বাকি ট্রাকগুলো ভোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল পুরো দল। একে একে বের হল পোর্টেবল জেনারেটর, পাওয়ার ড্রিল, গর্ত তৈরির ইলেকট্রিক মেশিন, জ্যাক হ্যাঁমার, হাতে ব্যবহৃত খন্তা, কোদাল, কুঁড়াল আর পাথর ভাঙ্গার জন্য বিশালাকার সব হাতুড়ি।
অন্যদিকে বাকি চারজনও একই ধরনের যন্ত্র ছুঁড়ে দড়ি বেয়ে উঠে গেল পাহাড় চূড়ার উপরে। প্রথম পর্বতারোহী এরই মাঝে পৌঁছে কোমরের সাথে সঁড়ি বেঁধে নিয়েছে। একটা ব্যাগে যন্ত্রপাতি ভরে নিয়ে গেছে সকল পবর্তারোহী। সাপের মত এঁকেবেঁকে নিচে নামা পাওয়ার টুলসের দড়ি মাটিতে জেনারেটরের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে।
“তোমাদেরকে সিলটা ভাঙ্গতে হবে।” মাইক্রোফোনে উপরের লোকদেরকে নির্দেশ দিল কুপার, “কোনো ধরনের সাবধানতার দরকার নেই। প্রবেশ মুখটা পরে আবার বন্ধ করে দেব।”
জেনারেটর চালু হতেই চারপাশের বিশাল পাথুরে মালভূমিতে প্রতিধ্বনিত হল সে শব্দ। ভয় পেয়ে গেল পাখি আর খরগোশের দল।
সিলটা ভাঙ্গার জন্য ড্রিল আর হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙ্গার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এত দূর থেকে সিলটা দেখতে পাচ্ছে না বিজয়। তবে বেশ বুঝতে পারছে যে নিশ্চয় অতি সপ্তপর্ণে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। কেউ কখনো জানতেই পারেনি যে পাথুরে বিন্যাসের মাঝে কোথাও একটা সিল লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
অবশেষে উপরের লোকগুলোর চিৎকারের সাথেই শোনা গেল ভেঙে পড়ার প্রচন্ড আওয়াজ আর ঢালু বেয়ে গড়াতে লাগল ভাঙ্গা অংশ। সিলটা ভেঙে গেছে।
খুলে গেল চারকোণা, কালো একটা প্রবেশ মুখ। যেরকম সাদা ঢালের উপরে ছিল তার তুলনায় পুরোপুরি অন্ধকার। দেখে তো তেমন বড় মনে হচ্ছে না। আর একেবারে প্রথম পবর্তারোহী নামতেই হিসাব করে দেখল দু’পাশে তিন ফুটের বেশি বড় হবে না। কেবল একজন ঢুকতে পারবে।
পাঁচটা কপিকলের মাধ্যমে পাওয়ার ইকুপমেন্টগুলো নামিয়ে আনা হল। বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রগুলো নামানোর আগেই একের পর এক পাঁচজনই ভেতরে ঢুকে গেল। এবার সাথে নিল হস্তচালিত যন্ত্র।
“আনুভূমিক এই টানেলটা পাথরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে।” ভ্যান ক্ষুককে জানাল কুপার, “খুব সরু হওয়াতে উবু হয়ে চলতে হচ্ছে।” খানিক বাদেই বোধহয় থেমে গেল পাঁচজন। মনোযোগ দিয়ে ইয়ারপিসের কথা শুনল কুপার। তারপর ভ্যান ক্লককে জানাল, “ওরা একটা চেম্বারে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নিচের দিকে পৌঁছে গেছে। এখন তাহলে আমাদেরও যাওয়া উচিত। কারণ একবার ওরা নিচে নামা শুরু করলেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।”
“চলো, তাহলে।” পিছু নেয়ার জন্য সবাইকে ইশারা করে লম্বা লম্বা পা ফেলে পাদদেশে পৌঁছে গেল ভ্যান কুক। তারপর একটা কপিকলে হাত দিয়ে বলল, “দেখা যাক, এত আগে অর্ডার কী খুঁজে পেয়েছিল।”
.
