পর্দায় উদয় হল আরেকটা ইমেজ, “আমরা যে ভাইরাস নিয়ে কাজ করছি তা হল একটা রেট্রোভাইরাস।” বলে চললেন সাক্সেনা, “এর জিন সম্পর্কীয় তথ্যসমূহ ডিএনএ নয় বরঞ্চ আরএনএ’র সংকেতে আবদ্ধ আছে। রেট্রোভাইরাসের মধ্যে আরো আছে আরএনএ’র উপর নির্ভরশীল ডিএনএ অণুযোগে গঠিত যৌগ, যেটা একটা নকলের (Transcriptase) উল্টো পিঠ। এর মাধ্যমেই আশ্রয়দাতা কোষের সংক্রমনের পর ডিএনএ’র সংশ্লেষণ ঘটে।”
রাধার চেহারায় শূন্য অভিব্যক্তি দেখে থেমে গেলেন ডা. সাক্সেনা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে একটু আগে যা বললেন মেয়েটা তার বিন্দু বিসর্গ কিছুই বোঝেনি। “ওকে” আরেকবার চেষ্টা করে জানালেন, “এটা তো নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে, সমস্ত প্রাণিসত্তার জিন সম্পৰ্কীয় তথ্যসমূহ ডিএনএ’তে লিপিবদ্ধ থাকে আর তা একটা দ্বৈত ধারা, ঠিক? ওয়েল, রেট্রোভাইরাসের মধ্যে জিনের তথ্যগুলো আরএনএ’তে আবদ্ধ থাকে আর এটা হল একটাই তন্ত। সাধারণত সমস্ত প্রাণিসত্তায় যখন কোষের পরিবর্তনের সময় জিনের তথ্যসমূহের নকল তৈরি করতে হয়, তখন ডিএনএ আরএনএতে বদলে যায় আর জিনের তথ্য পরিবহনের জন্য প্রোটিনের সৃষ্টি করে।”
রাধা কতদূর বুঝতে পারছে দেখার জন্য আবার থেমে গেলেন সাক্সেনা। তাই মেয়েটা মাথা নাড়তেই আবার শুরু করলেন, “রেট্রোভাইরাস পরিবর্তনের সময় কিন্তু আরএনএকে ডিএনএ’তে রূপান্তরিত হতে হয়। একারণেই এটাকে উল্টো দিকে যাত্রা হিসেবে ধরা হয়। একারণেই ট্রান্সক্রিপটেজ প্রোটিনের প্রয়োজন, যেন সক্রিয় থাকে পুরো প্রক্রিয়া। রেট্রোভাইরাস একবার যখন আশ্রয়দাতা কোষের অভ্যন্তরে মিশে যায় তখনই আরএনএ মুক্ত হয়ে পড়ে। আর হয়ে উঠে একতম্ভ বিশিষ্ট ডিএনএ। এই ডিএনএ’ই আবার উল্টো দিকে বদলে যাওয়ার মাধ্যমে হয়ে উঠে দ্বৈত ধারা সমৃদ্ধ এক বিশেষ ডিএনএ। ভাইরাস থেকে নেয়া আরেকটা জৈব রাসায়নিক পদার্থ (Engyme) ব্যবহার করে আশ্রয়দাতা কোষে এই বিশেষ প্রো-ভাইরাস বসিয়ে দেয়া হয়, যাকে বলা হয় সংহত করা, আর তারপরই আরএনএ’তে বদলে যায়। একটা নতুন ভাইরাস নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের উৎপাদন কাজে আরএনএর অনুবাদ করা হয়; ঠিক যেমনটা হয় সাধারণ প্রতিলিপি তৈরির ক্ষেত্রে। আশ্রয়দাতা কোষ থেকেই বলপূর্বকভাবে বহিস্কৃত করে দেয়া হয় এসব ভিরিয়ন।”।
সাক্সেনা কেন এত সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন তা এতক্ষণে বুঝতে শুরু করেছে রাধা, “তো তার মানে একটা রেট্রোভাইরাস প্রকৃতপক্ষে একটা আশ্রয়দাতা জিনের অংশ হয়ে উঠবে?”
