কিন্তু যদি ওর ধারণা সঠিক না হয় তো…
সাক্সেনাকে অফিসেই পাওয়া যাবে ভেবে এগিয়ে চলল রাধা।
স্বস্তি পেল দেখে যে কম্পিউটার মনিটরের সামনে বসে নোটবুকে হিজিবিজি কীসব লিখছেন সাক্সেনা।
সন্দেহের দোলাচলে দুলে উঠল রাধার মন। কিন্তু এসে যখন পড়েছে ঢুকতেই হবে। ফেরার আসলেই কোনো পথ নেই। সময়ও দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরাতে নিশ্চয়ই ওর প্রতিটা গতিবিধি ভিডিও হয়ে গেছে। কেউ না কেউ দেখেই ফেলবে যে এখানে এসেছে। তাই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।
চট করে রুমে ঢুকেই দরজা আটকে দিল রাধা। ভেতর থেকে বন্ধ করে দিতেই অবাক হয়ে তাকালেন সাক্সেনা।
বিস্ময় কেটে গিয়ে প্রথমে চমকে উঠলেও তারপর কী ঘটছে বুঝতে পেরেই রেগে উঠলেন ডাক্তার।
“চুপ।” সাক্সেনা কিছু বলার আগেই ডেস্কের উপর ইলেকট্রিক লাঠি দিয়ে বাড়ি দিল রাধা।
লাঠিটাকে ঠিকই চিনতে পারলেন ভাইরাসবিদ। কেঁপে উঠে তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে গেলেন। হেসে ফেলল রাধা। যা ভেবেছিল লোকটা ঠিক তাই। এতদিন সবার উপরে চোটপাট করলেও এখন ভয়ে আধমরা হয়ে যাচ্ছেন।
“তুমি জানো যে এটা দিয়ে পার পেতে পারবে না?” রাধাকে সাবধান করে দিলেও কথা বলার সময় নার্ভাস ভঙ্গিতে লাঠি আর মেয়েটার উপর চোখ বোলাচ্ছেন সাক্সেনা, “একটু পরেই সিকিউরিটি এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।”
“ততক্ষণে আমার কাজ সারা হয়ে যাবে।” পাল্টা উত্তর দিল রাধা, “ইন্টারনেট ব্রাউজার ওপেন করুন।” কথা বলার সময় তীব্র বেগে ঘোরাল হাতের লাঠি।
“এত বড় সাহস!” একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন সাক্সেনা। “চেষ্টা করে দেখুন কিছু করতে পারেন কিনা।” রাধা জানে তার পালানোর সম্ভাবনা অতি নগণ্য। আর সাক্সেনা প্রতিশোধ নিতেও পিছ পা হবেন না। কিন্তু বাইরের দুনিয়াকে এই ফ্যাসিলিটির খবর জানাতেই হবে। তার ভাগ্যে যাই থাকুক না কেন। তাই বাইরে মেসেজ পাঠাবার এটাই একমাত্র সুযোগ। নতুবা আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
মেয়েটার চেহারায় দৃঢ় সংকল্পের ছাপ দেখতে পেলেন সাক্সেনা। তার নিজেরও কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। এতদিন তার হাতেই ছিল সব ক্ষমতা। শাস্তি কিংবা পুরস্কার যাই হোক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি। তাই বলতে বাধা নেই যে কাজটা তিনি অত্যন্ত উপভোগ করেন। তবে এবারে পাল্টে গেছে খুঁটির চাল। যার একফোঁটাও সহ্য হচ্ছে না। কেমন যেন বমি বমি লাগছে। শীত করছে। মনে পড়ে গেল বিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা-সিগারেট হাতে বয়েজ রুমে ধরা পড়েছিলেন। সেই অপরাধের শাস্তি স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে। এই ঘটনার পর থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনিই হবেন সর্বেসবা। যেন অন্যদেরকে শাস্তি দিতে পারেন।
