ক্যালোসথিনস বুঝতে পারলেন যে আলোচনায় সমাপ্তি টানবার সময় পার হয়ে গেছে। নিজের রাজাকে তিনি ভালো ভাবেই চেনেন। এরই মাঝে ইতিহাসবিদের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছেন আলেকজান্ডার। জানেন কী ঘটতে চলেছে। আর মৃত্যুর মুখে পড়েও তিনি কাপুরুষের ন্যায় আচরণ করতে চান না।
“একজন দেবতার শক্তি হল” শান্ত স্বরে ক্রোধে উন্মত্ত রাজাকে জানালেন ক্যালিসথিনস, “জীবন কেড়ে নেয়া নয় বরঞ্চ দান করা। আর এক্ষেত্রেই আপনি ব্যর্থ হয়েছেন।”
ক্ষোভে উত্তপ্ত কড়াইয়ের মত ফুটছে আলেকজান্ডারের রাগ, “আমি আলেকজান্ডার! দেবতা হিসেবে পূজিত হবার জন্য আমার তোমাকে কিংবা তোমার সমর্থনের কোনো প্রয়োজন নেই।” সমস্ত ইন্দ্রিয়ে ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ায় চিৎকার করে উঠলেন, “দেবতা হবার জন্য তোমার গোপন উপকরণেরও কোনো প্রয়োজন নেই। আমি একজন দেবতা আর তাই আমার উপাসনা করা হবে। তোমার কিংবা আর কারো ধারণাকেই কোনো পরোয়া করি না! গার্ড!”
আলেকজান্ডারের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ক্যালিসথিনস, “পেট্রোক্লাস আপনার চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ ছিলেন, আলেকজান্ডার। কিন্তু তারপরেও মৃত্যু তাঁকে ছাড়েনি।”
গার্ডেরা এসে ক্যালিসথিনসকে চেপে ধরতেই নিষ্ঠুরভাবে হাসলেন আলেকজান্ডার, “এখন আমি বুঝতে পারছি যে বালক-ভূতেরা (Pageboy) কিভাবে আমাকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করার সাহস পেয়েছিল। আমার একেবারে কাছের কেউ তাদেরকে এ বিদ্রোহে উসকানি দিয়েছে। আর সেই সুযোগও। তখন অবাক হয়ে ভেবেছিলাম যে সে কে হতে পারে। কিন্তু এখন জেনে গেছি; তুমিই, তাইনা ক্যালিসথিনস? আর আগামীকালও সেই চেষ্টা করবে। তাই বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হল ক্রুশবিদ্ধ হওয়া। তুমি সেটা ভালোভাবেই জানো, বিদায় বন্ধু!”
চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেও ক্যালিসথিনস এখনো শেষ করেন নি। আর গার্ডেরা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার সময় ইতিহাসবিদের মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দগুলো শুনে যেন জমে গেলেন আলেকজান্ডার।
“আপনি হয়ত দেবতা হবার ভান করছেন আলেকজান্ডার। বিশ্বাস করছেন। যে আপনি একজন ঈশ্বর। কিন্তু তা কখনোই হতে পারবেন না। মেসিডোনিয়াতে ফেরার আগেই মৃত্যুবরণ করবেন! জন্মভূমিতে আর পা রাখতে পারবেন না!”
