“আহ, এই তো পেয়ে গেছি।” নির্দিষ্ট পাতার উপর আঙুল রেখে বলল ভ্যান কুক। “আদি পর্বের কয়েকটা শ্লোক আমাদেরকে হাজার হাজার বছর আগেকার ঘটনা জানাবে। অবশ্য শ্লোকের সত্যিকার অর্থের উপর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আর সময়ের আবর্তে হারিয়ে গেছে ঘটনাগুলোর প্রকৃত আবহ। বস্তুত এই গল্পের ইংরেজি নামটার মাঝেই গড়ল আছে। সত্য বটে সমুদ্রমন্থন বলতে মহাসমুদ্রের ঘূর্ণিও বলা যায়। তবে মন্থনের আসল শিকড় হল গণিত। ইংরেজিতে যেটার অসংখ্য অর্থ আছে। এর মাঝে একটা হল সবেগে ঘোরা। অন্য অর্থগুলোর মাঝে আছে মেশানো, নাড়া অথবা আলোড়িত করা। তার মানে ঐতিহাসিক টাইটেলটাকে ব্যাখ্যা করলে “সমুদ্রকে নাড়িয়ে দেয়া।” কিংবা “মিশিয়ে দেয়া বোঝায়।” আর তুমি নিজের চোখেই যা দেখেছ তার জন্য এটাই বেশি উপযুক্ত নয় কি? এছাড়া লেকের পাশে যে যন্ত্র দেখলাম তাতে তো তাই ঘটছে। লেকের পানি পাথরের নালা বেয়ে জলাধারে গিয়ে জমা হয় আর তারপর সমস্ত উপাদান মিশে যায়। হতে পারে যন্ত্রটা পানি তোলার সময় লেকের পানি নড়ে উঠে আর তাই লোকে এটাকে সবেগে ঘোরা” হিসেবেই ব্যাখ্যা করে। দেখা যাক আরো কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় কিনা।
মাথার উপরের বাতি জ্বালিয়ে বইয়ের পাতায় পিটপিট করে তাকাল ভ্যান কুক। “এসো, এই শ্লোকটা শোন:
देवैरसुरसंधै श्च मथ्यतां कलशोदधिः
भविष्यत्यमृतं तत्र मध्यमाने महोदधौ
শ্লোকটার ঐতিহাসিক অর্থ হল: দেবতা আর দানবদের হাতে সবেগে ঘোরার পর সমুদ্রের জল অমতের পাত্রে পরিণত হবে। কিন্তু তুমি যদি সবেগে ঘোরা বলে নাড়া কিংবা মেশানো বলল তাহলে পুরো অর্থটাই বদলে যাবে। ব্যাখ্যা হিসেবে পাবে: দেবতারা আর দানবেরা সমুদ্রের জলকে নেড়ে কিংবা মিশিয়ে
অমৃতের পাত্রে পরিণত করবেন।”
পরের শ্লোকটাও পড়ে ফেলল কুক :
सौषधीः समावाप्य सर्वरनानि चैव हि।
मन्थध्वमुदधिं देवा वेत्स्यध्वममृतं ततः
এখানকার ঐতিহাসিক অর্থ হল: সব ধরনের ঔষধি গাছ আর রত্ন অর্জনের (পর) ও ঈশ্বর, সমুদ্রকে সবেগে ঘোরাও; তাহলেই তুমি অমত পাবে।” আবারো যদি নাড়া কিংবা মিশিয়ে দেয়া ব্যবহার করো তাহলে কিউবে বর্ণিত গাছ আর ফল খুঁজে পাবে।”
যা শুনছে তা কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না বিজয়। বেড়ে উঠার দিনগুলোতে এই পৌরাণিক কাহিনি একাধিকবার শুনলেও ভ্যান কুক তার নিজের শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সব ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
“এবারে, কুনার উপত্যকায় যা পেয়েছি তার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত একটা শ্লোক শোন:
ततस्तेन सुराः सार्धं समुद्रमुपतस्थिरे।
तमूचुरमृतार्थाय निर्मथिष्यामहे जलम्
