সার্চলাইট হাতে সশস্ত্র দুই লোকের সাথে গোধূলি আলোয় ঘুরে বেড়াচ্ছে বিজয়। যে ঘটনার অভিজ্ঞতা নেই কিংবা যে দৃশ্য আগে দেখা হয়নি তা মনে পড়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি হচ্ছে। মনে পড়ল যে গত বছর ঠিক একই ধরনের একটা অভিযানে গিয়েছিল। তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পথ দেখছে না।
তাই নিজের ভাগ্যের কথা না ভেবে আশেপাশের পর্বতমালা আর পাথরগুলোর উপর মনোযোগ দিল। পাথরের উপর খোদাইকৃত ব্যাখ্যা আর চিত্র সম্পর্কে গ্রামবাসী ও গাইডের কথাই ঠিক। চারপাশে অসমাপ্ত শিল্পকর্ম আর ব্যাখ্যা সমেত বড় বড় পাথরের চাই। তবে এসব বোল্ডারের একটারও পদ্যের বর্ণনার সাথে মিল নেই।
পাহাড়ের আরেকটা অংশে যেতেই একপাশে গভীর চোরাকুঠুরি নজরে পড়ল। অথবা আরো ভালোভাবে বলতে গেলে মাত্র কয়েক ফুট চওড়া একটা গলিপথ যার শেষ মাথায় পাথরের দেয়াল। প্রবেশমুখটা আয়তকার। আর ঠিক এর উপরেই মনে হচ্ছে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে একটা চারকোণা ফাটল। কিন্তু এত ছোট যে কেউ হামাগুড়ি দিয়েও যেতে পারবে না। বিজয় বিস্মিত হয়ে ভাবল যে ফাটলের উদ্দেশ্য চোরাকুঠুরিতে প্রবেশ না হয় তাহলে কেনই বা তৈরি হয়েছে? প্রবেশমুখটাও তত বন্ধ। তাই গার্ডদেরকে ইশারায় অন্ধকারে ঢাকা চোরাকুঠুরির পাথরের গায়ে সার্চলাইটের আলো ফেলতে বলল।
প্রাকৃতিক চোরাকুঠুরির কাছেই একটা পাথরগাত্রে ভয়ংকর দৃশ্যটা দেখে কেঁপে উঠল বিজয়। উদ্যত ধনুক হাতে বোঝা যাচ্ছে না এমন এক প্রাণী শিকার করছে দুই ধনুর্বিদ। সম্ভবত একটা হরিণ আর একজন শিকারীর পাশে আরেকটা ছোট জন্তুও আছে। হতে পারে একটা কুকুর। কিন্তু চিত্রটা অসম্পূর্ণ থাকায় স্পষ্ট বোঝার কোনো উপায় নেই।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় মনে হল ভ্যান কুকের ধারণাই ঠিক। অসমাপ্ত চিত্রগুলো দেখে মনে হচ্ছে হাজার বছর আগেকার শিকারী কোনো গুহাবাসীর হাতে আঁকা। তাদের অভিযানের সাথে এ চিত্রগুলোর কোনো সম্পর্ক কি তাহলে আছে?
আরেকটু হলেই দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছিল। আর তখনই চোখে পড়ল ব্যাপারটা।
চিত্রের একটা অংশ সে বাদ দিয়ে গেছে। এই দৃশ্যের অনেকখানি উপরে পাথর কেটে তৈরি হয়েছে পাঁচ মাথাঅলা একটা তারা আর বাইরের দিকে রশ্মি। ছড়িয়ে দেয়া একটা বৃত্ত। বুঝতে পারল কী দেখছে।
“এইখানে।” চিৎকার করে ডাকল সবাইকে, “প্রথম সাইনপোস্ট।” স্থির দৃষ্টিতে ড্রয়িংটাকে দেখছে। শুক্র কোথায়? ঋষি ভ্রিগু’র পুত্র? নিচের শিকারীদের কেউ একজন নাকি?
