মিনিট খানেকের জন্য দাঁড়িয়ে সাজিয়ে নিল আরেকটা আইডিয়া। তেমন একটা ভরসাযোগ্য না হলেও হাতে আর কোনো অপশন নেই।
খুলে গেল লিফটের দরজা। দম বন্ধ করে ইলেকট্রিক লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল যেন কেউ বের হলেই তার উপর ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু নাহ, ভেতরে কেউ নেই। লাফ দিয়ে ঢুকেই আগেরবারের ফ্লোরের বোতাম টিপে দিল। গার্ডের অ্যাকসেস কার্ড ঢোকাতেই সচল হয়ে উঠল লিফট।
দ্রুত আর নিঃশব্দে কাঙিক্ষত ফ্লোরে পৌঁছে গেল লিফট। নীরবে খানিকটা খুলে গেল দরজা।
দুরু দুরু বুকে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল রাধা। নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকতে চাইলেও যেন ভেতর থেকে চিৎকার করছে সমগ্র সত্তা, দরজাটা আবার বন্ধ করে নিজ সেলে ফিরে যেতে বলছে।
কিন্তু এখন আর ফেরার উপায় নেই। অনেক দূর চলে এসেছে। গার্ডের উপর আক্রমণের কথা চাপা থাকবে না। কিংবা এর পরিণাম থেকে পালাতেও পারবে না।
তাই গভীরভাবে নিশ্বাস নিয়ে লিফটের বাইরে পা ফেলল রাধা।
.
জাদুর জন্য অপেক্ষা…
ফোন কেটে দিল বিজয়। কলিনের কথায় অবশ্যই যুক্তি আছে। আর অন্য কোনো আইডিয়া মাথায়ও এল না। শুধু এটুকুই আশা যেন তাদের দু’বন্ধুর ধারণাই সঠিক হয়।
আগ্রহ নিয়ে বিজয়ের দিকে তাকাল ভ্যান কুক। “আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।” কলিন কী কী বলেছে সব খুলে বলল বিজয়। “হয়ত আর একটুক্ষণ হলেই চলবে। সূর্য প্রায় ডুবে গেছে। এখন উত্তর-পশ্চিম দিকে তাকাতে হবে।”
ভ্যান ক্লকের চোখে সংশয় দেখা দিল, “তুমি নিশ্চিত যে এটা কাজ করবে? আমার কাছে তো সব আবোল-তাবোল মনে হচ্ছে।”
“খানিকক্ষণের মাঝেই যা দেখবে তারই মত দেবতাদের রহস্যের মাঝেও লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান।” নির্দ্বিধায় বলে উঠল বিজয়।
দিগন্তের আড়ালে নেমে গেল সূর্য। অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরো পর্বতমালা। সবাই মিলে সাগ্রহে অপেক্ষা করায় ভারী হয়ে উঠল এ নীরবতা।
বেশ কয়েক মিনিট পার হয়ে গেলেও কিছুই ঘটল না। দরদর করে ঘামছে বিজয়। আদৌ কি কিছু ঘটবে?
.
হাসপাতালে
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মুখ বিকৃতি করলেন ইমরান। ব্যথায় নয়; বরঞ্চ এটা ভাবতেই বিরক্ত লাগছে যে সবাই যখন রাধাকে খুঁজছে তিনি তখন বিছানায় শুয়ে আছেন। আর তাকে যারা মারার চেষ্টা করেছে তাদেরকেও তো খুঁজে বের করতে হবে।
গতকাল এসে এ পর্যন্ত যা যা হয়েছে তার সবকিছু জানিয়ে গেছে বিজয়। ছেলেটাকে দেখে ইমরানও খুশি হয়েছেন।
“আমরা তো আরো ধরেই নিয়েছিলাম যে আপনি মারা যাচ্ছেন। তারপর বিজয় বলেছে, “ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে কিছু হয়নি।”
“এই আর কি।” দুর্বলভাবে হেসেছেন ইমরান। এ্যাপনেল তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আর ধমনিগুলোকে মিস করে যাওয়ায় এই যাত্রায় টিকে গেছেন। জানালার কাঁচ ভাঙ্গার সাথে সাথে তৎক্ষণাৎ পাশের রুমে ঝাঁপিয়ে পড়ার বুদ্ধিটা মাথায় আসাতে বেঁচে গেছে জীবন। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে দুর্বল হয়ে পড়লেও লড়াই করার জন্য এখনো অটুট আছেন। সত্যিই তাই; তিক্ত হল ইমরানের চেহারা।
