দুহাত ভাঁজ করে রেখে বিজয়ীর ভঙ্গিতে রাধার দিকে তাকালেন সাক্সেনা, “তার মানে বুঝতেই পারছ যে এই ভাইরাস কতটা শক্তিশালী? আর মানব জাতির জন্য তা কতটা কল্যাণ বয়ে আনবে? আর শুধু ভাবো যে অর্ডার এ সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। বৃদ্ধ হবার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়ার ক্ষমতা। যে কোনো রোগের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা। অ্যান্টিবায়োটিকসের কথা ভুলে যাও। আমাদের কাছে অমর হবার ক্ষমতা থাকবে। আমাদের পায়ের কাছে আঁছড়ে পড়ে ভিক্ষা চাইবে পুরো পৃথিবী। তাই তো একে দেবতাদের রহস্য বলা হত!”
ভ্রুকুটি করল রাধা। কোথায় যেন খটকা আছে। “যদি ভাইরাসটা সত্যিই এত মহান হয় তাহলে গলাধকরণের পর আলেকজান্ডার মারা গেলেন কেন? আপনার ধারণানুযায়ী ব্যাকরেটিয়ার জিনটাকে কেন পরিবর্তন করে দেয়নি?”
“কারণ খাবার সময় নিশ্চয় কোনো গন্ডগোল করেছিলেন। আমরা এখনো প্রকৃত ভাইরাসটা খুঁজে পাইনি। কেবল প্রোফেজ পেয়েছি। তাই ভুলটা কোথায় ছিল সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু প্রকৃত ভাইরাস ছাড়া ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত গুপ্ত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না কিছু তাদের জিনের রসকে চালিত করে। আর একবার তা ঘটতে পারলেই আর রক্ষে নেই। আমরা আমাদের সাবজেক্টের উপরই এর প্রতিফলন দেখেছি। বিভিন্ন সময় আর তারপর আবার। ব্যাকটেরিয়া একবার সক্রিয় হয়ে উঠলেই কয়েক দিনের মাঝেই মারা গেছে সাবজেক্ট। কখনো কখনো এক কি দুমাস পর্যন্ত টিকে থাকত। আর এই কারণেই প্রকৃত ভাইরাস আর প্রকৃত ব্যাকটেরিয়া দরকার। আলেকজান্ডার এগুলো কোথায় পেয়েছিলেন সে স্থান খুঁজে বের করতে হবে। আর তারপরেই বোঝা যাবে যে রেট্রোভাইরাস আসলেই কিভাবে কাজ করে?
“তার মানে কিউবটার জন্যই অলিম্পিয়াসের সমাধি খোঁড়ার প্রয়োজন ছিল। যেন প্রকৃত প্রাণিসত্তার উৎসের কাছে পৌঁছানো যায়।” ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পেরেছে রাধা।
“ঠিক তাই। তাহলেই সিক্রেটটা আমাদের হাতের মুঠোর চলে আসবে।”
“তাহলে কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে আলেকজান্ডার ভুল করেছিল? হয়ত তা না। হয়ত এগুলো শুধুই প্যাথোজেন। যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যু ঘটায়।”
এবার সাক্সেনা ক্রু কুঁচকে ফেললেন, “দুটো কারণে। এক, আমাদের ক্লিনিকাল ট্রায়াল। এই মাত্র আমি যা বললাম তার সবকিছুই প্রমাণিত হয়ছে। আর দুই নম্বর হল, আরো প্রাচীন আর বিশ্বাসযোগ্য এক সূত্র।” থেমে গিয়ে খানিক পরেই জানালেন, “কারণ মহাভারতেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
বিস্ময়ে হা হয়ে গেল রাধা। এই ধরনের কোনো উত্তর শুনবে বলে আশা করেনি। মেয়েটার প্রতিক্রিয়া দেখে খুশি হয়ে হেসে ফেললেন সাক্সেনা, “এই রূপকথা তুমি শুনেছ। কেবল এর সত্যিকারের অর্থটা এতদিন জানতে না।”
একটুক্ষণ বিরতি দিয়ে আরো এক বিশদ বিবরণ শুরু করলেন ডাক্তার সাক্সেনা। শেষ করার পরে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল রাধা। এই মাত্র যা শুনল যেন দুলে উঠেছে পুরো পৃথিবী। কেউই আসলে এটা বিশ্বাস করতে পারবে না। কিন্তু গত বছর মহাভারতের সময়কার বিজ্ঞান নিজের চোখে দেখার পর সাক্সেনার কথা বিশ্বাস করতেই হল।
আর যদি তাই হয় তাহলে অর্ডারের দাসে পরিণত হবে পুরো দুনিয়া।
.