৬. বর্তমান সময়
পঞ্চম দিন
আলেকজান্ডারের রহস্য
“আপনি নিশ্চয় তামাশা করছেন!” নিজেকে সামলাতে পারল না রাধা। সত্যিই ব্যাপারটা একেবারে অবিশ্বাস্য। শত শত বছর আগেই আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আলেকজান্ডারের দেহ উধাও হয়ে গেছে। সবাই সেটাই জানে।”
“সঠিকভাবে বললে চতুর্থ শতকে।” রাধাকে শুধরে দিলেন সাক্সেনা। “আরো নিখুঁতভাবে বললে ৩৯১ খ্রিস্টাবের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে। অর্ডার তাঁর মমি চুরি করে আরেকটা স্থানে রেখে দিয়েছে যেখানে পচনের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে।”
“কিন্তু এক অর্থে অর্ডারই তো এ নীতি ভঙ্গ করে তার শরীরকে কাটা ছেঁড়া করে একটা ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া বের করেছে।” রাধা বুঝতে পারল যে অর্ডার কেবল নিজের কথাই ভাবে। পবিত্র বলে কিছু নেই। কোনো কিছুকেই তারা পরোয়া করে না। যেমন এখন সেরকমই একটা স্থাপনাতে সে বন্দী হয়ে আছে। সব ধরনের তথ্যকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে বুঝতে পারল যে ইমরানও পরীক্ষাতে এই দুটো জীবাণুই পেয়েছিলেন। অজ্ঞ ভলান্টিয়ারদের উপরেই অজানা এসব প্যাথোজেন ব্যবহার করে সাক্সেনা আর তার দল বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছিল। পরিণামে লোকগুলো ধীর কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়েছে। ক্রোধ বেড়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল রাধা। কয়েকদিন আগেই তাকে যে চেতনানাশক দেয়া হয়েছিল এসব কী তারই প্রতিক্রিয়া কিনা কে জানে। এই মুহূর্তে রেগে উঠা ঠিক হবে না। তাতে কেবল নিজের ক্ষতি হবে।
কাঁধ ঝাঁকালেন সাক্সেনা, “ওয়েল, বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য এটাতো করতেই হত।” যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে জানালেন ডাক্তার। “যাই হোক এই দুই প্রাণিসত্তার মাঝে লুকিয়ে আছে সেই রহস্য যা আমাদেরকে রোগ বালাইয়ের বিরুদ্ধে আরেকটা বর্ম তৈরি করতে সাহায্য করবে।”
“আমি এখনো বুঝতে পারছি না” অভিব্যক্তি আর গলার স্বরেই ফুটে উঠল রাধার অবিশ্বাস, “আপনি বললেন যে আলেকজান্ডার এই মহারহস্যের খোঁজে অভিযানে বেরিয়েছিলেন। আর সেটা খুঁজেও পেয়েছেন। তারপরেও দুই বছর পরেই মারা গেছেন। আর ভুক্তভোগী সকলের ক্ষেত্রেও কয়েক বছরের মধ্যে আলেকজান্ডারের মতই একই শারীরিক চিহ্ন ফুটে উঠেছে। তার মানে এই প্রাণিসত্তাদ্বয় কেবল মৃত্যুই ডেকে আনবে।”
“এখানেই তুমি ভুল করছ! হিসহিস করে উঠলেন সাক্সেনা; অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। “এই অর্গানিজমগুলো জীবন দান করে। কম্পিউটারের পর্দায় যেগুলো দেখছ সেগুলো প্রকৃত অর্গানিজম নয় যা আলেকজান্ডারে দেহে প্রবেশ করেছিল। রেট্রোভাইরাস হল একটা ব্যাকটেরিয়ানাশক আর ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে দূষিত করে।”
পর্দার ইমেজ বদল করে বললেন, “ভাইরাস নিজে থেকে পরিবর্তিত হতে পারে না। এ কারণেই তাদেরকে অন্য কোনো কোষ/সেল ছিনতাই করে পরাশ্রয়ী হতে হয়। আর এটাই হল ভাইরাসের পরিবর্তন প্রক্রিয়া।” পর্দার ডায়াগ্রামের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “একটা ভাইরাস প্রথমে টার্গেটকৃত কোষের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে আর তারপর আশ্রয়দাতা কোষের ঝিল্লির সাথে সংমিশ্রণ কিংবা জিন সম্বন্ধীয় উপাদানসমূহের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে আশ্রয়দাতা কোষের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। আর একবার যদি তা করতে পারে তাহলে আশ্রয়দাতা কোষের কোষবিশিষ্ট কলকজা ব্যবহার করে পরিবর্তিত হয় আর প্রায়োগিক ও কাঠামোগত প্রোটিন তৈরি করে। নবগঠিত জীবকোষ বিদ্যমান দুটি জটিল যৌগের একটি নিউক্লেইক অ্যাসিড আর কাঠামোগত প্রোটিন একসাথে মিলে গঠিত হয় ভাইরাসের নিউক্লিওক্যাপসিড। নবগঠিত এসব ভাইরাস কিংবা ভিরিয়নস লাইসিস নামক একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্ত হয়ে যায়; যার ফলে আশ্রয়দাতা কোষ প্রচুর ভিরিয়ন উদগিরণ করে দেয়। আর একই সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে হোস্ট সেল।”
