“তার মানে আলেকজান্ডারের শরীরে আপনারা যে রেট্রোভাইরাস পেয়েছেন তা ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখতে সক্ষম?”
“এর চেয়েও ভালো। এই কারণেই ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো এত কাজে লেগেছে। নতুবা সফলতার জন্যে প্রয়োজনীয় আবিষ্কার করা সম্ভব হত না। আমরা আলেকজান্ডারের মমিতে ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু সাবজেক্টের শরীরে প্রতিটাকে পৃথক পৃথকভাবে সংক্রমণ আর এর ফলাফল পর্যালোচনা করার আগ পর্যন্ত এদের সংযোগ বুঝতে পারিনি। ফলাফলের একটা হল রেট্রোভাইরাস নিজে ব্যাকটেরিয়ার অনুপস্থিতিতে আশ্রয়দাতা প্রাণিসত্তা হিসেবে মানব শরীরে আরো ভালোভাবে মিশে যেতে পারে। আর একবার মানব পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে প্রোটিন উৎপাদনকারী জিনে স্থানান্তরিত হয়। যার ফলে ধীর হয়ে যায় বয়স বাড়ার গতি। অর্থাৎ বুড়ো হওয়া প্রায় থেমে যায়। উদাহরণস্বরপ বলা যায় আইজিএফ ওয়ান এর কথা, যা পেশি নির্মাণের জন্য দায়ী মূল প্রোটিন। এ প্রোটিনের অনুপস্থিতিতে পেশি দুর্বল হয়ে পড়া ছাড়াও মেরামত আর পুনঃজন্মের ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন হল টেলেমারেজ, বৃদ্ধ হবার প্রক্রিয়াকে ধীর করার জন্য যেটির উপরে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। আমরা যে বৃদ্ধ হই আর মারা যাই, তার পেছনে টেলোমারেজের অনুপস্থিতিই যে প্রধান কারণ এর স্বপক্ষেও শক্ত প্রমাণ আছে। তবে টেলোমারেজের সমস্যা হল এর উপস্থিতিতে কোষগুলো বিরতিহীনভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে, অন্য কথায় বলতে গেলে ক্যান্সার। কিন্তু রেট্রোভাইরাসের উপস্থিতি বিআরএএফের উৎপাদন বাড়ায়; এটি এমন এক প্রোটিন যা সবল কোষের বৃদ্ধি আর বিভক্তির চক্রকে নিয়মিত রাখে, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে বাধা বলতে পারো। ধারণা করা হচ্ছে যে রেট্রোভাইরাস পি ফিফটি থ্রি নামক একটা প্রোটিনকেও কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় করে তোলে, যা সমস্ত কোষেই সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পি ফিফটি থ্রি এমন সব জিনের প্রকাশ ঘটায় যার মাধ্যমে কোষের চক্র থেমে যাওয়াসহ অপকারী কোষের বংশ বিস্তার রোধ হয়। এটাকে আরো সহজভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। শরীরে নতুন রেট্রোভাইরাসের উপস্থিতি ইন্টারফেরনের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়; এমন এক প্রোটিন যা পি ফিফটি থ্রি’র সংকেত ধারণকারী জিনের বদলকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। ফলে পি ফিফটি থ্রি প্রোটিনের প্রাচুর্য বেড়ে যায়।” খানিক থেমে রাধার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চাইলে আমি আরো ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। নতুন আরো কিছু জিন পাওয়া গেছে যার মাধ্যমে আরো অজানা সব প্রোটিনের উৎপাদন হতে পারে এবং এগুলো আমাদের গবেষণার মাধ্যমে মানব শরীরের শক্তিমত্তা, পুনঃনির্মাণ আর মেরামতের জন্য উপকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।”
“অসাধারণ।” মন্তব্য করল রাধা। শুনে মনে হচ্ছে চিকিৎসাশাস্ত্রে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার ঘটতে যাচ্ছে। আপনি আরো বলেছিলেন যে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমণ করে। এগুলোকে মেরেও ফেলে নাকি? এই ভাইরাস বর্মের কথাই বলেছেন?”
