বড়সড় একটা ঢেউ কিংবা পাঁচ মাথাঅলা একটা সাপ। পার্চমেন্টের পদ্যের সাথে হুবহু মিলে গেছে।
ত্রস্তপায়ে এগিয়ে গেলেন আলেকজান্ডার। রাজার সাথে তাল রাখতে গিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটলেন ইউমেনিস।
সাপ আকতির পাথরটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন দুজনে। প্রথম দেখায় যতটা মনে হয়েছিল তার চেয়েও অনেক উঁচু। মাথার উপরে প্রায় পনেরো ফুট পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
মশাল আগে বাড়িয়ে পার্চমেন্টে উল্লেখিত পাথরের নিচেকার ভূগর্ভস্থ গুহাকক্ষে ঢোকার কোনো উপায় পাওয়া যায় কিনা তা খুঁজে দেখলেন ইউমেনিস।
কিন্তু আলেকজান্ডার পেয়ে গেলেন। পাথরের ভাজের পেছনে লুকিয়ে আছে সরু একটা ফাটল। যদি কেউ এর অস্তিত্বের কথা না জানে, তাহলে উজ্জ্বল দিনের আলোতেও খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।
“এখানে অপেক্ষা করো।” ইউমেনিসের হাত থেকে মশালটা নিয়ে আদেশ দিলেন আলেকজান্ডার। “আমি শীঘ্রই ফিরে আসব।”
বাধা দেবার চেষ্টা করেও সাথে সাথে থেমে গেলেন ইউমেনিস। “এটা একটা পবিত্র স্থান” জানালেন আলেকজান্ডার, “কেবল একজন দেবতার জন্য উপযুক্ত। আমি একাই যাবো।”
অন্ধকারে ইউমেনিসকে একা রেখে ফাটল গলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন তরুণ বিজেতা। কিন্তু জেনারেল নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নন। দু’জনের একজনও জানেন না যে ফাঁকের ওপাশে কী আছে। এক আগন্তুকের কথার উপর ভরসা করেই এগোতে হবে। কিন্তু যদি এটা কোন কৌশল হয়, আলেকজান্ডারকে মেরে ফেলার জন্য সাজানো নাটক হয়?
একের পর এক মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে। শক্ত, পাথুরে ভূমিতে বসে রাজার ফেরার অপেক্ষা করছেন ইউমেনিস।
অবশেষে, মনে হল যেন অনন্তকাল শেষে ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এলেন। আলেকজান্ডার। দেহবর্ম পুরোটাই ভেজা হলেও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে চেহারা।
“হয়ে গেছে।” ইউমেনিসের হাতে মশাল ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “এবার আমি আসলেই একজন দেবতা হলাম!”
৮. ষষ্ঠ দিন
৭১. ষষ্ঠ দিন
অনুসন্ধানের কেন্দ্রস্থল
খোলা ফটকের ওপাশে কেবলই শূন্যতা; ছোট্ট চেম্বারটাকেও মনে হচ্ছে জড়িয়ে ধরার হুমকি দিচ্ছে সেই আঁধার।
পাথুরে দরজার ওপাশে গোপন গুহাকক্ষে অন্ধকারের দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিন্ন করার জন্য একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবকটা সার্চলাইট। ভেতরের দৃশ্য দেখে তো স্তম্ভিত হবার যোগাড়।
গুহাকক্ষের মেঝেতে কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে বিভিন্ন সাইজের সব ধরনের সাপ। কোবরা আর বিষধর সাপগুলোকে সহজেই চেনা গেল। আবার এমন কিছু আছে যেগুলো খুব বেশি হলে এক ফুট লম্বা। সবুজ, মরিচা আর ছাই রঙা ছাড়াও কালো কতগুলো সাপও আছে।
