস।” ব্যাখ্যা করলেন সাক্সেনা। প্রথম ইমেজটা দেখিয়ে বললেন, “আর ডান দিকে একটা ব্যাকটেরিয়া।” খানিক থেমে বললেন, “আগে এই দুটোই ছিল অজ্ঞাত, আর আমরা তা পেয়েছি গ্রেট আলেকজান্ডারের শরীর থেকে।”

.

৫০. ৩২৮ খ্রিস্টপূর্ব

বাল্ক, বর্তমান সময়ের আফগানিস্তান

“কী তোমাকে এত দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, প্রিয় ক্যালিসথিনস?” উজ্জ্বল দৃষ্টিতে ইতিহাসবিদের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার। “যেভাবে এগোবার কথা সবকিছু তো সেভাবেই এগোচ্ছে। কাজ করেছে আমার পরিকল্পনা। আমরা পারস্য জয় করেছি। ব্যাকট্রিয়ার গোত্রগুলোকেও অধীনে এনেছি। এমন মহাশক্তিধর সগডিয়ান রককেও পরাভূত করেছি।” ক্যালিসথিনসের কাঁধে এক হাত তুলে দিয়ে বললেন, “আর, প্রিয় ইতিহাসবিদ, তোমাকে যে মিশনে পাঠিয়েছিলাম তাতেও তুমি সফল হয়েছ। সর্বশ্রেষ্ঠ এক মিশন। যেটি আমাকে একজন দেবতায় পরিণত করবে!” তরুণ বিজেতা ইতিহাসবিদের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যে কিছু নিয়ে ভাবছো সেটা আমি পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারছি। এবারে বলো কারণটা কী। আমাকে জানতেই হবে।”

আলেকজান্ডারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেও দ্বিধা করছেন ক্যালিসথিনস। ক্লিটাসের ভাগ্য এখনো মন থেকে মুছে যায়নি। পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের উদ্দেশ্যে মেসিডোনিয়া থেকে যে আলেকজান্ডারের সাথে যাত্রা করেছিলেন ইনি তিনি নন। তখন পিতার জন্য অভিযানে বেরিয়েছিল এক তরুণ। যার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার স্পর্ধা ও সাহস। আর তৃষ্ণা ও ক্লান্তির সাথে যুদ্ধ করে, ভয়ংকর ঠাণ্ডা ও অনাহারে থেকেও হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে নিজ বাহিনিকে উদ্দীপ্ত করে তোলার ক্ষমতা। সেই আলেকজান্ডারের জন্য হাসতে হাসতেও নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল ক্যালিসথিন্স।

কিন্তু আজ সামনে যে আলেকজান্ডার দাঁড়িয়ে আছেন তিনি পুরোপুরি ভিন্ন মানুষ। সফলতাই কি তাকে এতটা উদ্ধৃত করে তুলেছে? প্রথমে দারিয়ুসের পতন আর বিসাস অধিগ্রহণ, দারিয়ুসকে হত্যা করে পারস্যের সিংহাসন দাবি করা, আর সবশেষে সগডিয়ান রক বিজয়ের পাশাপাশি ব্যাকট্রিয়ার গোত্রদের উপরেও পরিপূর্ণ মানুষের বোধশক্তি ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আলেকজান্ডার তো এখনো তরুণ। নাকি এর কারণ মেসিডোনিয়া ত্যাগ করার পর থেকেই যার পিছনে ছুটেছেন সেই সিক্রেট মিশন? মাত্র কয়েকমাস আগেও এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না ক্যালিসথিনস; যখন ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গল আর ওপাড়ে অক্সাস নদীর অ্যাসাইনমেন্ট সম্পর্কে জানিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। বিসাস হিন্দুকুশ পার হয়ে ব্যাকট্রিয়ার আশ্রয় নেয়ার পরই পুরো সেনাবাহিনি নিয়ে পার্বত্যঞ্চল অতিক্রম করে ব্যাকট্রিয়ার পর্দাপণের সুযোগ পেয়ে যান আলেকজান্ডার।

যুদ্ধের এত ডামাডোল এমনকি অভিযানে যাত্রা শুরু করার পর আলেকজান্ডারের প্রথম পরাজয়ের মধ্যেও কেউ খেয়াল করেনি যে ক্যাম্প ছেড়ে বহুদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ক্যালিসথিনস। ঠিক যেন ঘটনার পরিক্রমাও আলেকজান্ডারের পক্ষেই ষড়যন্ত্রে মেতেছে।

হয়ত তিনি সত্যিই জিউসের পুত্র আর তার স্বর্গীয় পিতা পুত্রকে খুঁজছেন। তারপরেও কেন যেন ক্যালিসথিনসের মনে হচ্ছে যে আলেকজান্ডারের এমনটা করার কোনো অধিকার নেই।

“মহারাজা” সাবধানে বলে উঠলেন ক্যালিসথিনস, “আপনি অনেক বদলে গেছেন।”

“আসলেই।” ইতিহাসবিদের পিঠ চাপড়ে দিলেন উৎফুল্ল আলেকজান্ডার। আজকাল প্রায়শই যা ঘটছে, প্রচুর পরিমাণে ওয়াইন পান করায় উচ্ছ্বসিত হয়ে আছেন আলেকজান্ডার।

আর ক্যালিসথিনস এও দেখেছেন যে কতটা দ্রুত এই অভিব্যক্তি পাল্টে গিয়ে হয়ে ওঠেন দুর্বিনীত আর প্রতিহিংসা পরায়ণ।

“মনে হয় এ সম্পর্কে অন্য কোনদিন কথা বললেই ভালো হবে।” আলেকজান্ডারের ক্রোধকে আর বাড়াতে চান না। ক্ষিপ্ত না করে রাজাকে সত্যিকারের উত্তর দেয়াটা সম্ভব নয়।

আর ক্যালিসথিনস মিথ্যেও বলেন নি। হয়ত নিজের লেখায় বিজেতা সম্পর্কে একটু বেশিই প্রশংসা করেছেন আর অতি কল্পনার মিশেল ঘটিয়েছেন যাতে বৃদ্ধি পায় তার রাজার মহিমা। কিন্তু স্বয়ং রাজার কাছে সৎ না থেকে পারবেন না। এটাই তার স্বভাব।

এবারে ক্যালিসথিনসের চোখের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার। “তো” চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের চিবুকে হাত বুলিয়ে জানালেন, “মনে হচ্ছে আমার ইতিহাসবিদ আরো কিছু বলতে চায়। এমন কিছু যা সে ভাবছে আমি পছন্দ করব না।”

আলেকজান্ডারের এমন উপলব্ধিকে ঘৃণা করেন ক্যালিসথিনস্। তিনি কিছুই। বললেন না।

“দেখো, ক্যালিসথিনস” তাগাদা দিলেন আলেকজান্ডার, “তুমি ভাবছ আমি বেশি ওয়াইন খেয়ে ফেলেছি? আর সে কারণে তোমার কথা বুঝতে পারব না? তুমি হচ্ছ আমার শ্রদ্ধাভাজন ইতিহাসবিদ। এ কারণেই অন্য কারো কথা এতটা মনোযোগ দিয়ে শুনি না, যতটা না তোমার! খুলে বলল কী তোমাকে এত পেরেশান করছে? প্রতিজ্ঞা করছি যে সবটুকু শুনব।”

ক্যালিসথিনস উপলব্ধি করলেন যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এখন এই আলোচনাকে রহিত করার প্রচেষ্টাই বরঞ্চ আলেকজান্ডারের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিবে।

“ঠিক আছে, মাই কিং” গভীরভাবে দম নিয়ে জানালেন ক্যালিসথিন “আপনার ঘোষণা শুনেই আমার যত দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আপনি চান যেন পারসীয় প্রথায় আপনার উপাসনা করা হয়।”

এত জোরে হেসে ফেললেন আলেকজান্ডার যে দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল সে আওয়াজ। “আর তুমি তাতে সম্মত নও?”

একেবারে চুপ করে রইলেন ক্যালিসথিনস।

চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার, “কেন তোমার মনে হচ্ছে যে এটা ভুল?” অবশেষে জানতে চাইলেন, “তুমিই তো দুনিয়াকে জানিয়েছ যে আমি জিউস আমোনের পুত্র। যা একদিন ইতিহাস লিখবে তোমার সেই বই-ই তো

আমার দেবত্ব সম্পর্কে সিউয়ার ওরাকলের স্বীকৃতির কথা প্রচার করেছে। সমুদ্রকে দু’ভাগ করে ফেলার কথা তুমিই লিখেছ।” মাথা তুলে ক্যালিসথিনসের দিকে তাকালেন, “মনে নেই? আরো আছে” ক্যালিসথিনসের কাঁধে এক হাত তুলে দিয়ে বললেন, “ক্যালিসথিনস তুমি তো বিশ্বাস করো যে আমি একজন দেবতা। নিশ্চয় মিথ্যে লেখো না। আর যদি তাই হয় তত আমাকে দেবতা হিসেবে উপাসনা করার বাসনাকে কেন ভুল ভাবছ?”

উত্তর দিলেন না ক্যালিসথিনস। বুঝতে পারলেন যে আসলে আলেকজান্ডারকে দেবার মত তার কাছে কোনো উত্তর নেইও। রাজা যা যা বলেছেন তার সবকিছুই সত্যি। কেবল ক্যালিথিনস যে তার দেবত্বে বিশ্বাস করে সেটুকু ছাড়া। কিন্তু কিভাবে জানাবেন যে বইয়ে তিনি কতটা তোষামোদ করেছেন? দেবতা হবার পরেও আলেকজান্ডারের দরবারে নিজের পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখার আশায় করেছেন?