এই শ্লোকের ঐতিহাসিক অর্থ হল: “তারপর দেবতারা আর দানবেরা সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে বললেন, “অমৃতের জন্য আমরা সমুদ্রকে সবেগে ঘোরা।” এখানে মজার ব্যাপার হল, সমুদ্র বলতে “পানির সন্নিবেশকে বোঝায়। আমরা তো তাই পেয়েছি, নাকি? তাহলে এই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ হল: “তারপর দেবতারা আর দানবেরা পানির সন্নিবেশের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন অমৃতের জন্য আমরা পানিকে নাড়ব কিংবা মিশিয়ে দেব।”
তারপর কয়েকটা পাতা উল্টে আরেকটা পদ্যের দিকে ইশারা করল কুক:
“এখানেই আসছে বিজ্ঞান। তবে এই শ্লোকের সঠিক ব্যাখ্যা পাবার জন্য তোমার কিন্তু একটা খোলা মন থাকতে হবে।
तत्र नानाजलचरा विनिष्पिष्टा महाद्रिणा।
विलयं समुपाजग्मुः शतशो लवणाम्भसि
ঐতিহাসিকভাবে এর মানে হল: “তখন বিশালাকার পর্বতের চাপে চূর্ণ হয়ে বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণী একসাথে ধ্বংস হয়ে যায় আর তারপর লবণাক্ত পানিতে আরো শতবার পুনর্জাত হয়ে উঠে।” জালাকারার অনুবাদে “সামুদ্রিক প্রাণী” বলাটা আসলে শুদ্ধ নয়। এই শব্দের মানে “পানির দ্বারা বেঁচে থাকা” আর তাহলে পানিতে বসবাসরত যে কোনো প্রাণিসত্তাকেই বোঝাচ্ছে। এর মাঝে আমরা যে লেক পেয়েছি সেখানে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়াও আছে। খেয়াল করো বিনিসপিস্তা শব্দটার মানে “নিচে বোঝায়।” সবশেষে, আবারো লবণ পানির কথা উল্লেখ আছে। আম্বাসি মানে জল আর লাভানাম মানে হল লবণাক্ত। তার মানে আমরা যে লেক পেয়েছি তার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। তাহলে নতুন করে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: “সামুদ্রিক প্রাণিসত্তা অথবা ব্যাকটেরিয়া লবণাক্ত পানিতে ধ্বংস হয়েও আরো শতবার পুনর্জাত হয়ে উঠে।” আরো ভালোভাবে বললে, “রেট্রোভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণের পর তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যকে বদলে দেয়, এক ধরনের পুনর্জীবন, তাই না? তুমি কী বলো?”
“মিঃ ভ্যান কুক” স্পিকারে ভেসে এলো পাইলটের গলা, “আমরা আকতাও এ অবতরণ করতে যাচ্ছি। ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই ল্যান্ড করব।”
বই বন্ধ করে অনুসন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে বিজয়ের দিকে তাকাল ভ্যান ক্লক, “আরো অনেক কিছু আছে। অনেক, অনেক কিছু। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগেকার একটা বৈজ্ঞানিক ঘটনা মহাভারত কিভাবে বর্ণনা করেছে দেখেছ? আর এটা কোনো মহাসমুদ্র কিংবা সমুদ্র নয়, লবণাক্ত জলই হল এ ঘটনার ভিত্তি। নিজের চোখেই যা এইমাত্র দেখলে।”
মাথা নাড়ল বিজয়। মুখের ভাষা হারিয়ে যেন বোবা হয়ে গেছে। শ্লোকের পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করছে যা ভাসা ভাসাভাবে বর্ণনা করেছে এক চমৎকার ঘটনার গল্প।
