বাম দিকে আফগানিস্তানের মেরুদন্ড, হিন্দুকুশ পর্বতমালা। সুউচ্চ আর ভয়ংকর। এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে দেবতাদের রহস্য।
আলেকজান্ডারের উপর সে নিজে যে গবেষণা করেছিল তা স্মরণ করল বিজয়। পারস্য সম্রাট দারিয়ুস আলেকজান্ডারের হাতে পরাজিত হবার পর নিজ সভাসদ বিসাসের হাতে খুন হয়েছিলেন আর অবমাননাকর এক মৃত্যুবরণ করেছেন। এরপর পঞ্চম আরটাজারজেস নাম ধারণ করে বিসাস হিন্দুকুশ থেকে ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত পালিয়ে বেরিয়েছেন এই আশায় যে আলেকজান্ডার তাকে খুঁজে পাবেন না। কিন্তু বিপদসংকুল পথ পার হয়ে খাওয়াক পাসের মধ্যে দিয়ে হিন্দকুশ এসেছিলেন আলেকজান্ডার। এমনকি যাত্রাপথে সেনাবাহিনির রসদের অভাবও দেখা দিয়েছিল। তারা বাঁচার জন্য নিজেদের জীব-জন্তু হত্যা করে কাঁচা মাংস খেতেও বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আলেকজান্ডার বিসাসকে ধরতে ঠিকই সফল হয়েছিলেন। নিষ্ঠুর অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয় পঞ্চম আরটাজারজেসকে।
এরপর দক্ষিণে সগডিয়ান রকের দিকে এগিয়ে গেছেন। আর এখানেই কোথাও সেনাবাহিনি ছেড়ে নিজের গোপন মিশনে বেরিয়ে পড়েন ক্যালিসথিনস। এখনো যেসব পদ্যের মর্মোদ্ধার করা যায়নি সেসব স্থানেও গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ফিরে আসার সময় আলেকজান্ডারের জন্য কী এনেছিলেন? কুনার উপত্যকায় কী এর উত্তর পাওয়া যাবে?
.
৫৫. এক বন্দীর ভাবনা
নিজের ছোট্ট কুঠুরির মেঝেতে দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে বসে আছে রাধা। গতকাল সাক্সেনার কাছে যা শুনল তারপর থেকেই যেন বোধবুদ্ধি সব অসাড় হয়ে গেছে। আর সে ছাড়া ব্যাপারটা অন্য কেউ জানেও না। বুঝতে পারছে অর্ডার নিজের মিশন পুরো করেই ছাড়বে। গন্তব্যে পৌঁছানোনার জন্য তাকে থামানোর কেউ নেই।
কিন্তু নিজের ব্যর্থতাই রাধাকে বেশি করে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ভাবতে ভাল লাগছে না যে ওর কিছুই করার নেই। এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে চাইছে দুনিয়াকে জানাতে যে সত্যিকারে কী ঘটছে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো কেন হয়েছে। অথচ এটাও জানে যে সাক্সেনা তাকে সব খুলে বলেছে কারণ ওর কোথাও যাবার উপায় নেই। ভেতর থেকে খোলা যায় না এমন একটা কুঠরিতে বন্দী হয়ে আছে রাধা। বাইরের করিডোর ইনস্টল করা সিসিটিভি ক্যামেরা ওর সেলের উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। যে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণই সাথে সাথে ধরা পড়ে যাবে। নিয়মিত বিরতিতে এসে চেক করে যায় একটা পুরুষ গার্ড। আর কোনোভাবে যদি গার্ডকে পরাস্ত করে বাইরে বের হতেও পারে। সেখানকার অবস্থাও তো জানা। পুরো দালানটাই ভূর্গভস্থ। বাইরে যাবার কোনো দরজাই দেখেনি।
তাই ভয়ংকর সত্যিটাকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এখান থেকে বেরোবার কোনো উপায় নেই। যদি না কেউ এসে ওকে উদ্ধার করে।
কিন্তু সেটার সম্ভাবনাও শূন্য। কারণ কেউ তো জানেই না যে সে কোথায় আছে।
.