“তোমার নীরবতা অসহ্য লাগছে।” গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার, “আমি কি এটাকে হ্যাঁ অর্থে ধরব? নাকি না? কেবল তুমিই দিতে পারো এর উত্তর। আমি কিন্তু ওয়াদানুযায়ী তোমার কথা শুনেছি।”

“আপনি যা বলেছেন মহারাজা, তা সত্য।” ব্যাকুল হয়ে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছেন ক্যালিসথিনস। “প্রতিটা শব্দই সত্য।” গলার স্বর প্রায় ফিসফিসের পর্যায়ে নামিয়ে জানালেন, “কিন্তু, মিশন এখনো শেষ হয়নি। যখন গোপন সেই স্থানে পৌঁছে নির্দেশ মত পানি পান করবেন তখুনি কেবল দেবতা হয়ে উঠবেন! এখন না।”

জ্বলে উঠল আলেকজান্ডারের চোখ, “তত তোমার ধারণা মায়ের দেয়া মানচিত্রের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ না করা পর্যন্ত আমি দেবতা নই?”

চোখ নামিয়ে নিলেন ক্যালিসথিনস।

এর সঠিক ব্যাখ্যা করে আলেকজান্ডার ধরে নিলেন যে তার প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে “হ্যাঁ।”

“তাহলে দেবতা থেকে জাত আমার জন্ম? আমার মা কি মিথ্যে বলেছে যে সে জিউসের সাথে থেকেছে? তুমি জানো আমি ওই অপদার্থ ফিলিপের পুত্র হতে পারি না!” উচ্চারিত প্রতিটা শব্দের সাথে বেড়ে যাচ্ছে আলেকজান্ডারের রোষ। “আর সিউয়া’র অরাকলের শব্দ, তোমার কাছে সেসবের কোনো মানে নেই? এটাও মিথ্যে?”

কথা বলতে বলতে দুজন পার হয়ে এলেন একটা কাঠের টেবিল যেটিতে পায়ার উপরে ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে আছে একটা তামার তৈরি থালা। আক্রোশ থামাবার চেষ্টায় নিচু হয়ে থালাটাকে তুলে করিডোরে ছুঁড়ে মারলেন আলেকজান্ডার। “ক্যালিসথিনস, আমার জন্ম আর দেবত্ব নিয়ে কথা বলার তুমিই বা কে? একজন ইতিহাসবিদ বৈ তো আর কিছু নও! তোমার কাজ হচ্ছে ঘটনার রেকর্ড রাখা। যা ঘটছে ইতিহাস যেন তা জানতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। বিচার করা নয়। কখনো ভুলবে না যে আমি তোমার রাজা। আমার হাতেই আছে তোমার জীবন। ঠিক আমার রাজ্যের অন্যান্য প্রজাদের মতন। যা এখন মেসিডোনিয়া থেকে ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা কি একজন দেবতার শক্তি নয়? জীবন কেড়ে নেয়া?”

ক্যালোসথিনস বুঝতে পারলেন যে আলোচনায় সমাপ্তি টানবার সময় পার হয়ে গেছে। নিজের রাজাকে তিনি ভালো ভাবেই চেনেন। এরই মাঝে ইতিহাসবিদের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছেন আলেকজান্ডার। জানেন কী ঘটতে চলেছে। আর মৃত্যুর মুখে পড়েও তিনি কাপুরুষের ন্যায় আচরণ করতে চান না।

“একজন দেবতার শক্তি হল” শান্ত স্বরে ক্রোধে উন্মত্ত রাজাকে জানালেন ক্যালিসথিনস, “জীবন কেড়ে নেয়া নয় বরঞ্চ দান করা। আর এক্ষেত্রেই আপনি ব্যর্থ হয়েছেন।”

ক্ষোভে উত্তপ্ত কড়াইয়ের মত ফুটছে আলেকজান্ডারের রাগ, “আমি আলেকজান্ডার! দেবতা হিসেবে পূজিত হবার জন্য আমার তোমাকে কিংবা তোমার সমর্থনের কোনো প্রয়োজন নেই।” সমস্ত ইন্দ্রিয়ে ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ায় চিৎকার করে উঠলেন, “দেবতা হবার জন্য তোমার গোপন উপকরণেরও কোনো প্রয়োজন নেই। আমি একজন দেবতা আর তাই আমার উপাসনা করা হবে। তোমার কিংবা আর কারো ধারণাকেই কোনো পরোয়া করি না! গার্ড!”

আলেকজান্ডারের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ক্যালিসথিনস, “পেট্রোক্লাস আপনার চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ ছিলেন, আলেকজান্ডার। কিন্তু তারপরেও মৃত্যু তাঁকে ছাড়েনি।”

গার্ডেরা এসে ক্যালিসথিনসকে চেপে ধরতেই নিষ্ঠুরভাবে হাসলেন আলেকজান্ডার, “এখন আমি বুঝতে পারছি যে বালক-ভূতেরা (Pageboy) কিভাবে আমাকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করার সাহস পেয়েছিল। আমার একেবারে কাছের কেউ তাদেরকে এ বিদ্রোহে উসকানি দিয়েছে। আর সেই সুযোগও। তখন অবাক হয়ে ভেবেছিলাম যে সে কে হতে পারে। কিন্তু এখন জেনে গেছি; তুমিই, তাইনা ক্যালিসথিনস? আর আগামীকালও সেই চেষ্টা করবে। তাই বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হল ক্রুশবিদ্ধ হওয়া। তুমি সেটা ভালোভাবেই জানো, বিদায় বন্ধু!”

চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেও ক্যালিসথিনস এখনো শেষ করেন নি। আর গার্ডেরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার সময় ইতিহাসবিদের মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দগুলো শুনে যেন জমে গেলেন আলেকজান্ডার।

“আপনি হয়ত দেবতা হবার ভান করছেন আলেকজান্ডার। বিশ্বাস করছেন। যে আপনি একজন ঈশ্বর। কিন্তু তা কখনোই হতে পারবেন না। মেসিডোনিয়াতে ফেরার আগেই মৃত্যুবরণ করবেন! জন্মভূমিতে আর পা রাখতে পারবেন না!”

৬. বর্তমান সময়

পঞ্চম দিন

আলেকজান্ডারের রহস্য

“আপনি নিশ্চয় তামাশা করছেন!” নিজেকে সামলাতে পারল না রাধা। সত্যিই ব্যাপারটা একেবারে অবিশ্বাস্য। শত শত বছর আগেই আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আলেকজান্ডারের দেহ উধাও হয়ে গেছে। সবাই সেটাই জানে।”

“সঠিকভাবে বললে চতুর্থ শতকে।” রাধাকে শুধরে দিলেন সাক্সেনা। “আরো নিখুঁতভাবে বললে ৩৯১ খ্রিস্টাবের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে। অর্ডার তাঁর মমি চুরি করে আরেকটা স্থানে রেখে দিয়েছে যেখানে পচনের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে।”

“কিন্তু এক অর্থে অর্ডারই তো এ নীতি ভঙ্গ করে তার শরীরকে কাটা ছেঁড়া করে একটা ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া বের করেছে।” রাধা বুঝতে পারল যে অর্ডার কেবল নিজের কথাই ভাবে। পবিত্র বলে কিছু নেই। কোনো কিছুকেই তারা পরোয়া করে না। যেমন এখন সেরকমই একটা স্থাপনাতে সে বন্দী হয়ে আছে। সব ধরনের তথ্যকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে বুঝতে পারল যে ইমরানও পরীক্ষাতে এই দুটো জীবাণুই পেয়েছিলেন। অজ্ঞ ভলান্টিয়ারদের উপরেই অজানা এসব প্যাথোজেন ব্যবহার করে সাক্সেনা আর তার দল বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছিল। পরিণামে লোকগুলো ধীর কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছে। ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল রাধা। কয়েকদিন আগেই তাকে যে চেতনানাশক দেয়া হয়েছিল এসব কী তারই প্রতিক্রিয়া কিনা কে জানে। এই মুহূর্তে রেগে উঠা ঠিক হবে না। তাতে কেবল নিজের ক্ষতি হবে।

কাঁধ ঝাঁকালেন সাক্সেনা, “ওয়েল, বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য এটাতো করতেই হত।” যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে জানালেন ডাক্তার। “যাই হোক এই দুই প্রাণিসত্তার মাঝে লুকিয়ে আছে সেই রহস্য যা আমাদেরকে রোগ বালাইয়ের বিরুদ্ধে আরেকটা বর্ম তৈরি করতে সাহায্য করবে।”

“আমি এখনো বুঝতে পারছি না” অভিব্যক্তি আর গলার স্বরেই ফুটে উঠল রাধার অবিশ্বাস, “আপনি বললেন যে আলেকজান্ডার এই মহারহস্যের খোঁজে অভিযানে বেরিয়েছিলেন। আর সেটা খুঁজেও পেয়েছেন। তারপরেও দুই বছর পরেই মারা গেছেন। আর ভুক্তভোগী সকলের ক্ষেত্রেও কয়েক বছরের মধ্যে আলেকজান্ডারের মতই একই শারীরিক চিহ্ন ফুটে উঠেছে। তার মানে এই প্রাণিসত্তাদ্বয় কেবল মৃত্যুই ডেকে আনবে।”

“এখানেই তুমি ভুল করছ! হিসহিস করে উঠলেন সাক্সেনা; অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। “এই অর্গানিজমগুলো জীবন দান করে। কম্পিউটারের পর্দায় যেগুলো দেখছ সেগুলো প্রকৃত অর্গানিজম নয় যা আলেকজান্ডারে দেহে প্রবেশ করেছিল। রেট্রোভাইরাস হল একটা ব্যাকটেরিয়ানাশক আর ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে দূষিত করে।”

