“ওরা হচ্ছে সব বেকুবের দল।” বিড়বিড় করে উঠলেন সাক্সেনা, “পুরো বিষয়টাকে আরো জটিল করে তুলছে। কিন্তু আমি হতাশ নই। মেয়েটা মারা গেলেও বিজয় সিং তো আর জানতে পারছে না। এরই মাঝে কুপারকে জানিয়ে দিয়েছি। সে সব সামলে নেবে।”
কৌতূহলী হয়ে উঠল ফ্রিম্যান। “তাহলে তুমি কেন মেয়েটার শরীরে ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার ককটেইল ইনজেকশনের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দিয়েছ? বুলেট না মারলেও এতেই মারা যাবে মেয়েটা। আমরা তো ভালোভাবেই জানি। এই পরীক্ষার পর এখন পর্যন্ত একজনও বেঁচে ফেরেনি। আর তুমি তো ওকে আরো একস্ট্রা একটা ভোজ দিয়েছ।”
মাথা ঝাঁকালেন সাক্সেনা, “আমি তো ভেবেছিলাম যে এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য বড় একটা সুযোগ পাওয়া গেল। এর আগে ঢোজ দেয়ার জন্য মারাত্মক ক্ষত সমৃদ্ধ সুস্থ কোনো সাবজেক্ট পাওয়া যায়নি। দেখা যাক কী ঘটে। খুব বেশি খারাপ নিশ্চয় হবে না। কারণ মেয়েটা এমনিতেই মারা যাবে। কিন্তু চমৎকার কিছু হলেও হতে পারে” মনে নেই আলেকজান্ডারের মমিতে কী পেয়েছিলাম?”
সম্মত হল ফ্রিম্যান। “হুম, মনে আছে। আর ছয় মাস গেলেই আমার এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল জেনে যাবে।” তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল, “আশা করছি কেউ এতে আহত হবে না।”
চারপাশে তাকালেন সাক্সেনা, “চলো এখান থেকে চলে যাই। এক অর্থে ভালই হল যে আমি এখানে থাকাকালীন মেয়েটা ই-মেইল পাঠিয়েছে। অন্তত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে স্থান ত্যাগের সময়টাতে পাওয়া গেল। এরই মাঝে সার্ভারও মুছে ফেলা হয়েছে। তাই ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চাইলেও কোনো তথ্য পাবে না। ফলে টাইটানের সাথে এই ফ্যাসিলিটিকে জড়াবার কোনো উপায়ও রইল না। তারপরেও আইবি’র জন্য ছোট্ট একটা জিনিস রেখে যাবো।”
মাথা নাড়লো ফ্রিম্যান। জানে সাক্সেনা কিসের কথা বলছে। “আহারে, সব নমুনাগুলোকে এখানে ছেড়ে যেতে হবে।”
“কোনো ব্যাপার না।” উত্তরে জানালেন সাক্সেনা, “আমাদের কাছে তো ওদের ইতিহাস আর রেজাল্ট আছে। ইতিমধ্যেই যে ফলাফল পেয়েছি তা ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নমুনার উপর পরীক্ষা শুরু করতে কোনো সমস্যাই হবে ন। এছাড়া নমুনারই হয়ত আর কোনো প্রয়োজন নেই। কুপার যদি একবার উৎসের স্যাম্পল খুঁজে পায় তাহলেই কেল্লা ফতে।”
পরস্পরের দিকে তাকাতেই খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল দু’জনের চেহারা। যেভাবেই হোক না কেন মিশন সফল হবেই। এখন পথের কাঁটা বলতে আর কিছুই রইল না।
.