পথ নির্দেশকের খোঁজে
জালালাবাদ ছাড়ার পর থেকেই কেবল উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা। উপত্যকা এখন বেশ সংকীর্ণ হয়ে গেছে। উধাও হয়ে গেছে দু’পাশের ক্ষেত। ডানদিকে নদী রেখে হিন্দুকুশের পাদদেশে এঁকেবেঁকে উঠে গেছে রাস্তা।
পথিমধ্যে অসংখ্য গ্রাম পার হয়ে এলেও তাদেরকে কাঙিক্ষত লোকেশনে পৌঁছে দিতে পারে এমন কোনো সাইনপোস্ট চোখে পড়েনি।
এখন বিপজ্জনক অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। মাঝে মাঝেই কানে আসছে রকেট ফায়ারের গুরুগম্ভীর আওয়াজ। আফগানিস্তানের এই উপত্যকায় যুদ্ধক্ষেত্রগুলো এখনো সক্রিয়। আলেকজান্ডারের পর দু’হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও রক্তপাত এখনো থামেনি। কুপার অবশ্য ভ্যান কুককে আশ্বস্ত করেছে যে উপত্যকায় তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে তালিবানের স্থানীয় ইউনিটকে আগেই জানানো হয়েছে।
“আজ ওরা আমাদের রাস্তায় মিসাইল ছুড়বে না” ভ্যান ক্লককে জানিয়েছে। কুপার। মনে হচ্ছে প্রতিজ্ঞাটা আসলেই সত্য। বিজয় শুধু আশা করছে যেন জালালাবাদ পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত তা বলবৎ থাকে।
সামনে গজিয়ে উঠল মাটির ঘরে ভর্তি আরেকটা গ্রাম। থেমে গেল পুরো গাড়ি বহর। স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য লাফ দিয়ে নেমে গেল গাইড।
এবার মনে হচ্ছে কিছু একটা পেয়েছে। চওড়া হাসি দিয়ে সামনের পর্বতমালার দিকে ইশারা করল লোকটা।
তারপর প্রথম এসইউভির দিকে এগিয়ে এলো; যেখানে বসে আছে বিজয়; কুপার আর ভ্যান কুক। কুপার গাড়ি থেকে নেমে গাইডের সাথে খানিকক্ষণ কথা বলে ভ্যান কুকের দিকে তাকাল।
“গ্রামবাসীদের মতে এখান থেকে এক কি. মি গেলেই পর্বতে যাবার রাস্তা পাওয়া যাবে। এরপর দুই ঘন্টা পাহাড়ে চড়ার পর পাওয়া যাবে প্রাচীন আমলের কয়েকটা পাথুরে লিপিসর্বস্ব কাঠামো। গাইড বলছে সাইন পোস্টও ওখানেই পাওয়া যাবে।”
গাইডের দিকে এক নজর তাকাল ভ্যান ক্লক, “ও যে আমাদেরকে ভাওতা দিচ্ছে না সেটাই বা কিভাবে বুঝব? হয়ত উপরে উঠে দেখব চল্লিশ হাজার বছর আগে পাথরের উপর আঁকিঝুঁকি কেটে গেছে কোনো গুহামানব।”
অট্টহাসি দিল কুপার। “ওতো আমাদের সাথেই যাচ্ছে আর এও জানে যে যা খুঁজছি তা না পেলে ওর পরিণতি কী হবে।”
“ঠিক আছে, তাহলে চলল।” আবারো দুলে উঠল পুরো ল্যান্ড রোভার বহর।
.
পালানোর পরিকল্পনা
রাধার মাথায় আস্তে আস্তে শেকড় ছড়াল এক ভাবনার বীজ। বাইরে থেকে কেউ যদি এই ফ্যাসিলিটির প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে দেয় তবেই কেবল ওকে উদ্ধার করতে পারবে, ব্যাপারটা উপলব্ধি করার সাথে সাথে চিন্তাটা মাথায় এলো। যদি কী খুঁজতে হবে তা কাউকে জানানো যায় তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা একেবারে অসম্ভব নয়।