পর্দার ইমেজ বদল করে বললেন, “ভাইরাস নিজে থেকে পরিবর্তিত হতে পারে না। এ কারণেই তাদেরকে অন্য কোনো কোষ/সেল ছিনতাই করে পরাশ্রয়ী হতে হয়। আর এটাই হল ভাইরাসের পরিবর্তন প্রক্রিয়া।” পর্দার ডায়াগ্রামের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “একটা ভাইরাস প্রথমে টার্গেটকৃত কোষের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে আর তারপর আশ্রয়দাতা কোষের ঝিল্লির সাথে সংমিশ্রণ কিংবা জিন সম্বন্ধীয় উপাদানসমূহের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে আশ্রয়দাতা কোষের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। আর একবার যদি তা করতে পারে তাহলে আশ্রয়দাতা কোষের কোষবিশিষ্ট কলকজা ব্যবহার করে পরিবর্তিত হয় আর প্রায়োগিক ও কাঠামোগত প্রোটিন তৈরি করে। নবগঠিত জীবকোষ বিদ্যমান দুটি জটিল যৌগের একটি নিউক্লেইক অ্যাসিড আর কাঠামোগত প্রোটিন একসাথে মিলে গঠিত হয় ভাইরাসের নিউক্লিওক্যাপসিড। নবগঠিত এসব ভাইরাস কিংবা ভিরিয়নস লাইসিস নামক একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্ত হয়ে যায়; যার ফলে আশ্রয়দাতা কোষ প্রচুর ভিরিয়ন উদগিরণ করে দেয়। আর একই সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে হোস্ট সেল।”

পর্দায় উদয় হল আরেকটা ইমেজ, “আমরা যে ভাইরাস নিয়ে কাজ করছি তা হল একটা রেট্রোভাইরাস।” বলে চললেন সাক্সেনা, “এর জিন সম্পর্কীয় তথ্যসমূহ ডিএনএ নয় বরঞ্চ আরএনএ’র সংকেতে আবদ্ধ আছে। রেট্রোভাইরাসের মধ্যে আরো আছে আরএনএ’র উপর নির্ভরশীল ডিএনএ অণুযোগে গঠিত যৌগ, যেটা একটা নকলের (Transcriptase) উল্টো পিঠ। এর মাধ্যমেই আশ্রয়দাতা কোষের সংক্রমনের পর ডিএনএ’র সংশ্লেষণ ঘটে।”

রাধার চেহারায় শূন্য অভিব্যক্তি দেখে থেমে গেলেন ডা. সাক্সেনা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে একটু আগে যা বললেন মেয়েটা তার বিন্দু বিসর্গ কিছুই বোঝেনি। “ওকে” আরেকবার চেষ্টা করে জানালেন, “এটা তো নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে, সমস্ত প্রাণিসত্তার জিন সম্পৰ্কীয় তথ্যসমূহ ডিএনএ’তে লিপিবদ্ধ থাকে আর তা একটা দ্বৈত ধারা, ঠিক? ওয়েল, রেট্রোভাইরাসের মধ্যে জিনের তথ্যগুলো আরএনএ’তে আবদ্ধ থাকে আর এটা হল একটাই তন্ত। সাধারণত সমস্ত প্রাণিসত্তায় যখন কোষের পরিবর্তনের সময় জিনের তথ্যসমূহের নকল তৈরি করতে হয়, তখন ডিএনএ আরএনএতে বদলে যায় আর জিনের তথ্য পরিবহনের জন্য প্রোটিনের সৃষ্টি করে।”

রাধা কতদূর বুঝতে পারছে দেখার জন্য আবার থেমে গেলেন সাক্সেনা। তাই মেয়েটা মাথা নাড়তেই আবার শুরু করলেন, “রেট্রোভাইরাস পরিবর্তনের সময় কিন্তু আরএনএকে ডিএনএ’তে রূপান্তরিত হতে হয়। একারণেই এটাকে উল্টো দিকে যাত্রা হিসেবে ধরা হয়। একারণেই ট্রান্সক্রিপটেজ প্রোটিনের প্রয়োজন, যেন সক্রিয় থাকে পুরো প্রক্রিয়া। রেট্রোভাইরাস একবার যখন আশ্রয়দাতা কোষের অভ্যন্তরে মিশে যায় তখনই আরএনএ মুক্ত হয়ে পড়ে। আর হয়ে উঠে একতম্ভ বিশিষ্ট ডিএনএ। এই ডিএনএ’ই আবার উল্টো দিকে বদলে যাওয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠে দ্বৈত ধারা সমৃদ্ধ এক বিশেষ ডিএনএ। ভাইরাস থেকে নেয়া আরেকটা জৈব রাসায়নিক পদার্থ (Engyme) ব্যবহার করে আশ্রয়দাতা কোষে এই বিশেষ প্রো-ভাইরাস বসিয়ে দেয়া হয়, যাকে বলা হয় সংহত করা, আর তারপরই আরএনএ’তে বদলে যায়। একটা নতুন ভাইরাস নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের উৎপাদন কাজে আরএনএর অনুবাদ করা হয়; ঠিক যেমনটা হয় সাধারণ প্রতিলিপি তৈরির ক্ষেত্রে। আশ্রয়দাতা কোষ থেকেই বলপূর্বকভাবে বহিস্কৃত করে দেয়া হয় এসব ভিরিয়ন।”।

সাক্সেনা কেন এত সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন তা এতক্ষণে বুঝতে শুরু করেছে রাধা, “তো তার মানে একটা রেট্রোভাইরাস প্রকৃতপক্ষে একটা আশ্রয়দাতা জিনের অংশ হয়ে উঠবে?”

“ঠিক তাই। যখন জীবনব্যাপী সংক্রমণের শুরু হয়। আশ্রয়দাতা কোষের গঠনতন্ত্রকে অর্জন কিংবা বদলে দেবার ক্ষমতা আছে এই রেট্রোভাইরাসের।

এগুলো এমনকি আশ্রয়দাতা কোষের জিনের জীবাণুর মধ্যেও মিশে গিয়ে স্থান পরিবর্তনশীল উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। মানে হল এরা ডিএনএ’র এমন এক অংশ যারা আশ্রয়দাতা জিনের চারপাশে যখন খুশি ঘুরে বেড়াতে পারে, জিন বদলে দিতে পারে আর আশ্রয়দাতা ডিএনএ’র রূপান্তরের কারণও সৃষ্টি করে। জিনকে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয়ও করে দিতে পারে। আর নির্দিষ্ট পরিবেশ উদ্দীপক পেলে রূপান্তর আর পুনঃমিশ্রণের মাধ্যমে দ্রুত নিজেদের জিনকেও বদলে ফেলতে পারে। এই কারণেই এইচআইভি ভাইরাস এতটা মারাত্মক। এটাও একটা রেট্রোভাইরাস। সাধারণত সুস্থ মানুষের ডিএনএ’কে বদলে দেয়।”

রাধার মাথা ঘুরে উঠল। এত তথ্য একসাথে শুনেছে যে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। “যাই হোক, খানিকটা বুঝেছি। কিন্তু একটা রেট্রোভাইরাস যদি এতটা মারাত্মক হয় তাহলে কিভাবে রোগের বিরুদ্ধে বর্ম তৈরিতে সাহায্য করবে?”

.

৫২. অমরত্ব

“এটাই হচ্ছে সমস্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালেন সাক্সেনা, “ভাইরাসদের তেমন কোনো সুখ্যাতি নেই; আর সেটা ঠিকও। বেশিরভাগ মারাত্মক আর দুরারোগ্য সংক্রমণের কারণও এরাই। ছোট ছোট এই দস্যুগুলোকে খতম করা আসলেই বেশ কঠিন। এমনকি আশ্রয়দাতা মারা গেলেও এরা ঠিকই গুপ্ত থেকে সুযোগ মত অন্য কোনো কোষে সংক্রামিত হয়ে চক্রটাকে টিকিয়ে রাখে। এও জানা গেছে যে শক্তিসত্তা না হারিয়েই হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকতে পারে। তবে ভাইরাসের আরেকটা দিক আছে যা মানুষ খুব বেশি জানে না। তুমি জানো মাইক্রোবিয়ম কি?”

কোথায় যেন শব্দটা পড়েছে! স্মরণ করে রাধা বলল, “ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এমন সব প্রাণিসত্তার সন্নিবেশ যা মানুষের মাঝেই বাস করে।”

“রাইট। এটা একটা প্রতীকী অস্তিত্ব। বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। এদের মাঝে সবচেয়ে সুপরিচিত হল ব্যাকটেরিয়া। খাবার আর আশ্রয়ের বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া আমাদেরকে হজম ও রাসায়নিক বিপাক ক্রিয়াকে সচল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এমন কোনো প্রতীকী ভাইরাসের গল্প শোনা যায়নি যা কিনা খারাপ ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে। আর তখনই ঘটে আমাদের ছোট্ট রেট্রোভাইসের আগমন। আগেই যেমনটা বলেছি, এটা একটা ব্যাকরেটিওফেজ। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের মিউকাস মেমব্রেন-নাক আর গলার নরম টিস্যুগুলো ব্যাকটেরিয়াওফেজে সমৃদ্ধ। যা আমাদের জন্যই ভালো; কারণ ব্যাকটেরিয়া মিউকাসের মধ্যে বংশবিস্তার করতে পারে। তাই মিউকাস সম্পর্কীয় সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া শিকার করে, এসব ভাইরাস আশ্রয়দাতার প্রতিষেধক প্রক্রিয়ার জন্য বর্ম তৈরি করতে পারে।”

“তার মানে আলেকজান্ডারের শরীরে আপনারা যে রেট্রোভাইরাস পেয়েছেন তা ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখতে সক্ষম?”

