প্রথম রুমে দেখা গেল অসংখ্য মটকা। দেয়ালের পাশে সারিবদ্ধ তাকে দাঁড়িয়ে আছে এক ফুট উঁচু মটকাগুলো। কমপক্ষে শখানেক তো হবেই। আর সবকটিই ধাতব পাতটার মত কালো ধাতু নিয়ে তৈরি। বিজয়ের ধারণা গত বছর নিজেও এই ধাতুগুলোই দেখেছিল। পাথরের ভেতরকার টানেলের মত এই মটকাগুলোও দেখে মনে হচ্ছে এগুলো আর গত বছর বন্ধুরা মিলে যে সিক্রেট লোকেশন খুঁজে পেয়েছিল সেটার নির্মাতারাও একই দলের লোক।
কিন্তু তাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। ভ্যান কুক হয়ত জানে। দুটো স্থান নির্মাণের পেছনেই কি অর্ডারের হাত আছে নাকি?
সার্চলাইটের আলো পড়তেই দেয়ালের একেবারে উপরের অংশে দেখা গেল দেবনাগরী ভাষায় লেখা একটা মাত্র শব্দ।
“রাসাকুন্ডা” বিজয় খোদাইকৃত লেখাটা পড়লেও জানে না এর মানে কী।
ছেলেটার হতভম্ব ভাব দেখে মিটিমিটি হাসছে ভ্যান কুক। “এসব পাত্রে এক বিশেষ ধরনের তরল থাকে; মহাভারতে যাকে অমৃত নামে বর্ণনা করা হয়েছে।” সৌজন্য প্রকাশের মত করে ব্যাখ্যা করল কুক। “এই তরল যে পান করবে তার শক্তি মত্তা বহুগুণে বেড়ে যাবে। মহাভারতে, দুর্যোধনের হাতে বিষ খাওয়ার পর ভীম যখন নাগাস রাজ্যে ফিরে আসে তখন এই তরল খাইয়েই ওর শক্তি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। মহাকাব্য অনুযায়ী একসাথে আট জগ অমৃত খেয়ে ফেলে ভীম; যার একেকটাই গায়ে হাজার হাতির জোর এনে দিতে পারে।”
“তোমার মানে কী এ জগগুলোর কথাই মহাভারতে লেখা হয়েছে?” নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না বিজয়। এরই মাঝে জেনে গেছে যে হাজার বছর আগেকার প্রকৃত ঘটনার উপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে মহাভারত। নিজের চোখে প্রমাণও দেখেছে। কিন্তু প্রাচীন মহাকাব্যের কোনো বস্তু চাক্ষুষ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
কাঁধ ঝাঁকাল ভ্যান ক্লক, “হয়ত একই জগ নয়। কিন্তু এখানে তো তাই লেখা আছে।” কুপারের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত শত বছর পরে মটকাগুলো নিশ্চয় খালি। বাস্প হয়ে উড়ে গেছে অমৃত। তবে পানিতে রেট্রোভাইরাস অবশ্যই থাকবে। অমৃত পান করার পরেই শরীরের শক্তি বেড়ে যাবার এটাই হল একমাত্র ব্যাখ্যা। তাই ভাইরাস সমৃদ্ধ তলানি থাকলেও থাকতে পারে। যথেষ্ট পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ করে নাও।”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল কুপার। সাথে সাথে ব্যাগও চলে এলো। বিজয় এতক্ষণ খেয়াল করেনি; কিন্তু সবার কোমরের কাছেই একটা করে ভেঙে বন্ধ করা যায় এমন নাইলনের ব্যাগ ঝুলছে। মটকাগুলো পরীক্ষা করে ব্যাগের মাঝে কিছু একটা ঢুকাতে লাগল সকলে।