শুধু ভ্যান ক্লক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুকের দিকে তাকিয়ে ইউরোপীয় লোকটার আত্মতৃপ্ত চেহারা দেখে বিস্মিত হয়ে গেল বিজয়। মনে হচ্ছে ক্লক যেন এরকমই কিছু আশা করেছিল।
“সবকটিকে তুলে নাও।’ আদেশ দিল ভ্যান, প্রতিটি ধরন থেকে দু’টো করে সাপ চাই। যতগুলো সম্ভব দ্রুত ভরে ফেল।”
দ্বিধায় পড়ে গেল কুপারের বাহিনি। হতে পারে কিছু কিছু কম-বিষধর সাপ আছে; তবে বেশিরভাগই বিষাক্ত।
অবস্থা দেখে গর্জন করে একের পর এক অর্ডার দিল কুপার; হাতে অস্ত্র নিয়েও প্রস্তুত রাখল। “আমি চাই সবাই এক্ষুনি কাজে লেগে পড়! তোমাদের কাছে অস্ত্র আছে। গিয়ে নমুনা তুলে আনো, যাও! প্রচুর পরিমাণে আছে; প্রয়োজন হলে গুলি করবে! দুজনে মিলে দল বানিয়ে একে অন্যের দিকে খেয়াল রাখবে।”
পরস্পরের দিকে দ্বিধান্বিত চোখে তাকালেও আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল সবাই। দরজার কাছে দশজন দাঁড়িয়ে কমরেডদের সুবিধার্তে সার্চলাইটের আলোয় ভাসিয়ে দিল পুরো কক্ষ।
কিন্তু মানুষ দেখে সাপগুলো যেন আরো বেশি করে কুন্ডলি পাকিয়ে গেল। সাপের উপর যেন পা না পড়ে তাই সাবধানে এক হাতে ব্যাগ আর আরেক হাতে অস্ত্র নিয়ে কাজে লেগে পড়ল কুপারের বাহিনি।
তবে সাথে সাথে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। একজন কোবরার উপর পা দিতেই চোখের পলকে আঘাত হানল সাপ। মেঝেতে পড়ে গেল আক্রান্ত ব্যক্তি। কিন্তু বাকিরা যে যার কাজে ব্যস্ত। আরেক দুর্ভাগা, কোবরাকে এড়াতে গিয়ে সাপের স্তূপের ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। হিসহিস করতে করতে তার গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কুন্ডলি পাকানো একগাদা সাপ। মুহুর্মুহু কামড়ে আর্তচিৎকার করা ছাড়া তার আর কিছুই করার রইল না।
সহকর্মীদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যরা এবার আরো সতর্ক হয়ে গেল। দুইজন দুইজন করে ভাগ হয়ে রাইফেলের ব্যারেল ব্যবহার করে অতি সপ্তর্পণে সাপ তুলে ব্যাগে ভরে ফেলল। কাজের গতি অত্যন্ত ধীর হয়ে গেলেও আর কাউকে হারাতে হল না।
উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিজয়। গুহাকক্ষের লোকগুলোর ভাগ্য নিয়ে চিন্তিত নয়। বরঞ্চ ভাবছে না জানি এরপর কী ঘটবে। কী আছে রাধা আর ওর ভাগ্যে?
চোখ তুলে তাকাতেই দেখল ফিরতে শুরু করেছে কুপারের বাহিনি। খেয়াল করে দেখল যে যতক্ষণ পর্যন্ত সাপেদের উপর কারো পা পড়েনি, ততক্ষণ পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতি করেনি বিষধর জন্তুগুলো। মোটের উপর বলতে গেলে মানুষের অনধিকার প্রবেশ দেখে ক্ষেপে গেলেও মানুষগুলোকে সাপেরা তেমন কিছুই করেনি।
অবশেষে একেবারে শেষ জোড়াও ভাঙ্গা দরজা দিয়ে মেইন চেম্বারে চলে এলো। সবার কপালে ঘাম আর ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে জামা। মাটির এতটা নিচে অসম্ভব ঠাণ্ডা অনুভূত হলেও কাজ করতে গিয়ে সবাই ঘেমে নেয়ে উঠেছে।
