ধরা যাক রাধা এখান থেকে বাইরে মেসেজ পাঠাবার কোনো একটা উপায় খুঁজে পেল? যেমন করেছিল আনোয়ার। কিন্তু আনোয়ারের দুর্ভাগ্যের কথা মনে হতেই অসুস্থবোধটাকে দূরে সরিয়ে দিতে বাধ্য হল।
জানে ওর ভাগ্যে কী লেখা আছে। বিজয় যেন ওদেরকে সাহায্য করে তার জন্য রাধাকে দর কষাকষির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেলেই রাধা খতম। অথবা তার চেয়েও খারাপ কিছু। যেমন তাদের ভয়ংকর সব এক্সপেরিমেন্টের সাবজেক্ট বনে যাওয়া। ফ্রিম্যানের প্রজেক্ট নিয়ে সাক্সেনার মন্তব্য মনে পড়ে গেল। ওরা যা করছে তাতে কি প্রজনন শাস্ত্রও জড়িত?
তবে আপাতত তা নিয়ে ভাবছে না। গুরুত্বপূর্ণ হল আইটি সেকশনে পৌঁছানো আর কোনো ভাবে একটা মেসেজ পাঠানো যায় কিনা তা দেখা।
অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত। যদিও ব্যর্থতার পরিণাম কী তাও জানে। কিন্তু এভাবে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থেকে সাক্সেনা আর তার দলের মিশনের সফলতা দেখা যায় না।
.
আশার ক্ষীণ আলো
ল্যাপটপের কাছে বসে ক্লান্ত চোখ দুটোকে ঘষল কলিন। অনেকক্ষণ ধরেই একনাগাড়ে কাজ করছে। বাইরে নেমে এসেছে রাত। এবার উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ালো। নিচে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশ অবস্থিত ছোট্ট গ্রামটার আলো।
পদ্যের একটা অংশের মর্মোদ্ধার করতে পেরেছে অথবা তেমনটা ভাবছে। কিন্তু কোনো উপকারে লাগল না।
অন্যদের সাথে বিস্তর আলোচনা আর ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে “লবণহীন সমুদ্র” বলতে আসলে আরাল সমুদ্রকে বোঝানো হয়েছে; অক্সাস নদীর জলে পুষ্ট একটা লেক, বর্তমানে যা আমু দরিয়া নামে পরিচিত।
ষাট বছর আগে আরাল সমুদ্র কী ছিল সে সম্পর্কে ধারণা ক্ষীণ হলেও মনে হচ্ছে এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রথমত, অক্সাস নদীর কাছাকাছি এই একটাই সমুদ্র আছে। দ্বিতীয়ত, যদি কেউ বাল্ক থেকে আসে তাহলে আরাল সমুদ্রে পৌঁছানোর জন্য অক্সাস নদী পার হতেই হবে। তৃতীয়ত, আরাল সমুদ্র প্রকৃতপক্ষেই বিশুদ্ধ পানিতে ভর্তি ছিল। অতঃপর নদীর গতিপথ পাল্টে যাওয়ায় আর সমুদ্রের নিজের প্রাক্তন আকার ছোট হয়ে যাওয়ায় কয়েক দশক ধরে নোনা জলে পরিণত হয়েছে। পানিতে বেড়ে গেছে লবণ আর দূষিত পদার্থের পরিমাণ।
তবে পদ্যের ইঙ্গিত অনুযায়ী অন্তত তিনটা শর্ত পূরণ করায় আরাল সমুদ্রকেই বেছে নিয়েছে কলিন। কিন্তু আরাল সমুদ্র কিংবা অক্সাস নদীর সাথে “তিন ভ্রাতার কী সম্পর্ক তা এখনো বোধগম্য হয়নি।
একই সাথে মনে হচ্ছে চোখ সম্পর্কে ডা. শুক্লার অনুবাদেও খানিকটা গরমিল আছে। হতে পারে এটা কেবলই একটা চোখ, কোনো নদী নয়? তাহলে অবশ্য নতুন এক ধাঁধার উদয় হবে : “দ্রুত বহতা চোখ” মানে কী?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল কলিন। যতটা সহজ ভেবেছিল ব্যাপারটা আসলে ততটা সহজ নয়। বিজয় কী করছে, কেমন আছে তাই বা কে জানে! আর কোনো ফোনও করেনি।
আবার ল্যাপটপের সামনে এসে বসে পড়ল। সময় একেবারে নেই। তার। জন্য। কিংবা রাধা আর বিজয়ের জন্যও।
.