লম্বা লম্বা পা ফেলে চেম্বারের বিপরীত দিকের রুমে ঢুকে গেল ভ্যান ক্লক। সার্চলাইটের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল দেয়ালের পাশের সারিবদ্ধ। রত্ন। মাথা নেড়ে ইউরোপীয় লোকটা বলল, “যেমনটা হওয়া উচিত সবকিছু ঠিক তাই।” নিজের চেয়েও বেশি বিজয়কে শোনাল, “এটাই হল শ্লোকের মানে।”
ভ্যান কুকের বিড়বিড়ানি বুঝতে পারল বিজয়। কাজাকাস্তান আসার পথে ফ্লাইটে বিজয়কে একটা শ্লোকের ব্যাখ্যা শুনিয়েছিল যাতে ঔষধি গাছ আর রত্নের কথা ছিল। ঔষধি গাছের কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে-ক্যালিসথিনসের উপর ব্যাকট্রিয়ার জঙ্গল থেকে এই গাছ সংগ্রহের ভার ছিল। কিন্তু সে সময় রত্নের ব্যাপারটা বিজয় বুঝতে পারেনি। এবার উপলব্ধি করছে যে রত্ন তত এখানেই আছে। ভাইরাসের ঠিক সাথে।
পাথরের সিলটা ভাঙ্গার সময় আলেকজান্ডারকে কী খুন করেছিল তা নিয়েও বিড়বিড় করেছিল ভ্যান কুক।
এখন সেই মন্তব্যের অর্থও ধরতে পেরেছে বিজয়। অমৃত পান করার পরেও কেন আলেকজান্ডার মৃত্যুবরণ করেছেন তাও স্পষ্ট হয়ে গেছে।
.
সর্বশেষ বাধা
“এটা একটা দরজা।” চেম্বারের ঠিক বিপরীত দিকের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা পাথরের স্ল্যাবটাকে দ্রুত একবার পরীক্ষা করে এসে জানাল ভ্যান কুক। মেইন চেম্বারের পাশেই আবিষ্কৃত হল ছোট আরেকটা চেম্বার। কিন্তু প্রথম চেম্বারের মটকা আর দ্বিতীয় রুমের রত্ন ব্যতীত তেমন বিশেষ কিছু আর পাওয়া গেল না। কেবল একটা কক্ষের দেয়ালে কিছু লেখা। মনে হচ্ছে এই স্থানে আগে যিনিই এসে থাকুক না কেন বন্ধ করার পূর্বে সবকিছুই নিয়ে গেছেন; শুধু পড়ে আছে রত্নপাথর আর জলাধার। এগুলোকেও কেন নিয়ে যান নি তার কোনো সদুত্তর মাথায় না এলেও এখন এত চিন্তা করার সময় নেই। ভাইরাসের আরো বিশ্বাসযোগ্য নমুনা পাবার জন্য তাড়াহুড়া শুরু করেছে ভ্যান ক্লক আর জেদ করে বসে আছে যে তা পাথুরে দরজার পেছনেই পাওয়া যাবে।
কিন্তু দরজাটা খোলার কোনো উপায় নেই। “ভেঙে ফেল।” দেরি সহ্য করতে না পেরে আদেশ দিল ভ্যান ক্লক।
বিশালাকার পাথর ভাঙ্গার হাতুড়ি এনে কাজে লেগে গেল তিনজন লোক।
পাথরের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ যাই থাকুক না কেন, তা এত সহজে হাতে পাওয়া যাবে না। আধঘণ্টা অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের পর পাথরের উপর ফাটল দেখা গেল। এর আগ পর্যন্ত পুরো চেম্বারে উড়াউড়ি করেছে ছোট ছোট পাথরের টুকরা। অন্যেরা তাই পাথুরে রকেটের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার প্রথম তিনজন ঘরে এসে পরবর্তী তিনজনের জন্য জায়গা ছেড়ে দিল। যেন নব উদ্যমে দ্রুত সমাপ্ত হয় কাজ।
আরো আধঘণ্টা প্রাণান্তকর চেষ্টার পর অবশেষে খসে পড়ল পাথুরের দরজার একেবারে শেষ অংশ।
