যুদ্ধের এত ডামাডোল এমনকি অভিযানে যাত্রা শুরু করার পর আলেকজান্ডারের প্রথম পরাজয়ের মধ্যেও কেউ খেয়াল করেনি যে ক্যাম্প ছেড়ে বহুদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ক্যালিসথিনস। ঠিক যেন ঘটনার পরিক্রমাও আলেকজান্ডারের পক্ষেই ষড়যন্ত্রে মেতেছে।
হয়ত তিনি সত্যিই জিউসের পুত্র আর তার স্বর্গীয় পিতা পুত্রকে খুঁজছেন। তারপরেও কেন যেন ক্যালিসথিনসের মনে হচ্ছে যে আলেকজান্ডারের এমনটা করার কোনো অধিকার নেই।
“মহারাজা” সাবধানে বলে উঠলেন ক্যালিসথিনস, “আপনি অনেক বদলে গেছেন।”
“আসলেই।” ইতিহাসবিদের পিঠ চাপড়ে দিলেন উৎফুল্ল আলেকজান্ডার। আজকাল প্রায়শই যা ঘটছে, প্রচুর পরিমাণে ওয়াইন পান করায় উচ্ছ্বসিত হয়ে আছেন আলেকজান্ডার।
আর ক্যালিসথিনস এও দেখেছেন যে কতটা দ্রুত এই অভিব্যক্তি পাল্টে গিয়ে হয়ে ওঠেন দুর্বিনীত আর প্রতিহিংসা পরায়ণ।
“মনে হয় এ সম্পর্কে অন্য কোনদিন কথা বললেই ভালো হবে।” আলেকজান্ডারের ক্রোধকে আর বাড়াতে চান না। ক্ষিপ্ত না করে রাজাকে সত্যিকারের উত্তর দেয়াটা সম্ভব নয়।
আর ক্যালিসথিনস মিথ্যেও বলেন নি। হয়ত নিজের লেখায় বিজেতা সম্পর্কে একটু বেশিই প্রশংসা করেছেন আর অতি কল্পনার মিশেল ঘটিয়েছেন যাতে বৃদ্ধি পায় তার রাজার মহিমা। কিন্তু স্বয়ং রাজার কাছে সৎ না থেকে পারবেন না। এটাই তার স্বভাব।
এবারে ক্যালিসথিনসের চোখের দিকে তাকালেন আলেকজান্ডার। “তো” চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের চিবুকে হাত বুলিয়ে জানালেন, “মনে হচ্ছে আমার ইতিহাসবিদ আরো কিছু বলতে চায়। এমন কিছু যা সে ভাবছে আমি পছন্দ করব না।”
আলেকজান্ডারের এমন উপলব্ধিকে ঘৃণা করেন ক্যালিসথিনস্। তিনি কিছুই। বললেন না।
“দেখো, ক্যালিসথিনস” তাগাদা দিলেন আলেকজান্ডার, “তুমি ভাবছ আমি বেশি ওয়াইন খেয়ে ফেলেছি? আর সে কারণে তোমার কথা বুঝতে পারব না? তুমি হচ্ছ আমার শ্রদ্ধাভাজন ইতিহাসবিদ। এ কারণেই অন্য কারো কথা এতটা মনোযোগ দিয়ে শুনি না, যতটা না তোমার! খুলে বলল কী তোমাকে এত পেরেশান করছে? প্রতিজ্ঞা করছি যে সবটুকু শুনব।”
ক্যালিসথিনস উপলব্ধি করলেন যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এখন এই আলোচনাকে রহিত করার প্রচেষ্টাই বরঞ্চ আলেকজান্ডারের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিবে।
“ঠিক আছে, মাই কিং” গভীরভাবে দম নিয়ে জানালেন ক্যালিসথিন “আপনার ঘোষণা শুনেই আমার যত দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আপনি চান যেন পারসীয় প্রথায় আপনার উপাসনা করা হয়।”
এত জোরে হেসে ফেললেন আলেকজান্ডার যে দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল সে আওয়াজ। “আর তুমি তাতে সম্মত নও?”