“এর চেয়েও ভালো। এই কারণেই ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো এত কাজে লেগেছে। নতুবা সফলতার জন্যে প্রয়োজনীয় আবিষ্কার করা সম্ভব হত না। আমরা আলেকজান্ডারের মমিতে ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু সাবজেক্টের শরীরে প্রতিটাকে পৃথক পৃথকভাবে সংক্রমণ আর এর ফলাফল পর্যালোচনা করার আগ পর্যন্ত এদের সংযোগ বুঝতে পারিনি। ফলাফলের একটা হল রেট্রোভাইরাস নিজে ব্যাকটেরিয়ার অনুপস্থিতিতে আশ্রয়দাতা প্রাণিসত্তা হিসেবে মানব শরীরে আরো ভালোভাবে মিশে যেতে পারে। আর একবার মানব পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে প্রোটিন উৎপাদনকারী জিনে স্থানান্তরিত হয়। যার ফলে ধীর হয়ে যায় বয়স বাড়ার গতি। অর্থাৎ বুড়ো হওয়া প্রায় থেমে যায়। উদাহরণস্বরপ বলা যায় আইজিএফ ওয়ান এর কথা, যা পেশি নির্মাণের জন্য দায়ী মূল প্রোটিন। এ প্রোটিনের অনুপস্থিতিতে পেশি দুর্বল হয়ে পড়া ছাড়াও মেরামত আর পুনঃজন্মের ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন হল টেলেমারেজ, বৃদ্ধ হবার প্রক্রিয়াকে ধীর করার জন্য যেটির উপরে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। আমরা যে বৃদ্ধ হই আর মারা যাই, তার পেছনে টেলোমারেজের অনুপস্থিতিই যে প্রধান কারণ এর স্বপক্ষেও শক্ত প্রমাণ আছে। তবে টেলোমারেজের সমস্যা হল এর উপস্থিতিতে কোষগুলো বিরতিহীনভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে, অন্য কথায় বলতে গেলে ক্যান্সার। কিন্তু রেট্রোভাইরাসের উপস্থিতি বিআরএএফের উৎপাদন বাড়ায়; এটি এমন এক প্রোটিন যা সবল কোষের বৃদ্ধি আর বিভক্তির চক্রকে নিয়মিত রাখে, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বাধা বলতে পারো। ধারণা করা হচ্ছে যে রেট্রোভাইরাস পি ফিফটি থ্রি নামক একটা প্রোটিনকেও কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় করে তোলে, যা সমস্ত কোষেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পি ফিফটি থ্রি এমন সব জিনের প্রকাশ ঘটায় যার মাধ্যমে কোষের চক্র থেমে যাওয়াসহ অপকারী কোষের বংশ বিস্তার রোধ হয়। এটাকে আরো সহজভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। শরীরে নতুন রেট্রোভাইরাসের উপস্থিতি ইন্টারফেরনের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়; এমন এক প্রোটিন যা পি ফিফটি থ্রি’র সংকেত ধারণকারী জিনের বদলকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। ফলে পি ফিফটি থ্রি প্রোটিনের প্রাচুর্য বেড়ে যায়।” খানিক থেমে রাধার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চাইলে আমি আরো ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। নতুন আরো কিছু জিন পাওয়া গেছে যার মাধ্যমে আরো অজানা সব প্রোটিনের উৎপাদন হতে পারে এবং এগুলো আমাদের গবেষণার মাধ্যমে মানব শরীরের শক্তিমত্তা, পুনঃনির্মাণ আর মেরামতের জন্য উপকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।”

“অসাধারণ।” মন্তব্য করল রাধা। শুনে মনে হচ্ছে চিকিৎসাশাস্ত্রে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার ঘটতে যাচ্ছে। আপনি আরো বলেছিলেন যে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণ করে। এগুলোকে মেরেও ফেলে নাকি? এই ভাইরাস বর্মের কথাই বলেছেন?”

মাথা নাড়লেন সাক্সেনা, “যা ভাবছ তার চেয়েও অনেক বড় কাজ করে। মানুষকে শুধু ব্যাকটেরিয়া দিয়ে দূষিত করার পরে দুটো জিনিস পেয়েছি। প্রথমত, ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে নয়। গলাধঃরণ হয়ে গেলেই এগুলো এক ধরনের বায়োফিল্ম তৈরি করে যেখানে কোষগুলো বিপুল পরিমাণে খনিজ পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকে। শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিষেধকের হাত থেকে ব্যাকটেরিয়াকে সুরক্ষা দেবার জন্যই এমনটা ঘটে। সেই মুহূর্তে কোষের মধ্যস্থতায় ব্যাকটেরিয়া নিজেও সুপ্ত অবস্থায় চলে যায়। যা সংক্রমণকে ধরে রাখে; ধ্বংস করেনা। তাই কিছু সময়ের জন্য কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ার চিহ্ন দেখা যায় না। আমরা সন্দেহ করেছি যে রেট্রোভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এর জিনগত বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করে দিলেই মানুষকে মেরে ফেলে এমন প্রোটিনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। হয়ত এর ফলে ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য উপকারী কোনো প্রোটিনেরও জন্ম দিতে পারে। আসলে তা এখনো জানি না। এই কারণেই প্রকৃত ভাইরাসটা প্রয়োজন।”

“কিন্তু আপনি তো বলেছেন যে আলেকজান্ডারের মমিতে ব্যাকটেরিয়া থেকে পৃথক ভাইরাস পেয়েছেন” মনে করিয়ে দিল রাধা, “এটাই কি সেই পৃথক ভাইরাস নয়?”।

“না। আমি বলেছি যে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ফলে দুটো আবিষ্কার করেছি। তোমাকে তো কেবল প্রথমটা বললাম। দ্বিতীয় যা পেয়েছি তা হল প্রোফেজের আকারে ব্যাকটেরিয়ার জিনের মাঝে ইতোমধ্যেই ভাইরাস আছে। একটা পর্যায়ে রেট্রোভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করলেও আমি আগে যেভাবে বলেছি সেভাবে পরিবর্তিত হতে পারেনি। হয়ত কোনো কারণে মারা গেছে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার জিনে জিনগত উপাদান হিসেবে মিশে গেছে, একটা প্রোফেজ। আর তখনই পুরো ব্যাপারটা হয়ে উঠে অত্যন্ত চমকপ্রদ। এমন কিছু আমরা এখনো জানি না, এমন কী? যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের পরে প্রোফেজের সংস্পর্শকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তখনি রেট্রোভাইরাস লাইসোজেনিক চক্রের মাধ্যমে মানব কোষে রূপান্তরিত হয়।”

বেশি বেশি মেডিকেল টার্ম ব্যবহার করছেন বুঝতে পেরে হাত তুললেন ডা. সাক্সেনা, “মূল কথা হল রেট্রোভাইরাসের এই সুপ্তাবস্থা-প্রোফেজ ব্যাকেটিয়ার ক্রোমোজমেই থাকে। একে বলা হয় প্রোফেজ ইনডাকশন। একবার তা ঘটে যাবার পর সাধারণ নিয়মেই ভাইরাস রূপান্তরিত হয়ে আরো প্রতিলিপি তৈরির জন্য মানব কোষকে আদেশ করে। তখনই রেট্রোভাইরাল ইনফেকশন ঘটে। কিন্তু, যেমনটা আগে বলেছি, তাতে আশ্রয়দাতার কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ রেট্রোভাইরাস হল উপকারি।”

দুহাত ভাঁজ করে রেখে বিজয়ীর ভঙ্গিতে রাধার দিকে তাকালেন সাক্সেনা, “তার মানে বুঝতেই পারছ যে এই ভাইরাস কতটা শক্তিশালী? আর মানব জাতির জন্য তা কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে? আর শুধু ভাবো যে অর্ডার এ সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। বৃদ্ধ হবার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়ার ক্ষমতা। যে কোনো রোগের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা। অ্যান্টিবায়োটিকসের কথা ভুলে যাও। আমাদের কাছে অমর হবার ক্ষমতা থাকবে। আমাদের পায়ের কাছে আঁছড়ে পড়ে ভিক্ষা চাইবে পুরো পৃথিবী। তাই তো একে দেবতাদের রহস্য বলা হত!”

ভ্রুকুটি করল রাধা। কোথায় যেন খটকা আছে। “যদি ভাইরাসটা সত্যিই এত মহান হয় তাহলে গলাধকরণের পর আলেকজান্ডার মারা গেলেন কেন? আপনার ধারণানুযায়ী ব্যাকরেটিয়ার জিনটাকে কেন পরিবর্তন করে দেয়নি?”

“কারণ খাবার সময় নিশ্চয় কোনো গন্ডগোল করেছিলেন। আমরা এখনো প্রকৃত ভাইরাসটা খুঁজে পাইনি। কেবল প্রোফেজ পেয়েছি। তাই ভুলটা কোথায় ছিল সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু প্রকৃত ভাইরাস ছাড়া ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত গুপ্ত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না কিছু তাদের জিনের রসকে চালিত করে। আর একবার তা ঘটতে পারলেই আর রক্ষে নেই। আমরা আমাদের সাবজেক্টের উপরই এর প্রতিফলন দেখেছি। বিভিন্ন সময় আর তারপর আবার। ব্যাকটেরিয়া একবার সক্রিয় হয়ে উঠলেই কয়েক দিনের মাঝেই মারা গেছে সাবজেক্ট। কখনো কখনো এক কি দুমাস পর্যন্ত টিকে থাকত। আর এই কারণেই প্রকৃত ভাইরাস আর প্রকৃত ব্যাকটেরিয়া দরকার। আলেকজান্ডার এগুলো কোথায় পেয়েছিলেন সে স্থান খুঁজে বের করতে হবে। আর তারপরেই বোঝা যাবে যে রেট্রোভাইরাস আসলেই কিভাবে কাজ করে?

