আজ আর হাতে কোনো অপশন নেই। তাই নিজের ভাগ্যের কথা ছেড়ে আরো বড় কিছু ভাবার কথা ঠিক করল। মানুষের জীবনকালই যদি অর্ডারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; তাহলে ওদের হাতে এসে যাবে সর্বময় ক্ষমতা। পৃথিবী পরিণত হবে অর্ডারের ভূতত্য। না জেনে এমনটা করলেও রাধা এটা হতে দিতে পারে না। আর দেবেও না।
তার চেয়ে ভালো নিজের পরিকল্পনা মত কাজ করা। প্রায় পৌঁছে গেছে বলা যায়।
“সামনে হাঁটুন।” উত্তরের পরিবর্তে সাক্সেনাকে আদেশ দিল রাধা।
একটা অফিসে ঢুকে ডেস্কের উপর রাখা ল্যাপটপে ওয়েব ব্রাউজার ওপেন করে দিলেন সাক্সেনা। পর্দায় ব্রাউজার দেখা দিতেই বললেন, “গো এহেড।”
চারপাশে তাকাল রাধা। মেইল-টাইপ করার সময় চায় না যে সাক্সেনা পাশে থাকুক। ইলেকট্রিক লাঠিটাকে নামিয়ে রাখতে হবে আর তাহলেই ধরা পড়ার সম্ভানা আছে। কিন্তু রুমে এমন কিছু দেখা যাচ্ছে না যা ওর কাজে লাগতে পারে।
তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হল। “এখানে বসুন” ডেস্কের চেয়ার দেখিয়ে দিল রাধা। শান্তভাবে চেয়ারে বসে পড়লেন সাক্সেনা। তাকিয়ে দেখলেন পাওয়ার কেবল থেকে ল্যাপটপের প্লাগ খুলে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাধা। বুঝতে পারলেন ও কী করবে।
“যাবার আগে শুনে যাও” পেছন থেকে বললেন সাক্সেনা, “যখন এসব শেষ করে তুমি তোমার সেলে ফিরবে তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে বাকি জীবন তোমার যাতনাভোগ নিশ্চিত করব। এটা আমার প্রতিজ্ঞা হিসেবে ধরে নাও।”
মনে মনে অসম্ভব ভয় পেয়ে গেল রাধা। জানে সাক্সেনা নিজের প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কিন্তু পরিকল্পনা করার সময়েই নিজের ভাগ্যের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছে। তাই যা খুশি হোক, কোনো পরোয়া নেই।
রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে হুড়কো টেনে দিয়ে দ্রুত নিজের ই মেইল অ্যাকাউন্ট ওপেন করল। সেল থেকে রাধার পালিয়ে আসা, এতক্ষণ কারো নজরে না পড়লেও এখন নিশ্চয় ভেতর থেকেই অ্যালার্ম বাজিয়ে দেবেন সাক্সেনা। তাই নিজের কাজ সমাধা করতে হয়ত হাতে কেবল কয়েক মিনিট সময় পাবে।
যত জনের কাছে সম্ভব মেসেজ পাঠানোর জন্য দ্রুত হাতে টাইপ করল রাধা। ওরা কখন দেখবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আশা শুধু এতটুকুই যেন দেরি না হয়ে শীঘি হয়।
সেন্ট বাটনে চাপ দেবার পর ফিরতি কনফার্মেশন মেসেজও পেয়ে গেল। ল্যাপটপ নিচে নামিয়ে দরজার গায়ে ধপ করে বসে পড়ল। সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল এতক্ষণের আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা।
নিজের সাথে বলতে গেলে যুদ্ধ করেই কোনোরকম আবার উঠে দাঁড়াল। সিকিউরিটি গার্ডদের এখনো কোনো পাত্তা নেই। হয়ত হাতে তাহলে আরো সময় পাওয়া যাবে।
সাদা দরজাগুলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল, যেগুলোর পেছনে সাক্সেনার কথা মত লুকিয়ে আছে ওর মুক্তি।
এতক্ষণ তো সবকিছু ভালোই এগোল। তার মাত্র কয়েক ফুট।
ঠিক তখনি সত্য হল রাধার দুঃস্বপ্ন। স্বাধীনতার দরজা হঠাৎ করেই নরকের দরজায় পরিণত হল। ঝট করে দরজা খুলেই হাতের অস্ত্র নাড়তে নাড়তে ওর দিকে ধেয়ে আসছে তিনজন সশস্ত্র গার্ড।
রাধা উপলব্ধি করল যে ওর খেলা শেষ। বাইরের দুনিয়া আর দেখা হল না।
.
৬০. পথ দেখিয়ে দিল শুক্র
স্থির দৃষ্টিতে উত্তর-পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বিজয়। মনে মনে চাইছে যেন কলিনের কথা মতই সবকিছু ঘটে।
পেছনে দাঁড়িয়ে অধৈর্য হয়ে শব্দ করছে ভ্যান ক্লক। নির্বিকার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুপার। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে নিজের শঙ্কাও প্রকাশ করেছে।
সূর্যের শেষ রশ্মিটুকুও মুছে দিয়ে শুরু হল অন্ধকারের রাজত্ব।
“জানো” ভ্যান ক্লক কিছু বলতে শুরু করলেও হঠাৎ যেন জমে গেল।
বিজয় নিজেও দেখতে পেয়েছে। শুরু হয়েছে।
“ভালো ভাবে লক্ষ্য করো।” অন্যদেরকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে নির্দেশ দিয়ে বলল, “কোথায় দেখা যাবে তার একেবারে সঠিক নোট রাখা চাই।” চট করে একবার পেছনে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল যে ছোট্ট চোরাকুঠুরির পাথরের চিত্রের সামনে কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
চোখের সামনে রাতের আকাশ চিরে ফুটে উঠল উজ্জ্বল আলোর একটা বিন্দু। অন্যান্য তারার চেয়েও এত দ্বীপ্তিময় যে এর আলোয় ফিকে হয়ে পড়েছে।
বাকিদের আলো।
দিনের আলোর মাঝে বন্দী হয়ে থাকা শুক্রের আভা মুক্তি পাবার সাথে সাথে আলোকিত করে তুলল চোরা কুঠুরির পাথরের গায়ে খোদাইকৃত পাঁচ মাথাঅলা তারা।
“এই তো, পেয়ে গেছি!” তীক্ষ্ণস্বরে চেঁচিয়ে উঠল বিজয়, “এটাই শুক্র। পশ্চিম দুনিয়ার কাছে পরিচিত ভেনাস গ্রহ। আর এর ঠিক নিচেই পর্বতের মাথায় খুঁজে পাবো শিবের লাঠি! এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়।”
এবারে বুঝতে পারল চোরা কুঠুরির উপরকার ফাটলের উদ্দেশ্য। এটা আসলে আলো প্রবেশ করার জন্য দেওয়ালে বসানো জানালা। যেন গ্রহের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠে চোরা কুঠুরির গায়ে খোদাইকৃত তারা।
সবাই নিঃশব্দে উঠতে শুরু করল বিজয়ের নির্দেশিত জায়গায়। দ্বিতীয়বারের মত চোরাকুঠুরির দিকে তাকাল কুপার; যেন যা দেখছে তা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
এখন বোঝা গেল আলেকজান্ডার কেন রাতে এসেছিলেন; আপন মনেই ভাবল বিজয়। শুধু যে সৈন্যদের কাছ থেকে নিজের মিশন গোপন করতে চেয়েছেন তা নয়; বরঞ্চ শিবের লাঠির অবস্থান জানার জন্য শুক্র গ্রহের আলো প্রয়োজন ছিল।