সাথে নিজের বাকি লোকদেরকে নিয়ে স্তপায়ে বিজয়ের আবিষ্কার দেখতে এগিয়ে এলো ভ্যান ক্লক।
“দিন আর রাত্রির সন্নিবেশ” ব্যাখ্যা করে বলল বিজয়, “সূর্য আর তারা, দিন আর রাত্রিকে বোঝাচ্ছে। একসাথে একই চিত্রে। তারমানে এটাই সেটা।”
“হুমমম” চোখ পিটপিট করে চিত্রটাকে দেখল ভ্যান কুক, “মনে হয় তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু এখন শিবের লাঠি কোথায় পাবো?”
উবে গেল বিজয়ের আবিষ্কারের উত্তেজনা। কারণ এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই ওর কাছে।
.
৫৭. প্রথম পদক্ষেপ
রাধার মনে হল এই-ই সুযোগ। আরেকটু অপেক্ষা করলে হয়ত বেশি দেরি হয়ে যাবে। গভীরভাবে দম নিয়ে গার্ডকে ডেকে পাঠানোর জন্য কল বাটনে চাপ দিল। সাধারণত টয়লেটে যাওয়া কিংবা শাওয়ার নিতে হলেই এমনটা করত। পুরো ফ্লোরের বাসিন্দারা একসাথে ব্যবহার করতে পারবে এত সংখ্যক কিউবিকল সমেত একটা কমন বাথরুম আছে। এর ঠিক পাশেই টয়লেট!
রুটিন মত চলে এলো গার্ড। হাতে টেজার হিসেবে কাজ করে এরকম একটা বেতের লাঠি। এটা ইলেকট্রিক চার্জ হিসেবে কাজ করে, যেন প্রয়োজন হলে শক দিয়ে স্থবির করে দেয়া যায়। গার্ড এই লাঠি ওর উপর কখনো ব্যবহার না করলেও অন্যদের উপর কয়েকবার প্রয়োগ করতে দেখেছে রাধা। লোকটা নিজের ভিকটিমদেরকে বিশেষ করে নারীদেরকে কিলবিল করে উঠতে দেখলে মজা পায়। নিজের পরিকল্পনা নিয়ে মত্ত রাধা তাই গার্ডের প্রতি কোনো সমবেদনাই বোধ করল না।
দ্রুত পায়ে করিডোর বেয়ে নেমে এলো রাধা, যেন তার তর সইছে না। গার্ডও লম্বা লম্বা পা ফেলে ওর সাথে তাল মেলাতে চাইল। চোখের কিনার দিয়ে লোকটার সেঁতো হাসি কিন্তু রাধা ঠিকই দেখতে পেল। পরিষ্কার বোঝা গেল যে গার্ড কত আমোদে আছে। তাই নিজের প্ল্যান পূরণের জন্য আরো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হল।
টয়লেটের সারির কাছে পৌঁছে গেল। ছোট ছোট কিউবিকল যেটার দরজা কেবল বাইরের দিকে খোলে। দরজার হাতল ধরে মনে মনে ঝালিয়ে নিল পুরো পরিকল্পনা। স্তরে স্তরে পার্টিকেল বোর্ড দিয়ে তৈরি হওয়ায় কিউবিকল বেশ ঠুনকো। ওর উদ্দেশ্য সফল হবে তো?
প্রমাণিত হবার কেবল একটাই রাস্তা আছে। ভেতরে ঢুকে পড়ল রাধা। কোনো হুড়কো নেই। আগেই ধারণা করা হয়েছে হয়ত কেউ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারে।
অপেক্ষা করছে রাধা। পুরো ব্যাপারটাই এখন ভাগ্যের হাতে। তাই জোর করে মাথা থেকে চিন্তা দূর করে দিল। চাইছে হয়ত ইচ্ছে শক্তির আকর্ষণে পেয়ে যাবে সব সুযোগ।
একের পর এক মিনিট কেটে যাচ্ছে। কিছুই হল না।
কিউবিকলের ভেতরটা সম্পূর্ণ নিপ। আর বাইরেও। নিজেকে শক্ত করল রাধা। ধৈর্য রাখতে হবে।
এখনো, কিছু ঘটছে না।
আর তারপর ঠিক যখন সে হাল ছেড়ে দেবে তখনি দরজার কাছে এগিয়ে এলো গার্ড। উঠে দাঁড়াল রাধা। এসে গেছে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আঘাত করার জন্য যার সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে হবে।