মাথা নাড়লেন সাক্সেনা, “যা ভাবছ তার চেয়েও অনেক বড় কাজ করে। মানুষকে শুধু ব্যাকটেরিয়া দিয়ে দূষিত করার পরে দুটো জিনিস পেয়েছি। প্রথমত, ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে নয়। গলাধঃরণ হয়ে গেলেই এগুলো এক ধরনের বায়োফিল্ম তৈরি করে যেখানে কোষগুলো বিপুল পরিমাণে খনিজ পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকে। শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিষেধকের হাত থেকে ব্যাকটেরিয়াকে সুরক্ষা দেবার জন্যই এমনটা ঘটে। সেই মুহূর্তে কোষের মধ্যস্থতায় ব্যাকটেরিয়া নিজেও সুপ্ত অবস্থায় চলে যায়। যা সংক্রমণকে ধরে রাখে; ধ্বংস করেনা। তাই কিছু সময়ের জন্য কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ার চিহ্ন দেখা যায় না। আমরা সন্দেহ করেছি যে রেট্রোভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এর জিনগত বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করে দিলেই মানুষকে মেরে ফেলে এমন প্রোটিনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। হয়ত এর ফলে ব্যাকটেরিয়া মানুষের জন্য উপকারী কোনো প্রোটিনেরও জন্ম দিতে পারে। আসলে তা এখনো জানি না। এই কারণেই প্রকৃত ভাইরাসটা প্রয়োজন।”
“কিন্তু আপনি তো বলেছেন যে আলেকজান্ডারের মমিতে ব্যাকটেরিয়া থেকে পৃথক ভাইরাস পেয়েছেন” মনে করিয়ে দিল রাধা, “এটাই কি সেই পৃথক ভাইরাস নয়?”।
“না। আমি বলেছি যে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের ফলে দুটো আবিষ্কার করেছি। তোমাকে তো কেবল প্রথমটা বললাম। দ্বিতীয় যা পেয়েছি তা হল প্রোফেজের আকারে ব্যাকটেরিয়ার জিনের মাঝে ইতোমধ্যেই ভাইরাস আছে। একটা পর্যায়ে রেট্রোভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করলেও আমি আগে যেভাবে বলেছি সেভাবে পরিবর্তিত হতে পারেনি। হয়ত কোনো কারণে মারা গেছে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার জিনে জিনগত উপাদান হিসেবে মিশে গেছে, একটা প্রোফেজ। আর তখনই পুরো ব্যাপারটা হয়ে উঠে অত্যন্ত চমকপ্রদ। এমন কিছু আমরা এখনো জানি না, এমন কী? যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের পরে প্রোফেজের সংস্পর্শকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তখনি রেট্রোভাইরাস লাইসোজেনিক চক্রের মাধ্যমে মানব কোষে রূপান্তরিত হয়।”
বেশি বেশি মেডিকেল টার্ম ব্যবহার করছেন বুঝতে পেরে হাত তুললেন ডা. সাক্সেনা, “মূল কথা হল রেট্রোভাইরাসের এই সুপ্তাবস্থা-প্রোফেজ ব্যাকেটিয়ার ক্রোমোজমেই থাকে। একে বলা হয় প্রোফেজ ইনডাকশন। একবার তা ঘটে যাবার পর সাধারণ নিয়মেই ভাইরাস রূপান্তরিত হয়ে আরো প্রতিলিপি তৈরির জন্য মানব কোষকে আদেশ করে। তখনই রেট্রোভাইরাল ইনফেকশন ঘটে। কিন্তু, যেমনটা আগে বলেছি, তাতে আশ্রয়দাতার কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ রেট্রোভাইরাস হল উপকারি।”