“তার মানে কিউবটার জন্যই অলিম্পিয়াসের সমাধি খোঁড়ার প্রয়োজন ছিল। যেন প্রকৃত প্রাণিসত্তার উৎসের কাছে পৌঁছানো যায়।” ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পেরেছে রাধা।

“ঠিক তাই। তাহলেই সিক্রেটটা আমাদের হাতের মুঠোর চলে আসবে।”

“তাহলে কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে আলেকজান্ডার ভুল করেছিল? হয়ত তা না। হয়ত এগুলো শুধুই প্যাথোজেন। যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যু ঘটায়।”

এবার সাক্সেনা ক্রু কুঁচকে ফেললেন, “দুটো কারণে। এক, আমাদের ক্লিনিকাল ট্রায়াল। এই মাত্র আমি যা বললাম তার সবকিছুই প্রমাণিত হয়ছে। আর দুই নম্বর হল, আরো প্রাচীন আর বিশ্বাসযোগ্য এক সূত্র।” থেমে গিয়ে খানিক পরেই জানালেন, “কারণ মহাভারতেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।”

বিস্ময়ে হা হয়ে গেল রাধা। এই ধরনের কোনো উত্তর শুনবে বলে আশা করেনি। মেয়েটার প্রতিক্রিয়া দেখে খুশি হয়ে হেসে ফেললেন সাক্সেনা, “এই রূপকথা তুমি শুনেছ। কেবল এর সত্যিকারের অর্থটা এতদিন জানতে না।”

একটুক্ষণ বিরতি দিয়ে আরো এক বিশদ বিবরণ শুরু করলেন ডাক্তার সাক্সেনা। শেষ করার পরে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল রাধা। এই মাত্র যা শুনল যেন দুলে উঠেছে পুরো পৃথিবী। কেউই আসলে এটা বিশ্বাস করতে পারবে না। কিন্তু গত বছর মহাভারতের সময়কার বিজ্ঞান নিজের চোখে দেখার পর সাক্সেনার কথা বিশ্বাস করতেই হল।

আর যদি তাই হয় তাহলে অর্ডারের দাসে পরিণত হবে পুরো দুনিয়া।

.

৫৩. আলেকজান্ডারের পথ অনুসরণ

হতাশ হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাল এলিস, কলিন আর ডা. শুক্লা। কোনো রকম অগ্রগতি ছাড়াই কেটে গেল দিনের বেশিরভাগ সময়। সমস্ত কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখল। পরীক্ষা করল সবকটি ছবি আর মানচিত্র। কিউবের বাকি চারটা পদ্য ছাড়াও ইউমেনিসের জার্নালের বাড়তি কবিতাগুলোও আলোচনা করে দেখল। কিন্তু কোনো লাভ হল না। হাতে কেবল গতকালের মর্মোদ্ধার করা কবিতা।

আগের দিন কিছুক্ষণের জন্য দুর্গের ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছিল বিজয়। জানিয়েছে যে কুপার ওকে একটা স্যাটেলাইট ফোন দিয়েছে। ফলে কুনার উপত্যকার মত পার্বত্যঞ্চলে সেলফোনের সিগন্যাল না থাকলেও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে কোনো সমস্যাই হবে না। অল্প সময়ের জন্য ফোন করায় তেমন কিছু বলতে পারেনি। তবে গলার স্বরে বেশ উত্তেজনা ছিল। এও বলেছে যে “দেবতাদের রহস্য”, আসলে হল অমৃত-অমরত্বের রহস্য মহাভারতের একটা পৌরাণিক কাহিনিতে যেটার বর্ণনা দেয়া আছে। সময় সংক্ষিপ্ত থাকায় বিস্তারিত বলার সুযোগ পায়নি। একই সাথে খানিকটা আকুতিও ছিল। কারণ সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই শীঘ্রিই কয়েকটা উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

এতক্ষণ ওরা নিজেরাও কিছু পাবে বলে আশা করেছিল। ছেলেটার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে সব সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আর পেশাদার খুনি, ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠে আর রাধাসহ তাদের সবার জীবন নির্ভর করছে বিজয়ের প্রতিজ্ঞার উপর, মনে হলেই দিশেহারা লাগে।

“চলেন আবার প্রথম থেকে শুরু করি।” ডা. শুক্লাকে তাগাদা দিল এলিস। কন্যার দুশ্চিন্তায় এমনিতে উনার অবস্থা খারাপ। মেয়েটা কোথায় আছে কেউ কিছুতেই বের করতে পারছে না।

কাগজগুলো আরেকবার চেক করে দেখে ভ্রুকুটি করল এলিস। শুরু থেকেই একটা মানচিত্র দেখে কী যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। কী সেটা?

মানচিত্রটাকে নিজের কাছে টেনে আরো একবার মনোযোগ দিয়ে দেখল। মানচিত্রে আফগানিস্তানের মধ্যে আলেকজান্ডারের ভ্ৰমণ পথগুলো দেখা যাচ্ছে। এরই মাঝে বহুবার দেখে ফেলেছে এ মানচিত্র। এই পথগুলোর সাথেই পদ্যে লেখা স্থানের মিল খুঁজতে হবে। কিন্তু ভারতে আসার সময় আলেকজান্ডার যত জায়গায় গিয়েছিলেন তার সাথে কবিতার স্থানগুলোর কোনো সম্পর্কই বের করতে পারছে না তারা।

গভীর চিন্তায় মগ্ন এলিসকে খেয়াল করে কলিন জানতে চাইল, “কিছু পেয়েছ নাকি?”

ঠোঁট কামড়ে ধরল এলিস। “কিছু একটা আমাকে খোঁচাচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারছি না কী। খুব পরিচিত কিছু একটা চোখে পড়েও পড়ছে না।” মাথা ঝাঁকাল এলিস।

মানচিত্রটাকে একটু টেনে নিয়ে কলিনও তাকাল, “আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথ।” মন্তব্য করে বলল, “ইন্টারেস্টিং। আফগানিস্তানে ঢুকে কান্দাহার, কাবুল আর গজনী দিয়ে উত্তরে মোড় নেবার আগে দক্ষিণে এগিয়ে গেছেন। এরপর হিন্দুকুশ পার্বত্যাঞ্চল পার হয়ে উত্তরে গেছেন। সগডিয়ান রকের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে জালালাবাদ আর কুনার ভ্যালিতে মোড় নেয়ার আগে বাল্কে ফিরে এসেছিলেন। মনে হচ্ছে পরিকল্পনা করেই পুরো অঞ্চল ঘুরেছেন। দুর্ঘটনাবশত এমনটা ঘটেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না।”

এলিস একদৃষ্টে এমনভাবে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কলিনের কথা শুনে এইমাত্র যেন ব্রেইনের অন্ধকার অংশে আলো জ্বলে উঠল। এবারে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এতক্ষণ ধরেই ওর চোখের সামনে ছিল। কিন্তু গাধার মতন সে কিছুই বোঝেনি।

“এই তো!” আঙুল নাড়াতেই কৌতূহলী হয়ে তাকাল কলিন।

“কী?” জানতে চাইল।

“বিজয়ের কথাই ঠিক।” উত্তর দিল এলিস। “আগে যে কেন দেখলাম? কুনার উপত্যকাতেই লুকিয়ে আছে সেই সিক্রেট। এটাই তাদের গন্তব্য।”

ডা. শুক্লাও ধাঁধায় পড়ে গেলেন, “তোমার কেন এটা মনে হল এলিস?”

“দেখুন।” মানচিত্রে সগডিয়ান রকের স্থানে আঙুল রাখল এলিস। “পর্যায়ক্রমটা খেয়াল করুন। জালালাবাদের আগে হল সগডিয়ান রক। হয়ত আমাদের ধাতব পাতটার কোনো প্রয়োজনই নেই। সম্ভবত ইউমেনিসের জার্নালের পদ্যগুলোকে ভৌগোলিক ক্রমানুযায়ী সাজানো হয়েছে আর আলেকজান্ডারও সেটা অনুসরণ করেই ভ্রমণ করেছেন। প্রথম দুটো পদ্যের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারলেই আমার যুক্তির সত্যতা প্রমাণ হয়ে যাবে।”

সবাই মিলে একসাথে মানচিত্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

খানিকক্ষণ পরেই চোখ তুলে তাকালেন ডা. শুকলা, “আমার মনে হয় আমি ঠিকভাবে মনোসংযোগ করতে পারিনি।” লাজুকভাবে হাসলেন প্রাজ্ঞ ভাষাবিদ, “আরো আগেই এটা বোঝা উচিত ছিল। আজ সকালের ফোনেই তো সূত্র দিয়েছে বিজয়। অথচ আমি তবুও বুঝিনি। কিন্তু এলিসের মুখে আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথের সূচি শুনেই ব্যাপারটা মাথায় এসেছে।” এলিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ।”

মানচিত্র জুড়ে বয়ে চলা নদীটাকে ইশারা করে বললেন, “এটা অক্সাস নদী। আর মনে হয় দ্বিতীয় পদ্যে এ নদীর কথাই বলা হয়েছে। সংস্কৃত শব্দটা হচ্ছে “চক্ষু” মানে চোখ! এতক্ষণ এভাবেই অনুবাদ করেছিলাম। কিন্তু মহাভারতে অক্সাসকেই চক্ষু বলা হয়েছে। অক্সাসের পদ্যের আগেই সগডিয়ান রকের পদ্যটা এসেছে। যদি মহাভারতের অমৃতকেই দেবতাদের রহস্য হিসেবে ধরা হয় তাহলে মহাভারতের মাঝেই লুকিয়ে আছে এর সূত্র। ফলে মহাকাব্যে বর্ণিত শুক্রের কথাও বোঝা যাচ্ছে এখন।”

