.
৬৭. ইঁদুর দৌড়
ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকালেন প্যাটারসন। মনে হচ্ছে সারারাত এভাবেই কেটে যাবে। জয়পুর থেকে এসে আবার হাসপাতালের রুমে ফিরে এসেছেন ইমরান। সেলাইয়ের ক্ষতে ব্যথা করছে আর সারারাত ভ্রমণের ক্লান্তিও আছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ আর সার্জারির ফলে দুর্বল হয়ে পড়ায় জয়পুরের ভ্রমণ কোনো সাহায্য করেনি।
রাধার সম্পর্কে প্যাটারসনকে সমস্ত কিছু জানিয়েছেন ইমরান। পুরো সময় জুড়ে উদাসীন মুখ নিয়ে বসেছিলেন বড়সড় প্যাটারসন। এটা একটা যুদ্ধ আর আগেও দলের সহকর্মী হারিয়েছেন। তাই শোক করার জন্য পরেও সময় পাওয়া যাবে। এখনো বহু কাজ বাকি।
কিন্তু কলিনের খবর শুনে তেমন খুশি হলেন না।
“কেন এত জায়গা থাকতে কাজাকাস্তানকেই বেছে নিল?”
ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠলেন প্যাটারসন। “মাত্র কয়দিন আগেই কিরগিজস্তান থেকে সামরিক ঘাঁটি তুলে আনা হয়েছে। মধ্য এশিয়ার আর কোথাও কোনো আমেরিকান ঘাঁটি নেই। আফগানিস্তানে যতক্ষণ ছিল চাইলে ওখানকার ড্রোন ঘাটি দিয়ে বিজয়কে সাহায্য করতে পারতাম কিংবা ঝামেলা ছাড়াই বের করে নিয়ে আসতে পারতাম। ওখানে এখনো আমাদের সেনাবাহিনি আছে। কিন্তু কাজাকস্তানে ব্যাপারটা কঠিন হয়ে যাবে। পুরো অঞ্চল এখন বেসামাল হয়ে আছে। আফগানিস্তানের যে কোনো ফ্লাইটকে উজবেক আর কাজাক আকাশসীমা পেরোতে হবে। আর আফগান ঘাঁটি থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করারও উপায় নেই, ওদের এত রেঞ্জ নেই। এত স্বল্প নোটিসে মনে হয় না এসব দেশ তাদের আকাশসীমায় আমাদের ফাইটার জেটকে অনুমতি দেবে।”
“এর মানে এখন থেকে বিজয়ের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে?” সশব্দে চিৎকার করে উঠলেন ইমরান।
কাঁধ ঝাঁকালেন প্যাটারসন। “ওকে কাভার দেয়ার জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। কিন্তু দুশ্চিন্তা সেটা না। এটার জন্য ওয়াশিংটন থেকে যা যা করার আমি করব। কিন্তু ভয় হচ্ছে হাতে বোধহয় যথেষ্ট সময় নেই। যদি ওরা কাজাকের স্থানীয় সময় অনুযায়ী কাল ভোরের মধ্যেই পৌঁছে যায় তাহলে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় আছে। তাহলে এই কথাই রইল। আমি দেখছি কী করা যায়।”
“অল দ্য বেস্ট।” সাইন অফ করে মনিটরের সুইচ বন্ধ করে দিলেন ইমরান। বুকের ভেতরটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই রাধাকে হারিয়েছেন। আর প্যাটারসনও বিজয়কে সাহায্য করার ব্যাপারে তেমন কোনো আশা দিতে পারল না। খারাপ দিকগুলো ইমরান ভালোই জানেন। আর মন না চাইলেও মানতে বাধ্য হচ্ছেন যে আজ দ্বিতীয় আরেক বন্ধুকেও হারাবেন।
.