প্রায় পৌঁছে গেছে
দুজন গার্ডের মাঝখানে স্যান্ডউইচ হয়ে কপিকলে চড়ে উপরে উঠে এলো বিজয়। ওকে অবশ্য তেমন কিছু করতে হয়নি। সব কাজ কপিকলই করেছে। তারপর সামনের প্রবেশ মুখে ঢুকে হারিয়ে গেল গার্ড। বিজয়ও পিছু নিল। হেলমেট ল্যাম্পের আলোয় গার্ডের আবছায়া দেহ দেখা যাচ্ছে।
পাথরের ভেতরে আনুভূমিকভাবে এগিয়ে গেছে টানেল। তবে ততটা সরু নয়। মাথা তেমন উঁচু করতে না পারলেও দু’পাশে জায়গা পাচ্ছে বিজয়। টানেলের মেঝে আর দেয়াল একেবারে মসৃণভাবে পালিশ করা হয়েছে। ফলে
মনে পড়ে গেল গত বছরের একটা টানেলের কথা। অন্য একটা সময়ে, ভিন্ন। একটা স্থান হলেও ঠিক এটার মতই ছিল সেই টানেল। ভাবতে অবাক লাগছে যে ওই টানেল আর এখন যেখানে হামাগুড়ি দিচ্ছে এই দুই টানেলের নির্মাতাদের মাঝে কোনো যোগাযোগ ছিল কিনা।
প্রায় ত্রিশফুট যাবার পর সামনে দেখা গেল একটা বড়সড় চেম্বার। উঠে দাঁড়িয়ে ভ্যান ক্লক আর বাকিদের সাথে যোগ দিল বিজয়। প্যাসেজ বেয়ে অন্যরাও চলে এলো।
“বাতি জ্বালাও।” ভ্যান ক্লক আদেশ দিতেই শক্তিশালী পোর্টেবল সার্চলাইচ জ্বলে উঠল। আলোকিত হয়ে উঠল নিচের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক ধাপ সিঁড়ি। এতটাই নিচে যে সার্চলাইটের আলোও সেই তলদেশ অব্দি পৌঁছাতে পারেনি।
কুপার সিগন্যাল দিতেই দ্রুত নিচে নেমে গেল চারজনের একটা অ্যাডভান্স টিম। নিজের ইয়ারপিসে তাদের গতিবিধি মনিটর করছে কুপার।
একের পর এক মিনিট কেটে যাচ্ছে। চুপচাপ, ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরো দল। আর তারপর বিজয়ের ধারণা মিনিট বিশেক পর, ভ্যান কুকের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল কুপার, “অল ক্লিয়ার।”
ভ্যান ক্লক সম্মতি দিতেই সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করল বাকি দল।
.
৬৯. অমৃত আর রত্ন
সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে পা দিয়ে চারপাশে তাকাতেই বিস্মিত হয়ে গেল বিজয়। সার্চলাইটের আলোতে উদ্ভাসিত হল পাথর কেটে তৈরি একটা বড়সড় হলরুম। এটা কোনো গুহাকক্ষ নয়; প্রাকৃতিক কিংবা মানুষসৃষ্টও নয়। চেম্বারে স্পষ্ট সব জামিতিক রেখা দেখা যাচ্ছে। আয়তাকার চেম্বারের দেয়ালগুলোও একেবারে মসৃণ। অন্ধকারে হারিয়ে গেছে দেয়ালের দুপাশে সারিবদ্ধ অসংখ্য দরজা। দলটার ঠিক সামনেই দেয়ালের একেবারে শেষ মাথায় একটা আয়তাকার পাথর। দেখে মনে হচ্ছে দেয়াল থেকে বের হয়েছে।’
ভ্যান কুক আর কুপারের নির্দেশে পুরো দল ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে দরজাগুলোরও পাশে দেখার জন্য ছড়িয়ে পড়ল। ভ্যান কুকের পিছু নিয়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে যাচ্ছে বিজয়; সর্বদাই ওর সাথে ঘুরছে দুজন গার্ড।