আরেকবার মানচিত্র দেখল এলিস, “আমারও মনে হয় আপনি ঠিক কথাই বলেছেন ভা, শুক্লা। এর পেছনে যুক্তিও আছে। পদ্যে অক্সাস পার হবার কথা বলা হয়েছে। একমাত্র একটা নদীই “দ্রুত গতিতে বইতে পারে।”

“আর প্রথম পদ্যটা-যেটা কিউবে নেই; কিন্তু জার্নালে আছে” বলে উঠলেন শুক্লা, “এখন যেহেতু আমরা জানি যে রহস্যটা মহাভারতের সাথে জড়িত তাহলে এটার অর্থ বুঝতেও কষ্ট হচ্ছে না। পরাজিত শক্তিমান রাজার লাইনটা হল কৌরভের লাইন। এই পদ্যে শক্তিমান রাজা বলতে ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে। কৌরভেরা ছিল তার পুত্র। সকলেই মারা গেছে। শেষ দুই লাইনে কৌরভদের ধ্বংসের কারণ “প্রবঞ্চনার প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে : “খুঁটি গড়িয়ে যাওয়া।” এখানে শকুনির খুঁটি গড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তিনি কৌরভদের মামা অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী গান্ধারীর ভাই ছিলেন। কৌরভরা ছিল একশত ভাই। গান্ধারের রাজকন্যা ছিলেন গান্ধারী। মহাভারতের একটা ভার্সন অনুযায়ী-আমার মনে হয় এটা অন্ধ্র প্রদেশ থেকে এসেছে-শকুনির পিতা সুবলকে পুরো পরিবারসহ ভীস্ম কারাগারে বন্দী করেছিলেন। শকুনি তাদেরকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছে যেন সে বেঁচে থেকে এর প্রতিশোধ নিতে পারে। পৌরাণিক এই কাহিনি অনুযায়ী সুবল শকুনিকে বলে গিয়েছিলেন যেন তাঁর হাড় থেকে খুঁটি তৈরি হয় যা মহাভারতে ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই হল, ‘ছল বা কৌশল, মৃত্যু থেকে জাত, প্রতিশোধ নিতে ব্যগ্র’ খুঁটি, সুবলের মৃত্যুর মাধ্যমে যার সৃষ্টি আর প্রতিশোধ নিয়েছে শকুনি। কান্দাহারেরই প্রাচীন নাম হল গান্ধার।”

নীরবে সবাই আবার ম্যাপের দিকে তাকাল। এখন বোঝা যাচ্ছে পদ্য আর আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথের মাঝে সম্পর্ক। কান্দাহার থেকে কাবুল। কাবুল থেকে বাল্ক। বাল্ক থেকে অক্সাস নদী পেরিয়ে সগডিয়ান রক আর তারপর আবার কাবুলে প্রত্যাবর্তন এবং এরপর জালালাবাদ।

“তবে লবণহীন সমুদ্র” এখনো বুঝতে পারিনি” অবাক হয়ে জানাল কলিন, “পদ্যনুযায়ী ওখানে মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে। “অভিযানের কেন্দ্রস্থল।”।

“এটা অবশ্যই অক্সাস নদীর উত্তর কিংবা পশ্চিমের কিছু একটা হবে।” গভীর ধ্যানে ডুবে গেলেন ডা. শুক্লা। জানালেন, “কিন্তু আরেকটা কথা কী জানো, তিনজন ভ্রাতা কে? আর তীরের মাথা মানে কী? ‘সাপের সিলের কথা না হয় নাই বললাম।”

‘আলেকজান্ডার তো একটা রেডিমেইড মানচিত্র পেয়েছিলেন” চটে উঠল কলিন, “আর এখানে আমরা রহস্যময় সব ধাঁধার অর্থ খুঁজতে বসেছি।”

“গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল কুনার উপত্যকাই যে এই ভ্রমণের শেষ গন্তব্য তা অন্তত বের করতে পেরেছি।” উপসংহার টানলেন ডা. শুক্লা। “তার মানে পদ্যের শেষ দুটো লোকেশন উপত্যকার ভেতরেই কোনো স্থান। যাক অবশেষে বিজয়ের জন্য কিছু পাওয়া গেল?” কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল আশা।

আর তাঁর কথাকে সত্য প্রমাণ করতেই যেন বেজে উঠল ডেস্ক ফোন। লাফাতে লাফাতে গিয়ে তুলে নিল কলিন। বিজয়। যা যা খুঁজে পেয়েছে সব খুলে বলল কলিন।

“শুনে তো যুক্তিযুক্তই মনে হচ্ছে।” সম্মত হল বিজয়, “আমার হয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিও কলিন। এখন রাখি। ওরা যাত্রার জন্য তৈরি হয়ে আছে। এগোবার জন্য হাতে কিছু পাওয়া গেল।”

.

৫৪. জালালাবাদ, আফগানিস্তান

ফোন ডিসকানেক্ট করে দিতেই চোখে প্রশ্ন নিয়ে বিজয়ের দিকে তাকাল ভ্যান ক্লক। এছাড়াও বাসায় বিজয় যে দু’বার ফোন করেছে প্রতিবার উপস্থিত থেকে সব শুনেছে। তাই বিজয়ের শুধু একটাই কাজ করার আছে দলের সাথে যোগাযোগ করে ধাঁধার সমাধান করা।

“কুনার উপত্যকাই সর্বশেষ গন্তব্য।” কলিনের সাথে কী আলোচনা হয়েছে তা সংক্ষেপে খুলে বলল বিজয়, “দিন-রাত্রি আর সর্পের ভয়ংকর দৃষ্টি এ দুটো পদ্যের বর্ণিত স্থান কুনার উপত্যকার মাঝেই অবস্থিত।

পাশেই দাঁড়ানো কপারের দিকে তাকাল ভ্যান ক্লক, “আমাদের গাইড কী বলে?”

“পর্বতে শিবের জিনিস বলতে কী বুঝিয়েছে সে সম্পর্কে কিছু জানে না” মাপা স্বরে জবাব দিল কুপার, “কিন্তু একই সাথে এও বলেছে যে সে এখানকার স্থানীয় নয়। জালালাবাদ থেকে এসেছে। তাই উপত্যকার চারপাশের গ্রামে খোঁজ নিতে হবে। এখান থেকে ৯০ মিনিট গেলেই আসাদাবাদ। রাস্তার অবস্থাও ভালো। ইউএস এইডের প্রজেক্ট হিসেবে মাত্র কয়েক বছর আগেই পাকিস্তান সীমান্তের সাথে কাবুলকে জুড়ে দেবার জন্য তৈরি হয়েছে এ রাস্তা। আমি বলব গিয়ে একবার দেখে আসা যাক।”

“আমার মনে হয় না এত দূর আসাদাবাদ পর্যন্ত যেতে হবে।” ধ্যানমগ্ন ভ্যান ব্রুক জানাল, “রাস্তা ছেড়ে পর্বতে যাবার নিশ্চয় অন্য কোনো রাস্তা আছে। আলেকজান্ডার আর কোনো ভাবে স্থান পেয়েছিলেন?”

নিঃশব্দে একমত হল বিজয়। গাঢ় কালো অন্ধকারেও সে স্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন ইউমেনিস আর আলেকজান্ডার। সিক্রেট জার্নাল অনুযায়ী হাতে ছিল কেবল মশালের আলো। পর্বতের এত গভীরে যখন যেতে পেরেছিলেন তার মানে পায়ে হাঁটা কোনো পথ নিশ্চয় আছে। যেখানে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। কিংবা ক্লাইম্বিং গিয়ারও লাগবে না।

কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। সিক্রেট জার্নাল সম্পর্কে এদেরকে কিছু জানাতে চায় না। পরিবর্তে তাকিয়ে দেখল যে উঠার পায়তারা কষছে ভ্যান কুক আর নিজের লোকদেরকে প্রস্তুতির জন্য তাগাদা দিতে গেল কুপার।

.

একটা অংশ এখনো নিখোঁজ

কঠোর দৃষ্টিতে আইভরি কিউবটার দিকে তাকাল কলিন। নিজের রহস্যের বেশির ভাগই উন্মুক্ত করে দিলেও আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথের একটা লোকেশন এখনো জানায়নি কিউবটা। তিন ভ্রাতা আর সাপের সিলঅলা পদ্যটার মর্মোদ্ধার করা যায়নি।

“আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না।” জানাল কলিন, “যদি কিউবের প্রত্যেকটা পদ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে এটাকে তো বাদ দেয়া যাবে না। নিখোঁজ অংশটুকু ছাড়া ধাঁধাটা সম্পূর্ণ হচ্ছে না। কুনার ভ্যালিতে ওরা যেটাই পাক না কেন উদ্দেশ্য সফল হবে না। কেননা এ পদ্যেই আছে “অভিযানের কেন্দ্রস্থল।” যদি সিক্রেটটা কুনার উপত্যকায় থাকে তাহলে কেন্দ্রস্থলের কথা কেন বলল? তার মানে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই না?”