৫৬. পর্বতে
একটা বোল্ডারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভ্যান কুক। চারপাশে সাইন পোস্টের খোঁজ করছে তার দল। দিনের আলো দ্রুত কমে এলেও তাদের সাথে শক্তিশালী পোর্টেবল সার্চলাইট আছে। ফলে আশপাশের পর্বতমালা আর পাথরগুলোও আলোকিত হয়ে উঠেছে।
কথা মত দু’ঘণ্টাতেই শেষ হয়েছে ট্রেক। তারপর এখানে এসে গাইডের নির্দেশে থেমে গেছে সকলে। লোকটার দাবি পদ্যে উল্লেখিত লোকেশনের জন্য এখানেই খুঁজতে হবে সাইনপোস্ট।
তবে চারপাশ দেখে অন্তত পদ্যের একটা অংশের সাথে মিল আছে বোঝ যাচ্ছে। তারা এখন কুনার নদীর উপরে। ভ্যান কুক হিসাব করে দেখেছে উপত্যকার মেঝে থেকে ২০০ ফুট উপরে, দুটো ঢালু অংশের সংযোগ স্থল বলা যায়। আর পদ্যে নদীর উপর ঢালের কথাই বলা হয়েছে।
এছাড়াও বসে বসে ভাবছে যে গন্তব্যে পৌঁছবার সত্যিকার মানেটা কী? অর্ডারে আরো এক ধাপ উপরে উঠে যাওয়া। একেবারে শীর্ষের কাছাকাছি। এমনকি হতে পারে অর্ডারকে চালিত করে যে ছোট্ট দলটা তার কাছাকাছিই পৌঁছে যাবে। তার পরিবারের সদস্যরাও শত শত বছর ধরে এই অর্ডারেরই সদস্য। জলদস্যু হিসেবে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সময়েও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে নিজেদের দায়িত্ব। কিন্তু ভ্যান কুক সেসব দিন দেখেন নি। এখন তো তারা অত্যন্ত ধনী। আরো বেশি শক্তিশালী। লোকে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে। তাই কয়েক বছর ধরে অর্ডারে পদমর্যাদাও বেড়েছে।
আর আজ তো অর্ডারের সর্বোচ্চ পুরস্কার একেবারে হাতের নাগালে চলে এসেছে। পরিচালকের সাথে একই টেবিলে বসার সুযোগ করে দেবে এ অবস্থান। যেখানে কেবল রক্তের সম্পর্কে প্রকৃত উত্তরাধিকারীরাই বসতে পারে। অর্ডারের সাথে একই সময়ে শুরু হওয়া এ বংশ পরিক্রমা হাজার হাজার বছর ধরেই বিশুদ্ধ হিসেবে টিকে আছে।
চোখ তুলে তাকাতেই দেখা গেল অন্ধকার চিরে দিয়েছে সার্চলাইটের আলো। নিজের বাহিনিকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তবে দৃষ্টি গিয়ে বিজয়ের উপর নিবদ্ধ হল। এই ছেলেটাকে কেন যেন বুঝতে পারছে না। ওর মাথায় কি নেই যে তার আর বাগদত্তার দিন শেষ হয়ে এসেছে? এতটা বোকা তো হতেই পারে না। অথচ এত কিছুর পরেও ছেলেটার মুখে আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। নাকি অন্য কোনো ব্যাক আপ প্ল্যান ও করে রেখেছে? ভ্যান কুক যতটা জানেন বিজয়ের সাথে কোনো অস্ত্র নেই। মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাটাকে দূরে সরিয়ে দিল। যদিও সেটা কোনো সমস্যাই না। ধাঁধার সমাধান করে প্রহেলিকার জাল ছিন্ন করা এই ছোকরার কাছে ডাল-ভাত। গত বছরেও ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও ওদেরকে সাহায্য করেছিল। আর এখন তো স্বয়ং নিজের ইচ্ছেতেই করছে। ইউরোপীয়ান হয়ে এর বেশি কিছু আর আশাও করেনা।