তিন ভ্রাতা
উসিয়ত মালভূমি পার হবার সময় হেলিকপ্টার দিয়ে বাইরে তাকাল বিজয়। অনেক নিচে দেখা যাচ্ছে বালুয় মোড়ানো সমতল ভূমি। ভোরের আলোয় তেমন কোনো গাছপালা চোখে পড়ছে না আর যতদূর দৃষ্টি যায় পানিও নেই। একেবারেই হতশ্রী দশা।
মরুভূমির বালি ভেদ করে ঊর্ধ্বে উঠে গেছে দানবীয় সব পাহাড়ের সারি; চুনাপাথরের পাহাড়। মনে হচ্ছে যেন মাথার উপর দিয়ে যেই উড়ে যাক না কেন সেটাকে ধরার প্রয়াস করছে। খাজ কাটা, ভাঙ্গা চূড়াগুলো কমপক্ষে ৩০০ মিটার উঁচু। সগর্বে জাহির করছে ভিন্ন ভিন্ন রঙ, শ্বেতশুভ্র সাদা থেকে শুরু করে নীল আর গোলাপি। এত উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবী নয় অন্য কোনো গ্রহ।
এখানেই কি তাহলে লুকিয়ে আছে ভাইরাসের উৎস? শীঘ্রিই জানা যাবে এর উত্তর।
আর ঠিক যেন বিজয়ের মনের কথা পড়তে পেরেই ঘুরে গেল পাইলট। স্পিকারে জানাল নিচের এই পাথুরে আকৃতিই তিন ভ্রাতা নামে সর্বাধিক পরিচিত।
“তীরের মুখ খোজো” নির্দেশ দিল ভ্যান কুক, “আমি চাই সবার চোখ যেন মাটিতে থাকে।”
বিস্মিত বিজয়ের চোখের সামনে নিচের সমতলভূমি এক বিশালাকার তীরের আকার নিল। মনে পড়ল মাইলের পর মাইল জুড়ে ভূমিতে খোদাইকৃত নাজকা আকৃতির কথা। তবে এখানে তীর ছাড়া আর কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব নেই।
তীরগুলো একসাথে মিলে ইউ-শেপ তৈরি করায় অগ্রভাগ খুঁজে পেতে কোনো সমস্যাই হল না।
পদ্যের অর্থ বুঝতে পারল বিজয়। ভ্যান ক্লক কেন সূর্যোদয়ের আগেই পৌঁছাতে চেয়েছে তার কারণও টের পেল।
আবির্ভূত হয়েছে তিন ভ্রাতার আকৃতি। একই সাথে রাজকীয় আর ভয়ংকর। আশেপাশের পুরো অঞ্চলকে ডুবিয়ে দিয়ে খাড়াভাবে প্রকাণ্ড চুনাপাথরের বালিয়াড়ির মত গর্বিত ভঙ্গিতে ঊর্ধ্ব মুখে উঠে গেছে তীক্ষ্ণ পাথরের তিনটা কলাম। তবে পুরোটাই খালি কোনো গাছপালা নেই। সদ্যজাত সূর্যের আলোয় পূর্বদিকে আগুন ধরে গেছে।
জনমানবশূন্য মালভূমির সৌন্দর্যকেও হারিয়ে দিল প্রকৃতির এই অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি। চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ল। প্রকৃতির কোনো উপাদান যদি মৃত্যুহীন জীবন দান করতে পারে তাহলে এটাই হচ্ছে সেই শ্রেষ্ঠ জায়গা।
“তিন ভ্রাতা” এরকম সৌন্দর্য দেখে ভ্যান কুক নিজেও ‘খ’ বনে গেছে। কিন্তু হুশ ফিরতেই পুরোপুরি সামরিক কায়দায় একের পর এক নির্দেশ দিয়ে গেল।
অন্যদিকে মাটিতে পিঁপড়া সদৃশ আকৃতি চারপাশে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটা এস ইউ ভি। অ্যাডভান্স টিম।
আর তারপরেই বিজয়ের চোখে পড়ল আরেক সেট তীরের মাথা। পথিমধ্যে ফেলে আসা বাকিগুলোর মতই মালভূমির পাথর। তবে এগুলো তিনজন ভ্রাতার দিকে নির্দেশ করছে; অথচ বাকিগুলোর মুখ ছিল উত্তরে।
