গভীর চিন্তায় মগ্ন এলিসকে খেয়াল করে কলিন জানতে চাইল, “কিছু পেয়েছ নাকি?”
ঠোঁট কামড়ে ধরল এলিস। “কিছু একটা আমাকে খোঁচাচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারছি না কী। খুব পরিচিত কিছু একটা চোখে পড়েও পড়ছে না।” মাথা ঝাঁকাল এলিস।
মানচিত্রটাকে একটু টেনে নিয়ে কলিনও তাকাল, “আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথ।” মন্তব্য করে বলল, “ইন্টারেস্টিং। আফগানিস্তানে ঢুকে কান্দাহার, কাবুল আর গজনী দিয়ে উত্তরে মোড় নেবার আগে দক্ষিণে এগিয়ে গেছেন। এরপর হিন্দুকুশ পার্বত্যাঞ্চল পার হয়ে উত্তরে গেছেন। সগডিয়ান রকের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে জালালাবাদ আর কুনার ভ্যালিতে মোড় নেয়ার আগে বাল্কে ফিরে এসেছিলেন। মনে হচ্ছে পরিকল্পনা করেই পুরো অঞ্চল ঘুরেছেন। দুর্ঘটনাবশত এমনটা ঘটেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না।”
এলিস একদৃষ্টে এমনভাবে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কলিনের কথা শুনে এইমাত্র যেন ব্রেইনের অন্ধকার অংশে আলো জ্বলে উঠল। এবারে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এতক্ষণ ধরেই ওর চোখের সামনে ছিল। কিন্তু গাধার মতন সে কিছুই বোঝেনি।
“এই তো!” আঙুল নাড়াতেই কৌতূহলী হয়ে তাকাল কলিন।
“কী?” জানতে চাইল।
“বিজয়ের কথাই ঠিক।” উত্তর দিল এলিস। “আগে যে কেন দেখলাম? কুনার উপত্যকাতেই লুকিয়ে আছে সেই সিক্রেট। এটাই তাদের গন্তব্য।”
ডা. শুক্লাও ধাঁধায় পড়ে গেলেন, “তোমার কেন এটা মনে হল এলিস?”
“দেখুন।” মানচিত্রে সগডিয়ান রকের স্থানে আঙুল রাখল এলিস। “পর্যায়ক্রমটা খেয়াল করুন। জালালাবাদের আগে হল সগডিয়ান রক। হয়ত আমাদের ধাতব পাতটার কোনো প্রয়োজনই নেই। সম্ভবত ইউমেনিসের জার্নালের পদ্যগুলোকে ভৌগোলিক ক্রমানুযায়ী সাজানো হয়েছে আর আলেকজান্ডারও সেটা অনুসরণ করেই ভ্রমণ করেছেন। প্রথম দুটো পদ্যের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারলেই আমার যুক্তির সত্যতা প্রমাণ হয়ে যাবে।”
সবাই মিলে একসাথে মানচিত্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
খানিকক্ষণ পরেই চোখ তুলে তাকালেন ডা. শুকলা, “আমার মনে হয় আমি ঠিকভাবে মনোসংযোগ করতে পারিনি।” লাজুকভাবে হাসলেন প্রাজ্ঞ ভাষাবিদ, “আরো আগেই এটা বোঝা উচিত ছিল। আজ সকালের ফোনেই তো সূত্র দিয়েছে বিজয়। অথচ আমি তবুও বুঝিনি। কিন্তু এলিসের মুখে আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথের সূচি শুনেই ব্যাপারটা মাথায় এসেছে।” এলিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ।”