মাথা খাটাতে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল এলিস, “এই পদ্যটা আসলেই জটিল। অক্সাস নদী সম্পর্কেও জেনে গেছি। তাছাড়া আর কিছু তো বুঝতে পারছি না।”

অভিব্যক্তিহীন চেহারা নিয়ে বসে আছেন ডা. শুক্লা। তবে মাথায় যে চিন্তার ঝড় চলছে তা বলাই বাহুল্য।

“এটাকে ভাঙার একটাই উপায় আছে” অবশেষে জানাল কলিন, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিজয় যা করে আমিও এখন তাই করব। না পাওয়া পর্যন্ত ইন্টারনেটে ঘুরতে থাকে। কিছু না কিছু অবশ্যই বের হবে।”

.

কুনার উপত্যকা, আফগানিস্তান

একেবারে সামনের ল্যান্ড রোভারে বসে পেছনের ল্যান্ড রোভারের সারির দিকে তাকাল বিজয়। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সশস্ত্র মানুষে ঠাসা ছয়টা এসইউভি। খেয়াল করে দেখেছে যে স্থানীয় আফগানগাইড ছাড়া বাকি সকলেই ককেশীয়। হয়ত, ইউরোপ আর ইউএস থেকে আসা ভাড়াটে সৈন্য। অথবা অর্ডারের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনির একাংশ। যাই হোক না কেন অর্ডারের পেশিশক্তির এরকম প্রদর্শনী সত্যিই ভীতি জাগানিয়া।

এই রাস্তাটা কাবুল থেকে জালালাবাদের পথের মত নয়। গিরিখাদ আর খাড়া ঢালগুলো নেই। যতদূর চোখ যায় রাস্তাটা কুনার নদী ধরেই এগিয়ে গেছে। দুপাশে ক্ষেত ভর্তি সমতল উপত্যকা। স্থানে স্থানে সংকীর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত বেশ চওড়াই বলা চলে।

ডান দিকে, উপত্যকা বেয়ে সাপের মত এঁকেবেঁকে চলে গেছে কুনার নদী। একেবারে দক্ষিণে, সফেদ কোহ্ পর্বতমালা যা পাকিস্তানের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত প্রদেশকে চিহ্নিত করেছে।

বাম দিকে আফগানিস্তানের মেরুদন্ড, হিন্দুকুশ পর্বতমালা। সুউচ্চ আর ভয়ংকর। এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে দেবতাদের রহস্য।

আলেকজান্ডারের উপর সে নিজে যে গবেষণা করেছিল তা স্মরণ করল বিজয়। পারস্য সম্রাট দারিয়ুস আলেকজান্ডারের হাতে পরাজিত হবার পর নিজ সভাসদ বিসাসের হাতে খুন হয়েছিলেন আর অবমাননাকর এক মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপর পঞ্চম আরটাজারজেস নাম ধারণ করে বিসাস হিন্দুকুশ থেকে ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত পালিয়ে বেরিয়েছেন এই আশায় যে আলেকজান্ডার তাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু বিপদসংকুল পথ পার হয়ে খাওয়াক পাসের মধ্যে দিয়ে হিন্দকুশ এসেছিলেন আলেকজান্ডার। এমনকি যাত্রাপথে সেনাবাহিনির রসদের অভাবও দেখা দিয়েছিল। তারা বাঁচার জন্য নিজেদের জীব-জন্তু হত্যা করে কাঁচা মাংস খেতেও বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আলেকজান্ডার বিসাসকে ধরতে ঠিকই সফল হয়েছিলেন। নিষ্ঠুর অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয় পঞ্চম আরটাজারজেসকে।

এরপর দক্ষিণে সগডিয়ান রকের দিকে এগিয়ে গেছেন। আর এখানেই কোথাও সেনাবাহিনি ছেড়ে নিজের গোপন মিশনে বেরিয়ে পড়েন ক্যালিসথিনস। এখনো যেসব পদ্যের মর্মোদ্ধার করা যায়নি সেসব স্থানেও গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ফিরে আসার সময় আলেকজান্ডারের জন্য কী এনেছিলেন? কুনার উপত্যকায় কী এর উত্তর পাওয়া যাবে?

.

৫৫. এক বন্দীর ভাবনা

নিজের ছোট্ট কুঠুরির মেঝেতে দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে বসে আছে রাধা। গতকাল সাক্সেনার কাছে যা শুনল তারপর থেকেই যেন বোধবুদ্ধি সব অসাড় হয়ে গেছে। আর সে ছাড়া ব্যাপারটা অন্য কেউ জানেও না। বুঝতে পারছে অর্ডার নিজের মিশন পুরো করেই ছাড়বে। গন্তব্যে পৌঁছানোনার জন্য তাকে থামানোর কেউ নেই।

কিন্তু নিজের ব্যর্থতাই রাধাকে বেশি করে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ভাবতে ভাল লাগছে না যে ওর কিছুই করার নেই। এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে চাইছে দুনিয়াকে জানাতে যে সত্যিকারে কী ঘটছে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো কেন হয়েছে। অথচ এটাও জানে যে সাক্সেনা তাকে সব খুলে বলেছে কারণ ওর কোথাও যাবার উপায় নেই। ভেতর থেকে খোলা যায় না এমন একটা কুঠরিতে বন্দী হয়ে আছে রাধা। বাইরের করিডোর ইনস্টল করা সিসিটিভি ক্যামেরা ওর সেলের উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। যে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণই সাথে সাথে ধরা পড়ে যাবে। নিয়মিত বিরতিতে এসে চেক করে যায় একটা পুরুষ গার্ড। আর কোনোভাবে যদি গার্ডকে পরাস্ত করে বাইরে বের হতেও পারে। সেখানকার অবস্থাও তো জানা। পুরো দালানটাই ভূর্গভস্থ। বাইরে যাবার কোনো দরজাই দেখেনি।

তাই ভয়ংকর সত্যিটাকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এখান থেকে বেরোবার কোনো উপায় নেই। যদি না কেউ এসে ওকে উদ্ধার করে।

কিন্তু সেটার সম্ভাবনাও শূন্য। কারণ কেউ তো জানেই না যে সে কোথায় আছে।

.

পথ নির্দেশকের খোঁজে

জালালাবাদ ছাড়ার পর থেকেই কেবল উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা। উপত্যকা এখন বেশ সংকীর্ণ হয়ে গেছে। উধাও হয়ে গেছে দু’পাশের ক্ষেত। ডানদিকে নদী রেখে হিন্দুকুশের পাদদেশে এঁকেবেঁকে উঠে গেছে রাস্তা।

পথিমধ্যে অসংখ্য গ্রাম পার হয়ে এলেও তাদেরকে কাঙিক্ষত লোকেশনে পৌঁছে দিতে পারে এমন কোনো সাইনপোস্ট চোখে পড়েনি।

এখন বিপজ্জনক অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। মাঝে মাঝেই কানে আসছে রকেট ফায়ারের গুরুগম্ভীর আওয়াজ। আফগানিস্তানের এই উপত্যকায় যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এখনো সক্রিয়। আলেকজান্ডারের পর দু’হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও রক্তপাত এখনো থামেনি। কুপার অবশ্য ভ্যান কুককে আশ্বস্ত করেছে যে উপত্যকায় তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে তালিবানের স্থানীয় ইউনিটকে আগেই জানানো হয়েছে।

“আজ ওরা আমাদের রাস্তায় মিসাইল ছুড়বে না” ভ্যান ক্লককে জানিয়েছে। কুপার। মনে হচ্ছে প্রতিজ্ঞাটা আসলেই সত্য। বিজয় শুধু আশা করছে যেন জালালাবাদ পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত তা বলবৎ থাকে।

সামনে গজিয়ে উঠল মাটির ঘরে ভর্তি আরেকটা গ্রাম। থেমে গেল পুরো গাড়ি বহর। স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য লাফ দিয়ে নেমে গেল গাইড।

এবার মনে হচ্ছে কিছু একটা পেয়েছে। চওড়া হাসি দিয়ে সামনের পর্বতমালার দিকে ইশারা করল লোকটা।

তারপর প্রথম এসইউভির দিকে এগিয়ে এলো; যেখানে বসে আছে বিজয়; কুপার আর ভ্যান কুক। কুপার গাড়ি থেকে নেমে গাইডের সাথে খানিকক্ষণ কথা বলে ভ্যান কুকের দিকে তাকাল।

“গ্রামবাসীদের মতে এখান থেকে এক কি. মি গেলেই পর্বতে যাবার রাস্তা পাওয়া যাবে। এরপর দুই ঘন্টা পাহাড়ে চড়ার পর পাওয়া যাবে প্রাচীন আমলের কয়েকটা পাথুরে লিপিসর্বস্ব কাঠামো। গাইড বলছে সাইন পোস্টও ওখানেই পাওয়া যাবে।”

গাইডের দিকে এক নজর তাকাল ভ্যান ক্লক, “ও যে আমাদেরকে ভাওতা দিচ্ছে না সেটাই বা কিভাবে বুঝব? হয়ত উপরে উঠে দেখব চল্লিশ হাজার বছর আগে পাথরের উপর আঁকিঝুঁকি কেটে গেছে কোনো গুহামানব।”

অট্টহাসি দিল কুপার। “ওতো আমাদের সাথেই যাচ্ছে আর এও জানে যে যা খুঁজছি তা না পেলে ওর পরিণতি কী হবে।”

“ঠিক আছে, তাহলে চলল।” আবারো দুলে উঠল পুরো ল্যান্ড রোভার বহর।

.