একেবারে চুপ করে রইলেন ক্যালিসথিনস।
চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার, “কেন তোমার মনে হচ্ছে যে এটা ভুল?” অবশেষে জানতে চাইলেন, “তুমিই তো দুনিয়াকে জানিয়েছ যে আমি জিউস আমোনের পুত্র। যা একদিন ইতিহাস লিখবে তোমার সেই বই-ই তো
আমার দেবত্ব সম্পর্কে সিউয়ার ওরাকলের স্বীকৃতির কথা প্রচার করেছে। সমুদ্রকে দু’ভাগ করে ফেলার কথা তুমিই লিখেছ।” মাথা তুলে ক্যালিসথিনসের দিকে তাকালেন, “মনে নেই? আরো আছে” ক্যালিসথিনসের কাঁধে এক হাত তুলে দিয়ে বললেন, “ক্যালিসথিনস তুমি তো বিশ্বাস করো যে আমি একজন দেবতা। নিশ্চয় মিথ্যে লেখো না। আর যদি তাই হয় তত আমাকে দেবতা হিসেবে উপাসনা করার বাসনাকে কেন ভুল ভাবছ?”
উত্তর দিলেন না ক্যালিসথিনস। বুঝতে পারলেন যে আসলে আলেকজান্ডারকে দেবার মত তার কাছে কোনো উত্তর নেইও। রাজা যা যা বলেছেন তার সবকিছুই সত্যি। কেবল ক্যালিথিনস যে তার দেবত্বে বিশ্বাস করে সেটুকু ছাড়া। কিন্তু কিভাবে জানাবেন যে বইয়ে তিনি কতটা তোষামোদ করেছেন? দেবতা হবার পরেও আলেকজান্ডারের দরবারে নিজের পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখার আশায় করেছেন?
“তোমার নীরবতা অসহ্য লাগছে।” গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন আলেকজান্ডার, “আমি কি এটাকে হ্যাঁ অর্থে ধরব? নাকি না? কেবল তুমিই দিতে পারো এর উত্তর। আমি কিন্তু ওয়াদানুযায়ী তোমার কথা শুনেছি।”
“আপনি যা বলেছেন মহারাজা, তা সত্য।” ব্যাকুল হয়ে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাইছেন ক্যালিসথিনস। “প্রতিটা শব্দই সত্য।” গলার স্বর প্রায় ফিসফিসের পর্যায়ে নামিয়ে জানালেন, “কিন্তু, মিশন এখনো শেষ হয়নি। যখন গোপন সেই স্থানে পৌঁছে নির্দেশ মত পানি পান করবেন তখুনি কেবল দেবতা হয়ে উঠবেন! এখন না।”
জ্বলে উঠল আলেকজান্ডারের চোখ, “তত তোমার ধারণা মায়ের দেয়া মানচিত্রের প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ না করা পর্যন্ত আমি দেবতা নই?”
চোখ নামিয়ে নিলেন ক্যালিসথিনস।
এর সঠিক ব্যাখ্যা করে আলেকজান্ডার ধরে নিলেন যে তার প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে “হ্যাঁ।”
“তাহলে দেবতা থেকে জাত আমার জন্ম? আমার মা কি মিথ্যে বলেছে যে সে জিউসের সাথে থেকেছে? তুমি জানো আমি ওই অপদার্থ ফিলিপের পুত্র হতে পারি না!” উচ্চারিত প্রতিটা শব্দের সাথে বেড়ে যাচ্ছে আলেকজান্ডারের রোষ। “আর সিউয়া’র অরাকলের শব্দ, তোমার কাছে সেসবের কোনো মানে নেই? এটাও মিথ্যে?”
কথা বলতে বলতে দুজন পার হয়ে এলেন একটা কাঠের টেবিল যেটিতে পায়ার উপরে ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে আছে একটা তামার তৈরি থালা। আক্রোশ থামাবার চেষ্টায় নিচু হয়ে থালাটাকে তুলে করিডোরে ছুঁড়ে মারলেন আলেকজান্ডার। “ক্যালিসথিনস, আমার জন্ম আর দেবত্ব নিয়ে কথা বলার তুমিই বা কে? একজন ইতিহাসবিদ বৈ তো আর কিছু নও! তোমার কাজ হচ্ছে ঘটনার রেকর্ড রাখা। যা ঘটছে ইতিহাস যেন তা জানতে পারে সেটা নিশ্চিত করা। বিচার করা নয়। কখনো ভুলবে না যে আমি তোমার রাজা। আমার হাতেই আছে তোমার জীবন। ঠিক আমার রাজ্যের অন্যান্য প্রজাদের মতন। যা এখন মেসিডোনিয়া থেকে ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা কি একজন দেবতার শক্তি নয়? জীবন কেড়ে নেয়া?”