“ঠিক তাই। যখন জীবনব্যাপী সংক্রমণের শুরু হয়। আশ্রয়দাতা কোষের গঠনতন্ত্রকে অর্জন কিংবা বদলে দেবার ক্ষমতা আছে এই রেট্রোভাইরাসের।
এগুলো এমনকি আশ্রয়দাতা কোষের জিনের জীবাণুর মধ্যেও মিশে গিয়ে স্থান পরিবর্তনশীল উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। মানে হল এরা ডিএনএ’র এমন এক অংশ যারা আশ্রয়দাতা জিনের চারপাশে যখন খুশি ঘুরে বেড়াতে পারে, জিন বদলে দিতে পারে আর আশ্রয়দাতা ডিএনএ’র রূপান্তরের কারণও সৃষ্টি করে। জিনকে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয়ও করে দিতে পারে। আর নির্দিষ্ট পরিবেশ উদ্দীপক পেলে রূপান্তর আর পুনঃমিশ্রণের মাধ্যমে দ্রুত নিজেদের জিনকেও বদলে ফেলতে পারে। এই কারণেই এইচআইভি ভাইরাস এতটা মারাত্মক। এটাও একটা রেট্রোভাইরাস। সাধারণত সুস্থ মানুষের ডিএনএ’কে বদলে দেয়।”
রাধার মাথা ঘুরে উঠল। এত তথ্য একসাথে শুনেছে যে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। “যাই হোক, খানিকটা বুঝেছি। কিন্তু একটা রেট্রোভাইরাস যদি এতটা মারাত্মক হয় তাহলে কিভাবে রোগের বিরুদ্ধে বর্ম তৈরিতে সাহায্য করবে?”
.
৫২. অমরত্ব
“এটাই হচ্ছে সমস্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালেন সাক্সেনা, “ভাইরাসদের তেমন কোনো সুখ্যাতি নেই; আর সেটা ঠিকও। বেশিরভাগ মারাত্মক আর দুরারোগ্য সংক্রমণের কারণও এরাই। ছোট ছোট এই দস্যুগুলোকে খতম করা আসলেই বেশ কঠিন। এমনকি আশ্রয়দাতা মারা গেলেও এরা ঠিকই গুপ্ত থেকে সুযোগ মত অন্য কোনো কোষে সংক্রামিত হয়ে চক্রটাকে টিকিয়ে রাখে। এও জানা গেছে যে শক্তিসত্তা না হারিয়েই হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকতে পারে। তবে ভাইরাসের আরেকটা দিক আছে যা মানুষ খুব বেশি জানে না। তুমি জানো মাইক্রোবিয়ম কি?”
কোথায় যেন শব্দটা পড়েছে! স্মরণ করে রাধা বলল, “ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এমন সব প্রাণিসত্তার সন্নিবেশ যা মানুষের মাঝেই বাস করে।”
“রাইট। এটা একটা প্রতীকী অস্তিত্ব। বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। এদের মাঝে সবচেয়ে সুপরিচিত হল ব্যাকটেরিয়া। খাবার আর আশ্রয়ের বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া আমাদেরকে হজম ও রাসায়নিক বিপাক ক্রিয়াকে সচল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এমন কোনো প্রতীকী ভাইরাসের গল্প শোনা যায়নি যা কিনা খারাপ ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে। আর তখনই ঘটে আমাদের ছোট্ট রেট্রোভাইসের আগমন। আগেই যেমনটা বলেছি, এটা একটা ব্যাকরেটিওফেজ। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের মিউকাস মেমব্রেন-নাক আর গলার নরম টিস্যুগুলো ব্যাকটেরিয়াওফেজে সমৃদ্ধ। যা আমাদের জন্যই ভালো; কারণ ব্যাকটেরিয়া মিউকাসের মধ্যে বংশবিস্তার করতে পারে। তাই মিউকাস সম্পর্কীয় সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া শিকার করে, এসব ভাইরাস আশ্রয়দাতার প্রতিষেধক প্রক্রিয়ার জন্য বর্ম তৈরি করতে পারে।”