৬৪. দুধেল মহাসমুদ্র
একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে বিজয়। চারপাশে কেবল জল আর জল। বিশাল অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে যে একেবারে কাছের তীর ছাড়া আর কোন কিনার চোখে পড়ছে না। যতদূর দৃষ্টি যায় পুরো গুহাকক্ষে ছড়িয়ে আছে লেক।
কিন্তু এ আবিষ্কার তাকে স্তম্ভিত করেনি। ভ্যান ক্লকের কাছ থেকে আগেই ধারণা পাওয়ায় এরকম বৃহৎ জলাধারের আশাই করেছিল। অথচ এখন লেকের দৃশ্য দেখে দম বন্ধ হবার জোগাড়।
সার্চলাইটের আলোয় রূপালি সাদা দ্যুতি ছড়াচ্ছে পুরো লেক। এতক্ষণে পৌঁছে গেছে বাকি দল। সকলেরই অবস্থান বিজয়ের মতন। বিমূঢ় হয়ে দেখছে। সামনের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য। সার্চলাইটের আলো পড়ে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। স্থির, নিশ্চল রূপালি-সাদা জল।
“এ কারণেই তারা এটাকে দুধেল মহাসমুদ্র বলত।” বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে উঠল ভ্যান কুক।
কিন্তু বিশালাকার এ গুহাকক্ষে লুকিয়ে আছে আরো অনেক বিস্ময়। সিঁড়িপথের পাশের দেয়ালে সার্চলাইটের আলো ফেলতেই দেখা গেল সুবিন্যস্ত ধাতব পাইপ আর পাথরের নালা। লেকের দিক থেকে এসে বড়সড় একটা পাথরের গহ্বরে শেষ হয়েছে নালা। অন্যান্য পাইপ আর নালাগুলো এসে আরো অসংখ্য পাথরের জলাধারের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছে বিশাল এক ধাতব যন্ত্র। যা তাদের মাথার উপরে উঁচু হয়ে আছে। পাইপ আর যন্ত্রটার নির্মাণে ব্যবহৃত ধাতু সম্পূর্ণ কালো। অথচ সার্চলাইটের আলো ধাতুর গায়ে এক ফোঁটাও মরিচা খুঁজে পেল না। বিজয়ের মনে পড়ল গত বছরের গোলাকার ধাতব ডিস্কটার কথা। পুরো যন্ত্রটা দেখে ঠিক যেন ইউএসে দেখা ছোট ছোট মদ চোলাইয়ের যন্ত্র বলে মনে হল।
হঠাই চিৎকার করে উঠল কুপারের বাহিনির একজন, “এখানে কিছু একটা নড়ছে!”
সাথে সাথে সবকটা সার্চলাইটের আলো ঘুরে গেল সেদিকে। সবাই স্থীর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এক মুহূর্তের জন্য কিছুই ঘটল না।
আর তার পরপরই আলোর কিনারে কী যেন একটা দুলে উঠল। বড়সড়, গোলাকার দেহ। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সার্চলাইটের পুলে টলতে লাগল একটা বিশালাকার কচ্ছপ। এতবড় যে চওড়ায় অন্তত বিশ ফুট হবে। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না বিজয়। ধীরে ধীরে হেঁটে আলোর সীমারেখা পেরিয়ে ওপাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেল জন্তুটা।
“ওকে, কাজে লেগে পড়ল সবাই।” আদেশ দিল ভ্যান কুক। পরবর্তী দশ মিনিটের মাঝেই স্যাম্পল সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে ফেলা চাই। তারপর এখান থেকে বেরিয়ে যাবো।”
লেকের তীরে গিয়ে রূপালি উপরিভাগ পরীক্ষা করে দেখল বিজয়। বিশ্বাস করা শক্ত যে পৌরাণিক কাহিনিতে এ জলাধারের কথাই বলা হয়েছে। যদিও সে পানির রঙের সত্যিকার কারণটা জানে। দ্য গ্রেট আলেকজান্ডারের মমিতে অর্ডার যে ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পেয়েছে এটাই হল তার উৎস। দুই হাজার তিনশ বছর আগেকার সেই নিয়তিনির্দিষ্ট রাতে তিনি এই লেকের পানিই পান করেছিলেন।
