রিসেপশনের বাতি বন্ধ। নীরব দালানটা মনে হচ্ছে একেবারেই পরিত্যক্ত। সুইচ বোর্ড দেখা গেলেও কোনো জনপ্রাণী নেই। পুরো দালানের দুই তলা ছেয়ে ফেলল কমান্ডোবাহিনি। কিছুই পাওয়া গেল না। বোঝা গেল যে সকলে ইচ্ছেকৃতভাবেই স্থান ত্যাগ করে গেছে।
“সিসিটিভি আর্কাইভ চেক করো। মুছে না ফেললে হয়ত কিছু পেয়ে যাবে।” অর্জুনকে নির্দেশ দিলেন ইমরান। ডেপুটি বাকি দলকে নিয়ে আর্কাইভ চেক করতে গেলেও তিনি গ্রাউন্ড ফ্লোরেই রয়ে গেলেন। এলিভেটরের কাছে যেতেই মনে পড়ল দিল্লির মেডিকেল সেন্টারের বেসমেন্টের কথা।
লিফট চেক করে তিনটা বেজমেন্ট ফ্লোরের বাটন খুঁজে পেলেন ইমরান। কিন্তু অ্যাকসেস কার্ড ছাড়া লিফট সচল করার উপায় নেই। তবে এবার তিনি প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। তার দলের ইলেকট্রনিকস এক্সপার্ট হাতে বহনযোগ্য এমন এক মাস্টার প্রোগ্রামার বানিয়ে দিয়েছে যার মধ্যে এলিভেটরের সিকিউরিটি সিস্টেম নষ্ট করে যেখানে খুশি যাওয়া যাবে।
গুনগুন করে উঠল ইয়ার ফোন। অর্জুন। “স্যার, আপনি একটু আসবেন?”
“এক্ষুনি আসছি।” কমান্ডো টিমের কাছে যাবার জন্য ঘুরলেন ইমরান। “অ্যাকসেস পেলেই সব ফ্লোর খুঁজে দেখ! শেষ করেই আমাকে রিপোর্ট করবে। আমি জানতে চাই নিচে কী আছে।”
খানিক বাদেই সিকিউরিটি সেন্টারে অর্জুনের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“স্যার, অদ্ভুত একটা জিনিস পেয়েছি।” ইমরানকে দেখানোর জন্য ভিডিও ক্লিপ প্লে করার আগে জানাল অর্জুন, “আর্কাইভস, একেবারে ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলা হয়েছে। একটা বাদে আর কোনো রেকর্ডিং নেই। এটাই মাথায় ঢুকছে না। সব মুছে ফেললেও একটা কেন রেখে গেছে?”
“চলো, দেখাও।” শক্ত হয়ে গেল ইমরানের চেহারা। কেন যেন মনের মাঝে অশনি সংকেত বেজে উঠেছে। মানে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যেই রেখে গেছে এই ক্লিপ। তাই সন্দিগ্ধ চোখে মনিটরের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
ভিডিও ক্লিপে দেখা গেল মেঝেতে ল্যাপটপের উপর ঝুঁকে বসে আছে। রাধা।
সাথে সাথে সচকিত হয়ে উঠলেন ইমরান। বুঝতে পারলেন কী ঘটছে। মনে হচ্ছে তাল হারিয়ে পড়ে যাবেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়াল রাধা। সাবধানে চার পাশে তাকিয়ে হাঁটা আরম্ভ করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পর্দার কিনারে আরেকটা দৃশ্য দেখাল অর্জুন। অডিও না থাকলেও তিনজন গার্ড যে তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে রাধাকে গুলি করছে তা বুঝতে কোনো
অসুবিধাই হল না। আতঙ্কে জমে গেলেন ইমরান। রক্তের সমুদ্রে ডুবে গেল রাধা। মেয়েটার ক্ষতস্থানের রক্ত ছড়িয়ে পড়ল মেঝের সর্বত্র।
তারপর হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল ভিডিও ক্লিপ।
ইমরানের পায়ে যেন শেকড় গজিয়ে গেছে। একেবারে অথর্বের মত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখের সামনে এইমাত্র রাধাকে মারা যেতে দেখেছেন।
.
৬৬. ষষ্ঠ দিন
সমুদ্র মন্থন
ভ্যান ক্লকের অতিশয় আরামদায়ক আর জাকজমকপূর্ণ গাম্ফস্ট্রিম জেটের পেটে বসে আছে বিজয়। গন্তব্য কাজাকাস্তানের আকর্তাও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; যেখান থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে কলিনের বর্ণিত অবস্থানে পৌঁছে যাবে। তাদের আগমনের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছে একদল সশস্ত্র প্রহরী। সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে অর্ডার যখন যেখানে খুশি তাদের লোকজন আর অস্ত্রশস্ত্র পাঠিয়ে দিতে পারে।
বাইরে এখনো রাত। ভ্যান ক্লকের চাপে তৎক্ষণাৎ রওনা দিতে হয়েছে। সূর্যোদয় হবার আগেই মালভূমিতে পৌঁছাতে চায়। কী খুঁজছে জানলেও দিনের কোন সময়টার ছায়া পড়ে উন্মোচিত হবে ভাইরাসের উৎস সেই গোপন প্রবেশপথ সে সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা নেই। তাই সকালে অবতরণ করাটাই সবচেয়ে নিরাপদ হবে।
ইতোমধ্যেই আকর্তাও থেকে রওনা হয়ে গেছে একটা অ্যাডভ্যান্স টিম। সারা দিনের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করে ফোর হুইল ড্রাইভে চড়ে বালি আর কাদাময় পথ পাড়ি দিয়ে ৪০০ কি. মি. দূরত্বে পৌঁছে অপেক্ষা করবে মূল দলের জন্য আর একই সাথে পুরো এলাকা টহল দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও তাদের হাতে।
হঠাৎ করেই বিজয়ের মাথায় একটা চিন্তা এলো। কুনার উপত্যকায় ভ্যান ক্লকের ধারণাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তারপরেও কেন যেন মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছে না।
ভ্যান কুকের সাথে ক্রসচেক করল নিজের ধারণা।
“অবশ্যই আমরা যা পেয়েছি তা মহাভারতেই লেখা আছে।” ঘোৎ ঘোৎ করে উঠল ভ্যান কুক, “তোমাকে কেবল পদ্যগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা করতে হবে।” উঠে কেবিনেটের কাছে গিয়ে মোটাসোটা একটা বই তুলে এনে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বলল, “সংস্কৃত বোঝো?”
মাথা নেড়ে না বলল বিজয়।
“হুমম, বেশিরভাগ ভারতীয়েরই একই অবস্থা।” কণ্ঠের হতাশা লুকাতে পারলেন না ভ্যান কুক, “আমি এ ভাষা গড়গড় করে পড়তে পারি।” বললো, “চলো তোমাকে ব্যাখ্যা করে শোনাই।”
বইটা খুলে একের পর এক পাতা উল্টে বলল, “এটা আদি পর্বের ভলিউম মহাভারতের একেবারে প্রথম বই। এখানেই সমুদ্রমন্থনের গল্পটা আছে।”
প্রথমবারের মত বিজয় উপলব্ধি করল যে ইউরোপীয় ক্লকের সংস্কৃত উচ্চারণ একেবারে নিখুঁত। শুধু অন্যান্য পশ্চিমাদের মত খানিকটা টান আছে। হয়ত একেবারে ছোট বয়সে শিখেছে। তারপর বছরের পর বছর ধরে পরিচর্চা করে সংস্কৃত পড়া আর লেখায় এতটা দক্ষতা আয়ত্ত করেছে।