মানচিত্র জুড়ে বয়ে চলা নদীটাকে ইশারা করে বললেন, “এটা অক্সাস নদী। আর মনে হয় দ্বিতীয় পদ্যে এ নদীর কথাই বলা হয়েছে। সংস্কৃত শব্দটা হচ্ছে “চক্ষু” মানে চোখ! এতক্ষণ এভাবেই অনুবাদ করেছিলাম। কিন্তু মহাভারতে অক্সাসকেই চক্ষু বলা হয়েছে। অক্সাসের পদ্যের আগেই সগডিয়ান রকের পদ্যটা এসেছে। যদি মহাভারতের অমৃতকেই দেবতাদের রহস্য হিসেবে ধরা হয় তাহলে মহাভারতের মাঝেই লুকিয়ে আছে এর সূত্র। ফলে মহাকাব্যে বর্ণিত শুক্রের কথাও বোঝা যাচ্ছে এখন।”
আরেকবার মানচিত্র দেখল এলিস, “আমারও মনে হয় আপনি ঠিক কথাই বলেছেন ভা, শুক্লা। এর পেছনে যুক্তিও আছে। পদ্যে অক্সাস পার হবার কথা বলা হয়েছে। একমাত্র একটা নদীই “দ্রুত গতিতে বইতে পারে।”
“আর প্রথম পদ্যটা-যেটা কিউবে নেই; কিন্তু জার্নালে আছে” বলে উঠলেন শুক্লা, “এখন যেহেতু আমরা জানি যে রহস্যটা মহাভারতের সাথে জড়িত তাহলে এটার অর্থ বুঝতেও কষ্ট হচ্ছে না। পরাজিত শক্তিমান রাজার লাইনটা হল কৌরভের লাইন। এই পদ্যে শক্তিমান রাজা বলতে ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়েছে। কৌরভেরা ছিল তার পুত্র। সকলেই মারা গেছে। শেষ দুই লাইনে কৌরভদের ধ্বংসের কারণ “প্রবঞ্চনার প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে : “খুঁটি গড়িয়ে যাওয়া।” এখানে শকুনির খুঁটি গড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তিনি কৌরভদের মামা অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী গান্ধারীর ভাই ছিলেন। কৌরভরা ছিল একশত ভাই। গান্ধারের রাজকন্যা ছিলেন গান্ধারী। মহাভারতের একটা ভার্সন অনুযায়ী-আমার মনে হয় এটা অন্ধ্র প্রদেশ থেকে এসেছে-শকুনির পিতা সুবলকে পুরো পরিবারসহ ভীস্ম কারাগারে বন্দী করেছিলেন। শকুনি তাদেরকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছে যেন সে বেঁচে থেকে এর প্রতিশোধ নিতে পারে। পৌরাণিক এই কাহিনি অনুযায়ী সুবল শকুনিকে বলে গিয়েছিলেন যেন তাঁর হাড় থেকে খুঁটি তৈরি হয় যা মহাভারতে ব্যবহৃত হয়েছে। এটাই হল, ‘ছল বা কৌশল, মৃত্যু থেকে জাত, প্রতিশোধ নিতে ব্যগ্র’ খুঁটি, সুবলের মৃত্যুর মাধ্যমে যার সৃষ্টি আর প্রতিশোধ নিয়েছে শকুনি। কান্দাহারেরই প্রাচীন নাম হল গান্ধার।”
নীরবে সবাই আবার ম্যাপের দিকে তাকাল। এখন বোঝা যাচ্ছে পদ্য আর আলেকজান্ডারের ভ্রমণ পথের মাঝে সম্পর্ক। কান্দাহার থেকে কাবুল। কাবুল থেকে বাল্ক। বাল্ক থেকে অক্সাস নদী পেরিয়ে সগডিয়ান রক আর তারপর আবার কাবুলে প্রত্যাবর্তন এবং এরপর জালালাবাদ।
“তবে লবণহীন সমুদ্র” এখনো বুঝতে পারিনি” অবাক হয়ে জানাল কলিন, “পদ্যনুযায়ী ওখানে মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে। “অভিযানের কেন্দ্রস্থল।”।
“এটা অবশ্যই অক্সাস নদীর উত্তর কিংবা পশ্চিমের কিছু একটা হবে।” গভীর ধ্যানে ডুবে গেলেন ডা. শুক্লা। জানালেন, “কিন্তু আরেকটা কথা কী জানো, তিনজন ভ্রাতা কে? আর তীরের মাথা মানে কী? ‘সাপের সিলের কথা না হয় নাই বললাম।”