পালানোর পরিকল্পনা

রাধার মাথায় আস্তে আস্তে শেকড় ছড়াল এক ভাবনার বীজ। বাইরে থেকে কেউ যদি এই ফ্যাসিলিটির প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে দেয় তবেই কেবল ওকে উদ্ধার করতে পারবে, ব্যাপারটা উপলব্ধি করার সাথে সাথে চিন্তাটা মাথায় এলো। যদি কী খুঁজতে হবে তা কাউকে জানানো যায় তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা একেবারে অসম্ভব নয়।

ধরা যাক রাধা এখান থেকে বাইরে মেসেজ পাঠাবার কোনো একটা উপায় খুঁজে পেল? যেমন করেছিল আনোয়ার। কিন্তু আনোয়ারের দুর্ভাগ্যের কথা মনে হতেই অসুস্থবোধটাকে দূরে সরিয়ে দিতে বাধ্য হল।

জানে ওর ভাগ্যে কী লেখা আছে। বিজয় যেন ওদেরকে সাহায্য করে তার জন্য রাধাকে দর কষাকষির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেলেই রাধা খতম। অথবা তার চেয়েও খারাপ কিছু। যেমন তাদের ভয়ংকর সব এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট বনে যাওয়া। ফ্রিম্যানের প্রজেক্ট নিয়ে সাক্সেনার মন্তব্য মনে পড়ে গেল। ওরা যা করছে তাতে কি প্রজনন শাস্ত্রও জড়িত?

তবে আপাতত তা নিয়ে ভাবছে না। গুরুত্বপূর্ণ হল আইটি সেকশনে পৌঁছানো আর কোনো ভাবে একটা মেসেজ পাঠানো যায় কিনা তা দেখা।

অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত। যদিও ব্যর্থতার পরিণাম কী তাও জানে। কিন্তু এভাবে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থেকে সাক্সেনা আর তার দলের মিশনের সফলতা দেখা যায় না।

.

আশার ক্ষীণ আলো

ল্যাপটপের কাছে বসে ক্লান্ত চোখ দুটোকে ঘষল কলিন। অনেকক্ষণ ধরেই একনাগাড়ে কাজ করছে। বাইরে নেমে এসেছে রাত। এবার উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ালো। নিচে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশ অবস্থিত ছোট্ট গ্রামটার আলো।

পদ্যের একটা অংশের মর্মোদ্ধার করতে পেরেছে অথবা তেমনটা ভাবছে। কিন্তু কোনো উপকারে লাগল না।

অন্যদের সাথে বিস্তর আলোচনা আর ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে “লবণহীন সমুদ্র” বলতে আসলে আরাল সমুদ্রকে বোঝানো হয়েছে; অক্সাস নদীর জলে পুষ্ট একটা লেক, বর্তমানে যা আমু দরিয়া নামে পরিচিত।

ষাট বছর আগে আরাল সমুদ্র কী ছিল সে সম্পর্কে ধারণা ক্ষীণ হলেও মনে হচ্ছে এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রথমত, অক্সাস নদীর কাছাকাছি এই একটাই সমুদ্র আছে। দ্বিতীয়ত, যদি কেউ বাল্ক থেকে আসে তাহলে আরাল সমুদ্রে পৌঁছানোর জন্য অক্সাস নদী পার হতেই হবে। তৃতীয়ত, আরাল সমুদ্র প্রকৃতপক্ষেই বিশুদ্ধ পানিতে ভর্তি ছিল। অতঃপর নদীর গতিপথ পাল্টে যাওয়ায় আর সমুদ্রের নিজের প্রাক্তন আকার ছোট হয়ে যাওয়ায় কয়েক দশক ধরে নোনা জলে পরিণত হয়েছে। পানিতে বেড়ে গেছে লবণ আর দূষিত পদার্থের পরিমাণ।

তবে পদ্যের ইঙ্গিত অনুযায়ী অন্তত তিনটা শর্ত পূরণ করায় আরাল সমুদ্রকেই বেছে নিয়েছে কলিন। কিন্তু আরাল সমুদ্র কিংবা অক্সাস নদীর সাথে “তিন ভ্রাতার কী সম্পর্ক তা এখনো বোধগম্য হয়নি।

একই সাথে মনে হচ্ছে চোখ সম্পর্কে ডা. শুক্লার অনুবাদেও খানিকটা গরমিল আছে। হতে পারে এটা কেবলই একটা চোখ, কোনো নদী নয়? তাহলে অবশ্য নতুন এক ধাঁধার উদয় হবে : “দ্রুত বহতা চোখ” মানে কী?

দীর্ঘশ্বাস ফেলল কলিন। যতটা সহজ ভেবেছিল ব্যাপারটা আসলে ততটা সহজ নয়। বিজয় কী করছে, কেমন আছে তাই বা কে জানে! আর কোনো ফোনও করেনি।

আবার ল্যাপটপের সামনে এসে বসে পড়ল। সময় একেবারে নেই। তার। জন্য। কিংবা রাধা আর বিজয়ের জন্যও।

.

৫৬. পর্বতে

একটা বোল্ডারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যান কুক। চারপাশে সাইন পোস্টের খোঁজ করছে তার দল। দিনের আলো দ্রুত কমে এলেও তাদের সাথে শক্তিশালী পোর্টেবল সার্চলাইট আছে। ফলে আশপাশের পর্বতমালা আর পাথরগুলোও আলোকিত হয়ে উঠেছে।

কথা মত দু’ঘণ্টাতেই শেষ হয়েছে ট্রেক। তারপর এখানে এসে গাইডের নির্দেশে থেমে গেছে সকলে। লোকটার দাবি পদ্যে উল্লেখিত লোকেশনের জন্য এখানেই খুঁজতে হবে সাইনপোস্ট।

তবে চারপাশ দেখে অন্তত পদ্যের একটা অংশের সাথে মিল আছে বোঝ যাচ্ছে। তারা এখন কুনার নদীর উপরে। ভ্যান কুক হিসাব করে দেখেছে উপত্যকার মেঝে থেকে ২০০ ফুট উপরে, দুটো ঢালু অংশের সংযোগ স্থল বলা যায়। আর পদ্যে নদীর উপর ঢালের কথাই বলা হয়েছে।

এছাড়াও বসে বসে ভাবছে যে গন্তব্যে পৌঁছবার সত্যিকার মানেটা কী? অর্ডারে আরো এক ধাপ উপরে উঠে যাওয়া। একেবারে শীর্ষের কাছাকাছি। এমনকি হতে পারে অর্ডারকে চালিত করে যে ছোট্ট দলটা তার কাছাকাছিই পৌঁছে যাবে। তার পরিবারের সদস্যরাও শত শত বছর ধরে এই অর্ডারেরই সদস্য। জলদস্যু হিসেবে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সময়েও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে নিজেদের দায়িত্ব। কিন্তু ভ্যান কুক সেসব দিন দেখেন নি। এখন তো তারা অত্যন্ত ধনী। আরো বেশি শক্তিশালী। লোকে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে। তাই কয়েক বছর ধরে অর্ডারে পদমর্যাদাও বেড়েছে।

আর আজ তো অর্ডারের সর্বোচ্চ পুরস্কার একেবারে হাতের নাগালে চলে এসেছে। পরিচালকের সাথে একই টেবিলে বসার সুযোগ করে দেবে এ অবস্থান। যেখানে কেবল রক্তের সম্পর্কে প্রকৃত উত্তরাধিকারীরাই বসতে পারে। অর্ডারের সাথে একই সময়ে শুরু হওয়া এ বংশ পরিক্রমা হাজার হাজার বছর ধরেই বিশুদ্ধ হিসেবে টিকে আছে।

চোখ তুলে তাকাতেই দেখা গেল অন্ধকার চিরে দিয়েছে সার্চলাইটের আলো। নিজের বাহিনিকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তবে দৃষ্টি গিয়ে বিজয়ের উপর নিবদ্ধ হল। এই ছেলেটাকে কেন যেন বুঝতে পারছে না। ওর মাথায় কি নেই যে তার আর বাগদত্তার দিন শেষ হয়ে এসেছে? এতটা বোকা তো হতেই পারে না। অথচ এত কিছুর পরেও ছেলেটার মুখে আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। নাকি অন্য কোনো ব্যাক আপ প্ল্যান ও করে রেখেছে? ভ্যান কুক যতটা জানেন বিজয়ের সাথে কোনো অস্ত্র নেই। মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটাকে দূরে সরিয়ে দিল। যদিও সেটা কোনো সমস্যাই না। ধাঁধার সমাধান করে প্রহেলিকার জাল ছিন্ন করা এই ছোকরার কাছে ডাল-ভাত। গত বছরেও ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও ওদেরকে সাহায্য করেছিল। আর এখন তো স্বয়ং নিজের ইচ্ছেতেই করছে। ইউরোপীয়ান হয়ে এর বেশি কিছু আর আশাও করেনা।

সার্চলাইট হাতে সশস্ত্র দুই লোকের সাথে গোধূলি আলোয় ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজয়। যে ঘটনার অভিজ্ঞতা নেই কিংবা যে দৃশ্য আগে দেখা হয়নি তা মনে পড়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি হচ্ছে। মনে পড়ল যে গত বছর ঠিক একই ধরনের একটা অভিযানে গিয়েছিল। তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পথ দেখছে না।

তাই নিজের ভাগ্যের কথা না ভেবে আশেপাশের পর্বতমালা আর পাথরগুলোর উপর মনোযোগ দিল। পাথরের উপর খোদাইকৃত ব্যাখ্যা আর চিত্র সম্পর্কে গ্রামবাসী ও গাইডের কথাই ঠিক। চারপাশে অসমাপ্ত শিল্পকর্ম আর ব্যাখ্যা সমেত বড় বড় পাথরের চাই। তবে এসব বোল্ডারের একটারও পদ্যের বর্ণনার সাথে মিল নেই।

পাহাড়ের আরেকটা অংশে যেতেই একপাশে গভীর চোরাকুঠুরি নজরে পড়ল। অথবা আরো ভালোভাবে বলতে গেলে মাত্র কয়েক ফুট চওড়া একটা গলিপথ যার শে