এরপর রাধার কথা শুনে তো চমকে গেছেন। আরো অবাক হয়েছেন এই শুনে অপহরণের পর দু’দিন পার হয়ে গেলেও মেয়েটার কোনো খবরই বের করা যাচ্ছে না। ঠিক যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
বিজয় চলে যাবার সাথে সাথে তাই বৈদ্যকে ফোন করে রাধার খোঁজে নামার অনুমতি চেয়েছেন ইমরান। এও জানিয়েছেন যে হাসপাতালের রুমে শুয়েই টাস্ক ফোর্সের কাজ করবেন।
বাধ্য হয়েই রাজি হয়েছেন বৈদ্য; জানেন যে ইমরানের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ হবে না। তাছাড়া এটাও ঠিক যে ফিল্ডে যেতে না পারলে কি হয়েছে; রুমে থেকেই সবকিছু তদারকি করতে পারবেন ইমরান। কেননা তিনিই তো টাস্ক ফোর্সের ভারত প্রধান।
ফলে ইমরানের রুম এখন একটা ছোটখাটো আইটি সেন্টারে পরিণত হয়েছে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে একগাদা তার, যন্ত্রপাতি, রাউটার আর সার্ভার। বিভিন্ন এঙ্গেলে স্থাপন করা হয়েছে তিনটা ফ্ল্যাট স্ক্রিন মনিটর। বিভিন্ন লোকেশনে যেসব টিম কাজ করছে তাদের সার্বক্ষণিক সচল চিত্র প্রচার করছে এসব মনিটর। একটা মনিটর আবার সরাসরি প্যাটারসনের সাথে সংযুক্ত।
সারা দিন বিভিন্ন দলের সাথে আলোচনা করেন ইমরান; তাদের প্রধান খবর বিশ্লেষণ করে বুঝতে চেষ্টা করেন যে কী ঘটছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না।
কিছুই না।
যেন রাধার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে।
.
৫৯. সাহায্যের হাত
দিনের শুরুতেই সাক্সেনা যেখানে নিয়ে এসেছিলেন ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে এল রাধা। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে চলাফেরার চেষ্টা করছে। এতক্ষণ পর্যন্ত ভাগ্য যথেষ্টই সহায়তা করেছে। আগের বারের মতই করিডোরের দু’পাশের বেশির ভাগ দরজাই বন্ধ। আর কয়েকটা খোলা থাকলেও ভেতরে ল্যাবরেটরি কোট পরিহিত কর্মীরা এতটা ব্যস্ত যে করিডোরে কী হচ্ছে তাতে কারো কোনো খেয়ালই নেই।
রাধা লক্ষ করে দেখল যে কোথাও কোনো মেয়ে নেই। শুধু পুরুষ। বিস্মিত হয়ে ভাবল এর কারণ কী। যাই হোক এখন সেসব নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। এমনিতেই পাকস্থলীর মাঝে গুলিয়ে উঠছে ভয়। মনে হচ্ছে ক্রমেই এগিয়ে এসে ওর চেতনা গ্রাস করে নেবে।
বিভিন্ন সময়ে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে খুব কাছ থেকে সাক্সেনাকে পর্যবেক্ষণ করেছে রাধা। উপসংহারে পৌঁছেছে যে লোকটা দুর্বলদেরকে ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করেন। আর তাই অন্যদের উপর প্রভাব খাটাতে পারলেই স্বস্তি বোধ করেন। আশেপাশের মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা, তারা কখন খুশি হবে আর কখনই বা দুঃখ পাবে তা নির্ণয় করার মাধ্যমে সঞ্চয় করেন নিজের আত্মবিশ্বাস। তাই রাধা আশা করছে নিজ অন্তরে লোকটা হবেন পুরোপুরি একটা কাপুরুষ আর ভীতুর ডিম। কেননা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে সাক্সেনার এরকম আচরণের পিছনে আছে তার অভ্যন্তরের অনিরাপত্তা বোধ আর বিভিন্ন ধরনের মনোবিকৃতি। নিজের চেয়ে ক্ষমতাবান কারো সামনে পড়লে কুঞ্চিত হয়ে আত্মসমর্পণ করবে আর তখনই হবে রাধার জিত।