অথচ আজ, এত বছর পরে আবার ফিরে গেছেন বয়েজরুমে। লাঠি হাতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। তাকে আঘাত আর অপদস্থ করার সমস্ত ক্ষমতা এখন ওর হাতে।
বহু বছর পরে তীব্র ভয়ের স্বাদ পেলেন সাক্সেনা। কিন্তু পুরোটাই একতরফা। এছাড়া মানসিক আর শারীরিক আরেকবার আঘাত পাবার কথা চিন্তাই করতে পারেন না। “ফাইন। আমি সহযোগিতা করব। কিন্তু তুমি তো এখান থেকে বাইরে ই-মেইল পাঠাতে পারবে না। এটা একটা সিকিউর ফ্যাসিলিটি। কোথাও কোনো ধরনের মেইল কিংবা ফোন করা যায় না। আমাদেরকে উপরে যেতে হবে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে।”
“ফাইন। তাহলে চলুন।” দরজার দিকে ইঙ্গিত করল রাধা।
দুজনে একসাথেই অফিস থেকে বের হল। রাধা সাক্সেনার কাছাকাছিই রইল। যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে ইলেকট্রিক লাঠিটাকে ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু অবাক হয়ে দেখল যে ও নিজে যেদিক দিয়ে এসেছে সেই বামদিকের লিফটের পরিবর্তে সাক্সেনা ডান দিকে মোড় নিলেন-করিভোরের একেবারে শেষ মাথার বিশাল সাদা দরজাটার দিকে। রাধা ভেবেছিল হয়ত অন্য কোন সিঁড়ি; কিন্তু ওর ধারণা ভুল।
সাক্সেনা নিজের অ্যাকসেস কার্ড ব্যবহার করতেই দরজা খুলে উনোচিত হল আরেকটা লিফটের ল্যান্ডিং। রাধা যতটা ভেবেছিল এই ফ্যাসিলিটি তার চেয়েও কয়েক গুণ বিশাল। কিন্তু কেন যেন তেমন বিস্মিত হল না; ডানে যে কাজ হচ্ছে তাতে এরকমটাই লাগার কথা।
তারা এলিভেটরে চড়ে বসতেই সাক্সেনা নিজের কার্ড অ্যাকসেস করে গ্রাউন্ড ফ্লোর বেছে নিলেন। উঠতে শুরু করল এলিভেটর।
এবার রাধা উপলব্ধি করল যে এই লিফটে আগে থেকেই পেশেন্টদের আটটা ফ্লোর প্রোগ্রাম করা আছে। তার মানে ল্যাবের কর্মীরা ওসব ফ্লোরে যেতে পারে না।
থেমে গেল এলিভেটর। দরজা খুলতেই দেখা গেল ডান-বাম উভয় দিকেই কেবল সারি-সারি দরজা। সাক্সেনা ডান দিকে মোড় নিতেই পিছু নিল রাধা।
“ওই দরজাগুলোর পেছনে কী আছে?” পেছনের দিকে ইশারা করে জানতে চাইল রাধা।
“রিসেপশন আর মেইন ক্লিনিকের দরজা।” মুখ গোমড়া করে উত্তর দিলেন সাক্সেনা। চিন্তিত ভঙ্গিতে রাধার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাকে ভয় দেখিয়ে মেসেজ পাঠানো সম্পর্কে এখনো চাইলে নিজের মত বদলাতে পারো।” ইলেকট্রিকের লাঠির প্রতি ইশারা করে বললেন, “আর অ্যাকসেস কার্ড ব্যবহার করে বরঞ্চ ওই দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।”
ক্রোধে জ্বলে উঠল রাধা। বুঝতে পারল সাক্সেনা ব্যঙ্গ করছেন। স্বাধীনতার একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। বাইরের মুক্ত দুনিয়া আর তার মাঝে আছে কেবল এক সারি দরজা। কিন্তু একই সাথে এটাও জানে যে পালিয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। এতক্ষণে নিশ্চয় সবাই সর্তক হয়ে গেছে আর সিসিটিভি মনিটরে বসে দেখছে ওর গতিবিধি।