৫৩. আলেকজান্ডারের পথ অনুসরণ
হতাশ হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাল এলিস, কলিন আর ডা. শুক্লা। কোনো রকম অগ্রগতি ছাড়াই কেটে গেল দিনের বেশিরভাগ সময়। সমস্ত কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখল। পরীক্ষা করল সবকটি ছবি আর মানচিত্র। কিউবের বাকি চারটা পদ্য ছাড়াও ইউমেনিসের জার্নালের বাড়তি কবিতাগুলোও আলোচনা করে দেখল। কিন্তু কোনো লাভ হল না। হাতে কেবল গতকালের মর্মোদ্ধার করা কবিতা।
আগের দিন কিছুক্ষণের জন্য দুর্গের ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছিল বিজয়। জানিয়েছে যে কুপার ওকে একটা স্যাটেলাইট ফোন দিয়েছে। ফলে কুনার উপত্যকার মত পার্বত্যঞ্চলে সেলফোনের সিগন্যাল না থাকলেও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে কোনো সমস্যাই হবে না। অল্প সময়ের জন্য ফোন করায় তেমন কিছু বলতে পারেনি। তবে গলার স্বরে বেশ উত্তেজনা ছিল। এও বলেছে যে “দেবতাদের রহস্য”, আসলে হল অমৃত-অমরত্বের রহস্য মহাভারতের একটা পৌরাণিক কাহিনিতে যেটার বর্ণনা দেয়া আছে। সময় সংক্ষিপ্ত থাকায় বিস্তারিত বলার সুযোগ পায়নি। একই সাথে খানিকটা আকুতিও ছিল। কারণ সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই শীঘ্রিই কয়েকটা উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।
এতক্ষণ ওরা নিজেরাও কিছু পাবে বলে আশা করেছিল। ছেলেটার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে সব সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আর পেশাদার খুনি, ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠে আর রাধাসহ তাদের সবার জীবন নির্ভর করছে বিজয়ের প্রতিজ্ঞার উপর, মনে হলেই দিশেহারা লাগে।
“চলেন আবার প্রথম থেকে শুরু করি।” ডা. শুক্লাকে তাগাদা দিল এলিস। কন্যার দুশ্চিন্তায় এমনিতে উনার অবস্থা খারাপ। মেয়েটা কোথায় আছে কেউ কিছুতেই বের করতে পারছে না।
কাগজগুলো আরেকবার চেক করে দেখে ভ্রুকুটি করল এলিস। শুরু থেকেই একটা মানচিত্র দেখে কী যেন একটা মনে আসি আসি করেও আসছে না। কী সেটা?
মানচিত্রটাকে নিজের কাছে টেনে আরো একবার মনোযোগ দিয়ে দেখল। মানচিত্রে আফগানিস্তানের মধ্যে আলেকজান্ডারের ভ্ৰমণ পথগুলো দেখা যাচ্ছে। এরই মাঝে বহুবার দেখে ফেলেছে এ মানচিত্র। এই পথগুলোর সাথেই পদ্যে লেখা স্থানের মিল খুঁজতে হবে। কিন্তু ভারতে আসার সময় আলেকজান্ডার যত জায়গায় গিয়েছিলেন তার সাথে কবিতার স্থানগুলোর কোনো সম্পর্কই বের করতে পারছে না তারা।
